default-image

খুবই ভালো খবর হলো, গত কয়েক দশকে বিশ্ব এ ক্ষেত্রে বিস্ময়কর অগ্রগতি অর্জন করতে পেরেছে। ১৯৯০ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর যত শিশু মারা গেছে, এখন সেই সংখ্যা অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে! শিশুর মৃত্যুহারে উন্নতি ঘটানোর বিষয়টি যদি বৈশ্বিক অবস্থা পরিমাপে ভালো দিক নির্দেশ করে, তবে বলতেই হবে, গত কয়েক বছরে কোভিড–১৯–সহ নানা নেতিবাচক ঘটনা সত্ত্বেও বৈশ্বিক অবস্থার নাটকীয় অগ্রগতি হয়েছে। তা ছাড়া নতুন নতুন উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি সম্পর্কে আমি যতটা ওয়াকিবহাল, তার ভিত্তিতে বলতেই পারি যে সামনের বছরগুলোতে এ ক্ষেত্রে আরও অগ্রগতি আমরা দেখতে পাব।

শিশুমৃত্যু বিষয়টির সঙ্গে আমি প্রথম পরিচিত হই ২৫ বছর আগে নিউইয়র্ক টাইমস–এ প্রকাশিত একটি নিবন্ধের সুবাদে। নিবন্ধটি ছিল স্বল্প ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে অনিরাপদ পানি পানের কারণে সৃষ্ট স্বাস্থ্য সমস্যাগুলো নিয়ে। বিশ্বে প্রতিবছর ৩১ লাখ মানুষ ডায়রিয়ায় মারা যাচ্ছে, যাদের প্রায় সবাই শিশু—এটা জানতে পেরে আমি অত্যন্ত মর্মাহত হয়েছিলাম। ওই সব শিশুর ডায়রিয়া হওয়ার প্রধান কারণ ছিল দূষিত পানি পান করা। ডায়রিয়া ৩১ লাখ শিশুর প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে? আমি ভাবলাম, এটা সত্য হতে পারে না। আবার নিজেকে প্রশ্ন করি—পারে কি? কিন্তু সেটাই ছিল বাস্তবতা।

এরপর এ বিষয়ে আরও জানতে আমি তাগাদা অনুভব করি। আর কী কী বড় ধরনের অসমতা আছে, যেগুলো আমার জানা ছিল না?

তখন থেকে বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য নিয়ে যা কিছু খুঁজে পেতাম, তার সব পড়া শুরু করলাম। হাতের নাগালে যত বিশেষজ্ঞকে পেতাম, তাঁদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে লাগলাম। আমি জানতে পারলাম যে গবেষকেরা শিশুমৃত্যু বলতে শুধু পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুকেই বোঝান। তাঁরা এই বয়স ধরেন কারণ, প্রথম পাঁচ বছর শৈশবের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ; এ সময় শিশুরা সবচেয়ে বেশি অরক্ষিত ও ভঙ্গুর থাকে।

৮২ শতাংশ মৃত্যুর কারণ সংক্রামক ব্যাধি

শিশুমৃত্যুর ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারায় আমি এ–সংক্রান্ত পরিসংখ্যান প্রেক্ষাপটের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে পারি। ১৯৫০ সালে প্রায় দুই কোটি শিশু মারা যায়। ১৯৯০ সালে এ সংখ্যা ১ কোটি ২০ লাখে নেমে আসে, যদিও ওই সময় আগের চেয়ে বেশি শিশুর জন্ম হয়েছিল। ২০০০ সাল নাগাদ শিশুমৃত্যুর সংখ্যা ১ কোটির নিচে নেমে আসে। আর ২০১৯ সাল নাগাদ তা ৫০ লাখের নিচে নেমে আসে। বস্তুত ওই মৃত্যুর সবই ঘটেছে স্বল্প ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে।

তখন প্রশ্ন দাঁড়িয়েছিল—এত বেশিসংখ্যক শিশু কেন মারা যাচ্ছে?

