যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন কী, কেন গুরুত্বপূর্ণ, কী কী জানা দরকার
যুক্তরাষ্ট্রে আগামী ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে মধ্যবর্তী নির্বাচন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মেয়াদের বাকি দুই বছর কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ তাঁর দল রিপাবলিকান পার্টি, নাকি বিরোধী ডেমোক্রেটিক পার্টির হাতে থাকবে, তা নির্ধারিত হবে এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। ফলে এবারের ভোট শুধু কংগ্রেসের আসন দখলের লড়াই নয়, ট্রাম্পের নেতৃত্ব ও তাঁর প্রশাসনের কর্মকাণ্ডের প্রতি ভোটারদের সমর্থন যাচাইয়েরও একটি পরীক্ষা।
কয়েক সপ্তাহ ধরে চলছে আগাম ভোট। ২০২২ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের মতো ভোটার উপস্থিতি হলে এবার ১০ কোটির বেশি মানুষ ভোট দিতে পারেন। নির্বাচন ঘিরে দুই দলের মধ্যে রাজনৈতিক উত্তেজনাও এখন তুঙ্গে। ভোটারদের সমর্থন পেতে উভয় দলই নির্বাচনী প্রচারে বিপুল অর্থ ব্যয় করছে।
১২ অক্টোবর পর্যন্ত নির্বাচনী বিজ্ঞাপনেই ব্যয় হয়েছে রেকর্ড ৩৮০ কোটি ডলার। নির্বাচনী অর্থায়নের নথি অনুযায়ী, রিপাবলিকানদের সমর্থনে একাই প্রায় ৩৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার ব্যয় করেছেন ধনকুবের ইলন মাস্ক। এত বিপুল অর্থের প্রচার এবং বড়সংখ্যক ভোটারের অংশগ্রহণ এবারের নির্বাচনকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলের ওপর নির্ভর করবে, ট্রাম্প তাঁর মেয়াদের বাকি সময়ে কতটা নির্বিঘ্নে আইন প্রণয়ন ও নীতিগত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারবেন। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারালে তাঁর প্রশাসনকে বিরোধী দলের বাধার মুখে পড়তে হতে পারে। অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের এক বা দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেলে ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের ওপর নজরদারি ও তদন্তের সুযোগ পাবেন।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন কী, কেন এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, কংগ্রেসের দুই কক্ষের ক্ষমতা কতটা এবং এবারের ভোটের ফল ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য কী অর্থ বহন করতে পারে—এসব প্রশ্নের উত্তর জানার চেষ্টা করা হয়েছে এই প্রতিবেদনে।
মধ্যবর্তী নির্বাচন কী
যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হয় প্রতি চার বছর পরপর। কিন্তু প্রেসিডেন্টের মেয়াদের মাঝপথে, অর্থাৎ দুই বছর পর নভেম্বরে দেশটিতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এর নাম মধ্যবর্তী নির্বাচন বা মিডটার্ম ইলেকশন। এ নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট পদে ভোট হয় না। ভোটারেরা কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদ ও উচ্চকক্ষ সিনেটের সদস্য ও বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের গভর্নর নির্বাচন করেন।
কয়েক সপ্তাহ ধরে চলছে আগাম ভোট। ২০২২ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের মতো ভোটার উপস্থিতি হলে এবার ১০ কোটির বেশি মানুষ ভোট দিতে পারেন। নির্বাচন ঘিরে দুই দলের মধ্যে রাজনৈতিক উত্তেজনাও এখন তুঙ্গে। ভোটারদের সমর্থন পেতে উভয় দলই নির্বাচনী প্রচারে বিপুল অর্থ ব্যয় করছে।
কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদ সদস্যদের মেয়াদ দুই বছর। ফলে মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের সব আসনে ভোট হয়। তবে সিনেটের সব আসনে নির্বাচন হয় না। সিনেট সদস্যদের মেয়াদ ছয় বছর। প্রতি দুই বছর পরপর এই কক্ষের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসনে ভোট হয়। এ কারণে কোনো প্রেসিডেন্টের মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে কংগ্রেসের ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
এ নির্বাচনকে শুধু আইনপ্রণেতা বেছে নেওয়ার ভোট হিসেবে দেখা হয় না। সাধারণত ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের কাজের ওপর নাগরিকেরা সন্তুষ্ট কি না, তাও এতে প্রকাশ পায়। প্রেসিডেন্টের দল ক্ষমতায় থেকে দুই বছরে কী করেছে, অর্থনীতি ও জনজীবনের পরিস্থিতি কেমন, সরকারের নীতিতে ভোটারেরা সন্তুষ্ট কি না—এসব বিষয় নির্বাচনে প্রভাব ফেলে।
