ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তের ভুক্তভোগী হবেন কারা

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পফাইল ছবি: এএফপি

বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য অভিবাসী ভিসা (ইমিগ্র্যান্ট ভিসা) প্রক্রিয়া স্থগিত করতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির কর্তৃপক্ষ এ সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে। ২১ জানুয়ারি থেকে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে। তবে পর্যটক বা স্বল্পমেয়াদি ভিসাধারীরা এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়বেন না।

এই স্থগিতাদেশের প্রভাব বাংলাদেশের সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার চার দেশ—পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ভুটান ও নেপালের ওপর পড়বে। সেই সঙ্গে লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চল, বলকান অঞ্চল, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কিছু দেশের নাগরিকদের ওপর পড়বে।

এই পরিবর্তন শুধু সেসব মানুষের ওপর প্রযোজ্য হবে, যাঁরা স্থায়ীভাবে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করতে চান। যাঁরা শুধু ভ্রমণ বা স্বল্পমেয়াদি ভিসায় দেশটিতে যেতে চান, তাঁদের ক্ষেত্রে এই নিয়ম কার্যকর হবে না।

আগামী পাঁচ মাস পর কানাডা ও মেক্সিকোর সঙ্গে যৌথভাবে ফিফা বিশ্বকাপ আয়োজন করতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। এমন সময়ে অভিবাসী, শরণার্থী, বিদেশি শিক্ষার্থী ও ভিসা আবেদনকারীদের ওপর একের পর এক কঠোর পদক্ষেপের কারণে পর্যটকদের প্রতি ট্রাম্প প্রশাসনের মনোভাব নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।

কী বলছে মার্কিন প্রশাসন

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, তারা ঘোষিত তালিকার দেশগুলোর নাগরিকদের অভিবাসী ভিসার আবেদনপ্রক্রিয়া বন্ধ রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের কনস্যুলেটগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে। এর আগে গত নভেম্বরে জারি করা একটি আদেশের ধারাবাহিকতায় এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়। ওই আদেশে যেসব সম্ভাব্য অভিবাসী যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আর্থিক বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারেন, তাঁদের যাচাই-বাছাইপ্রক্রিয়া আরও জোরদার করার কথা বলা হয়েছিল।

পররাষ্ট্র দপ্তর এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘ট্রাম্প প্রশাসন আমেরিকার অভিবাসনব্যবস্থার এমন অপব্যবহার বন্ধ করতে যাচ্ছে, যার মাধ্যমে একদল মানুষ আমেরিকান জনগণের সম্পদ শুষে নিচ্ছে।’

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘এই ৭৫টি দেশের অভিবাসী ভিসাপ্রক্রিয়া স্থগিত থাকবে। এই সময়ের মধ্যে পররাষ্ট্র দপ্তর তাদের অভিবাসনপ্রক্রিয়া পদ্ধতি পুনর্মূল্যায়ন করবে, যাতে এমন কোনো বিদেশি নাগরিক প্রবেশ করতে না পারেন, যাঁরা সরকারি জনকল্যাণমূলক তহবিল ও সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করতে পারেন।’

তালিকায় আছে কোন কোন দেশ

অভিবাসী ভিসা স্থগিত হতে যাওয়া ৭৫টি দেশ হলো আফগানিস্তান, আলবেনিয়া, আলজেরিয়া, অ্যান্টিগা ও বারবুডা, আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, বাহামাস, বাংলাদেশ, বার্বাডোজ, বেলারুশ, বেলিজ, ভুটান, বসনিয়া, ব্রাজিল, মিয়ানমার, কম্বোডিয়া, ক্যামেরুন, কেপ ভার্দে, কলম্বিয়া, আইভরি কোস্ট, কিউবা, কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র, ডোমিনিকা, মিসর, ইরিত্রিয়া, ইথিওপিয়া, ফিজি, গাম্বিয়া, জর্জিয়া, ঘানা, গ্রেনাডা, গুয়াতেমালা, গিনি, হাইতি, ইরান, ইরাক, জ্যামাইকা, জর্ডান, কাজাখস্তান, কসোভো, কুয়েত, কিরগিজস্তান, লাওস, লেবানন, লাইবেরিয়া, লিবিয়া, মেসিডোনিয়া, মলদোভা, মঙ্গোলিয়া, মন্টেনেগ্রো, মরক্কো, নেপাল, নিকারাগুয়া, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান, কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, রাশিয়া, রুয়ান্ডা, সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিস, সেন্ট লুসিয়া, সেন্ট ভিনসেন্ট অ্যান্ড গ্রেনাডিনস, সেনেগাল, সিয়েরা লিওন, সোমালিয়া, দক্ষিণ সুদান, সুদান, সিরিয়া, তানজানিয়া, থাইল্যান্ড, টোগো, তিউনিসিয়া, উগান্ডা, উরুগুয়ে, উজবেকিস্তান ও ইয়েমেন।

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের ম্যানহাটানে টাইমস স্কয়ার এলাকা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন পথচারীরা। ১৪ নভেম্বর ২০২২
ছবি: রয়টার্স