এসব মৃত্যুর প্রায় ১৮ শতাংশের কারণ ছিল অসংক্রামক কিছু রোগ, যেমন ক্যানসার, হৃদ্‌যন্ত্র ও রক্তনালির সমস্যা। আর বাকি ৮২ শতাংশ মৃত্যুর কারণ ছিল সংক্রামক ব্যাধি। যার মধ্যে ডায়রিয়া ও ম্যালেরিয়া এবং মায়ের কাছ থেকে আসা শারীরিক সমস্যা, যেগুলো অপুষ্টিসহ নানা কারণে জটিল হয়েছিল এমন সব সমস্যা ছিল। (আজকের দিনেও অসংক্রামক ও সংক্রামক ব্যাধিতে মৃত্যুর অনুপাত ১৮: ৮২ রয়ে গেছে।)

এক দিক দিয়ে এটা ছিল হৃদয়বিদারক। সবচেয়ে বেশি শিশুর মৃত্যু হচ্ছিল যেসব কারণে, সেগুলোকে ধনী দেশগুলোর নাগরিকেরা বিবেচনা করতেন বড়জোর একটি দুঃখজনক অধ্যায় (যেমন ডায়রিয়া) হিসেবে; আর কিছু রোগের (যেমন ম্যালেরিয়া) অভিজ্ঞতা তাঁদের একদমই ছিল না।

অন্যভাবে বলা যায়, শিশুরা প্রাণঘাতী রোগে মারা যাচ্ছে, এটা বাস্তব সত্য হলেও তা ছিল বাস্তবতার একটি অংশ মাত্র। কোথায় তাদের জন্ম হচ্ছে, তা–ও ছিল ওই শিশুদের মৃত্যুর একটি কারণ।

অন্যদিকে এটা জানতে পারাটা অনুপ্রেরণামূলক ছিল যে এসব মৃত্যুর বড় অংশই চাইলে রোধ করা সম্ভব। যখন আমি রোগগুলোর প্রকোপ কমতে দেখলাম, তখন বুঝলাম, ‘এটাই আমাদের পথরেখা। এখানেই বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশনের কাজ করা উচিত।’

সঠিক কর্মী দল, অংশীদার ও অর্থায়নের মাধ্যমে আমরা সবচেয়ে বড় ঘাতকদের মোকাবিলায় নিয়মমতো কাজ করার মধ্য দিয়ে বিশ্বকে সাহায্য করতে পারি। যেসব সমাধান ইতিমধ্যে রয়েছে, সেগুলোকে আরও সহজলভ্য করতে হবে এবং তা স্বল্প আয়ের দেশগুলোর মানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে। আর যা দরকার, অথচ নেই, তা উদ্ভাবনে মনোযোগী হতে হবে।

শিশুমৃত্যু রোধে অগ্রগতি

দেখা যায় শিশুমৃত্যু রোধে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে যেখানে, সেটি নিউমোনিয়া। এ ক্ষেত্রে অগ্রগতিও হয়েছে। ২০০০ সালে ১৫ লাখের বেশি শিশুর প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল নিউমোনিয়া, ২০১৯ সাল নাগাদ এই সংখ্যা কমে আসে ৬ লাখ ৭০ হাজারে। এটা এখনো অনেক বড় সংখ্যা। তবে মৃত্যু কমেছে ৫৫ শতাংশের বেশি। নিউমোনিয়া–সংক্রান্ত নানা গবেষণা ও উদ্ভাবন এখনো চলছে। সেগুলো আমাকে এতটাই নাড়া দিয়েছে যে এ নিয়ে আমি আলাদা পোস্ট লিখেছি, ভিডিও করেছি।

ডায়রিয়া মোকাবিলাও অগ্রগতির আরেক উদাহরণ। গত দুই দশকে এ রোগে মৃত্যুর সংখ্যা ৫৮ শতাংশ কমেছে। এর অন্যতম প্রধান কারণ মুখে খাওয়ার স্যালাইন, যেটা রোগীর শরীরে ইলেকট্রোলাইটের ঘাটতি পূরণ করে।

এ ছাড়া বিভিন্ন দেশের সরকার ডায়রিয়ার জন্য দায়ী ব্যাকটেরিয়া ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে বড় মাত্রায় পয়োনিষ্কাশন (স্যানিটেশন) প্রকল্প পরিচালনা করেছে। অন্যদিকে বিজ্ঞানীরা সাশ্রয়ী মূল্যের রোটাভাইরাস টিকা তৈরি করেছেন। এ টিকা সর্বত্র পৌঁছে দিতে বিশ্ব একযোগে কাজ করেছে। ২০১০ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত সময়ে রোটাভাইরাস টিকা দুই লাখের বেশি মৃত্যু ঠেকিয়েছে। আশা করা হচ্ছে ২০৩০ সাল নাগাদ এ টিকা ৫ লাখের বেশি মৃত্যু রোধ করবে।

