হরমুজ প্রণালি খুলতে বড় কিছু ছাড় দিতে হচ্ছে ট্রাম্পকে
ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য চুক্তিকে যুগান্তকারী হিসেবে অভিহিত করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। অবশ্য তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন, এটি ‘এখনো পুরোপুরি চূড়ান্ত হয়নি।’ তবে পরমাণু জ্বালানির মজুত, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ এবং ক্ষেপণাস্ত্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে এখনো কোনো আলোচনাই হয়নি।
এসব চুক্তি হয়তো পরে হতে পারে—সম্ভবত কয়েক মাসের মধ্যে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পরমাণু আলোচনার জন্য নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়নি। ইরানের সঙ্গে আলোচনার অতীত ইতিহাস বিবেচনা করলে এতে আরও অনেক বেশি সময়ও লাগতে পারে। তবে আপাতত ট্রাম্প এমন একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে পেরেছেন, যা যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বৃদ্ধি করতে পারে এবং হরমুজ প্রণালি আবার সচল করতে পারে; যা আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জ্বালানিসংকটের অবসান ঘটাবে।
পাকিস্তানি জেনারেল আসিম মুনিরের মধ্যস্থতায় ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার এই খাদের কিনারে থাকা আলোচনা থেকে সবচেয়ে বড় ইতিবাচক যে খবরটি এসেছে, তা হলো—যে সংঘাতটি খুব সহজেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারত, তা এখন প্রশমিত হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও ইরানের সর্বোচ্চ নেতা—উভয়েই যদি এই চুক্তির চূড়ান্ত খসড়া অনুমোদন করেন, তবে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল পরিবহনের এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি আবার উন্মুক্ত হবে।
আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের মুখে পড়তে যাওয়া রিপাবলিকানদের জন্য এটি একটি বড় স্বস্তির খবর। কারণ, দেশটিতে প্রতি গ্যালন পেট্রোলের দাম যখন ৪ দশমিক ৫০ ডলারের কাছাকাছি ঘোরাফেরা করছে।
অথচ মাত্র ১১ সপ্তাহ আগে যে প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেছিলেন, ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ ছাড়া ইরানের সঙ্গে কোনো চুক্তি হবে না’, তাঁর চলতি সপ্তাহান্তে ঘোষিত চুক্তিটি সেই অবস্থানের চেয়ে অনেক দূরে। এমনকি তাঁর সুরও এখন অনেকটাই নরম।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘আলোচনা সুশৃঙ্খল ও গঠনমূলকভাবে এগিয়ে চলছে এবং আমি আমার প্রতিনিধিদের চুক্তির জন্য তাড়াহুড়া না করতে নির্দেশ দিয়েছি; কারণ, সময় আমাদের পক্ষে রয়েছে।’
তবে ট্রাম্প মূলত ইরানের সেই দাবির কাছেই নতিস্বীকার করেছেন, যেখানে সবচেয়ে কঠিন বিষয়গুলোকে পরের জন্য তুলে রাখার কথা বলা হয়েছিল। অবশ্য এর বিনিময়ে তিনি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে ইরানিদের অবরোধ অন্তত সাময়িকভাবে হলেও তুলে দিতে বাধ্য করতে সফল হয়েছেন।
শেষ পর্যন্ত দুই পক্ষেরই পিছু হটা ছাড়া উপায় ছিল না। তারা তাদের সামনে থাকা খারাপ বিকল্পগুলোর মধ্যে তুলনামূলক কম ক্ষতিকরটি বেছে নিয়েছে। তবে এর ফলে পরিস্থিতি কেবল গত ২৮ ফেব্রুয়ারির আগের অবস্থায় ফিরে যাচ্ছে, যেদিন ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি চিরতরে বন্ধ করার জন্য আগ্রাসন শুরু করেছিলেন।
এখন পর্যন্ত তারা সেই লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছেন। ইরানের কাছে এখনো ১১ টনের বেশি পারমাণবিক জ্বালানি রয়েছে, যার মধ্যে ৯৭০ পাউন্ড বোমা তৈরির উপযুক্ত—যদিও তা ভূগর্ভের গভীরে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে। এ ছাড়া ইরানে সরকার উৎখাত করে সাবেক কট্টরপন্থী প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদকে ক্ষমতায় বসানোর যে প্রাথমিক অভ্যুত্থান পরিকল্পনা ছিল, তা–ও বাস্তবে রূপ নেয়নি।
মাত্র ১১ সপ্তাহ আগে ট্রাম্প ঘোষণা করেছিলেন, ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ ছাড়া ইরানের সঙ্গে কোনো চুক্তি হবে না। তবে বর্তমান চুক্তি সেই হুংকারের ধারেকাছেও নেই। ট্রাম্পের সুর এখন অনেক বদলে গেছে।
হরমুজ যদি আসলেই খুলে দেওয়া হয়, তবে ট্রাম্পের সহযোগীরা বলছেন যে তারা ইরানের সঙ্গে দ্বিতীয় ধাপের আলোচনা শুরু করার পরিকল্পনা করছেন, যেখানে যুদ্ধ শুরুর মূল কারণগুলো নিয়ে গুরুত্বসহকারে আলোচনা হবে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা গতকাল রোববার সাংবাদিকদের বলেন, ইরান ইতিমধ্যে তাদের ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত হস্তান্তর করতে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে—যে মজুত দিয়ে খুব অল্প সময়ের মধ্যে ডজনখানেক বোমা তৈরি করা সম্ভব।
তবে ইরান এই জ্বালানি হস্তান্তরের বিষয়ে প্রকাশ্যে কিছুই বলেনি, যা হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বন্ধ করার ক্ষমতার পাশাপাশি তাদের সবচেয়ে বড় দর-কষাকষির হাতিয়ার। মার্কিন ওই কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন, ইরান কীভাবে তাদের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ধ্বংস করবে, সেই সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়াটি এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মতে, আলোচনার শেষে ইরান তাদের বাকি ইউরেনিয়াম দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেবে কি না, তা–ও এখনো নিশ্চিত নয়।
যুক্তরাষ্ট্র আরও জানিয়েছে, ইরান নতুন পারমাণবিক জ্বালানি সমৃদ্ধকরণ সাময়িকভাবে স্থগিত করার বিষয়ে মৌখিকভাবে সম্মত হয়েছে। তবে মাত্র ৯ দিন আগে খোদ ট্রাম্প এয়ারফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, তেহরানের নেতারা ২০ বছরের জন্য এই কার্যক্রম স্থগিত রাখার প্রতিশ্রুতি থেকে পিছিয়ে গেছেন এবং বর্তমানে এই ইস্যুতে তাদের অবস্থান কী, তা স্পষ্ট নয়।
এ ছাড়া ইরান তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের আকার ও পাল্লার ওপর সীমাবদ্ধতা আরোপের বিষয়ে আলোচনা করতেও এখন পর্যন্ত অস্বীকৃতি জানিয়েছে। অথচ যুক্তরাষ্ট্র এই বিষয়ে জেদ ধরবে বলে জানিয়েছিল। ইসরায়েলের জন্য এটি একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। কারণ, তারা ইরানের অনেক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের নাগালের মধ্যে রয়েছে।
এসব সমস্যা সমাধানের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আত্মবিশ্বাস দেখানো হলেও, যেকোনো মুহূর্তে এই আলোচনা এবং নাজুক যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। গতকাল রোববার সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে মার্কিন কর্মকর্তা বারবার স্বীকার করেছেন, ইরান শেষ পর্যন্ত কী মেনে নেবে বা সর্বোচ্চ নেতা এতে আনুষ্ঠানিকভাবে সই করবেন কি না, তা তারা নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না।
তবে ওই কর্মকর্তা বলেন, প্রণালিটি আবার চালু হলে—যেখানে ইরান কোনো টোল নিতে পারবে না—তা অর্থনৈতিক চাপ দূর করবে, বাজারকে আশ্বস্ত করবে এবং পারমাণবিক সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনার সুযোগ তৈরি করবে। তিন মাস ধরে ইরান এই জলপথকে নিজেদের সার্বভৌম এলাকা বলে যে দাবি করে আসছিল—যা আগে আন্তর্জাতিক জলসীমা হিসেবে ব্যবহৃত হতো—সেটি যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে মোকাবিলা করবে, তা ওই কর্মকর্তা স্পষ্ট করেননি।
তবে ওই কর্মকর্তা এতটুকু বলেছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে এই চুক্তিটি ইরানের জন্য ‘পিছু হটা’। কারণ, তারা কোনো টোল আদায় করতে পারছে না।
