ট্রাম্পের পদক্ষেপে ‘চোখ–কান’ হারাচ্ছে সমুদ্র গবেষণা

পৃথিবীর পৃষ্ঠের ৭০ শতাংশের বেশি অংশ জুড়ে রয়েছে মহাসাগর। এই মহাসাগর থেকে আসে পৃথিবীর অক্সিজেনের অন্তত ৫০ শতাংশ। তাই মানবজাতির টিকে থাকা এর ওপর অনেকটাই নির্ভর করে। এই মহাসাগর গবেষণা বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্যও মহা গুরুত্বপূর্ণ। এই বিষয়ে সচেতনতায় ৮ জুন পালিত হয় বিশ্ব মহাসাগর দিবস। ২০২৬ সালে দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘পুনঃকল্পনা’। অর্থাৎ নতুন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে মহাসাগরের প্রতিবেশ আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আসা। এ জন্য গবেষণা জরুরি। কিন্তু তাতে বাদ সেধেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পদক্ষেপ।

টানা বৃষ্টির ফাঁকে আকাশ কিছুটা পরিষ্কার হয়ে এসেছে। এমন সময় প্রশান্ত মহাসাগরের দিকে তাকিয়ে আছেন এক নারী। ভেনিস পিয়ার, দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়া, যুক্তরাষ্ট্র। ২৫ ডিসেম্বর, ২০২৫ছবি: এএফপি

জলবায়ু সংকট ও সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র বুঝতে অত্যন্ত জরুরি সামুদ্রিক পর্যবেক্ষণব্যবস্থা ভেঙে দেওয়ার পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। ইউরোপীয় ও মার্কিন বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন, এই পদক্ষেপের ফলে আবহাওয়ার পূর্বাভাস এবং এল নিনোর পূর্বাভাসের সঠিকতা ‘মারাত্মকভাবে কমে যাবে’। অর্থনৈতিক খেসারত দিতে হবে খোদ যুক্তরাষ্ট্রকেও।

গত মাসে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, বৈশ্বিক সমুদ্র পর্যবেক্ষণ নেটওয়ার্কে যুক্তরাষ্ট্রের এই ব্যবস্থাটি বড় ভূমিকা রাখে। এটি বন্ধ করে দিলে মহাসাগরগুলোর উষ্ণতা বৃদ্ধির বার্ষিক হিসাবে ভুলের মাত্রা ব্যাপকভাবে বেড়ে যাবে।

গ্লোবাল ক্লাইমেট অবজারভিং সিস্টেমের (বৈশ্বিক সমুদ্র পর্যবেক্ষণব্যবস্থা) সমুদ্রবিশেষজ্ঞ প্যানেলের প্রধান সাবরিনা স্পাইক। তিনি প্যারিসের ইকোলে নরমাল সুপেরিয়রের (ইএনএস) বৈশ্বিক সমুদ্র পর্যবেক্ষণবিষয়ক বিশেষজ্ঞও। সাবরিনা স্পাইকের মতে, ট্রাম্পের পদক্ষপের ফলে ঝড়, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঘূর্ণিঝড় এবং এল নিনোর পূর্বাভাস ও আগাম সতর্কতাব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়বে। কখনো কখনো এই দুর্বলতা ‘বিপজ্জনক রূপ’ নিতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশন এই ‘ওশান অবজারভেটরিজ ইনিশিয়েটিভ’ (ওওআই) পরিচালনা করে। এটি মূলত সমুদ্রের তলদেশ, পানির নিচের গ্লাইডার ও ভাসমান প্ল্যাটফর্মের এক বিশাল নেটওয়ার্ক। এই নেটওয়ার্ক থেকে সারা বিশ্বের গবেষক, নীতিনির্ধারক, শিক্ষক ও নাবিকেরা নিয়মিত তথ্য পেয়ে থাকেন।

