ইরানে আবার ‘কঠোর’ আঘাত হানবে যুক্তরাষ্ট্র: ট্রাম্প

হোয়াইট হাউসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ৯ জুন ২০২৬ছবি: রয়টার্স

ইরানে ‘কঠোর’ আঘাত হানার ঘোষণা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মঙ্গলবার দিবাগত রাতে দুই পক্ষ পাল্টাপাল্টি হামলা চালানোর পর বুধবার এ ঘোষণা দেন তিনি।

ওয়াশিংটনের স্থানীয় সময় বুধবার ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা গতকাল তাদের ওপর কঠোর আঘাত হেনেছি এবং আজকেও তাদের ওপর কঠোর আঘাত হানতে যাচ্ছি।’ ইরানের প্রতি চুক্তিতে সই করারও আহ্বান জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

ট্রাম্পের এই ঘোষণার পর ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এক্সে এক পোস্টে বলেছেন, যে কোনো চাপ বা হুমকির বিরুদ্ধে ইরান কঠোরভাবে দাঁড়াবে।

হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের একটি সামরিক হেলিকপ্টার ভূপাতিত হওয়ার পর মঙ্গলবার দিবাগত রাতে মার্কিন বাহিনী ইরানের বিভিন্ন নিশানায় বিমান হামলা চালায়। জবাবে জর্ডান, কুয়েত ও বাহরাইনে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি লক্ষ্য করে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায় ইরান।

পাল্টাপাল্টি হামলার পর বুধবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, চুক্তির দর-কষাকষিতে ইরান সময় ক্ষেপণ করছে। এ জন্য দেশটিকে মূল্য দিতে হবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র বারবার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করছে অভিযোগ করে ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়, তারা ওয়াশিংটনের সঙ্গে ‘কূটনৈতিক যোগাযোগ’ পুনর্মূল্যায়ন করবে।

নতুন করে এই উত্তেজনার মধ্যেও ওয়াশিংটন ও তেহরানকে আলোচনায় ফেরাতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তারই অংশ হিসেবে বুধবার কাতারের একটি প্রতিনিধিদল ইরানের রাজধানী তেহরানে গেছে।

কূটনৈতিক একটি সূত্র সিএনএনকে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করে কাতারের প্রতিনিধিরা বাকি মতপার্থক্য কমিয়ে আনতে ইরানিদের সঙ্গে বৈঠক করতে বুধবার সকালে তেহরান পৌঁছান। মার্কিন এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আমি মনে করি, পাল্টাপাল্টি হামলা আলোচনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে না।’

মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশ্লেষক ইলাইজা ম্যাগনিয়ার আল-জাজিরাকে বলেন, কোনো পক্ষই ‘অন্তহীন’ যুদ্ধে জড়াতে চায় না। কারণ, এতে দুই পক্ষের বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল একযোগে ইরানে আগ্রাসন শুরু করে। এর ৪০ দিনের মাথায় ৮ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ওয়াশিংটন-তেহরান সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়। ১১ ও ১২ এপ্রিল পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে দুই দেশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রায় ২১ ঘণ্টার বৈঠক কোনো সমঝোতা ছাড়া শেষ হয়। এর পর থেকে তাদের মধ্যে দ্বিতীয় বৈঠকের চেষ্টা চলছে।

সাময়িক যুদ্ধবিরতির মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান পাল্টাপাল্টি হামলা চালালেও সেগুলো এবারের মতো এতটা বড় মাত্রায় ছিল না। তা ছাড়া ৮ এপ্রিলের পর গত রবি ও সোমবার ইরান-ইসরায়েলের মধ্যে প্রথমবারের মতো পাল্টাপাল্টি হামলা হয়।

২০ নিশানায় মার্কিন হামলা

সেন্টকম জানায়, মঙ্গলবার দিবাগত রাত তিনটার দিকে হরমুজ প্রণালির ওমান উপকূলে ইরানের ড্রোন হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের একটি অ্যাপাচি হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়। পরে প্রায় দুই ঘণ্টা অভিযান চালিয়ে দুই ক্রুকে নিরাপদে উদ্ধার করা হয়।

ওয়াশিংটনের ভাষ্যমতে, হেলিকপ্টার হারানোর প্রতিশোধ নিতে হরমুজ উপকূলে ইরানের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় প্রায় চার ঘণ্টা হামলা চালানো হয়। যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা বলেন, ইরানের প্রায় ২০টি নিশানায় হামলা চালানো হয়েছে।

ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জানায়, হরমুজ উপকূলে কেশম দ্বীপ ও সিরিক বন্দর এলাকায় যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালিয়েছে। ইরানের সংবাদমাধ্যমগুলো দেশটির বন্দরনগরী বন্দর আব্বাস ও হরমুজ প্রণালির প্রবেশমুখে জাস্কের কাছেও বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে।

আরও পড়ুন

২১ নিশানায় ইরানের পাল্টা জবাব

আইআরজিসি দাবি করেছে, মার্কিন হামলার জবাবে তারা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে বাহরাইন, কুয়েত ও জর্ডানে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোতে হামলা চালিয়েছে। মোট ২১টি নিশানায় এসব হামলা চালানো হয়েছে।

আইআরজিসি আরও জানায়, জর্ডানে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের আল-আজরাক ঘাঁটির চারটি স্থাপনায় তারা দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের হ্যাঙ্গার ও একটি কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রও ছিল।

ইরানের একটি ক্ষেপণাস্ত্র
ফাইল ছবি: আইআরজিসি/রয়টার্স

প্রাথমিক মূল্যায়নের কথা উল্লেখ করে যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা বলেন, ইরানের ছোড়া প্রায় সব ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করা হয়েছে। তাৎক্ষণিকভাবে হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতির কোনো খবর পাওয়া যায়নি।

জর্ডানের সামরিক বাহিনী জানায়, আল-আজরাক ঘাঁটির দিকে ছোড়া পাঁচটি ক্ষেপণাস্ত্র তারা ভূপাতিত করেছে। এতে কোনো হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেনি।

কুয়েত ও বাহরাইন আকাশপথে হামলা প্রতিহতের কথা জানিয়েছে। কুয়েতে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বড় বিমানঘাঁটিসহ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনা রয়েছে। আর বাহরাইনে রয়েছে এ অঞ্চলে মার্কিন নৌবাহিনীর সদর দপ্তর।

আরও পড়ুন

ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলার হুমকি

যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতুর মতো ইরানের বেসামরিক স্থাপনায় হামলার হুমকি দিয়ে আসছেন ট্রাম্প। বুধবার তিনি একই হুমকির পুনরাবৃত্তি করে ফক্স নিউজকে বলেন, তেহরান চুক্তিতে সই করতে রাজি না হলে তিনি ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতুগুলোকে লক্ষ্য করে নতুন হামলার নির্দেশ দিতে পারেন।

এদিন প্রায় আধা ঘণ্টার ব্যবধানে নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ইরান নিয়ে দুটি পোস্ট দেন ট্রাম্প। প্রথমটিতে ট্রাম্প দর-কষাকষিতে দেরি করায় ইরানকে মূল্য চোকাতে হবে উল্লেখ করে লেখেন, ‘ইরানের সামরিক বাহিনী পুরোপুরি বিশৃঙ্খল অবস্থায় রয়েছে। তাদের নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর বড় অংশের কার্যত আর কোনো অস্তিত্বই নেই।...মধ্যপ্রাচ্যের মোড়লের মৃত্যু ঘটেছে।’

পরের পোস্টে ট্রাম্প দাবি করেন, ‘ইরান কোনো ব্যবসাই করতে পারছে না, তারা সামরিক বাহিনীর বেতন বা অন্য কোনো বিল পরিশোধ করতে পারছে না। তারা দ্রুত একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে।’

আমাদের অঞ্চল ছেড়ে যান: আরাগচি

ওয়াশিংটনের সঙ্গে তেহরানের কূটনৈতিক যোগাযোগ পুনর্মূল্যায়ন করার কথা উল্লেখ করে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, যেকোনো কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার জন্য ন্যূনতম একটি স্থিতিশীল পরিবেশ থাকা প্রয়োজন।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি মঙ্গলবার রাতে এক্সে এক পোস্টে লেখেন, ‘যুদ্ধক্ষেত্রে পরাজয়ের মুখোমুখি হওয়ার পরও যুক্তরাষ্ট্র আমাদের দৃঢ়তা ও সংকল্পকে পরীক্ষা করার পথ বেছে নিয়েছে। আমাদের শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনী যেকোনো হামলা বা হুমকির জবাব দেবে। নিরাপদ থাকতে চাইলে আমাদের অঞ্চল ছেড়ে চলে যান।’