ইতিহাসের ভয়াবহ জ্বালানি–সংকটের মুখে বিশ্ব, সতর্কবার্তা আইইএ প্রধানের

অস্ট্রেলিয়ার ক্যানবেরায় ন্যাশনাল প্রেসক্লাবে এক অনুষ্ঠানে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) প্রধান ফাতিহ বিরোল। ২৩ মার্চ ২০২৬ছবি: রয়টার্স

ইরানের যুদ্ধ বিশ্বকে ভয়াবহ জ্বালানি–সংকটের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে বলে হুঁশিয়ার করেছেন আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) প্রধান ফাতিহ বিরোল। তিনি বলেছেন, গত শতকের সত্তরের দশক এবং কয়েক বছর আগের ইউক্রেন যুদ্ধ যে জ্বালানি–সংকট তৈরি করেছিল, সেই দুই ঘটনা যোগ করলেও এবারের পরিস্থিতির সমান হবে না। কিন্তু বিশ্বের নীতিনির্ধারকেরা এই সমস্যার গভীরতা এখনো পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারছেন না।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ ২৪ দিনে গড়ানোর মধ্যে আজ সোমবার অস্ট্রেলিয়ার ক্যানবেরায় ন্যাশনাল প্রেসক্লাবে এক অনুষ্ঠানে এই সতর্কবার্তা দেন আইইএর নির্বাহী পরিচালক ফাতিহ বিরোল।

ফাতিহ বিরোল বলেন, ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার কারণে বর্তমানে ভয়াবহ জ্বালানি–সংকট তৈরি হয়েছে। এটা ১৯৭৩ ও ১৯৭৯ সালের ধাক্কা এবং ২০২২ সালে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের ফলে সৃষ্ট গ্যাস–সংকটকেও ছাড়িয়ে গেছে।

জ্বালানি তেলসমৃদ্ধ আরব দেশগুলো ১৯৭৩ সালে ইসরায়েলের বন্ধুরাষ্ট্রগুলোতে তেল বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা দিলে বিশ্বের জ্বালানি বাজারে তার ধাক্কা লাগে। তার ছয় বছর পর ১৯৭৯ সালে জ্বালানি তেল উৎপাদনকারী শীর্ষস্থানীয় দেশ ইরানে ইসলামী বিপ্লবের পর আবার জ্বালানির বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়। এরপর ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর রাশিয়ার ওপর নানা নিষেধাজ্ঞায় জ্বালানির বিশ্ববাজার আবার অস্থির হয়ে ওঠে।

হরমুজ প্রণালি প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং জ্বালানি স্থাপনায় হামলার কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেল সরবরাহ প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ১ লাখ ব্যারেল কমেছে।

সেই সময়গুলোর সঙ্গে তুলনা করে আইইএর প্রধান বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে মনে হচ্ছে, যেন ওই দুটি তেল–সংকট ও একটি গ্যাস–সংকট একসঙ্গে ঘটেছে।’

ফাতিহ বিরোল জানান, হরমুজ প্রণালি প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং জ্বালানি স্থাপনায় হামলার কারণে বিশ্বে জ্বালানি তেল সরবরাহ প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ১ লাখ ব্যারেল কমেছে। এর মাত্রা সত্তরের দশকের সংকটের দ্বিগুণের বেশি। বর্তমান সংকটের কারণে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) সরবরাহ কমেছে প্রায় ১৪ হাজার কোটি কিউবিক মিটার। অথচ ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে এই ঘাটতি ছিল প্রায় সাড়ে ৭ হাজার কোটি কিউবিক মিটার।

আইইএর প্রধান আরও বলেন, চলমান যুদ্ধে ৯টি দেশের অন্তত ৪০টি জ্বালানি স্থাপনা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাঁর ভাষ্যে, ‘বিশ্ব অর্থনীতি এখন এক বিশাল হুমকির মুখে পড়েছে।’ তবে তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই সমস্যার দ্রুত সমাধান হবে।

আমার মনে হয়েছে, বিশ্বের নীতিনির্ধারকেরা এই সমস্যার গভীরতা এখনো পুরোপুরি অনুধাবন করতে পারেননি।
—ফাতিহ বিরোল, নির্বাহী পরিচালক, আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর প্যারিসভিত্তিক আইইএর সদস্যদেশগুলো জরুরি মজুত থেকে ৪০ কোটি ব্যারেল তেল ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছে। তা ছাড়া জ্বালানি খরচ কমাতে বিভিন্ন দেশ নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে।

বিভিন্ন দেশ যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে সেগুলোর কয়েকটি হলো অফিসে যাওয়ার পরিবর্তে বাসায় থেকে কাজ করা ও গাড়ি ভাগাভাগি করতে উৎসাহিত করা এবং মহাসড়কে যানবাহনের গতিসীমা কমিয়ে আনা।

আইইএ প্রধান ফাতিহ বিরোল বলেন, ‘আমার মনে হয়েছে, বিশ্বের নীতিনির্ধারকেরা এই সমস্যার গভীরতা এখনো পুরোপুরি অনুধাবন করতে পারেননি।’

ফাতিহ বিরোল জানান, প্রয়োজনে আরও কৌশলগত তেল মজুত ছাড়ার বিষয়ে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আলোচনা চলছে। তবে তাঁর মতে, এই সংকটের একমাত্র সমাধান হলো হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করা।

বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল ও এলএনজি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা চালানোর পর থেকে প্রণালিটি তারা প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম কখনো কখনো ৫০ শতাংশের বেশি বেড়েছে।

হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করতে নানা পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। প্রণালিটি খুলে দিতে গত শনিবার তিনি ইরানকে ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়েছেন। ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন, এই সময়ের মধ্যে প্রণালিটি উন্মুক্ত করা না হলে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ধ্বংস করে দেওয়া হবে।

ইরান পাল্টা হুমকি দিয়ে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা চালালে তারা নৌপথটি পুরোপুরি বন্ধ করে দেবে। অবকাঠামোগুলো মেরামত না করা পর্যন্ত তা বন্ধই থাকবে। পাশাপাশি পুরো অঞ্চলের জ্বালানি ও পানি অবকাঠামোতে হামলা চালানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান।

তবে ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম শেষ হওয়ার আগে ট্রাম্প সোমবার তেহরানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের ‘গঠনমূলক’ আলোচনা হওয়ার কথা জানান। তিনি ইরানের জ্বালানি স্থাপনায় হামলা পাঁচ দিনের জন্য স্থগিত রাখার ঘোষণাও দেন।