যুক্তরাষ্ট্রের উপকূল থেকে শুরু করে উত্তর আটলান্টিক ও দক্ষিণ মহাসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত এই ব্যবস্থা। সামুদ্রিক দাবদাহ, ক্ষতিকর শৈবালের বিস্তার, সাবডাকশন জোনের ভূমিকম্প, সমুদ্রের অম্লতা বৃদ্ধি এবং মৎস্যসম্পদের ওঠানামা নিয়ে গবেষণায় এটি ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশন ‘ওশান অবজারভেটরিজ ইনিশিয়েটিভ’ (ওওআই) পরিচালনা করে। এটি মূলত সমুদ্রের তলদেশ, পানির নিচের গ্লাইডার ও ভাসমান প্ল্যাটফর্মের এক বিশাল নেটওয়ার্ক। এই নেটওয়ার্ক থেকে সারা বিশ্বের গবেষক, নীতিনির্ধারক, শিক্ষক ও নাবিকেরা নিয়মিত তথ্য পেয়ে থাকেন।

এই ব্যবস্থাটি বাতিল করলে ‘গ্লোবাল ওশান অবজারভিং সিস্টেম’ (গস) তার একটি প্রধান অংশ হারাবে। রোবোটিক ফ্লোট, ভাসমান বয়া ও গবেষণা জাহাজের এই নেটওয়ার্ককে বিশেষজ্ঞরা সমুদ্রের ‘চোখ ও কান’ বলে থাকেন। তাঁরা বলছেন, এই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি সতর্কতাব্যবস্থা মানুষের ‘জীবন বাঁচায়’।

গস মূলত আবহাওয়া ও জলবায়ুবিষয়ক সামুদ্রিক তথ্যের জন্য জাতিসংঘের সমন্বয়ে তৈরি একটি কাঠামো। বিভিন্ন দেশ এতে তথ্য সরবরাহ করে। গত মাসে ‘নেচার ক্লাইমেট চেঞ্জ’ জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখানো হয়েছে, গস-এর তথ্য হারালে সমুদ্রের তাপমাত্রার হিসাব কীভাবে ব্যাহত হতে পারে। অথচ এই তাপমাত্রার হিসাবের ওপর ভিত্তি করেই আবহাওয়ার পূর্বাভাস, এল নিনোর পূর্বাভাস ও মৎস্য ব্যবস্থাপনার কাজ চলে।

গবেষণায় দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের পর্যবেক্ষণব্যবস্থাটি হারালে যে ক্ষতি হবে, তা সারা বিশ্বের ৮০ শতাংশ সামুদ্রিক তথ্য এলোমেলোভাবে হারিয়ে যাওয়ার চেয়েও ভয়াবহ। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়নে পরিচালিত প্ল্যাটফর্মগুলো প্রতিটি মহাসাগরীয় অববাহিকায় বিস্তৃত। বিশ্বের অন্য কোনো দেশ বর্তমানে এই শূন্যস্থান পূরণ করতে পারছে না।

গবেষণাপত্রের সহ-লেখক স্পাইক বলেন, ‘সমুদ্রের তাপমাত্রাই জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সূচক। এটি শুধু সমুদ্রের ভেতরের অবস্থা নয়, বরং পুরো জলবায়ু–ব্যবস্থার চিত্র তুলে ধরে।’

ওওআই ব্যবস্থাটি বাতিল করলে ‘গ্লোবাল ওশান অবজারভিং সিস্টেম’ (গস) তার একটি প্রধান অংশ হারাবে। রোবোটিক ফ্লোট, ভাসমান বয়া এবং গবেষণা জাহাজের এই নেটওয়ার্কটিকে বিশেষজ্ঞরা সমুদ্রের ‘চোখ ও কান’ বলে থাকেন। তাঁরা বলছেন, এই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি সতর্কতাব্যবস্থা মানুষের ‘জীবন বাঁচায়’।