ভিসা স্থগিতের প্রক্রিয়াটি যেভাবে কাজ করবে

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ তালিকায় থাকা দেশগুলোর নাগরিকেরা অভিবাসী ভিসার আবেদন এখনো জমা দিতে পারবেন। তবে এই স্থগিতাদেশ চলাকালে কোনো অভিবাসী ভিসা অনুমোদন বা ইস্যু করা হবে না। এই স্থগিতাদেশ কবে নাগাদ তুলে নেওয়া হতে পারে, সে বিষয়ে মার্কিন সরকারের পক্ষ থেকে কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা জানানো হয়নি।

তবে দ্বৈত নাগরিকদের জন্য একটি বিশেষ সুযোগ থাকছে। যদি কোনো আবেদনকারী স্থগিতাদেশের তালিকায় নেই এমন কোনো দেশের বৈধ পাসপোর্ট ব্যবহার করে আবেদন করেন, তবে তিনি এই নিষেধাজ্ঞার আওতামুক্ত থাকবেন।

এই স্থগিতাদেশ নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, অস্থায়ী ভিসা, পর্যটন ভিসা কিংবা ব্যবসায়িক ভিসার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না।

আরও পড়ুন

অভিবাসন ঠেকাতে ট্রাম্পের নেওয়া অন্যান্য পদক্ষেপ

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ট্রাম্প প্রশাসন অভিবাসন আইন আরও কঠোর করেছে। বিশেষ করে যেসব দেশের তথ্য যাচাই (ভেটিং) প্রক্রিয়া শক্তিশালী নয় কিংবা যাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করা হয়, তাদের ওপর কড়াকড়ি বাড়ানো হয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর এসব দেশ থেকে অভিবাসন সীমিত করার পদক্ষেপ আরও বাড়িয়েছে।

গত বছর জানুয়ারিতে হোয়াইট হাউসের এক বিবৃতিতে জানানো হয়, সরকারি সম্পদের ওপর চাপ সৃষ্টি, নিরাপত্তা উদ্বেগ বা নবাগতদের মানিয়ে নেওয়ার জটিলতা এড়াতে যুক্তরাষ্ট্র বিপুলসংখ্যক অভিবাসী, বিশেষ করে শরণার্থী গ্রহণ করতে পারবে না।

গত জুন মাসে প্রশাসন এই পদক্ষেপের পরিসর আরও বাড়িয়ে ১২টি দেশের নাগরিকদের ওপর পূর্ণ ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। দেশগুলো হলো আফগানিস্তান, চাদ, কঙ্গো, নিরক্ষীয় গিনি, ইরিত্রিয়া, হাইতি, ইরান, লিবিয়া, মিয়ানমার, সোমালিয়া, সুদান ও ইয়েমেন।

অক্টোবরের মধ্যে হোয়াইট হাউস ২০২৬ অর্থবছরের জন্য শরণার্থী গ্রহণের সর্বোচ্চ সীমা মাত্র ৭ হাজার ৫০০ নির্ধারণ করে, যা যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সর্বনিম্ন। এই কোটা মূলত দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গ আফ্রিকানদের জন্য ব্যবহার করা হবে। দক্ষিণ আফ্রিকায় শ্বেতাঙ্গদের ওপর গণহত্যার ষড়যন্ত্রতত্ত্ব ফলাও করে প্রচার করেন ট্রাম্প, যা সত্য নয়। যদিও দেশটিতে সহিংস অপরাধের হার অনেক বেশি এবং সব বর্ণের মানুষই এর শিকার হয়ে থাকেন।

একই সময়ে ট্রাম্প প্রশাসন অন্য দেশে বসবাসরত শরণার্থীদের সহায়তায় পরিচালিত বৈদেশিক সাহায্য কর্মসূচিও কাটছাঁট করেন।

দক্ষ জনশক্তির অভিবাসন সীমিত করতেও পদক্ষেপ নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। এর উদ্দেশ্য হিসেবে মার্কিন নাগরিকদের জন্য কর্মসংস্থান সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে। গত সেপ্টেম্বরে এইচ-১বি ভিসার আবেদন ফি একলাফে ১ লাখ ডলারে উন্নীত করা হয়। এ ভিসা মার্কিন কোম্পানিগুলো বিদেশি কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যবহার করে।

গত নভেম্বরে ওয়াশিংটন ডিসিতে ন্যাশনাল গার্ডের দুই সদস্যকে গুলি করার ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে এক আফগান নাগরিক গ্রেপ্তার হওয়ার পর ভ্রমণের ওপর অতিরিক্ত বিধিনিষেধ জারি করে সরকার। আগে নিষিদ্ধ থাকা ১২টি দেশের তালিকায় আরও ছয়টি দেশকে যুক্ত করা হয়। নতুন যুক্ত হওয়া দেশগুলো হলো ফিলিস্তিন, বুরকিনা ফাসো, মালি, নাইজার, দক্ষিণ সুদান ও সিরিয়া।

এ ছাড়া অভিবাসন কর্মকর্তারা রাজনৈতিক আশ্রয় (অ্যাসাইলাম) সংক্রান্ত আবেদনগুলো স্থগিত করেন এবং প্রথমে নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়া দেশগুলোর নাগরিকদের নাগরিকত্ব ও গ্রিন কার্ডের আবেদন প্রক্রিয়া বন্ধ করে দেন।

আরও পড়ুন