যদিও মৃত্যু অর্ধেকে নেমে এসেছে, তারপরও শিশুমৃত্যুর প্রধান তিন কারণ এখনো আগের অবস্থানেই রয়েছে। সেই ১৯৯০ সালে যেমন নবজাতকের রোগবালাই, নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়ার কারণে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হতো, এখনো তা–ই ঘটছে। তবে হামের ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নতি ঘটেছে। ১৯৯০ সালে যেখানে প্রায় পাঁচ লাখ মৃত্যুর কারণ ছিল হাম, সেখান থেকে তা এখন ৮৭ শতাংশ
কমে এসেছে।

কারণ? টিকা। ২০০০ সাল থেকে গ্যাভি (বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ, বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন ও বিশ্বব্যাংকের সমন্বয়ে গঠিত টিকা জোট) সারা বিশ্বে ৫০ কোটির বেশি শিশুকে হামের টিকা দিয়েছে। নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির পাশাপাশি বিশেষ টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে এসব টিকা দেওয়া হয়েছে। (এটা টিকার ভালো দিকের একটা উদাহরণ মাত্র।

তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে করোনা মহামারি ও অন্যান্য কারণে টিকাদানের হার কমেছে।) এ ছাড়া ম্যালেরিয়াও প্রাণঘাতী রোগের তালিকার ৪ নম্বরে বেশি দিন থাকবে না। কারণ, এর টিকাসহ বিশেষ ধরনের মশারি ও মশা নিধনের ‘শুগার বেইট’সহ নানা উদ্ভাবন হয়েছে।

শিশুর জীবন রক্ষায় আসুক সাফল্য

কয়েক দশকের এ অগ্রগতির জন্য অনেকের ধন্যবাদ প্রাপ্য। উচ্চ হারে রোগের কবলে থাকা দেশগুলো ব্যাপক মাত্রায় টিকাদান কর্মসূচি চালিয়েছে, স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটিয়েছে এবং একে অপরের সঙ্গে সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি নিয়ে অভিজ্ঞতা বিনিময় করেছে।

অপর দিকে ধনী দেশগুলো আন্তরিকতার সঙ্গে এ প্রচেষ্টায় সহায়তা দিয়েছে। ওষুধ প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলো বিশেষজ্ঞদের কাজে লাগিয়ে নতুন নতুন উদ্ভাবনে যেমন ভূমিকা রেখেছে, তেমনি স্বল্প ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর জন্য সায়শ্রী দামের ওষুধ–টিকা তৈরি করেছে। বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশনসহ অন্যান্য সংস্থা নতুন নতুন ধারণা ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনের জন্য অতিরিক্ত অর্থায়নে এগিয়ে এসেছে।

যদিও এটা সত্য যে এখনো বহু শিশু তাদের পঞ্চম জন্মদিনটা দেখা পর্যন্ত বেঁচে থাকে না, তবু এ কথাও সত্য যে বিশ্ব সঠিক পথেই এগোচ্ছে।

যদি সবাই তাদের নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করে যান, তাহলে আমরা আরও দ্রুত এগিয়ে যাব এবং আরও অনেক প্রাণ বাঁচাতে পারব। কেননা জাতিসংঘ ২০৩০ সাল নাগাদ শিশুমৃত্যু অর্ধেকে (৩০ লাখের কম) নামিয়ে আনার যে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, তা কোভিড ও অন্যান্য প্রতিবন্ধকতার কারণে অর্জন করা সম্ভব হবে না। তবে পরের দশকে ওই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব।

যখন যুদ্ধ ও মহামারি প্রতিদিনই খবরের শিরোনাম হচ্ছে, সেই সময়ে আশাবাদী হওয়ার মতো বিষয়গুলোর দিকে তাকানোটা গুরুত্বপূর্ণ। শিশুদের জীবন রক্ষায় বিশ্বের সুযোগ ও সামর্থ্য নিশ্চিতভাবে সে রকমেরই একটি বিষয়।

 ইংরেজি থেকে অনুবাদ হাসান ইমাম

যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন