যুক্তরাষ্ট্রকে কি বিশ্বাস করা যায়, ইতিহাস কী বলছে
জর্জ ক্যাটসিয়াফিকাস প্রখ্যাত মার্কিন সমাজবিজ্ঞানী ও ইতিহাসবিদ। তিনি ৩০ বছর ধরে বোস্টনের ওয়েন্টওয়ার্থ ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে অধ্যাপনা করেছেন। ‘এশিয়াজ আননোন আপরাইজিংস’ ও ‘ভিয়েতনাম ডকুমেন্টস’-এর লেখক ও সম্পাদক হিসেবে তিনি বিশ্বজুড়ে পরিচিত। সামাজিক আন্দোলনে তাঁর প্রবর্তিত ‘ইরোস ইফেক্ট’ তত্ত্বটি অত্যন্ত প্রভাবশালী। এশিয়ার নানা গণ-অভ্যুত্থান ও সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের ইতিহাস তুলে ধরাই তাঁর গবেষণার মূল লক্ষ্য। যুক্তরাজ্যভিত্তিক মিডল ইস্ট মনিটরে তিনি যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের যুদ্ধ নিয়ে লিখেছেন। ২০ এপ্রিল লেখাটি অনলাইনে প্রকাশিত হয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন নিজের গায়ে কলঙ্ক না মাখানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু তিনি যতই সেই চেষ্টা করুন না কেন, এখন একটি বিষয় পরিষ্কার—ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র অমর্যাদাকরভাবে হেরেছে। ইরানকে ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ করানো নিয়ে তাঁর প্রতিশ্রুতি এখন ফাঁকা বুলিতে পরিণত হয়েছে। কোনো যুদ্ধ শুরু না করা এবং ‘শান্তির প্রেসিডেন্ট’ হওয়ার বিষয়ে নির্বাচনী প্রচারে ট্রাম্প যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তাঁর সেই বক্তব্য যেমন মিথ্যা ছিল, এখনকার বক্তব্যও একই রকম মিথ্যা।
বিজয় দাবি করার পথ খুঁজতে গিয়ে ট্রাম্প একচোটে নিজেকে জয়ী ঘোষণা করে দিয়েছেন। নিজের মিথ্যাচারের প্রতি বৈশ্বিক সমর্থন পেতে তিনি মরিয়া হয়ে উঠেছেন। এটা করতে গিয়ে তিনি বিশ্বনেতাদের ওপর আক্রমণ শুরু করেছেন। যেসব বিশ্বনেতা তাঁর এই উন্মাদনাকে সমর্থন করছেন না, তিনি তাঁদের ওপর চড়াও হচ্ছেন। এমনকি এ তালিকায় তাঁর নিজের অনুগত ‘মাগা’ বা ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ কর্মসূচির সমর্থকদের কারও কারও নাম রয়েছে।
ইরানি সভ্যতাকে পুরোপুরি ধ্বংস করার হুমকি দেওয়ার পর ট্রাম্প পোপ লিওকে ‘লুজার’ বা ব্যর্থ বলে আক্রমণ করেছেন। এমনকি নিজেকে যিশুর পুনর্জন্ম বলেও দাবি করেছেন তিনি। বিভ্রান্ত ট্রাম্পের এই হীন কর্মকাণ্ডের কি কোনো শেষ নেই?