স্পাইক আরও বলেন, সমুদ্রের গভীরতা অনুযায়ী তাপমাত্রার যে মাপজোখ নেওয়া হয়, তা তথ্য সংগ্রহের সবচেয়ে সহজ পদ্ধতিগুলোর একটি। এই তথ্যগুলো হারালে শুধু সমুদ্রের উষ্ণতা বৃদ্ধির হিসাবই হারাবে না, বরং পুরো জলবায়ু–ব্যবস্থায় নজরদারির সক্ষমতা হারাবে। কারণ, এই পর্যবেক্ষণ থামিয়ে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ সূচক আর পাওয়া যাবে না।

স্পাইক বলেন, ‘পূর্বাভাস দেওয়ার কাজ হয়তো চলবে। তবে এর মান কমে যাবে, যা কখনো কখনো বিপদের কারণ হতে পারে। শুধু বায়ুমণ্ডলের পর্যবেক্ষণ যথেষ্ট নয়। গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঝড়, ঘূর্ণিঝড় এবং এল নিনোর আগাম সতর্কতাব্যবস্থার মূল ভিত্তিই হলো সমুদ্রের ডেটা।’

স্পাইক আরও বলেন, ‘এর পরিণতি শুধু বিজ্ঞানের জগতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। যুক্তরাষ্ট্রের নিজেদেরই বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতি হবে। কৃষি খাত থেকে শুরু করে বিমা প্রতিষ্ঠান ও দুর্যোগ মোকাবিলা খাত—সব জায়গাতেই এই প্রভাব পড়বে।’

স্পাইক সতর্ক করে বলেন, যে বছর এল নিনো এবং চরম আবহাওয়ার পূর্বাভাস থাকে, সে বছর যুক্তরাষ্ট্রের এই তথ্যগুলো না থাকলে দুর্যোগের আগাম পরিস্থিতি স্পষ্টভাবে বোঝা যাবে না। ফলে সময়মতো প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার সক্ষমতাও হারাবে বিশ্ব। এর বাস্তব ঝুঁকি একেবারেই স্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্র এবং পুরো দক্ষিণ আমেরিকার কৃষকেরা এল নিনোর পূর্বাভাসের ওপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত নেন কখন কোন ফসল বুনতে হবে। খরা নাকি বন্যা হতে পারে, সেই ধারণার ওপর ভিত্তি করেই মাসখানেক আগে সব কৃষিকাজের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

২০২৩-২৪ সালের এল নিনোটি ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী পাঁচটি এল নিনোর একটি। ২০২৪ সালে বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধির যে রেকর্ড হয়েছে, তার পেছনেও এর বড় প্রভাব ছিল।

স্পাইক ও তাঁর সহকর্মীদের গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু যুক্তরাষ্ট্রের এই পর্যবেক্ষণব্যবস্থাটি সরিয়ে নিলে বার্ষিক সমুদ্র উষ্ণতা বৃদ্ধির হিসাবে ভুলের মাত্রা ১৬৩ শতাংশ বেড়ে যেতে পারে।

এদিকে গত বৃহস্পতিবার ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) জানিয়েছে, বিশ্বের মহাসাগরগুলো পর্যবেক্ষণে তারা নিজস্ব সক্ষমতা বাড়াতে যাচ্ছে। ‘ওশানআই’ নামের এই উদ্যোগে ১০ কোটি ৭০ লাখ ডলার বিনিয়োগ করবে তারা। এর অর্ধেকের বেশি অর্থ যাবে গস-এর তহবিলে। ইউরোপীয় কমিশনের এই ঘোষণাটি আগে থেকেই পরিকল্পিত ছিল, এটি যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের কোনো সরাসরি প্রতিক্রিয়া নয়।

মিনেসোটার ইউনিভার্সিটি অব সেন্ট টমাসের প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও এই গবেষণার সহ-লেখক জন পি আব্রাহাম। ৩৬ কোটি ৮০ লাখ ডলারের ওওআই সিস্টেম ভেঙে ফেলার মার্কিন প্রশাসনের এই পদক্ষেপকে তিনি ‘সামান্য টাকা বাঁচাতে গিয়ে বিশাল ক্ষতি ডেকে আনা’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।

