ট্রাম্পের নতুন শুল্কে কার লাভ, কার ক্ষতি

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত পাল্টা শুল্ক আদালতে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে, কিন্তু তিনি পুরোনো একটি আইনের একটি ধারাকে প্রথমবারের মতো সক্রিয় করে আবার শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাঁর এই পদক্ষেপে বিশ্ববাণিজ্যে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।

ট্রাম্প প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে অন্যান্য দেশকে তাঁর নীতিতে সমর্থন দিতে শুল্ককে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে আসছেন। কিন্তু গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্প প্রশাসনের বৈশ্বিক পাল্টা শুল্ক আরোপের পদক্ষেপকে অবৈধ ঘোষণা করেন।

১৯৭৭ সালের ইন্টারন্যাশনাল ইমার্জেন্সি ইকোনমিক পাওয়ারস অ্যাক্ট (আইইইপিএ) ব্যবহার করে ২০২৫ সালের ২ এপ্রিল বিশ্বের ১৫৭টি দেশের ওপর বিভিন্ন হারে পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছিলেন ট্রাম্প।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
ফাইল ছবি: রয়টার্স

ওই শুল্ক আরোপের পর অনেক দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নানা ধরনের বাণিজ্য সমঝোতা ও চুক্তির মাধ্যমে ট্রাম্পের আরোপ করা শুল্ক নিজেদের মতো করে ঠিকঠাক করেছে।

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের সেই ক্ষমতা প্রয়োগকেই অবৈধ ঘোষণা করলেন। দেশটির সর্বোচ্চ আদালত বলেছেন, ইন্টারন্যাশনাল ইমার্জেন্সি ইকোনমিক পাওয়ারস অ্যাক্ট (আইইইপিএ) প্রেসিডেন্টকে শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দেয় না। এ ক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের।

সুপ্রিম কোর্টে বিচারকদের ৬–৩ ভোটে এই সিদ্ধান্ত আসে। রক্ষণশীল প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস রায়ে বলেন, ‘আজ আমাদের কাজ শুধু এই সিদ্ধান্ত নেওয়া যে আইইইপিএতে প্রেসিডেন্টকে দেওয়া আমদানি নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতায় শুল্ক আরোপ করার ক্ষমতা অন্তর্ভুক্ত আছে কি না। না, এটা নেই। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান কর ও শুল্ক আরোপের ক্ষমতা প্রেসিডেন্টকে নয়, কংগ্রেসকে প্রদান করেছে।’

যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট
ফাইল ছবি: রয়টার্স

তাই আদালত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের একতরফা শুল্ক নির্ধারণ ও পরিবর্তন করাকে সংবিধানবহির্ভূত ঘোষণা করে তা আটকে দেন।

তবে নাছোড়বান্দা ট্রাম্প সুপ্রিম কোর্টের এই রায় ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে নির্বাহী ক্ষমতা বলে ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের ১২২ ধারা সক্রিয় করে সব বাণিজ্য অংশীদারের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন।

অতীতে আর কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট এই ধারা প্রয়োগ করেননি। ‘বৃহৎ ও গুরুতর’ বৈদেশিক লেনদেনের ঘাটতি মেটাতে আইনের এই ধারা ব্যবহার করার কথা বলা আছে।

গতকাল শনিবার শুল্কহার আরও বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করার ঘোষণা দেন ট্রাম্প। আর ১২২ ধারা অনুযায়ী, এটিই এ আইনের সর্বোচ্চ হার। দেশের বাণিজ্যে ঘাটতি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট সাময়িকভাবে সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করতে পারেন। সর্বোচ্চ ১৫০ দিনের জন্য এ শুল্ক কার্যকর হবে। কেবল কংগ্রেস শুল্কের মেয়াদ বাড়াতে পারবে। আগামী মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) থেকে ট্রাম্পের নতুন শুল্ক কার্যকর হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউস
ফাইল ছবি: এএফপি

হোয়াইট হাউসের বরাতে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, ১২২ ধারা অনুযায়ী আরোপিত শুল্কের মধ্যে কিছু পণ্যের জন্য ছাড় রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ পদার্থ, ধাতু ও জ্বালানি পণ্য।

ট্রাম্পের এক হারে এই নতুন শুল্ক আরোপের প্রভাব একেক দেশের ওপর একেক রকম হবে। বিভিন্ন দেশ এখন এর আইনি ও অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবিলায় কীভাবে কী করা যায়, তা নিয়ে চিন্তাভাবনা করছে। কারণ, অনেক দেশের যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি রয়েছে। সেগুলো মানার বাধ্যবাধকতা কতটা, সেটাও বিবেচনা করতে হবে।

নতুন শুল্কে কোন কোন দেশ সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে বা কারা অসুবিধায় পড়তে পারে, তা দেখে নেওয়া যাক—

সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর ট্রাম্পের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার শুক্রবার ফক্স নিউজকে বলেন, সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে তাদের চুক্তি মেনে চলতেই হবে, তা ‘সেকশন ১২২’–এর শুল্কের চেয়ে বেশি হারের হলেও।

জেমিসন গ্রিয়ার আরও বলেন, মালয়েশিয়া ও কম্বোডিয়ার মতো দেশগুলো থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রপ্তানিতে আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারিত ১৯ শতাংশ শুল্কই বহাল থাকবে, যদিও ট্রাম্পের নতুন ‘সর্বজনীন’ শুল্কহার এর চেয়ে কম।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্কবিষয়ক আলোচনায় ইন্দোনেশিয়ার প্রধান সমঝোতাকারী এয়ারলাঙ্গা হার্তার্তো বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রপ্তানিতে ১৯ শতাংশ শুল্কহার নির্ধারণ করে দুই দেশের মধ্যে শুক্রবার একটি বাণিজ্যচুক্তি স্বাক্ষর হয়। আদালতের রায় সত্ত্বেও ইন্দোনেশিয়া ওই চুক্তি ধরে রাখবে।

ট্রাম্প প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে অন্যান্য দেশকে তাঁর নীতিতে সমর্থন দিতে শুল্ককে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে আসছেন
ছবি: রয়টার্স

যুক্তরাষ্ট্র–তাইওয়ান বাণিজ্যচুক্তির আওতায় তাইওয়ানের পণ্যের ওপর সাধারণ শুল্ক ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়েছে। এর বিনিময়ে তাইপে যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রায় ৮ হাজর ৫০০ কোটি ডলারের জ্বালানি, উড়োজাহাজ ও বিভিন্ন সরঞ্জাম কেনার বিষয়ে সম্মত হয়েছে।

এশিয়ার যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য অংশীদার দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের বেলাও একই শুল্ক। যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্র দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কার্যালয় ‘ব্লু হাউস’ ট্রাম্পের নতুন শুল্ক নিয়ে একটি বিবৃতি দিয়েছে। এতে বলা হয়, সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা বাণিজ্যচুক্তি পর্যালোচনা করবে এবং জাতীয় স্বার্থ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেবে।

ট্রাম্প প্রশাসনের আগের শুল্ক আরোপের পর গত বছরের নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র–দক্ষিণ কোরিয়া নতুন বাণিজ্যচুক্তি করে। এখন এ চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রে দক্ষিণ কোরিয়ার ৩৫ হাজার কোটি ডলারের বিনিয়োগের বিনিময়ে দেশটির শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়েছিল। দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৮৫ শতাংশ আসে রপ্তানি থেকে। যুক্তরাষ্ট্র দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি বাজার।

গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্প প্রশাসনের বৈশ্বিক পাল্টা শুল্ক আরোপের পদক্ষেপকে অবৈধ ঘোষণা করেন।
ছবি: রয়টার্স

যুক্তরাষ্ট্র–যুক্তরাজ্য বাণিজ্যচুক্তির আওতায় যুক্তরাজ্যের বেশির ভাগ পণ্যের আমদানিতে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাজ্য থেকে আমদানি করা গাড়ি, ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামের ওপর আরোপিত উচ্চ শুল্ক আলোচনার মাধ্যমে কমানো হয়েছে।

ট্রাম্প যেসব দেশের ওপর সবচেয়ে বেশি শুল্ক আরোপ করেছিলেন, ভারত তার একটি। শুরুতে ভারতীয় পণ্য আমদানির ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছিল। পরে রাশিয়া থেকে জ্বালানি তেল আমদানির কারণে আরও ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়। ফলে ভারতের ওপর ট্রাম্প প্রশাসনের আগের পাল্টা শুল্ক দাঁড়িয়েছিল মোট ৫০ শতাংশ।

চলতি মাসের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত একটি প্রাথমিক বাণিজ্যচুক্তিতে পৌঁছায়। তখন ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করতে রাজি হয়েছেন এবং এর বিনিময়ে পোশাক, ওষুধ, মূল্যবান পাথর, টেক্সটাইলসহ ভারতের শীর্ষ রপ্তানি পণ্যের ওপর মার্কিন শুল্ক কমিয়ে ১৮ শতাংশ করা হবে। একই সঙ্গে ভারতও সব মার্কিন শিল্পপণ্য ও বেশ কিছু কৃষিপণ্যের ওপর শুল্ক প্রত্যাহার বা হ্রাসের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।

আরও পড়ুন

তবে ব্রাজিলের মতো দেশের জন্য মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের রায় দারুণ সুখবর হয়ে এসেছে। ট্রাম্প ব্রাজিলের ওপর ৪০ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছেন। ওই শুল্ক কমানোর জন্য বা কোনো বাণিজ্যচুক্তি করা নিয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে ব্রাজিল কোনো আলোচনায়ই যায়নি। এখন সাময়িক সময়ের জন্য হলেও ব্রাজিলের ওপর মার্কিন শুল্ক ৪০ শতাংশ থেকে নেমে ১৫ শতাংশ হয়েছে।

জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস বলেন, মার্চের শুরুর দিকে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের আগে তিনি ইউরোপের যৌথ অবস্থানের মধ্যে সমন্বয় করবেন।

ইউরোপীয় পার্লামেন্টের বাণিজ্য কমিটির প্রধান বার্নড লাঙ্গে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের চুক্তি দ্রুত অনুমোদনের বিষয়টি সামনে আসতে পারে, তবে আদালতের রায়ের প্রভাব আগে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

আরও বেশ কয়েকটি দেশ বিষয়টির ওপর নজর রাখবে। মঙ্গলবার শুল্ক কার্যকর হওয়ার পর বিষয়টি হয়তো আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে।

আরও পড়ুন

সব দেশ হয়তো চুক্তি বাতিল করতে চাইবে না। অনেক দেশ ইতিমধ্যে ট্রাম্পের শুল্কনীতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে শুরু করেছে। এমনকি আন্তর্জাতিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, বৈশ্বিক অর্থনীতি এখনো তুলনামূলক স্থিতিশীল এবং আগামী বছর প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক থাকতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে দুটি সম্ভাবনা আছে—কিছু দেশ নতুন করে দর–কষাকষির চেষ্টা করবে, আবার কেউ কেউ অনিশ্চয়তা এড়াতে বিদ্যমান চুক্তিই বহাল রাখতে চাইবে।