ট্রাম্প আরোপিত ‘বেআইনি’ শুল্কের ১৭৫ বিলিয়ন ডলার ফেরতের দাবি

ক্যাপিটল হিল, যুক্তরাষ্ট্রছবি: রয়টার্স

মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্ক আদায়কে বেআইনি বলে রায় দেওয়ার পর দেশটির তিন ডেমোক্র্যাট সিনেটর প্রায় ১৭৫ বিলিয়ন ডলার ফেরতের দাবি জানিয়েছেন। অবৈধভাবে শুল্কারোপের মাধ্যমে ওই অর্থ যুক্তরাষ্ট্র সংগ্রহ করেছে দাবি করে এ বিষয়ে বিল উত্থাপনের উদ্যোগও নিয়েছেন তাঁরা।

স্থানীয় সময় গতকাল সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) ওরেগনের সিনেটর রন ওয়াইডেন, ম্যাসাচুসেটসের এড মার্কি এবং নিউ হ্যাম্পশায়ারের জিন শাহিন একটি বিল উত্থাপন করতে চলেছেন, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক ও সীমান্ত প্রতিরক্ষা বিভাগকে ১৮০ দিনের মধ্যে ওই অর্থ ফেরত এবং ওই অর্থের ওপর উপযুক্ত সুদ পরিশোধের বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে।

প্রস্তাবিত বিল অনুযায়ী, ছোট ব্যবসাগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে অর্থ ফেরত দিতে হবে এবং আমদানিকারক, পাইকার ও বড় কোম্পানিগুলোকে গ্রাহকদের কাছে সেই অর্থ পৌঁছে দিতে হবে।

ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়ার পেন হোয়ার্টন বাজেট মডেলের হিসাব অনুযায়ী, মোট শুল্ক ফেরতের পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ১৭৫ বিলিয়ন ডলার, যা গড়ে প্রতিটি মার্কিন পরিবারের জন্য প্রায় ১ হাজার ৩০০ ডলারের সমান।

তবে ফেরত দেওয়ার কাঠামো নির্ধারণ করা কঠিন হবে। কারণ, শুল্কের ব্যয় সরাসরি গ্রাহকদের ওপর পড়েছে, আবার অনেক ক্ষেত্রে আমদানিকারকেরা তা আংশিকভাবে নিজেরা বহন করেছে বা পণ্যের দামের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে গ্রাহকদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে।

ওরেগনের সিনেটর ওয়াইডেন বলেন, ট্রাম্পের অবৈধ কর পরিকল্পনা এরই মধ্যে মার্কিন পরিবার, ছোট ব্যবসা ও উৎপাদন খাতকে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে ফেলেছে। একের পর এক নতুন শুল্কের চাপে পড়েছেন তাঁরা। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এ সমস্যা সমাধানের গুরুত্বপূর্ণ প্রথম পদক্ষেপ হলো দ্রুত ছোট ব্যবসায়ী ও উৎপাদনকারীদের হাতে অর্থ ফিরিয়ে দেওয়া।

যদিও বিলটি আইনে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা কম, তারপরও ডেমোক্র্যাটরা যে জনমতের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে শুরু করেছেন, বিষয়টি দলটির মধ্যে আশার সঞ্চার করেছে।

অপর দিকে সুপ্রিম কোর্ট গত শুক্রবার রায় দেওয়ার পরও ট্রাম্প প্রশাসন শুল্ক ফেরত দেওয়ার বিষয়ে খুব একটা আগ্রহ দেখায়নি।

এই রায়ের পর আগামী নভেম্বরে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ডেমোক্র্যাটরা জনগণকে জানাতে শুরু করেছেন যে ট্রাম্প অবৈধভাবে কর বাড়িয়েছেন এবং এখন সেই অর্থ ফেরত দিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন।

নিউ হ্যাম্পশায়ারের সিনেটর শাহিন বলেন, অতিরিক্ত শুল্কের কারণে বাজারে পণ্যমূল্যের ওপর যে প্রভাব পড়েছে, তা পুষিয়ে নেওয়ার প্রথম ধাপ হলো প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বেআইনিভাবে আদায় করা শুল্ক জনগণকে ফেরত দেওয়া।

ম্যাসাচুসেটসের সিনেটর মার্কি বলেন, ছোট ব্যবসায় মূলধন থাকে না বললেই চলে এবং তাদের জন্য অর্থ ফেরত পাওয়ার প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল ও সময়সাপেক্ষ হতে পারে।

তবে ট্রাম্প প্রশাসন বলছে, তাদের হাত বাঁধা। কারণ, কোনো অর্থ ফেরত দেওয়া হলে তা আদালতের পরবর্তী মামলার মাধ্যমে নির্ধারিত হওয়া উচিত।

রিফান্ড বা অর্থ ফেরতের ক্ষেত্রে কংগ্রেসের কোনো ভূমিকা থাকা উচিত কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র কুশ দেশাই বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শুল্ক ব্যবহার করে বাস্তব ফল এনে দিয়েছেন, যেখানে ডেমোক্র্যাটরা শুধু কথার খই ফোটাচ্ছেন। তাই স্বাভাবিকভাবেই ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্প ও জনগণের সাফল্য খর্ব করতে উঠেপড়ে লেগেছেন। এটি দুর্ভাগ্যজনক হলেও আশ্চর্য নয়।

ডেমোক্র্যাটদের এ বার্তা রিপাবলিকানদের জন্য চাপ তৈরি করতে পারে। কারণ, সরকার কেন স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে অর্থ ফেরত দিচ্ছে না, এ প্রশ্নের জবাব দিতে তাঁদের বেগ পেতে হতে পারে। রিপাবলিকান আইনপ্রণেতারা গত বছর ট্রাম্পের সই করা আয়কর ছাড়ের আইনকে সামনে রেখে কংগ্রেসে নিজেদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে চেয়েছিলেন। সে সময় তাঁরা বলেছিলেন, এ বছরের কর ফেরত জনগণকে সহায়তা করবে।

গত রোববার যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় কোষাগার মন্ত্রী স্কট বেসেন্ট সিএনএনকে বলেন, অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রসঙ্গ তোলা ‘ভুল উপস্থাপন’, কারণ সুপ্রিম কোর্টের রায়ে এ বিষয়ে কিছু বলা হয়নি। প্রশাসনের অবস্থান হলো ফেরত দেওয়া হবে কি না, তা বিচারব্যবস্থায় চলমান মামলাগুলোর মাধ্যমে নির্ধারিত হবে; প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তে নয়।

স্কট বেসেন্ট বলেন, এটি প্রশাসনের বিষয় নয়, বিষয়টি নিম্ন আদালতের। অর্থ ফেরত বিষয়ে আদালতের রায় না আসা পর্যন্ত তিনি অপেক্ষা করবেন বলেও জানান।

ট্রাম্প ১৯৭৭ সালের ‘আন্তর্জাতিক জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইন’ ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় প্রতিটি বাণিজ্য অংশীদারের ওপর বিস্তৃত শুল্ক আরোপের পক্ষে যুক্তি দেখিয়েছেন। তিনি বলেন, আমদানির ওপর করারোপের তাঁর ক্ষমতা সামরিক সংঘাতের অবসান ঘটাতে, নতুন ফেডারেল রাজস্ব আনতে এবং বাণিজ্য কাঠামো নিয়ে আলোচনার জন্য চাপ প্রয়োগ করতে সহায়তা করেছে।

এর আগে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, এই অর্থ ফেরত দিলে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ঋণ বাড়বে এবং অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। গত শুক্রবার এক ব্রিফিংয়ে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, তিনি হোয়াইট হাউস ছাড়ার পরও ফেরতপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে পারে।

ট্রাম্প বলেন, সম্ভবত আগামী দুই বছর এ নিয়ে মামলা চলবে, পরে সময়সীমা সংশোধন করে তিনি বলেন, শেষ পর্যন্ত আমরা পাঁচ বছর পর্যন্ত আদালতেই থাকব।