এআই কি তাহলে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনিকে বাস্তবতায় নিয়ে আসবে, মানুষের বুদ্ধিমত্তাকে সে ছাড়িয়ে যাবে
‘ট্রান্সসেনডেন্স’ নামের ২০১৪ সালের এক মার্কিন চলচ্চিত্রে দেখানো হয়, মৃত্যুপথযাত্রী এক বিজ্ঞানী নিজের চেতনা একটি সুপারকম্পিউটারে স্থানান্তর করেন। এরপর তিনি প্রায় সর্বশক্তিমান এক বুদ্ধিমত্তায় রূপ ধারণ করেন। এর এক বছর পর মুক্তি পাওয়া ‘এক্স মাকিনা’ নামের আরেকটি চলচ্চিত্রে দেখা যায়, মানবসদৃশ একটি রোবট নিয়ন্ত্রকদের বোকা বানিয়ে বৃহত্তর জগতে ঢুকে পড়েছে।
বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনিনির্ভর এই দুটি চলচ্চিত্রসহ আরও অনেক গল্পে ‘সিঙ্গুলারিটি’ ধারণা দেখা গেছে। সিঙ্গুলারিটি বলতে এমন একটি সময়কে বোঝানো হয়েছে, যখন ভবিষ্যতে প্রযুক্তি, বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) মানুষের বুদ্ধিমত্তাকে ছাড়িয়ে যাবে এবং ধীরে ধীরে মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।
মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানি ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান গত শনিবার (২৫ জুলাই) ঘোষণা দেন, বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনিনির্ভর সেই মুহূর্ত এসে গেছে। তাঁর ভাষায়, এআই এখন ‘সিঙ্গুলারিটি’তে পৌঁছেছে। যদিও অল্টম্যান জোর দিয়ে বলেছেন, এই পরিবর্তন বিশ্বের জন্য ইতিবাচক হতে পারে। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁর মন্তব্য নতুন করে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
অল্টম্যান ঠিক কী বলেছে? তাঁর এই বক্তব্য কি আরও নির্বিঘ্ন স্বয়ংক্রিয়তার ইঙ্গিত দিচ্ছে নাকি সামনে বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি করছে?
সিঙ্গুলারিটি কী
‘সিঙ্গুলারিটি’ বলতে ভবিষ্যতের এমন একটি কাল্পনিক সময়কে বোঝানো হয়, যখন এআইয়ের মতো কোনো প্রযুক্তি মানুষের বুদ্ধিমত্তাকে ছাড়িয়ে যাবে এবং নিজে নিজের সক্ষমতা আরও বৃদ্ধি করতে পারবে। তত্ত্ব অনুযায়ী, তখন প্রযুক্তিটিকে মানুষের নিয়ন্ত্রণে রাখা বা আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। এর ফলে মানবসভ্যতার ওপর অনাকাঙ্ক্ষিত ও অনিশ্চিত প্রভাব পড়তে পারে।
এই তত্ত্ব বলছে, এআই যদি একবার নিজের উন্নয়নের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিয়ে নেয়, তাহলে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এত দ্রুত ঘটতে থাকবে যে মানুষ তার সঙ্গে তাল মেলাতে পারবে না। তখন এআই কার্যত মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে নিজস্ব গতিতে বিবর্তিত হতে থাকবে।
তবে এটি এখনো তাত্ত্বিক ধারণার পর্যায়ে রয়েছে। তাই এর প্রকৃত প্রভাব কী হতে পারে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
সারা জীবন আমি এই মুহূর্তটির [প্রযুক্তির সিঙ্গুলারিটি] অপেক্ষায় ছিলাম। আমার বিশ্বাস, এটি অসাধারণ হবে, বিশ্বের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক ও দারুণ একটি পরিবর্তন।স্যাম অল্টম্যান, প্রধান নির্বাহী, ওপেনএআই
কোনো কোনো বিশেষজ্ঞের আশঙ্কা, সিঙ্গুলারিটি মানবজাতির জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। অন্যদের মতে, কিছু বিপর্যয় তৈরি করলেও এটি মানুষের জন্য কল্যাণকর হতে পারে।
এখন পর্যন্ত সিঙ্গুলারিটির ধারণা মূলত বিজ্ঞান কল্পকাহিনির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। এর সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণগুলোর একটি হলো, ১৯৯৯ থেকে ২০০৩ সালের মধ্যে মুক্তি পাওয়া দ্য ম্যাট্রিক্স চলচ্চিত্র–ত্রয়ী। এই তিনটি চলচ্চিত্রে দেখানো হয়েছে, সিঙ্গুলারিটির পরের এক অন্ধকার ভবিষ্যতে যন্ত্রই মানুষের ওপর কর্তৃত্ব করছে, তাদের শাসন করছে।
২০১৭ সালে মুক্তি পাওয়া সিঙ্গুলারিটি নামের একটি চলচ্চিত্রে দেখা যায়, মানুষের যুদ্ধ বন্ধ করতে তৈরি একটি সুপারকম্পিউটার শেষ পর্যন্ত এই সিদ্ধান্তে পৌঁছায়, মানবজাতিই সবচেয়ে বড় হুমকি। এরপর সেটি মানুষকে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করে দিতে প্রলয়ংকরী হামলা শুরু করে।
সিঙ্গুলারিটি নিয়ে কী বলেছেন অল্টম্যান
স্যাম অল্টম্যান ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান পণ্য (প্রোডাক্ট) চ্যাটজিপিটি। এটি বর্তমানে ভোক্তাপর্যায়ের এআই বাজারে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। এর সাপ্তাহিক সক্রিয় ব্যবহারকারী ৯০ কোটির বেশি, গ্রাহকসংখ্যা প্রায় ৫ কোটি।
গত বছর অল্টম্যান পূর্বাভাস দিয়েছিলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে এআই প্রায় সব ক্ষেত্রে মানুষের বুদ্ধিমত্তাকে ছাড়িয়ে যাবে।
গত শনিবার ‘রিলেন্টলেস’ নামের একটি পডকাস্টে অল্টম্যান বলেন, ‘আমরা এখন সিঙ্গুলারিটির মধ্যে প্রবেশ করেছি।’
অল্টম্যান বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বলেন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতির দিক থেকে বিশ্ব ধীরে ধীরে সিঙ্গুলারিটির দিকে এগোচ্ছে। আমার বিশ্বাস, এই পরিবর্তন বিশ্বের জন্য ইতিবাচক হবে।
এই প্রযুক্তিবিদ আরও বলেন, ‘আমরা এখন সত্যিই সেই মুহূর্তে পৌঁছেছি, যেটি নিয়ে একসময় মধ্যাহ্নভোজের টেবিলে তেমন একটা গুরুত্ব না দিয়ে আলোচনা করতাম।’
অল্টম্যান বলেন, ‘সারা জীবন আমি এই মুহূর্তটির অপেক্ষায় ছিলাম। আমার বিশ্বাস, এটি অসাধারণ হবে, বিশ্বের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক ও দারুণ একটি পরিবর্তন।’
‘সিঙ্গুলারিটি’ বলতে ভবিষ্যতের এমন একটি কাল্পনিক সময়কে বোঝানো হয়, যখন এআইয়ের মতো কোনো প্রযুক্তি মানুষের বুদ্ধিমত্তাকে ছাড়িয়ে যাবে এবং নিজে নিজের সক্ষমতা আরও বাড়াতে পারবে।
পডকাস্টের পরবর্তী অংশে অল্টম্যান এআই খাতের সেই সব নেতার সমালোচনা করেন, যাঁরা এআই বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে বলে সতর্ক করে আসছেন। তবে তিনি কারও নাম উল্লেখ করেননি। ওপেনএআইয়ের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেই এ ধরনের সতর্কবার্তার জন্য পরিচিত।
অল্টম্যান বলেন, ‘ভবিষ্যৎ নিয়ে আঁকা অন্য কিছু প্রতিষ্ঠানের বিকল্প চিত্রগুলো আমার কাছে বেশ ভীতিকর মনে হয়। আমি নিশ্চিত করার চেষ্টা করব, যেন সে ধরনের কিছু বাস্তবে না ঘটে।’
গত মাসে ‘ক্লদ চ্যাটবটের’ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিক বিশ্বের শীর্ষ এআই প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি উন্নত এআই ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রয়োজনে সমন্বিতভাবে সাময়িকভাবে স্থগিত করার ব্যবস্থা তৈরির আহ্বান জানায়। প্রতিষ্ঠানটি সতর্ক করে বলে, এআই এত দ্রুত উন্নত হচ্ছে যে একসময় মানুষের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
এআই উন্নয়নে নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিতে অ্যানথ্রপিকের বিশেষ পরিচিতি রয়েছে। গত ৪ জুন প্রকাশিত এক ব্লগ পোস্টে প্রতিষ্ঠানটি লিখেছে, প্রয়োজনে এআইয়ের উন্নয়ন ধীর করা বা সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার সুযোগ থাকা বিশ্বের জন্য ভালো হবে।
নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ শুধু সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী ভাষা মডেলগুলো (এলএলএম) থেকে আসে—বিষয়টি এমন নয় [বরং এআই ওয়ার্মের মতো ছোট মডেল থেকেও তা আসতে পারে]। এ বিষয়টি বুঝতে পারা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।নিকোলা পাপেরনো, গবেষক, টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়