এর চেয়েও খারাপ বিষয় হলো, ট্রাম্পের তোষামোদকারী অধীনরা তাঁর ক্ষমতার লোভকে বাড়িয়ে দিচ্ছেন। তাঁরা তাঁর একনায়কতান্ত্রিক শৈলীকে অনুকরণ করছেন। পাকিস্তানে ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে ২১ ঘণ্টা আলোচনার পর মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত মানতে ইরানের ‘ব্যর্থতা’ নিয়ে নিন্দা জানিয়েছেন।
ভিয়েতনাম যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক পরিসমাপ্তির লক্ষ্যে বিখ্যাত মার্কিন কূটনীতিক হেনরি কিসিঞ্জার ও ভিয়েতনাম কমিউনিস্ট পার্টির পলিটব্যুরো সদস্য লে ডাক থোর প্যারিসে ১৯৭৩ সালে একটি শান্তিচুক্তি করতে চার বছর আট মাস সময় লেগেছিল। সেখানে ভ্যান্স এক দিনের কম সময় আলোচনা করে পাকিস্তান ত্যাগ করেন।
ভ্যান্স এমনভাবে কথা বলছিলেন, যেন তিনি কোনো রিয়েল এস্টেট বা আবাসন প্রকল্পের চুক্তি করছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এটিই ছিল তাঁর ‘সেরা ও শেষ প্রস্তাব’। তাঁর আচরণ দেখে মনে হয়েছে, তিনি আলোচনার জন্য ইসলামাবাদে যাননি; বরং আত্মসমর্পণের শর্ত চাপিয়ে দিতে গিয়েছিলেন।
ট্রাম্প ও ভ্যান্সের কাছে প্রকৃত আলোচনার কোনো স্থান নেই। তাঁরা ইসরায়েলের শর্তানুযায়ী একটি তাৎক্ষণিক শান্তিচুক্তি চান। প্রথম বৈঠকের পর থেকে ইরান বলে আসছে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের বিশ্বাস অর্জন করতে পারেনি। তাই তাদের বর্তমান অবস্থান যথার্থ।
শান্তিপূর্ণ সমাধানের আলোচনার মাঝপথে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দুবার ইরানে অতর্কিত হামলা চালিয়েছে। তারা ইরানের নেতৃত্বকে হত্যা করেছে। হাসপাতাল, স্কুল ও বেসামরিক মানুষের আবাসন ধ্বংস করেছে। এসব কারণে যুক্তরাষ্ট্রের অসততা নিয়ে ইরান সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার প্রশাসন শত শত ঘণ্টা আলোচনা শেষে ২০১৫ সালে ইরানের সঙ্গে জয়েন্ট কম্প্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন (জেসিপিওএ) বা পারমাণবিক চুক্তি করেছিল। কিন্তু ট্রাম্প তাঁর প্রথম মেয়াদে কংগ্রেসের সঙ্গে পরামর্শ না করে এ চুক্তি একতরফাভাবে বাতিল করে দেন এবং ইরানের ওপর আবার নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের আদিবাসী বা নেটিভ আমেরিকানদের সঙ্গে দেশটির সরকার ৫০০টির বেশি চুক্তি করেছিল। এর মধ্যে একটিও যথাযথভাবে রক্ষা করা হয়েছে, এমন নজির খুঁজে পাওয়া কঠিন। ইতিহাসবিদেরা এই জঘন্য রেকর্ডকে ‘চুক্তিভঙ্গের কলঙ্কিত অধ্যায়’ বলে অভিহিত করেছেন।
ইরান এখন সেসব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানাচ্ছে। ইরানের কয়েক শ কোটি ডলার অর্থ বর্তমানে জব্দ করে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। ২০২৩ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এসব অর্থ ছাড় দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র এখনো সেই সম্পদ আটকে রেখেছে।
ট্রাম্পের একনায়কসুলভ আচরণই বর্তমান সংকটের মূল কারণ। ঘনিষ্ঠ তোষামোদকারীদের বাইরে আর কারও সঙ্গে পরামর্শ না করে মাত্র ২১ ঘণ্টার আলোচনার পর হরমুজ প্রণালি অবরোধের নির্দেশ দেন তিনি। এ ধরনের পদক্ষেপকে সাধারণত যুদ্ধ ঘোষণার শামিল হিসেবে ধরা হয়।
ইসলামাবাদে ভ্যান্সের অবস্থানের অবাস্তব ও অপক্ব চরিত্রটি মাত্র একটি তুলনার মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা যায়। ভিয়েতনাম যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক পরিসমাপ্তির লক্ষ্যে বিখ্যাত মার্কিন কূটনীতিক হেনরি কিসিঞ্জার ও ভিয়েতনাম কমিউনিস্ট পার্টির পলিটব্যুরো সদস্য লে ডাক থোর প্যারিসে ১৯৭৩ সালে একটি শান্তিচুক্তি করতে চার বছর আট মাস সময় লেগেছিল।
সেখানে ভ্যান্স এক দিনের কম সময় আলোচনা করে পাকিস্তান ত্যাগ করেন। তিনি ইরানকে এই বলে সতর্ক করেন, তারা যেন যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে ‘খেলা’ না করে। যুক্তরাষ্ট্রের নিজের ইচ্ছায় চাপিয়ে দেওয়া এই যুদ্ধের ভয়াবহতাকে তিনি যেন স্রেফ একটি ভিডিও গেমের সঙ্গে তুলনা করলেন।
দুঃখজনক বিষয় হলো, ইরান ওয়াশিংটনের কোনো প্রতিশ্রুতি কেন বিশ্বাস করতে পারছে না, তা যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রকে পরাজিত করেছে, তাদের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে বোঝা যায়। উত্তর কোরিয়া ও ভিয়েতনাম—এ দুই দেশের সঙ্গে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের পরপর যুক্তরাষ্ট্র তা লঙ্ঘন করেছিল।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, প্রেসিডেন্ট পদে যে–ই থাকুক না কেন, যুক্তরাষ্ট্রকে কখনো বিশ্বাসযোগ্য দেশ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। ডেমোক্র্যাট হোক বা রিপাবলিকান, যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্টরা আসেন আর যান। কিন্তু দেশটির অসততা ও প্রতারণা অপরিবর্তিত থাকে।
ইরানের দাবিগুলোর অন্যতম হলো দেশটি ধ্বংস করার অপরাধে যুক্তরাষ্ট্রকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এ প্রসঙ্গে ১৯৭৩ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ভিয়েতনামের প্রধানমন্ত্রী ফাম ভ্যান ডংয়ের কাছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের পাঠানো একটি চিঠির কথা উল্লেখ করা যায়। সেখানে নিক্সন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ১৯৭৩ সালের ২৭ জানুয়ারি স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী ‘উত্তর ভিয়েতনামের যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠনে’ অংশ নেবে।
নিক্সনের অনুমান অনুযায়ী, ক্ষতিপূরণ বাবদ অনুদান আকারে পাঁচ বছরে ৩ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা) দেওয়া হবে। ভিয়েতনামের কর্মকর্তারা নিক্সনের কথার ওপর ভরসা করেছিলেন এবং ওই বিলিয়ন ডলার হিসাবে ধরেই নিজেদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিকল্পনা তৈরি করেছিলেন।
তবে এজেন্ট অরেঞ্জ, বি-৫২ বোমারু বিমান ও ৫ লাখ মার্কিন সেনার তাণ্ডবে বিধ্বস্ত সেই দেশটিকে একটি পয়সাও পরে আর দেওয়া হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের আদিবাসী বা নেটিভ আমেরিকানদের সঙ্গে দেশটির সরকার ৫০০টির বেশি চুক্তি করেছিল। এর মধ্যে একটিও যথাযথভাবে রক্ষা করা হয়েছে, এমন নজির খুঁজে পাওয়া কঠিন। ইতিহাসবিদেরা এই জঘন্য রেকর্ডকে ‘চুক্তিভঙ্গের কলঙ্কিত অধ্যায়’ বলে অভিহিত করেছেন।
২০০৩ সালের এক সন্ধ্যায় উত্তর কোরিয়ার রাজধানী পিয়ংইয়ংয়ে পানীয় হাতে দেশটির কয়েকজন মানুষের সঙ্গে আড্ডার দেওয়ার সময় আমি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের এ প্রসঙ্গ টানি। শুনে তাঁরা বিস্ময়ে বিমূঢ় গেলেন। তাঁরা জানতে চাইলেন, ‘তার মানে যুক্তরাষ্ট্রের কি কোনো সম্মানবোধ নেই?’
তখন থেকে ঠিক ৫০ বছর আগে স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি চুক্তির বদলে একটি স্থায়ী শান্তিচুক্তির মাধ্যমে কোরীয় যুদ্ধ শেষ করার যে প্রত্যাশা তাঁরা করেছিলেন, তা বিলীন হয়ে যেতে দেখে আমি বিষণ্ন মনে মাথা নেড়ে সম্মতি জানালাম।
এখন এ সম্ভাবনাই বেশি যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আবারও ইরানিদের হত্যা করবে এবং দেশটিকে ধ্বংস করবে। এই দানবগুলো একটি শান্তিচুক্তিতে সম্মত হয়ে এমন একটি সংঘাতের অবসান ঘটাবে, যা ইরান কখনো চায়নি—এমন সম্ভাবনা খুবই কম।
এখানে আমার আরও উল্লেখ করা উচিত, যুক্তরাষ্ট্র এখনো যুদ্ধবিরতি চুক্তির ১৫ নম্বর অনুচ্ছেদ লঙ্ঘন করে চলেছে। এ অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা আছে, উভয় পক্ষই ‘কোরিয়াতে কোনো ধরনের অবরোধে জড়াবে না’। অথচ যুক্তরাষ্ট্র উত্তর কোরিয়ার ওপর একটি নিরবচ্ছিন্ন অবরোধ বজায় রেখেছে, যা আন্তর্জাতিক ঋণ ও নতুন বিনিয়োগের পথ রুদ্ধ করার পাশাপাশি বাণিজ্য ও যাতায়াত বাধাগ্রস্ত করে দেশটির আর্থিক খাতকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
ট্রাম্প যেভাবে ইরানের ওপর নতুন অবরোধ আরোপ করেছেন, ঠিক সেভাবেই উত্তর কোরিয়াকে কয়লা ও খনিজ রপ্তানিতে সাহায্যকারী পরিবহন সংস্থা, জাহাজ ও ব্যক্তিদের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র।
যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা ও চুক্তি উপেক্ষা করে। অথবা সিনেটের মতামত ছাড়াই মার্কিন প্রেসিডেন্টরা একতরফাভাবে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেন। এর একটি বড় উদাহরণ হলো আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) বিভিন্ন রায়কে গুরুত্ব না দেওয়া। যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে ও ইসরায়েলকে এই আদালতের রায়ের বাধ্যবাধকতা থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে।
আরেকটি উদাহরণ হলো জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক প্যারিস চুক্তি থেকে ওয়াশিংটনের নিজেকে প্রত্যাহার করে নেওয়া। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এটাকে সম্ভবত ইতিহাসের সবচেয়ে বড় যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য করবে। সংগত কারণে যুক্তরাষ্ট্র কখনো আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) সদস্য হয়নি।
সুস্থ বুদ্ধির জয় হবে কি না, তা এখন একটি বড় প্রশ্ন। শয়তানতুল্য ট্রাম্প আর ‘সাতানিয়াহু’-ই (ব্যঙ্গ করে নেতানিয়াহুর নাম উচ্চারণ) কেবল মানবতার ওপর কালো ছায়া ফেলছেন না; বরং যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক রেকর্ডও সামনের দিনগুলোতে ভয়াবহ পরিস্থিতির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এখন এ আশঙ্কাই বেশি যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আবারও ইরানিদের হত্যা করবে এবং দেশটিকে ধ্বংস করবে। এই দানবগুলো একটি শান্তিচুক্তিতে সম্মত হয়ে এই সংঘাতের অবসান ঘটাবে—এমন সম্ভাবনা খুবই কম।