এফবিআইয়ের গোয়েন্দাদের হাজার হাজার সংবেদনশীল তথ্য চুরির দাবি
যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (এফবিআই) হাজারো কর্মকর্তার বিপুল পরিমাণ সংবেদনশীল ব্যক্তিগত তথ্য চুরির দাবি করেছে একটি হ্যাকার দল। ‘শাইনিহান্টার্স’ নামে পরিচিত হ্যাকার দলটি গত মঙ্গলবার এ দাবি করে। ঘটনা সত্যি হলে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ আইন প্রয়োগকারী সংস্থার জন্য এটি একটি বড় ধরনের ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁসের ঘটনা হতে পারে।
হ্যাকার দলটি দাবি করেছে, এফবিআইয়ের একটি অনলাইন চাকরির পোর্টাল থেকে নথিগুলো চুরি করা হয়েছে। এর মধ্যে বর্তমান ও সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের পাশাপাশি আবেদনকারীদের নাম, স্থায়ী ঠিকানা, ফোন নম্বর, স্বামী বা স্ত্রীর নাম, নির্দিষ্ট কিছু চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্য এবং অন্যান্য তথ্য রয়েছে। তবে দলটি এখনো এসব তথ্য প্রকাশ্যে ফাঁস করেছে বলে মনে হয় না।
এফবিআই পরিচালক ক্যাশ প্যাটেল এবং সংস্থাটির সাইবার নিরাপত্তা বিভাগের প্রধান ব্রেট লেদারম্যানকে উদ্দেশ করে অনলাইনে পোস্ট করা এক বার্তায় হ্যাকার দলটি বলেছে, ‘আমরা এফবিআইয়ের নিরাপত্তাবলয় ভেদ করেছি।’ বার্তাটিতে আরও বলা হয়, ‘আমাদের কাছে প্রায় সব এফবিআই এজেন্ট এবং এফবিআইয়ে চাকরির আবেদনকারী ব্যক্তির অত্যন্ত সংবেদনশীল তথ্য রয়েছে।’
বার্তায় শাইনিহান্টার্স জানায়, চলতি বছরের মার্চ থেকে মে মাসের দিকে এফবিআই তাদের কৌশল সম্পর্কে সতর্ক করে একটি গণবিজ্ঞপ্তি জারি করেছিল। তার প্রতিশোধ হিসেবেই তারা এফবিআইকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। হ্যাকার দলটি এক সপ্তাহের মধ্যে ওই বিজ্ঞপ্তিটি ‘সংশোধন বা সম্পূর্ণরূপে অপসারণ’ করার দাবি জানিয়েছে। ওই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছিল, শাইনিহান্টার্স ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের হুমকি ও ব্ল্যাকমেল করে হয়রানি করার জন্য পরিচিত। সময়সীমার মধ্যে দাবি না মানলে আরও গুরুতর পরিণতির হুঁশিয়ারি দিয়েছে দলটি।
এফবিআইয়ের এক মুখপাত্র তথ্য ফাঁসের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, সংস্থাটি এই দাবির বিষয়ে অবগত এবং তদন্ত চালাচ্ছে। এক বিবৃতিতে এফবিআই জানিয়েছে, তথ্য ফাঁসের মূল উৎস কোথায়—কোনো থার্ড পার্টি নাকি এফবিআইয়ের নিজস্ব সংস্থা, তা এখনো নির্ধারণ করা যায়নি। তবে আমরা সক্রিয় ও কঠোরভাবে বিষয়টি তদন্ত করছি এবং এফবিআইজবস ডট জিওভিকে সহায়তা করা থার্ড পার্টি সেবাদাতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছি, যাতে সব ধরনের ঝুঁকি কমানো যায়।
বুধবার সকালেও চাকরির ওয়েবসাইটটিতে প্রবেশ করা যায়নি। আগের দিন সাইটটির হোমপেজে একটি ব্যানার ঝুলছিল, যাতে লেখা ছিল—‘এই সাইটটি শাইনিহান্টার্স দখল করেছে।’
নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া বার্তায় শাইনিহান্টার্স জানায়, তাদের কাছে ১০ হাজারের বেশি মানুষের ব্যক্তিগত তথ্যের রেকর্ড রয়েছে। সম্ভাব্য এই হ্যাকিংয়ের খবরটি প্রথম প্রকাশ করে অনলাইন সাইবার নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিবিষয়ক সংবাদমাধ্যম ৪০৪ মিডিয়া।
অপরাধী চক্র পর্যবেক্ষণকারী এফবিআইয়ের সাবেক কর্মকর্তা এবং সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, তথ্য ফাঁসের এই ঘটনা সত্যি বলেই মনে হচ্ছে। এটি সংস্থাটির জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক একটি নিরাপত্তা–ঘাটতি এবং কাউন্টার ইন্টেলিজেন্সের (পাল্টা গোয়েন্দা তথ্য) জন্য বড় হুমকি হতে পারে। অন্যান্য উদ্বেগের পাশাপাশি এফবিআই কর্মকর্তাদের এই ব্যক্তিগত তথ্য যদি ডার্ক ওয়েবে পোস্ট করা হয়, তবে চীন, রাশিয়া বা অন্য কোনো দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তা হাতিয়ে নিতে পারে এবং তা দিয়ে গোয়েন্দা তৎপরতা চালাতে পারে।
আইনবিষয়ক প্রতিষ্ঠান বেকার ম্যাকেঞ্জির পার্টনার এবং এফবিআই ও বিচার বিভাগের সাবেক ঊর্ধ্বতন সাইবার নিরাপত্তা কর্মকর্তা সুমন দান্তিকি বলেন, ‘খবরটি সত্যি হলে এই তথ্য চুরি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে সাইবার হুমকি থেকে কেউ মুক্ত নয়।
দুঃখজনকভাবে এটি গুরুতর জননিরাপত্তা ও পাল্টা গোয়েন্দা ঝুঁকির সৃষ্টি করেছে।’
এফবিআইয়ের সাবেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সিনথিয়া কাইজার (যিনি বড় ধরনের সাইবার তদন্ত তদারক করতেন) বলেন, আরও একটি প্রত্যক্ষ দুশ্চিন্তার বিষয় হলো—যেসব এফবিআই এজেন্ট অপরাধীদের জেলে পাঠিয়েছেন, হিংস্র অপরাধীরা তাঁদের ওপর প্রতিশোধ নিতে এই তথ্য কাজে লাগাতে পারে। অপরাধী সন্দেহভাজনদের বিরুদ্ধে আদালতে পেশ করা কাগজপত্রে এফবিআই এজেন্টরা স্বাক্ষর করলেও, সাধারণ প্রশিক্ষণ অনুযায়ী তাঁদের সংবেদনশীল ব্যক্তিগত তথ্য—যেমন বাড়ির ঠিকানা বা পারিবারিক সম্পর্ক যেন সহজে অনলাইনে না আসে, তা নিশ্চিত করা হয়।
শাইনিহান্টার্স একটি সুপরিচিত হ্যাকার দল, যারা বছরের পর বছর ধরে সক্রিয় রয়েছে এবং একাধিক বড় ধরনের ও চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁসের দাবি করেছে। যদিও নিরাপত্তা গবেষকদের মতে, দলটি মাঝেমধ্যে তাদের কার্যক্রম নিয়ে বাড়িয়ে বলে বা মিথ্যা তথ্য দেয়। তবে বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য হ্যাকিংয়ের পেছনে তাদের ভূমিকা নির্ভরযোগ্যভাবে প্রমাণিত।
চলতি বছরের মে মাসে তারা দাবি করেছিল, বিশ্বজুড়ে হাজার হাজার স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবহৃত ক্যানভাস নামে একটি অনলাইন লার্নিং সিস্টেম তারা হ্যাক করেছে, যার ফলেই এফবিআই ওই সতর্কতা বিজ্ঞপ্তিটি জারি করেছিল। দলটি আরও দাবি করেছে, ২০২৪ সালে টিকিটমাস্টারের ওপর সাইবার হামলার পেছনেও তারা ছিল, যার মাধ্যমে ৫০ কোটির বেশি গ্রাহকের তথ্য ফাঁস হয়েছিল।
এফবিআইয়ের এই সম্ভাব্য তথ্য ফাঁসের ঘটনা এক দশক আগের ওপিএম (অফিস অব পারসোনেল ম্যানেজমেন্ট) থেকে প্রায় দুই কোটি সরকারি কর্মচারী ও ঠিকাদারের রেকর্ড চুরির কথা মনে করিয়ে দেয়। ওবামা প্রশাসন ওই ঘটনার জন্য চীন সরকারকে দায়ী করেছিল, যা যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে অন্যতম নিকৃষ্ট সাইবার নিরাপত্তা ব্যর্থতা হিসেবে গণ্য হয়। এর ফলে ভবিষ্যতে এ ধরনের বিস্তারিত তথ্যসংবলিত ডেটাবেজ চুরি রোধ করতে সরকারি সংস্থাগুলো সংবেদনশীল তথ্যকে আরও ভালোভাবে সুরক্ষিত ও পৃথক করার উদ্যোগ নেয়।
ওপিএম বিপর্যয়ের বিষয়টি মাথায় রেখে এফবিআইয়ের সাবেক কর্মকর্তারা বলেছেন, সংস্থাটির কর্মী সম্পর্কিত এত মূল্যবান ও বিশাল পরিমাণ ব্যক্তিগত তথ্য একটি জব পোর্টালের সঙ্গে যুক্ত অনলাইন ডেটাবেজে ছিল, তা জেনে তাঁরা স্তম্ভিত।
শাইনিহান্টার্সের এই হ্যাকিং এফবিআইয়ের সাম্প্রতিক সাইবার নিরাপত্তা ব্যর্থতার সিরিজের সর্বশেষ সংযোজন। চলতি বছরের শুরুর দিকে সংস্থাটি একটি ডেটাবেজে চীনা হ্যাকারদের উপস্থিতি শনাক্ত করেছিল, যা তারা দেশীয় নজরদারি আদেশের জন্য ব্যবহার করত। এই আবিষ্কার বিশেষভাবে উদ্বেগজনক ছিল, কারণ ওয়াশিংটন সন্দেহ করছিল, বেইজিং এফবিআইয়ের অভ্যন্তরীণ নেটওয়ার্কে একটি মারাত্মক অনুপ্রবেশের ওপর ভিত্তি করে এটি চালিয়েছে, যে নেটওয়ার্কটি অপরাধী সন্দেহভাজনদের ওপর দেশীয় ওয়্যারট্যাপ বজায় রাখতে ব্যবহৃত হতো। বিষয়টি মার্কিন টেলিযোগাযোগ অবকাঠামোতে একটি ব্যাপক গোয়েন্দা অভিযানের অংশ ছিল, যা কর্মকর্তারা ২০২৪ সালে প্রথম প্রকাশ করেছিলেন।
এ ছাড়া প্যাটেলের ব্যক্তিগত ই–মেইলও মার্চ মাসে ইরানের গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি প্রো-ইরানি হ্যাকটিভিস্ট গ্রুপ হ্যাক ও ফাঁস করেছিল।
সর্বশেষ ঘটনায় শাইনিহান্টার্স জানিয়েছে, তারা ওরাকল পিপলসফট সফটওয়্যারের মধ্যে একটি জিরো ডে (পূর্বে অনাবিষ্কৃত) কম্পিউটার বাগ বা ত্রুটি ব্যবহার করেছে।
এটি একটি অ্যাপ্লিকেশন, যা প্রতিষ্ঠানগুলো মানবসম্পদ ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার জন্য ব্যবহার করে। হ্যাকার দলটি উক্ত ত্রুটি সম্পর্কে নির্দিষ্ট প্রশ্নের জবাব দিতে অস্বীকার করে একটি ই–মেইলে বলেছে, ‘আমরা আমাদের সাধারণ ব্যবসায়িক কার্যক্রমের জন্য এই জিরো ডে ব্যবহার করার ইচ্ছা রাখি।’ ওরাকল মন্তব্যের অনুরোধে কোনো সাড়া দেয়নি।
এফবিআই তাদের বিজ্ঞপ্তিটি প্রত্যাহার না করলে মোট দুই থেকে তিন টেরাবাইট তথ্য নিয়ে শাইনিহান্টার্স কী করার পরিকল্পনা করেছে, তা স্পষ্ট নয়। যুক্তরাষ্ট্রের একটি সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ফ্ল্যাশপয়েন্ট জানিয়েছে, হ্যাকাররা সম্ভবত অন্যান্য করপোরেট ভুক্তভোগীর ক্ষেত্রে যেভাবে কাজ করে, সেভাবেই চুরি করা তথ্য শিগগিরই অনলাইনে ফাঁস করে দেবে।
টাইমসকে পাঠানো ই–মেইলে শাইনিহান্টার্স বলেছে, ‘এফবিআই আমাদের অনুরোধ না মানলে আমরা কী করব, তা নিয়ে মন্তব্য করতে পারি না। আমরা আবার বলছি, আমরা এফবিআইকে ব্ল্যাকমেল করছি না এবং এর পেছনে কোনো আর্থিক উদ্দেশ্য নেই।’
হ্যাকাররা আরও যোগ করেছে, ‘আমাদের একমাত্র উদ্দেশ্য, লক্ষ্য ও প্রেরণা হলো সত্যকে সামনে আনা।’