আব্রাহাম বলেন, ‘সমুদ্রের চোখ-কান হিসেবে পরিচিত এই সেন্সরগুলোর পেছনে এক বিলিয়ন ডলারের কম খরচ বাঁচাতে চাইছে মার্কিন সরকার। অথচ প্রতিবছর আমাদের শত শত বিলিয়ন ডলারের জলবায়ুজনিত ক্ষতি মোকাবিলা করতে হয়। যুক্তরাষ্ট্রে আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড় ও ঝড়ের কারণে হওয়া ক্ষতির তুলনায় এই পর্যবেক্ষণব্যবস্থার খরচ একেবারেই নগণ্য।’

১৯৮০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে ৪০০টির বেশি জলবায়ু ও আবহাওয়া বিপর্যয়ের ঘটনা ঘটেছে। এর প্রতিটিতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ছিল এক বিলিয়ন বা ১০০ কোটি ডলারের বেশি। শুধু ২০২৪ সালেই এমন বিপর্যয়ে ১৭ হাজার ৭০০ কোটি ডলারের ক্ষতি হয়েছে।

ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফিয়ারিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (নোয়া) এই বিলিয়ন ডলারের জলবায়ু ও আবহাওয়াবিষয়ক ডেটাবেজ পরিচালনা করে। সংস্থাটির ওয়েবসাইটে দেওয়া এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ‘অগ্রাধিকার পরিবর্তনের’ কারণে এই তথ্যভান্ডার আর হালনাগাদ করা হবে না।

আব্রাহাম বলেন, এই পর্যবেক্ষণব্যবস্থাটি মূলত ‘জলবায়ুজনিত ক্ষতি কমানোর ক্ষেত্রে বেশ সস্তা একটি উপায়’ ছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের পর্যবেক্ষণব্যবস্থাটি হারালে যে ক্ষতি হবে, তা সারা বিশ্বের ৮০ শতাংশ সামুদ্রিক তথ্য এলোমেলোভাবে হারিয়ে যাওয়ার চেয়েও ভয়াবহ। যুক্তরাষ্ট্রের নিজেদেরই বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতি হবে। কৃষি খাত থেকে শুরু করে বিমা প্রতিষ্ঠান ও দুর্যোগ মোকাবিলা খাত—সব জায়গাতেই এই প্রভাব পড়বে।’

আব্রাহাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এটি আসলে টাকা বাঁচানোর কোনো বিষয় নয়, এটি হলো জলবায়ুবিজ্ঞানের গবেষণাকে ধ্বংস করার পাঁয়তারা।’

সামান্থা বার্জেস ইউরোপীয় ইউনিয়নের আর্থ অবজারভেশন সিস্টেম ‘কোপার্নিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিস’ (সি৩এস)-এর কৌশলগত জলবায়ু প্রধান। তিনি বলেন, সমুদ্র পর্যবেক্ষণব্যবস্থা ‘অপরিহার্য’। কারণ, মহাকাশ থেকে গভীর সমুদ্র দেখা যায় না। ভয়ংকর ঝড়ের আগাম সতর্কতা দিয়ে এই ব্যবস্থা মানুষের ‘জীবন বাঁচায়’।

চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে ওওআই-এর অর্থায়ন ও তদারককারী প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশন একটি বিবৃতি দিয়েছে। তারা জানিয়েছে, এই কর্মসূচি পুরোপুরি বাতিল করা হচ্ছে না। এটিকে তারা কাজের পরিধি কমানো হিসেবে উল্লেখ করেছে। তবে তথ্য সংগ্রহের ঠিক কতটা সক্ষমতা অবশিষ্ট থাকবে, তা স্পষ্ট করা হয়নি।

বার্জেস বলেন, ‘পরিবর্তনশীল এই বিশ্বে ঝুঁকি কমানোর জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে সেরা পর্যবেক্ষণব্যবস্থা পাওয়াটা আমাদের জন্য জরুরি। সমুদ্রের তথ্য ছাড়া আমরা আসলে অন্ধের মতো পথ চলছি।’