রোববার বিকেলে ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে সংশয় বাড়িয়ে দিয়ে বলেন, ‘আমি যদি ইরানের সঙ্গে কোনো চুক্তি করি, তবে সেটি ২০১৫ সালে ওবামার করা চুক্তির মতো হবে না। তাঁর চুক্তি একটি ভালো এবং যথাযথ চুক্তিই হবে।’ ওবামার সেই চুক্তি ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রমকে সীমিত করলেও তা পুরোপুরি নির্মূল করতে পারেনি।
ট্রাম্প স্বীকার করেন, ‘আমাদের চুক্তিটি সম্পূর্ণ বিপরীত, কিন্তু এখনো কেউ এটি দেখেনি বা জানে না, এটি কী। এটি এমনকি এখনো পুরোপুরি চূড়ান্তও হয়নি। তাই, সেই পরাজিতদের কথা শুনবেন না, যারা নিজেরা কিছু না জেনেই সমালোচনা করছে।’
এই ‘পরাজিতদের’ তালিকায় ট্রাম্পের নিজের দলেরই অনেক প্রভাবশালী সদস্য রয়েছেন। রিপাবলিকান দলের ইরানবিরোধী কট্টরপন্থীরা বলছেন, ট্রাম্প চাপের মুখে নতিস্বীকার করেছেন এবং কাজটি শেষ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। অন্যতম কঠোর সমালোচক, সিনেট আর্মড সার্ভিসেস কমিটির চেয়ারম্যান রিপাবলিকান সিনেটর রজার উইকার সতর্ক করে বলেছেন, ‘এর ফলে “অপারেশন এপিক ফিউরির” মাধ্যমে অর্জিত সবকিছুই বৃথা যাবে।’
নয়াদিল্লিতে এক কূটনৈতিক সফরে থাকা মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘আপনি কাগজের টুকরায় লিখে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে পারমাণবিক সমস্যার সমাধান করতে পারবেন না। প্রণালিটি অবিলম্বে আবার চালু করতে হবে এবং তারপর আমরা নির্ধারিত রূপরেখার অধীনে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ, উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম এবং তাদের কখনো পারমাণবিক অস্ত্র না রাখার প্রতিশ্রুতির বিষয়ে অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে আলোচনায় বসব।’
এবার ট্রাম্প কেন তাঁর অবস্থান পরিবর্তন করলেন—এমন প্রশ্নের জবাবে মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, ইরান বেশ কিছু বিষয়ে ছাড় দিচ্ছে, তবে সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্তগুলো এখনো সামনে রয়ে গেছে।
বাকি দুটি রহস্য হলো—যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত ইরানের জব্দ করা শত শত কোটি ডলারের তহবিল অবমুক্ত করার দাবি কীভাবে মেটাবে এবং ইরানের তেল বিক্রি বা প্রযুক্তি ও পণ্য কেনার ওপর বছরের পর বছর ধরে জারি থাকা নিষেধাজ্ঞা কীভাবে প্রত্যাহার করবে।
মার্কিন কর্মকর্তা জানান, অর্থ সংকটে থাকা ইরানি সরকারের জন্য সবচেয়ে সংবেদনশীল এসব বিষয় নিয়ে এখনো কোনো আলোচনাই হয়নি। অবশ্য তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, এগুলো কোনো চুক্তির অংশ হতে পারে। তিনি ‘নো ডাস্ট, নো ডলারস’ (জ্বালানি ধ্বংস না হলে ডলার নয়) নীতি উল্লেখ করে বলেন—যা মূলত ট্রাম্পের ভাষায় ‘পারমাণবিক ধুলা’, যা দিয়ে তিনি ইসফাহানের পারমাণবিক স্থাপনায় থাকা উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামকে বোঝান, যেখানে গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র বোমা হামলা চালিয়েছিল।
ট্রাম্প আভাস দিয়েছেন, তিনি ইরানকে তাদের আটকে থাকা অর্থ কখনো ফেরত দেবেন না। এ সময় তিনি নিজেকে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সঙ্গে তুলনা করেন, যিনি ১৯৭০-এর দশকে ইরানের কেনা অস্ত্রের জন্য দেওয়া ১৭০ কোটি ডলার ফেরত দিয়েছিলেন, যা কখনো সরবরাহ করা হয়নি।
গত রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প লিখেন, ওবামা ‘ইরানকে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ এবং পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির একটি সহজ ও উন্মুক্ত পথ করে দিয়েছিলেন। আমাদের চুক্তিটি এর সম্পূর্ণ বিপরীত।’ তবে ট্রাম্প নিজেই যেমনটা স্বীকার করেছেন, এসব বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি।