যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়ার পারমাণবিক অস্ত্র চুক্তির সমাপ্তি কি নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতার আশঙ্কা বাড়াচ্ছে

১৯৯১ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে ‘স্টার্ট’ নামের একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এ চুক্তির কারণে উভয় পক্ষ ৬ হাজারের বেশি পারমাণবিক যুদ্ধাস্ত্র মোতায়েন করতে পারেনিছবি: এএফপি

যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে সর্বশেষ পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। ফলে নতুন করে অস্ত্র প্রতিযোগিতার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

২০১০ সালে স্বাক্ষরিত ‘নিউ স্টার্ট’ নামের এ কৌশলগত অস্ত্র হ্রাস চুক্তিটি ভয়াবহ পারমাণবিক যুদ্ধ প্রতিরোধে করা হাতে গোনা কয়েকটি চুক্তির মধ্যে ছিল অন্যতম।

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেন, এ চুক্তির সমাপ্তি ‘আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য এক ভয়াবহ মুহূর্ত’। তিনি রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রকে অবিলম্বে পরবর্তী কোনো কাঠামো নিয়ে আলোচনার আহ্বান জানিয়েছেন।

গত বুধবার মধ্যরাতে চুক্তিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার মধ্য দিয়ে ওয়াশিংটন ও মস্কোর মধ্যে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণে সহযোগিতার আপাতত অবসান হলো। অথচ এ চুক্তি একসময় স্নায়ুযুদ্ধ শেষ করতে সাহায্য করেছিল।

এ চুক্তির মাধ্যমে উভয় দেশ সর্বোচ্চ ১ হাজার ৫৫০টি কৌশলগত পারমাণবিক যুদ্ধাস্ত্র মোতায়েন করতে পারত। এ ছাড়া তথ্য আদান-প্রদান ও সরাসরি পরিদর্শনের মাধ্যমে একে অপরের ওপর নজর রাখার ব্যবস্থাও ছিল।

গুতেরেস সতর্ক করে বলেন, চুক্তিটির মেয়াদ শেষ হওয়ায় ‘বিশ্ব এখন পারমাণবিক অস্ত্রের ওপর কোনো বাধ্যবাধকতাহীন এক পরিস্থিতির মুখে এসে দাঁড়িয়েছে।’ ঘটনা হলো, এ দুই দেশের কাছেই বিশ্বের সিংহভাগ পারমাণবিক অস্ত্রের মজুত রয়েছে।

পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তির মেয়াদের সমাপ্তি আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য এক ভয়াবহ মুহূর্ত।
—আন্তোনিও গুতেরেস, জাতিসংঘ মহাসচিব

জাতিসংঘের মহাসচিব দেশ দুটিকে বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে মানানসই নতুন ব্যবস্থা তৈরির আহ্বান জানিয়েছেন। কারণ, তিনি মনে করেন, ‘পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের ঝুঁকি এখন কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে।’

গুতেরেস আরও বলেন, ইতিবাচক বিষয় হলো, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন পারমাণবিক অস্ত্রের অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার রোধের প্রয়োজনীয়তা বোঝেন। তবে তিনি তাঁদের কথার চেয়ে কাজে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেছেন।

বুধবার পোপ লিও-ও দুই দেশকে চুক্তিটি নবায়নের আহ্বান জানিয়ে বলেন, বর্তমান বিশ্বপরিস্থিতিতে নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতা এড়াতে সম্ভাব্য সবকিছু করা প্রয়োজন।

১৯৯১ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে ‘স্টার্ট’ নামের একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এ চুক্তির কারণে উভয় পক্ষ ৬ হাজারের বেশি পারমাণবিক যুদ্ধাস্ত্র মোতায়েন করতে পারেনি।

বর্তমান বিশ্বপরিস্থিতিতে নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতা এড়াতে সম্ভাব্য সবকিছু করা প্রয়োজন।
—লিও, পোপ চতুর্দশ

সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর চেক প্রজাতন্ত্রের রাজধানী প্রাগে ২০১০ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে ‘নিউ স্টার্ট’ চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। এটাকে স্টার্টের উত্তরসূরি হিসেবে দেখা হচ্ছিল।

রাশিয়ার পারমাণবিক অস্ত্রবাহী সামরিক যান
ফাইল ছবি: রয়টার্স

ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে উত্তেজনার কারণে তিন বছর আগে এ চুক্তি স্থগিত করে রাশিয়া। তা সত্ত্বেও উভয় দেশ চুক্তিটি মেনে চলত বলে ধারণা করা হয়।

চুক্তিটি পারমাণবিক অস্ত্রের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি রুখে দিয়েছিল এবং একে অপরের উদ্দেশ্য বুঝতে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে সাহায্য করত।

এ চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়া বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং একটি উদ্বেগজনক ধারার অংশ। এর আগে আরও কিছু দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি বাতিল হয়েছে। এর মধ্যে আছে ইন্টারমিডিয়েট-রেঞ্জ নিউক্লিয়ার ফোর্সেস অ্যাগ্রিমেন্ট (আইএনএফ)। এটি ইউরোপে স্বল্পপাল্লার পারমাণবিক অস্ত্র মোতায়েন বন্ধ করেছিল।

বিশ্বকে নিরাপদ রাখার যে কাঠামো ছিল, তা এখন ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
—টনি রাডাকিন, যুক্তরাজ্যের সশস্ত্র বাহিনীর সাবেক প্রধান

আবার ওপেন স্কাইস ট্রিটিতে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়াসহ আরও কিছু দেশ স্বাক্ষর করেছে। এতে স্বাক্ষরকারী দেশগুলো একে অপরের ওপর অস্ত্রহীন পর্যবেক্ষণকারী উড়োজাহাজ চালিয়ে সামরিক শক্তি তদারক করতে পারত।

এ ছাড়া কনভেনশনাল আর্মড ফোর্সেস ইন ইউরোপ ট্রিটি ইউরোপে রাশিয়া ও ন্যাটোর ট্যাংক, সেনা ও কামানের সংখ্যা সীমিত রাখত।

যুক্তরাজ্যের সশস্ত্র বাহিনীর সাবেক প্রধান অ্যাডমিরাল স্যার টনি রাডাকিন সতর্ক করে বলেছেন, বিশ্বকে নিরাপদ রাখার যে কাঠামো ছিল, তা এখন ‘ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে’।

১৯৯১ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে ‘স্টার্ট’ নামের একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এ চুক্তির কারণে উভয় পক্ষ ৬ হাজারের বেশি পারমাণবিক যুদ্ধাস্ত্র মোতায়েন করতে পারেনি।

গত বছর একটি বক্তৃতায় সাবেক এই কর্মকর্তা বলেছিলেন, ‘পারমাণবিক অস্ত্রে ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব দেওয়া এবং প্রধান অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তিগুলোর ভেঙে পড়া বর্তমান বিশ্বনিরাপত্তার ‘সবচেয়ে বিপজ্জনক দিকগুলোর একটি’।

১৯৪৫ সালের ১৬ জুলাই পারমাণবিক বোমা পরীক্ষার পর
ছবি : লস আলমোস ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির সৌজন্যে

২০১০ সালে তৎকালীন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ নিউ স্টার্ট চুক্তিতে সই করেছিলেন। রাশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ এই নেতা সম্প্রতি বলেছেন, এ চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় ‘সবার আতঙ্কিত হওয়া উচিত’। পারমাণবিক হামলার হুমকি দেওয়া একজন রাজনীতিবিদের মুখ থেকে এটি একটি গুরুতর মন্তব্য।

ওয়াশিংটন মনে করে, ভবিষ্যতে যেকোনো অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তিতে চীনকেও অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। কারণ, চীন তাদের পারমাণবিক ভান্ডার বাড়াচ্ছে।

বুধবার রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের একজন জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা বলেন, চুক্তিটির মেয়াদ শেষ হলেও তিনি (পুতিন) ‘পরিমিত ও দায়িত্বশীলভাবে কাজ করার’ ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।

তবে ওই দিনই আরও পরে রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে তারা আর কোনো বাধ্যবাধকতা মানতে বাধ্য নয় এবং নিজেদের পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে তারা স্বাধীন।’

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘রাশিয়া দায়িত্বশীল ও ভারসাম্যপূর্ণভাবে কাজ করার ইচ্ছা প্রকাশ করছে। জাতীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত সম্ভাব্য অতিরিক্ত হুমকি মোকাবিলায় চূড়ান্ত সামরিক ও প্রযুক্তিগত পদক্ষেপ নেওয়ার জন্যও প্রস্তুত রয়েছে।’

অবশ্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে কম উদ্বিগ্ন মনে হয়েছে। গত মাসে তিনি নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেছিলেন, ‘যদি (নিউ স্টার্ট চুক্তির) মেয়াদ শেষ হয়, তবে হবে...আমরা বরং আরও ভালো একটি চুক্তি করব।’

ওয়াশিংটন মনে করে, ভবিষ্যতে যেকোনো অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তিতে চীনকেও অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। কারণ, চীন তাদের পারমাণবিক ভান্ডার বাড়াচ্ছে।

জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোহান ওয়েডফুলের কণ্ঠেও একই সুর শোনা গেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার তিনি বলেন, ‘চীনকে অবশ্যই এর (নতুন পারমাণবিক চুক্তির) অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।’

যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীন এমন সব দূরপাল্লার হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে, যা ঘণ্টায় ৬ হাজার ৪৩৭ কিলোমিটার বেগে ছুটতে পারে। এসব ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করা বেশ কঠিন।

তবে দীর্ঘকাল ধরে রাশিয়া বলে আসছে, ভবিষ্যতে কোনো চুক্তি হলে তাতে ইউরোপের পারমাণবিক শক্তিধর দেশ ফ্রান্স ও ব্রিটেনকেও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রতিরক্ষা গবেষণা প্রতিষ্ঠান আরইউএসআইয়ের পারমাণবিক সক্ষমতা বৃদ্ধি ও পারমাণবিক নীতি কর্মসূচির জ্যেষ্ঠ রিসার্চ ফেলো দারয়া দোলজিকোভা বলেন, নিউ স্টার্ট চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়া ‘উদ্বেগজনক। কারণ, উভয় পক্ষের কৌশলগত ক্ষমতা বৃদ্ধির আকাঙ্ক্ষা রয়েছে।’

যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া—উভয়ে বর্তমানে নিজেদের পারমাণবিক শক্তির আধুনিকায়ন করছে। তাই বলা যায়, একটি নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতা এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে।

চীনের ৭০ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে তিয়েনআনমেন স্কয়ারে সামরিক কুচকাওয়াজে পরমাণু অস্ত্র বহরে সক্ষম আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ডিএফ-৪১ প্রদর্শন করা হয়। ১২ জুন, ২০২৩
ছবি: এএফপি

দোলজিকোভা বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ভেদ করার নিজেদের ক্ষমতা নিয়ে কিছুটা উদ্বেগ রয়েছে’ রাশিয়ার। উত্তর আমেরিকাকে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র থেকে রক্ষা করার জন্য ট্রাম্প ‘গোল্ডেন ডোম’ তৈরির পরিকল্পনা করেছেন। এটা রাশিয়ার উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে রাশিয়া এমন সব নতুন অস্ত্র তৈরি করছে, যা আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ভেদ করতে পারে। এর মধ্যে সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে হামলা চালানোর উপযোগী নতুন আন্তমহাদেশীয়, পারমাণবিক অস্ত্রবাহী ও পারমাণবিক শক্তিচালিত টর্পেডো অন্যতম। ‘বুরেভেস্তনিক’ নামের পারমাণবিক অস্ত্রবাহী ও পারমাণবিক শক্তিচালিত একটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রও তৈরি করেছে রাশিয়া।

যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীন এমন সব দূরপাল্লার হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে, যা ঘণ্টায় ৬ হাজার ৪৩৭ কিলোমিটার বেগে ছুটতে পারে। এসব ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করা বেশ কঠিন।

আরও পড়ুন

দোলজিকোভা বলেন, এই বিস্তৃত সামরিক সক্ষমতা নতুন অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তির পথ ‘আরও কঠিন’ করে তুলবে।

এই বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, ‘পারমাণবিক অস্ত্রের গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে।’ বেশির ভাগ দেশ এসব অস্ত্র তাদের প্রতিরোধ সক্ষমতার অংশ হিসেবে চায়।

যুক্তরাষ্ট্র বা রাশিয়া নতুন কোনো অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়ে তাড়াহুড়া করছে বলে মনে হচ্ছে না।

গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কায় ট্রাম্প-পুতিনের সাক্ষাৎকারে এ বিষয় আলোচনার সূচিতে ছিল। কিন্তু কোনো চুক্তি হয়নি।

এখনো একটি নতুন চুক্তি সম্ভব। কিন্তু নিউ স্টার্ট চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়া আরও বেশি অস্থিতিশীল ও বিপজ্জনক একটি যুগের ইঙ্গিত দিচ্ছে।