ন্যাটো থেকে বের হয়ে যাওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে ভাবছেন ট্রাম্প
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ন্যাটো যোগ দিতে ব্যর্থ হওয়ায় এই সামরিক জোট থেকে বের হয়ে যাওয়ার কথা গুরুত্বের সঙ্গে ভাবছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেছেন। আজ বুধবার সাক্ষাৎকারটি প্রকাশ করা হয়েছে।
সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প ন্যাটোকে ‘কাগুজে বাঘ’ বলে মন্তব্য করে বলেন, এই সামরিক প্রতিরক্ষা জোট থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে একবার সরিয়ে নেওয়ার পর ইরান যুদ্ধ শেষে সেটিতে যোগ দেওয়ার কথা ‘পুনর্বিবেচনা’ করার প্রশ্নই আসে না।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আগ্রাসন শুরু করে। তখন থেকে ইরান বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি প্রায় বন্ধ করে দেয়। তা খুলতে সহযোগিতার জন্য মিত্রদেশগুলোকে সেখানে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন ট্রাম্প, কিন্তু তারা সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। ফলে ইউরোপকে আর নির্ভরযোগ্য প্রতিরক্ষা অংশীদার মনে করছে না যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্পের উল্লিখিত মন্তব্য সেটির সবচেয়ে বড় ইঙ্গিত।
এ সংঘাতের পর যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটোর সদস্যপদ পুনর্বিবেচনা করবে কি না—এ প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘ওহ হ্যাঁ, আমি বলব, এটি পুনর্বিবেচনার ঊর্ধ্বে। আমি কখনো ন্যাটোতে প্রভাবিত হইনি। আমি সব সময় জানতাম, ওরা একটা কাগুজে বাঘ। আর পুতিনও সেটা জানেন।’
সাধারণ সময়ে বিশ্বের ২০ শতাংশ জ্বালানি তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে সরবরাহ করা হয়। ইরান কার্যত প্রণালিটি বন্ধ রাখায় বিশ্বজুড়ে তেল ও গ্যাসের দাম বিপুলভাবে বেড়েছে। বিশ্বব্যাপী মন্দার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
ন্যাটোর বিষয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘আমাদের পাশে না থাকার বিষয়টি আসলে অবিশ্বাস্য ছিল। আমি তাদের খুব বেশি পীড়াপীড়ি করিনি। আমি শুধু বলেছিলাম, এই যে শোনো। এটা স্বয়ংক্রিয়ভাবে হবে, এমনটাই আমি ভেবে নিয়েছিলাম।’
ইউরোপের ন্যাটো সদস্যদের বিষয়ে অভিযোগের সুরে ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা ইউক্রেনসহ সব ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছি। ইউক্রেন আমাদের সমস্যা ছিল না। এটি ছিল একটি পরীক্ষা। আমরা তাদের পাশে ছিলাম। আমরা সব সময় তাদের পাশে থাকতাম, কিন্তু তারা আমাদের পাশে দাঁড়ায়নি।’
যুক্তরাজ্যের প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের সমালোচনা করেন ট্রাম্প। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় যোগ দিতে অস্বীকার করায় তিনি যুক্তরাজ্যের নৌবাহিনী বা ব্রিটিশ রয়্যাল নেভির সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
যুক্তরাজ্যের যুদ্ধজাহাজের বহরের অবস্থা উল্লেখ করে ট্রাম্প বলেন, ‘আপনাদের তো কোনো নৌবাহিনীই নেই। আপনারা বড্ড সেকেলে হয়ে গেছেন। আপনাদের এমন সব বিমানবাহী রণতরি আছে, যেগুলো কাজই করে না।’
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা খাতে আরও বেশি ব্যয় করা উচিত কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘কী করতে হবে, তা আমি তাঁকে বলতে যাচ্ছি না। তিনি যা চান, করতে পারেন। তাতে কিছু যায় আসে না। স্টারমার শুধু দামি সব উইন্ডমিল (বায়ুকল) চান, যা আপনাদের জ্বালানি খরচ হু হু করে বাড়িয়েছে।’
ট্রাম্পের এ মন্তব্যের পর স্যার কিয়ার স্টারমার ন্যাটোর প্রতি তাঁর সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি এটিকে ‘বিশ্বের এযাবৎকালের সবচেয়ে কার্যকর সামরিক জোট’ বলে মন্তব্য করেন।
ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতির এ সময়ে ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করার ইঙ্গিত দেন কিয়ার স্টারমার।
কিয়ার স্টারমার বলেন, ‘যতই শোরগোল হোক না কেন’, তিনি যুক্তরাজ্যের স্বার্থ অনুযায়ী কাজ করবেন। স্টারমার জোর দিয়ে বলেন, ‘এটি আমাদের যুদ্ধ নয় এবং আমরা এতে জড়াতে যাচ্ছি না।’
যুদ্ধে দীর্ঘদিনের মিত্রদের অবস্থান নিয়ে হোয়াইট হাউস ক্রমে হতাশ হয়ে পড়ছে। গতকাল মঙ্গলবার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও মিত্রদের ওপর ক্ষোভ ঝাড়েন।
ট্রাম্পের এই সাক্ষাৎকার প্রকাশের কয়েক ঘণ্টা আগে ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রুবিও বলেন, ইরান যুদ্ধ শেষ হলে যুক্তরাষ্ট্রকে ন্যাটোর সদস্যপদের বিষয়টি ‘আবার পর্যালোচনা’ করে দেখতে হবে।
ট্রাম্প টেলিগ্রাফকে বলেন, রুবিও এ মন্তব্য করায় তিনি ‘খুশি’ হয়েছেন।
ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে, তিনি জার্মানি থেকে মার্কিন সেনা সরিয়ে নেওয়ার কথাও ভাবছেন। গত বছর দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফেরার পর থেকে তিনি বিষয়টি নিয়ে ভাবছেন।
ইরান যুদ্ধে ন্যাটোর সহায়তা চেয়ে ট্রাম্পের আহ্বানে মিত্ররা কেন সাড়া দিচ্ছে না, তা নিয়ে নানা আলোচনা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্রাম্পের এ আহ্বানের পর ন্যাটোর ‘আর্টিকেল ৫’ আবার সামনে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, এক সদস্যদেশের ওপর আক্রমণ মানে সবার ওপর আক্রমণ।
এই আর্টিকেল বা ধারাটি ইতিহাসে মাত্র একবার কার্যকর করা হয়েছিল, ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের টুইন টাওয়ারে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার পর, যা সংক্ষেপে ৯/১১ হামলা নামে পরিচিত। টুইট টাওয়ার হামলার পর আফগান যুদ্ধে ন্যাটো যোগ দিয়েছিল। এ যুদ্ধে ১ হাজার ১০০ জনের বেশি অ–মার্কিন সেনা নিহত হয়েছিলেন। এর মধ্যে ৪৫৭ জন ছিলেন ব্রিটিশ সেনা।
ন্যাটোর আর্টিকেল ৫ কেবল তখনই প্রযোজ্য হয়, যখন কোনো ন্যাটোর সদস্যদেশ আক্রান্ত হয়। তাই এটি ইরান যুদ্ধের ক্ষেত্রে কার্যকর হবে না। কারণ, এ যুদ্ধ ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান আগ্রাসনের মাধ্যমে শুরু হয়েছে।