যুক্তরাষ্ট্র–ইরানের ঐতিহাসিক বৈঠকের অন্দরমহল কেমন ছিল

যুদ্ধ থামাতে দুই চিরশত্রু বসেছিল এক ছাদের নিচে। ইসলামাবাদের সেরেনা হোটেলকে রাতারাতি বদলে দেওয়া হয়েছিল ‘কূটনৈতিক দুর্গে’। লবির পাশের ছোট্ট ‘ফয়সালাবাদ রুম’ থেকে শুরু করে ত্রিভুজাকার টেবিল সাজানো বিশাল হল—সব প্রস্তুত ছিল ইতিহাস রচনার জন্য। কিন্তু ২১ ঘণ্টার ম্যারাথন আলোচনা শেষে কোনো চুক্তি না হওয়ায় সেই হল আর ব্যবহার করা হয়নি।

ইসলামাবাদের সেরেনা হোটেল। এখানেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে রুদ্ধদ্বার শান্তি আলোচনা চলেছেছবি: রয়টার্স

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদের মধ্যে বহুল আলোচিত ও ঐতিহাসিক বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়েছে পাকিস্তানের ইসলামাবাদের ‘সেরেনা হোটেল’-এ। আলোচনার সুবিধার্থে হোটেলের কক্ষগুলোকে সাজানো হয়েছিল বিশেষভাবে।

হোটেলের লবি–সংলগ্ন একটি ছোট কনফারেন্স রুম, যার নাম ‘ফয়সালাবাদ রুম’, সেখানেই মূল আলোচনা হয়। সাধারণত দাপ্তরিক কাজের জন্য এ কক্ষটি ব্যবহৃত হলেও বৈঠকের সময় সরিয়ে ফেলা হয় এর ভেতরে থাকা বড় টেবিল ও চেয়ারগুলো। সেখানে প্রতিনিধিদের বসার জন্য ব্যবস্থা করা হয় আরামদায়ক সোফা ও লাউঞ্জ সিটিংয়ের।

পুরো হোটেলকে তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ করা হয়েছিল। একটি অংশ বরাদ্দ ছিল মার্কিন প্রতিনিধিদের জন্য, একটি ইরানিদের জন্য এবং অন্য অংশটি ছিল যৌথ আলোচনার জন্য।

হোটেলের নিচতলার একটি কক্ষকে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের ব্যক্তিগত অফিসে রূপ দেওয়া হয়েছিল। অন্যদিকে ইরানের প্রতিনিধিদলের প্রধান দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিও হোটেলের একটি কক্ষকে অফিস হিসেবে ব্যবহার করেছেন।

তবে ইরানি প্রতিনিধিরা হোটেলে কাজ করলেও তাঁরা অবস্থান করেন পাশের ‘ম্যারিয়ট হোটেল’-এ।

সেরেনা হোটেলের একটি বড় হলে বিশাল ত্রিভুজাকার টেবিল বসানো হয়েছিল। যদি কোনো চুক্তি সই হতো, তবে এ হলেই তা ঘোষণা করার কথা ছিল। তবে কোনো সমঝোতা না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত হলটি আর ব্যবহার করা হয়নি।

নিরাপত্তার জন্য হোটেলের ভেতর মোবাইল ফোনের ব্যবহার ছিল নিষিদ্ধ। আলোচনার পুরো সময় হোটেলকে সাধারণ অতিথিদের জন্য বন্ধ রেখে একটি সুরক্ষিত দুর্গে পরিণত করা হয়েছিল।

আরও পড়ুন

প্রসঙ্গত, সেরেনা হোটেলটি ২০০২ সালে উদ্বোধন করা হয়। প্রায় ১৫ একর জমির ওপর ৪০০টির বেশি কক্ষ ও একাধিক কনফারেন্স হল নিয়ে এটি ইসলামাবাদের সবচেয়ে নিরাপদ হোটেলগুলোর একটি। এটি ইসলামাবাদের সুরক্ষিত ‘রেড জোন’–এ অবস্থিত, যেখানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং বিভিন্ন দেশের দূতাবাস রয়েছে।

সেরেনা হোটেলের একটি বড় হলে বিশাল ত্রিভুজাকার টেবিল বসানো হয়েছিল। যদি কোনো চুক্তি সই হতো, তবে এ হলেই তা ঘোষণা করার কথা ছিল। তবে কোনো সমঝোতা না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত হলটি আর ব্যবহার করা হয়নি।

বৈঠকের পুরো সময় হোটেলের প্রায় সব কর্মীকে নির্দিষ্ট কিছু তলায় সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছিল অথবা হোটেল থেকে বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। দায়িত্বরত যাঁরা ছিলেন, তাঁদের নিরাপত্তা যাচাই করে ভেতরে রাখা হয়। এক কর্মী বলেছেন, ‘গোটা বিশ্বের দৃষ্টি সেরেনার দিকে ছিল, এটা বড় সম্মানের। তবে স্বাভাবিক কাজে ফিরতে পেরে স্বস্তি লেগেছে।’

আলোচনার পুরো সময় পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির রাতভর দুই দেশের প্রতিনিধিদলের মধ্যে বার্তা বহন করে চলছিলেন। তাঁকেই মূল মধ্যস্থতাকারী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

আরও পড়ুন

বৈঠক শেষ হওয়ার পরও গত রোববার রাতে হোটেলটিতে ছিল মার্কিন ও পাকিস্তানি নিরাপত্তাকর্মীদের ভিড়। এ ছাড়া মার্কিন দলের কিছু নিম্নপদস্থ সদস্য তখনো হোটেলে ছিলেন।

নিরাপত্তার জন্য হোটেলটির ভেতর মোবাইল ফোনের ব্যবহার ছিল নিষিদ্ধ। আলোচনার পুরো সময় হোটেলকে সাধারণ অতিথিদের জন্য বন্ধ রেখে একটি সুরক্ষিত দুর্গে পরিণত করা হয়েছিল।

বৈঠক শেষ হওয়ার পরদিন সোমবার সকালে ফয়সালাবাদ রুমে আবার কনফারেন্স টেবিল ও চেয়ার সাজানো হয়। প্রতিটি আসনের সামনে রাখা হয় কাগজ ও কলম। আর তা ছিল পরবর্তী বৈঠকের প্রস্তুতিস্বরূপ।

{তথ্যসূত্র: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস, রয়টার্স, আল–জাজিরা ও দ্য ন্যাশনাল}

আরও পড়ুন