এআইয়ের ঝুঁকি নিয়ে কেন অনেকে সতর্ক করছেন
মার্কিন কংগ্রেসের দুই সদস্য গত ২৩ জুলাই ‘এআই কিল সুইচ অ্যাক্ট’ নামে একটি দ্বিদলীয় বিল উত্থাপন করেছেন। এতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের উন্নত এআই মডেলে একটি ‘কিল সুইচ’ যুক্ত করতে হবে। এর মাধ্যমে কোনো এআই মডেল যদি কখনো ভয়াবহ ঝুঁকি তৈরি করে, তাহলে মানুষ সেটিকে ধীরগতির করতে, সাময়িকভাবে স্থগিত রাখতে বা পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে পারবে।
এমন এক সময়ে বিলটি উত্থাপন করা হলো, যখন কয়েক দিন আগে ওপেনএআই ‘নজিরবিহীন এক সাইবার ঘটনা’র কথা প্রকাশ করেছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা মূল্যায়নের সময় তাদের সবচেয়ে উন্নত দুটি এআই মডেল পরীক্ষামূলক পরিবেশ থেকে বেরিয়ে যায়। এরপর সেগুলো এআই মডেল তৈরির প্ল্যাটফর্ম হাগিং ফেসে হ্যাকিং চালায়।
যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজিটাল ইকোনমি ল্যাবের উদ্যোগে ১৩ জুলাই প্রকাশিত এক খোলাচিঠিতে কয়েক শ বিশেষজ্ঞ স্বাক্ষর করেন। তাঁরা নীতিনির্ধারক ও প্রযুক্তি খাতের নেতাদের প্রতি এআইয়ের অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবিলায় ‘সময়ক্ষেপণ না করে পদক্ষেপ নেওয়ার’ আহ্বান জানান।
চিঠিতে বলা হয়, আগামী এক দশকে এআইয়ের সক্ষমতা অনেক বেশি বৃদ্ধি করতে পারে। ফলে এমন এক পরিবর্তন ঘটতে পারে, যা শিল্পবিপ্লবের চেয়েও বড় হবে। এসব কিছু অনেক কম সময়ের মধ্যে ঘটবে।
চিঠিতে আরও বলা হয়, এই পরিবর্তনের ফলে ব্যাপক কর্মসংস্থান হারানোর মতো ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তবে একই সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রার মান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হওয়ার মতো সুযোগও সৃষ্টি হতে পারে।
গত জুনে কানাডার টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক দেখান, এআই ব্যবহার করে নতুন ধরনের ‘এআই ওয়ার্ম’ তৈরি করা সম্ভব। এটি এক ডিভাইস থেকে আরেক ডিভাইসে ছড়িয়ে পড়ার সময় নিজেই হ্যাকিং কৌশল বদলে নিতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত একটি বৃহৎ কম্পিউটার নেটওয়ার্কের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারবে।
কোনো কোনো বিশেষজ্ঞের আশঙ্কা, সিঙ্গুলারিটি মানবজাতির জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। অন্যদের মতে, কিছু বিপর্যয় তৈরি করলেও এটি মানুষের জন্য কল্যাণকর হতে পারে।
গবেষণাটির প্রধান গবেষক নিকোলা পাপেরনো এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ শুধু সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী ভাষা মডেলগুলো (এলএলএম) থেকে আসে—বিষয়টি এমন নয় [বরং এআই ওয়ার্মের মতো ছোট মডেল থেকেও তা আসতে পারে]। এ বিষয়টি বুঝতে পারা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’
অ্যানথ্রপিকের প্রস্তাবের মতো গত কয়েক বছর ধরে অন্যান্য এআই গবেষকেরা এআই উন্নয়নে সাময়িক বিরতি দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে আসছেন। কিন্তু সেই আহ্বান এখনো কার্যকর হয়নি।
২০২৩ সালে অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ‘ফিউচার অব লাইফ ইনস্টিটিউট’ নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করার জন্য ছয় মাস এআই উন্নয়ন স্থগিত রাখার উদ্যোগ নিয়েছিল। টেসলার প্রধান নির্বাহী ও এক্সএআইয়ের মালিক ইলন মাস্কও উদ্যোগটি সমর্থন করেছিলেন।