আগামী ৩ নভেম্বরের নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনেই ভোট হবে। আর সিনেটের ১০০টি আসনের মধ্যে নির্বাচন হবে ৩৫টিতে। এর মধ্যে ৩৩টি আসনে নিয়মিত নির্বাচন হবে। বাকি দুটি আসনে বিশেষ নির্বাচন।
১৯৪৬ সালের পর থেকে অনুষ্ঠিত মধ্যবর্তী নির্বাচনগুলোতে ক্ষমতাসীন দল প্রতিনিধি পরিষদে গড়ে ২৬ দশমিক ৫টি আসন হারিয়েছে বলে জানিয়েছেন জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক টড বেল্ট।
তবে মধ্যবর্তী নির্বাচনের মধ্য দিয়ে প্রেসিডেন্ট পরিবর্তন হয় না। বরং তাঁর দলের হাতে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ থাকবে কি না, সেটিই নির্ধারণ হয়। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ থাকলে প্রেসিডেন্টের পক্ষে নিজের নীতিগত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা তুলনামূলক সহজ হয়।
বিপরীতে বিরোধী দল এক বা উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেলে আইন প্রণয়ন, সরকারি ব্যয় অনুমোদন এবং প্রশাসনের কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারির ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টকে বাধার মুখে পড়তে হতে পারে।
কংগ্রেস কী, এর দুই কক্ষের কাজ কী
যুক্তরাষ্ট্রের আইনসভা দ্বিকক্ষবিশিষ্ট। উচ্চকক্ষ সিনেট এবং নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদ (হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস)। আইন তৈরি ও পাস করা, কেন্দ্রীয় সরকারের ব্যয়ের অনুমোদন দেওয়া এবং সরকারের কাজের ওপর নজরদারি করা কংগ্রেসের প্রধান দায়িত্ব।
ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পেলে নিউইয়র্কের প্রতিনিধি হাকিম জেফরিস স্পিকার হতে পারেন। তিনি এখন প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের নেতা।
নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের আসনসংখ্যা ৪৩৫। যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি অঙ্গরাজ্যের প্রত্যেকটিতে এক বা একের অধিক আসন থাকে। যে অঙ্গরাজ্যে জনসংখ্যা বেশি, সেখানে আসন সংখ্যাও বেশি। আর যেখানে জনসংখ্যা কম, সেখানে আসন সংখ্যাও কম। প্রতিটি আসন থেকে একজন করে প্রতিনিধি নির্বাচিত হন। তাঁদের মেয়াদ দুই বছর। তাই, প্রতি দুই বছর পরপর প্রতিনিধি পরিষদের সব কটি আসনে নির্বাচন হয়।
অন্যদিকে, সিনেটে মোট আসন ১০০টি। যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি অঙ্গরাজ্যের প্রতিটি থেকে দুজন করে সিনেটর নির্বাচিত হন। অঙ্গরাজ্য যতই ছোট বা বড় হোক, জনসংখ্যা কম বা বেশি হোক, সিনেটে প্রতিটি অঙ্গরাজ্যের প্রতিনিধিত্ব সমান। একজন সিনেটরের মেয়াদ ছয় বছর। তবে সব সিনেটরের মেয়াদ একসঙ্গে শেষ হয় না। প্রতি দুই বছর পরপর সিনেটের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসনে নির্বাচন হয়। এভাবে সিনেটে ধারাবাহিকতা বজায় থাকে।
আইন পাসের ক্ষেত্রে দুই কক্ষেরই সম্মতি প্রয়োজন। কোনো বিল প্রতিনিধি পরিষদে পাস হওয়ার পর সিনেটেও পাস হতে হয়। এরপর সেটি প্রেসিডেন্টের কাছে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়।
তবে দুই কক্ষের কিছু আলাদা ক্ষমতাও রয়েছে। প্রতিনিধি পরিষদে সরকারি ব্যয়সংক্রান্ত বিল উত্থাপনের পাশাপাশি প্রেসিডেন্ট বা কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরু করার ক্ষমতা রয়েছে।
অন্যদিকে, প্রেসিডেন্টের মন্ত্রিসভার সদস্য, রাষ্ট্রদূত ও কেন্দ্রীয় আদালতের বিচারকদের নিয়োগ অনুমোদনের দায়িত্ব সিনেটের। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নিয়োগেও সিনেটের সম্মতি প্রয়োজন হয়।
এবারের নির্বাচনে কত আসনে ভোট হচ্ছে
আগামী ৩ নভেম্বরের নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনেই ভোট হবে। আর সিনেটের ১০০টি আসনের মধ্যে নির্বাচন হবে ৩৫টিতে। এর মধ্যে ৩৩টি আসনে নিয়মিত নির্বাচন হবে। বাকি দুটি আসনে বিশেষ নির্বাচন।
ফ্লোরিডা ও ওহাইওর এই দুটি আসন আগে যথাক্রমে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের দখলে ছিল। তাঁদের পদত্যাগের পর আসন দুটি শূন্য হয়।
এ ছাড়া ৩৬টি অঙ্গরাজ্যে গভর্নর নির্বাচন হবে। অঙ্গরাজ্যগুলোর আইনসভার সদস্য এবং বিভিন্ন স্থানীয় পদের জন্যও ভোট দেবেন ভোটারেরা।
যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ২১ কোটি নিবন্ধিত ভোটার রয়েছেন। দেশটির প্রাপ্তবয়স্ক বাসিন্দাদের প্রায় ৮০ শতাংশ ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত। ক্যালিফোর্নিয়ায় নিবন্ধিত ভোটারের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি-২ কোটি ৩২ লাখ। এরপর টেক্সাসে ১ কোটি ৭৪ লাখ এবং ফ্লোরিডায় ১ কোটি ৩৬ লাখ। এই তিন অঙ্গরাজ্যের ভোটারই দেশটির মোট নিবন্ধিত ভোটারের প্রায় ২৬ শতাংশ।
তবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের তুলনায় মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি সাধারণত কম থাকে। ১৯৪৪ সালের পর থেকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে গড়ে ৫৮ শতাংশ ভোট পড়েছে। মধ্যবর্তী নির্বাচনে এই হার প্রায় ৪২ শতাংশ।
কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পেতে দুই দলের হিসাব
বর্তমানে কংগ্রেসের উভয় কক্ষেই রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। ফলে এবারের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের লক্ষ্য দুই কক্ষের অন্তত একটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়া। আর রিপাবলিকানদের লক্ষ্য নিজেদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখা।
প্রতিনিধি পরিষদে ৪৩৫ আসনের মধ্যে কোনো দলকে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে অন্তত ২১৮টি আসন নিশ্চিত করতে হয়। বর্তমানে রিপাবলিকানদের দখলে ২১৮টি আসন, আর ডেমোক্র্যাটদের দখলে আছে ২১৪টি আসন। প্রতিনিধি পরিষদে একজন স্বতন্ত্র সদস্য রয়েছেন। এ ছাড়া দুটি আসন শূন্য রয়েছে। ফলে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ নিতে ডেমোক্র্যাটদের এবার অন্তত চারটি আসন বৃদ্ধি করতে হবে।
জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক টড বেল্ট বলেন, প্রতিনিধি পরিষদের প্রায় ৩৫টি আসনের ফল শেষ পর্যন্ত কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে উচ্চকক্ষ সিনেটের হিসাব কিছুটা আলাদা। ১০০ সদস্যের এই কক্ষে বর্তমানে রিপাবলিকানদের ৫৩ জন সদস্য রয়েছেন। আর ডেমোক্র্যাটদের সদস্য সংখ্যা ৪৫ জন। এ ছাড়া রয়েছেন দুজন স্বতন্ত্র সদস্য। ফলে ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে ভোট দেওয়া সদস্যের সংখ্যা ৪৭।
সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে সাধারণত ৫১টি আসন প্রয়োজন। তবে ভোট সমান হলে ভাইস প্রেসিডেন্টের একটি অতিরিক্ত ভোট দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে। বর্তমান ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স রিপাবলিকান হওয়ায় ৫০-৫০ সমতা হলেও তাঁর ভোটে রিপাবলিকানরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে পারবেন। এ কারণে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিতে ডেমোক্র্যাটদের নিট চারটি আসন বাড়িয়ে ৫১টিতে পৌঁছাতে হবে।
ট্রাম্প প্রশাসন নির্বাচনে হস্তক্ষেপের চেষ্টা করতে পারে—এমন আশঙ্কায় আইনি লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের নির্বাচন কর্মকর্তা ও কংগ্রেসের ডেমোক্র্যাট সদস্যরা।
এবার সিনেটের যে ৩৫টি আসনে ভোট হচ্ছে, তার মধ্যে ২২টি আসন বর্তমানে রিপাবলিকানদের এবং ১৩টি ডেমোক্র্যাটদের দখলে। ফলে ডেমোক্র্যাটদের নিজেদের ১৩টি আসন ধরে রাখার পাশাপাশি রিপাবলিকানদের দখলে থাকা কয়েকটি আসনও জিততে হবে।
সিনেটের কোন কোন আসনে নজর থাকবে
সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণে কয়েকটি অঙ্গরাজ্যের নির্বাচন বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। জর্জিয়ায় ডেমোক্র্যাট সিনেটর জন অসফের সঙ্গে লড়ছেন রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক কলিন্স। মিশিগানে সিনেটের একটি শূন্য আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ডেমোক্র্যাট আবদুল আল-সাইদ ও রিপাবলিকান মাইক রজার্স। নিউ হ্যাম্পশায়ারেও একটি শূন্য আসনে ডেমোক্র্যাট ক্রিস পাপাসের প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান জন সুনুনু।
রিপাবলিকানদের দখলে থাকা মেইন ও নর্থ ক্যারোলাইনাও ডেমোক্র্যাটদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। মেইনে রিপাবলিকান সিনেটর সুসান কলিন্সের প্রতিদ্বন্দ্বী ডেমোক্র্যাট ট্রয় জ্যাকসন। নর্থ ক্যারোলাইনায় শূন্য আসনে লড়ছেন ডেমোক্র্যাট রয় কুপার ও রিপাবলিকান মাইকেল হোয়াটলি।
এ ছাড়া ওহাইও, আলাস্কা ও আইওয়ার নির্বাচনও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হতে পারে। ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথ খুঁজতে থাকায় টেক্সাস ও কানসাসের আসনও আলোচনায় এসেছে। মেইন, ওহাইও, নর্থ ক্যারোলাইনা, আইওয়া, জর্জিয়াসহ অন্তত ১০টি সিনেট আসন চূড়ান্ত ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
ভোটারদের কাছে কোন বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ
এবারের নির্বাচনে ভোটারদের সবচেয়ে বেশি ভাবাচ্ছে জীবনযাত্রার খরচ। পেট্রল ও অন্যান্য জ্বালানির দাম, বাড়িভাড়া, বাড়ি কেনার খরচ এবং চিকিৎসার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেক পরিবারকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসন কী ভূমিকা রেখেছে, তা ভোটারদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে।
এ ছাড়া গর্ভপাতের অধিকার, অভিবাসননীতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা নিয়েও ভোটারদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। ইরান যুদ্ধের কারণে দেশের নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতিও নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার এবং তথ্য সংরক্ষণের জন্য বড় বড় ডেটা সেন্টার তৈরির ফলে মানুষের চাকরি, বিদ্যুতের চাহিদা ও খরচ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ভোটারদের পছন্দ কেমন, তার একটি ধারণা পাওয়া যায় পিউ রিসার্চ সেন্টারের জরিপে। ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে ৪ অক্টোবর পর্যন্ত নিবন্ধিত ভোটারদের মধ্যে এ জরিপ চালানো হয়। এতে দেখা যায়, ৪৪ শতাংশ ভোটার তাঁদের এলাকার ডেমোক্র্যাট প্রার্থীকে ভোট দিতে চান। আর রিপাবলিকান প্রার্থীকে ভোট দেবেন ৩৬ শতাংশ। অন্য প্রার্থীকে ভোট দিতে চান ৫ শতাংশ। আর ১৫ শতাংশ ভোটার তখনো সিদ্ধান্ত নেননি।
জরিপে নারী ও পুরুষ ভোটারদের পছন্দেও পার্থক্য দেখা গেছে। পুরুষ ভোটারদের মধ্যে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—দুই দলের প্রার্থীর সমর্থনই ৪২ শতাংশ। তবে নারী ভোটারদের মধ্যে ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন বেশি। তাঁদের ৪৫ শতাংশ ডেমোক্র্যাট প্রার্থীকে এবং ৩১ শতাংশ রিপাবলিকান প্রার্থীকে সমর্থন করেন।
ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পেলে কী হবে
প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে গেলে তাঁরা ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন কাজের ওপর নজর রাখতে পারবেন। প্রশাসনের কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠলে এ কক্ষের কমিটিগুলো তদন্ত করতে পারবে। সরকারি কর্মকর্তাদের ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবে এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র চাইতে পারবে। এ ছাড়া প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে অভিশংসনের অভিযোগ আনার ক্ষমতাও প্রতিনিধি পরিষদের হাতে।
সরকারি খরচের হিসাবেও প্রতিনিধি পরিষদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি দপ্তরগুলো চালাতে প্রতিবছর ১২টি বরাদ্দ বিল অনুমোদন করতে হয়। এসব বিল নিয়ে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের মধ্যে মতবিরোধ হলে সরকারি অর্থছাড় আটকে যেতে পারে। তখন অর্থের অভাবে সরকারের কিছু দপ্তরের কাজ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এ পরিস্থিতিকে বলা হয় ‘গভর্নমেন্ট শাটডাউন’।
তবে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পেলেই ডেমোক্র্যাটরা নিজেদের ইচ্ছেমতো আইন পাস করতে পারবেন না। কোনো বিল আইনে পরিণত হতে হলে সিনেটের অনুমোদনও প্রয়োজন। তাই সিনেট রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে থাকলে দুই কক্ষের মতবিরোধের কারণে নতুন আইন পাস করা কঠিন হতে পারে।
সিনেটে ডেমোক্র্যাটরা জিতলে কী হবে
সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে গেলে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য সমস্যা তৈরি হতে পারে। কারণ, প্রেসিডেন্ট মন্ত্রিসভার সদস্য, রাষ্ট্রদূত, কেন্দ্রীয় আদালতের বিচারক ও সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নিয়োগের জন্য যাঁদের মনোনীত করেন, তাঁদের নিয়োগ অনুমোদন করতে হয় সিনেটকে। ডেমোক্র্যাটরা সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পেলে এসব নিয়োগ আটকে দিতে বা প্রত্যাখ্যান করতে পারবেন।
এর প্রভাব ট্রাম্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও থাকতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় আদালতের বিচারকেরা সাধারণত আজীবন দায়িত্ব পালন করেন। তাই ট্রাম্পের সময়ে নিয়োগ পাওয়া বিচারকেরা তাঁর মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মামলার রায় দিতে পারেন।
প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে প্রতিনিধি পরিষদ অভিশংসনের অভিযোগ আনলে সিনেটে তার বিচার হয়। তবে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর প্রেসিডেন্টকে পদ থেকে সরাতে সিনেটের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন। ১০০ সদস্যের সিনেটে এর জন্য অন্তত ৬৭ জনের সমর্থন লাগবে। তাই শুধু সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পেলেই ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্পকে ক্ষমতা থেকে সরাতে পারবেন না।
কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে গেলেও ট্রাম্পই প্রেসিডেন্ট থাকবেন। কোনো বিল তাঁর পছন্দ না হলে তিনি সেটি আটকে দিতে পারবেন। তাঁর এই সিদ্ধান্ত বাতিল করতে হলে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—দুই কক্ষেরই অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন লাগবে।
প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার কে হবেন
ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পেলে নিউইয়র্কের প্রতিনিধি হাকিম জেফরিস স্পিকার হতে পারেন। তিনি এখন প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের নেতা।
স্পিকার নির্বাচিত হলে জেফরিস হবেন এই পদে দায়িত্ব পালন করা প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তি। তিনি প্রতিনিধি পরিষদের বিভিন্ন কমিটিকে ট্রাম্প প্রশাসন ও তাঁর ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের কর্মকাণ্ড তদন্তের দায়িত্ব দিতে পারবেন।
ট্রাম্পের সময়ে ‘নজিরবিহীন মাত্রায় দুর্নীতি’ হয়েছে বলে অভিযোগ করে আসছেন জেফরিস। তিনি বলেছেন, ডেমোক্র্যাটরা ক্ষমতায় গেলে এসব বিষয়ে তদন্ত করা হবে।
এ ছাড়া প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের কোন বিষয়গুলোকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে, তা ঠিক করবেন জেফরিস। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, স্বাস্থ্যসেবা, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, বাড়িভাড়া, জ্বালানি ও অন্যান্য খরচ সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখার দিকে দলটি গুরুত্ব দেবে।
অন্যদিকে রিপাবলিকানরা জয়ী হলে স্পিকারের পদ তাঁদের হাতেই থাকবে। বর্তমান স্পিকার মাইক জনসন আবারও এ পদে থাকতে পারেন। তবে দলের কেউ তাঁকে চ্যালেঞ্জ করলে অন্য কোনো রিপাবলিকানও স্পিকার নির্বাচিত হতে পারেন।
নির্বাচনে হস্তক্ষেপের আশঙ্কা
নির্বাচনের ফল নিয়ে অনিশ্চয়তার পাশাপাশি ভোটে হস্তক্ষেপের আশঙ্কাও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি অঙ্গরাজ্যের নিজস্ব কর্তৃপক্ষ নির্বাচন পরিচালনা করে।
২০২০ সালের নির্বাচনের পর থেকে ট্রাম্প বারবার দাবি করে আসছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি হয়। তবে এসব দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
ট্রাম্প প্রশাসন নির্বাচনে হস্তক্ষেপের চেষ্টা করতে পারে—এমন আশঙ্কায় আইনি লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের নির্বাচন কর্মকর্তা ও কংগ্রেসের ডেমোক্র্যাট সদস্যরা।