লাতিন আমেরিকার দেশে দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান, কী কৌশল ছিল
যুক্তরাষ্ট্র গত ২০০ বছরে লাতিন আমেরিকা—তথা মধ্য আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে প্রকাশ্যে কিংবা গোপনে অসংখ্য সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছে। ভেনেজুয়েলা এমন আগ্রাসনের সর্বশেষ উদাহরণ। কোনো সার্বভৌম দেশে হামলা চালিয়ে প্রেসিডেন্ট ও ফার্স্ট লেডিকে এভাবে তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা আধুনিক ইতিহাসে নজিরবিহীন। তবে ১৯৮৯ সালে লাতিন আমেরিকার আরেক দেশ পানামায় হামলা চালিয়ে প্রায় একইভাবে দেশটির প্রেসিডেন্ট ম্যানুয়েল আন্তোনিও নরিয়েগাকে ধরে নিয়ে গিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা। এ লেখায় লাতিন আমেরিকায় যুগে যুগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে পরিচালিত উল্লেখযোগ্য কিছু অভিযান নিয়ে সংক্ষেপে আলোকপাত করা হলো।
কয়েক মাসের জল্পনার অবসান ঘটিয়ে গত শনিবার ভোররাতে ভেনেজুয়েলায় ‘বড় পরিসরে’ আগ্রাসন চালায় যুক্তরাষ্ট্র। তুলে নিয়ে যায় দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো এবং তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে। কোনো সার্বভৌম দেশে হামলা চালিয়ে প্রেসিডেন্ট ও ফার্স্ট লেডিকে এভাবে তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা আধুনিক ইতিহাসে নজিরবিহীন। তবে ১৯৮৯ সালে লাতিন আমেরিকার আরেক দেশ পানামায় হামলা চালিয়ে প্রায় একইভাবে দেশটির প্রেসিডেন্ট ম্যানুয়েল আন্তোনিও নরিয়েগাকে ধরে নিয়ে গিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা।
যুক্তরাষ্ট্র গত ২০০ বছরে লাতিন আমেরিকা তথা মধ্য আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে প্রকাশ্যে কিংবা গোপনে সংখ্যা সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছে। এর মধ্যে ১৮০০ সালের শেষ দিক থেকে বিশ শতকের শুরু পর্যন্ত মধ্য আমেরিকায় পরিচালিত অভিযানগুলো ‘বানানা ওয়ারস’ নামে পরিচিত। এ অঞ্চলে মার্কিন কোম্পানির স্বার্থ রক্ষায় এসব অভিযান চালানো হয়েছিল।
প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্টের আমলে ১৯৩৪ সালে ‘গুড নেইবার পলিসি’ ঘোষণা করে যুক্তরাষ্ট্র। এতে দক্ষিণ বা লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে আক্রমণ কিংবা দখলদারি না চালানো ও তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু শীতল যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র এ অঞ্চলের নির্বাচিত বামপন্থী নেতাদের উৎখাতের লক্ষ্যে অসংখ্য অভিযানে অর্থায়ন করে।
যুক্তরাষ্ট্রের এসব অভিযানের কিছু সফল হয়, আর কিছু ব্যর্থ হয়। এসব অভিযানের প্রায় সব কটি যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার (সিআইএ) সমন্বয়ে পরিচালনা করা হয়েছিল। সংস্থাটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৪৭ সালে।
ভেনেজুয়েলায় গত শনিবার পরিচালিত ‘অপারেশন অ্যাবসলিউট রিসলভ’-কে স্নায়ুযুদ্ধের পর লাতিন আমেরিকায় সবচেয়ে বড় মার্কিন সামরিক অভিযান বলে উল্লেখ করা হয়েছে বিবিসির প্রতিবেদনে।
লাতিন আমেরিকার নানা দেশে বিভিন্ন সময় যুক্তরাষ্ট্রের চালানো এ ধরনের কিছু অভিযানের ইতিহাস সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো—
গুয়াতেমালা
১৯৫৪ সালে গুয়াতেমালার নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হাকোবো আরবেঞ্জ গুজমান স্থানীয় সশস্ত্র কিছু গোষ্ঠীর হাতে উৎখাত হন। এসব গোষ্ঠীকে সহায়তা দিয়েছিল সিআইএ। তখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ছিলেন রিপাবলিকান পার্টির ডুয়াইট আইজেনহাওয়ার।
আরবেঞ্জ একটি কোম্পানিকে জাতীয়করণ করতে চেয়েছিলেন। এতে যুক্তরাষ্ট্রে এ আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল, আরবেঞ্জের অধীন গুয়াতেমালায় আরও সমাজতান্ত্রিক নীতি গড়ে উঠবে।
অপারেশন পিবিসাকসেসের অধীন সিআইএ গুয়াতেমালার সামরিক কর্মকর্তা কার্লোস কাস্তিয়ো আরমাসের নেতৃত্বাধীন যোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দেয়। তাঁরা আরবেঞ্জকে উৎখাত করেন। অভ্যুত্থানের পর আরমাস ক্ষমতা দখল করেন।
পরে ১৯৬০ সালে গুয়াতেমালায় গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। চলে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত। গৃহযুদ্ধের একদিকে ছিল সরকার ও সামরিক বাহিনী, অন্যদিকে বিভিন্ন বামপন্থী বিদ্রোহী গোষ্ঠী।
চিলির বামপন্থী প্রেসিডেন্ট সালভাদর আলেন্দকে উৎখাত করার জন্য অর্থায়ন করেছিল সিআইএ। আলেন্দ কয়েকটি তামা কোম্পানি জাতীয়করণের পরিকল্পনা করেছিলেন। এসব কোম্পানির অনেকগুলো মার্কিন মালিকানাধীন ছিল।
ভেনেজুয়েলায় গত শনিবার পরিচালিত ‘অপারেশন অ্যাবসোলিউট রিসোলভ’-কে স্নায়ুযুদ্ধের পর লাতিন আমেরিকায় সবচেয়ে বড় মার্কিন সামরিক অভিযান বলে উল্লেখ করা হয়েছে বিবিসির প্রতিবেদনে।
কিউবা
কিউবার স্বৈরশাসক ফুলজেনসিও বাতিস্তাকে উৎখাত করে ১৯৫৯ সালে ক্ষমতায় আসেন দেশটির কমিউনিস্ট নেতা ফিদেল কাস্ত্রো। দেশটিতে এ কমিউনিস্ট বিপ্লব ওয়াশিংটন পছন্দ করেনি।
আইজেনহাওয়ারের আমলে কিউবার নির্বাসিত নাগরিকদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা করে সিআইএ। উদ্দেশ্য, আক্রমণ চালিয়ে কাস্ত্রো সরকারকে উৎখাত করা। ১৯৬০ সালে নবনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডিকে শপথ গ্রহণের সময় এ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানানো হয়।
যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে সিআইএর প্রশিক্ষণ শিবির সম্পর্কে খবর পেয়ে যান কাস্ত্রো। তা সত্ত্বেও নিজেদের পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যায় সিআইএ। ১৯৬১ সালে কেনেডি ‘বে অব পিগস ইনভেশনের’ অনুমোদন দেন। কিন্তু কিউবার সামরিক বাহিনীর প্রতিরোধের মুখে দেশটির নির্বাসিত নাগরিকদের দিয়ে কাস্ত্রোকে উৎখাতের সেই অভিযান ব্যর্থ হয়।
ব্রাজিল
১৯৬১ সালে ব্রাজিলে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন জোয়াও গুলার্ট। সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংস্কার বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়ে তিনি ক্ষমতায় এসেছিলেন। তিনি কিউবার মতো সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন ও মার্কিন মালিকানাধীন ইন্টারন্যাশনাল টেলিফোন অ্যান্ড টেলিগ্রাফের (আইটিটি) একটি সহায়ক প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করেছিলেন।
এ ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় ব্রাজিলের যুক্তরাষ্ট্রপন্থী রাজনীতিবিদদের অর্থায়ন ও বামপন্থীবিরোধী বিভিন্ন গোষ্ঠীকে সমর্থন দিতে শুরু করে সিআইএ। সংস্থাটির তৎপরতার কারণে গুলার্ট সরকার দুর্বল হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত ১৯৬৪ সালে ব্রাজিলে সামরিক অভ্যুত্থান হয়। শুরু হয় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ স্বৈরশাসনের, যা স্থায়ী হয়েছিল ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত।
১৯৬১ সালে কেনেডি ‘বে অব পিগস ইনভেশনের’ অনুমোদন দেন। কিন্তু কিউবার সামরিক বাহিনীর প্রতিরোধের মুখে দেশটির নির্বাসিত নাগরিকদের দিয়ে কাস্ত্রোকে উৎখাতের সেই অভিযান ব্যর্থ হয়।
ইকুয়েডর
ইকুয়েডরে ১৯২৫ থেকে ১৯৪৭ সালের মধ্যে ২৭ জন প্রেসিডেন্ট আসা-যাওয়া করেন। কিন্তু ১৯৫০-এর দশকে দেশটিতে এক বিরল স্থিতিশীল অবস্থা বিরাজ করে। তবে তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।
১৯৬০-এর দশকের শুরুতে ইকুয়েডরের প্রেসিডেন্ট হোসে ভেলাসকো ইবারা ও ভাইস প্রেসিডেন্ট কার্লোস হুলিও আরোসেমেনার কিউবাপন্থী নীতি নিয়ে উদ্বেগে পড়ে যুক্তরাষ্ট্র। ইকুয়েডরের এসব নেতা সোভিয়েত ব্লকের দেশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার পক্ষপাতী ছিলেন।
সিআইএ ইকুয়েডরের তৎকালীন নেতাদের এ মনোভাব পছন্দ করেনি। সংস্থাটি যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিক সংগঠনগুলোর মাধ্যমে দেশটিতে বামপন্থীবিরোধী মনোভাব ছড়ানোর জন্য অর্থায়ন করেছিল।
পরবর্তী সময়ে সিআইএর একজন এজেন্ট মার্কিন বিশ্লেষক রজার মরিসকে বলেন, ‘শেষ পর্যন্ত তারা (সিআইএ) ইকুয়েডরে যাঁদের ন্যূনতম প্রভাবও ছিল, তাঁদের প্রায় সবাইকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারত।’ লাতিন আমেরিকায় নিজেদের কর্মকাণ্ড মূল্যায়নে ২০০৪ সালে সিআইএর অনুমোদনে সংস্থাটির ওই এজেন্ট এ কথা বলেছিলেন।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, আরোসেমেনা প্রথমে ইবারার বিরুদ্ধে একটি অভ্যুত্থান ঘটান এবং আরও বেশি বামপন্থার দিকে ঝোঁকেন। পরে তিনি সুর নরম করেন। এরপর ১৯৬৩ সালে সেনাবাহিনী তাঁর বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান করে। নতুন সামরিক শাসক কমিউনিস্ট পার্টিকে নিষিদ্ধ ও কিউবার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে। এসবই মূলত যুক্তরাষ্ট্রের চাওয়া ছিল।
বলিভিয়া
বলিভিয়ার রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের জন্য ১৯৬৩ থেকে ১৯৬৪ সালের মধ্যে গোপনে বিপুল অর্থায়ন করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। এসব গোপন কর্মকাণ্ডের নেতৃত্ব দিত সিআইএ।
বলিভিয়ার যেসব নেতা মার্কিন তহবিল পেয়েছিলেন, তাঁরা ১৯৬৪ সালের নভেম্বরে দেশটির সামরিক অভ্যুত্থানকে সমর্থন করেছিলেন। অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন জেনারেল রেনে বারিয়েন্টোস ওর্তুনো। অভ্যুত্থানে উৎখাত হয়ে দেশটির নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ভিক্তর পাজ এস্তেনসোরো নির্বাসনে চলে যেতে বাধ্য হন।
কিন্তু সফল সামরিক অভ্যুত্থানের পরও বলিভিয়ায় হস্তক্ষেপ বন্ধ করেনি যুক্তরাষ্ট্র। ১৯৭০-এর দশকের শুরুতে দেশটির আরেকটি সরকার পরিবর্তনের দিকে নজর দেয় ওয়াশিংটন। এবার নিশানা প্রেসিডেন্ট হুয়ান হোসে তোরেস। তিনি ক্ষমতায় এসে দেশটিতে সক্রিয় একাধিক মার্কিন কোম্পানিকে জাতীয়করণ করেছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭১ সালের জুনে বলিভিয়ার প্রশাসনিক রাজধানী লাপাজে নিয়োজিত তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ওয়াশিংটনকে জানিয়েছিলেন, তোরেসের বিরোধীদের সমর্থন দেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে তোরেসের বিরোধিতা করার জন্য বলিভিয়ার সেনা ও রাজনৈতিক নেতাদের অর্থসহায়তা দিতে হোয়াইট হাউস গোপনে ৪ লাখ ১০ হাজার ডলার (বর্তমান মূল্যে প্রায় ৩৩ লাখ ডলার) তহবিল বরাদ্দ দেয়।
দুই মাস পর বলিভিয়ার জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা হুগো বানজার প্রেসিডেন্ট তোরেসের বিরুদ্ধে সফল অভ্যুত্থান ঘটান। অভ্যুত্থানের পরও বানজার সরকারকে অর্থায়ন করা অব্যাহত রাখে যুক্তরাষ্ট্র। বানজার সরকার ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত বলিভিয়া শাসন করে। প্রায় দুই দশক পরে ১৯৯৭ সালে নির্বাচনের মাধ্যমে আবার ক্ষমতায় এসেছিলেন বানজার।
চিলি
চিলির বামপন্থী প্রেসিডেন্ট সালভাদর আলেন্দকে উৎখাত করার জন্য অর্থায়ন করেছিল সিআইএ। আলেন্দ কয়েকটি তামা কোম্পানি জাতীয়করণের পরিকল্পনা করেছিলেন। এসব কোম্পানির অনেকগুলো মার্কিন মালিকানাধীন ছিল।
আলেন্দের প্রতিদ্বন্দ্বীদের সমর্থন এবং বামপন্থীবিরোধী মনোভাব ছড়ানোর কাজে সিআইএর তহবিলের বড় একটি অংশ ব্যবহার করা হয়েছিল। দেশটিতে শেষ পর্যন্ত ১৯৭৩ সালে সামরিক অভ্যুত্থান হয়। অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেন জেনারেল অগাস্তো পিনোশে। পিনোশের নির্মম স্বৈরশাসন ১৭ বছর স্থায়ী হয়েছিল।
অভ্যুত্থানের সময় গ্রেপ্তার হওয়ার আগে একে ৪৭ রাইফেল ব্যবহার করে আত্মহত্যা করেন আলেন্দ। তবে তাঁর মৃত্যুর কারণ নিয়ে দীর্ঘদিন নানা সন্দেহ ছিল। কয়েক দশক পর তাঁর আত্মহত্যার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে।
৬ দেশে অপারেশন কন্ডর
ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির কারণে রিচার্ড নিক্সনের পদত্যাগের পর ১৯৭৪ সালের আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হন জেরাল্ড ফোর্ড। পরের বছর লাতিন আমেরিকার ছয় দেশে ডানপন্থী সামরিক স্বৈরশাসনকে সমর্থন দিতে একটি আন্তরাষ্ট্রীয় নেটওয়ার্কের কার্যক্রম শুরু করে সিআইএ। এ নেটওয়ার্কের নাম ছিল ‘অপারেশন কন্ডর’, যা ১০ থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত সক্রিয় ছিল।
অপারেশন কন্ডরের নিশানায় থাকা দেশগুলো ছিল আর্জেন্টিনা, বলিভিয়া, ব্রাজিল, চিলি, উরুগুয়ে ও প্যারাগুয়ে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, বামপন্থী ও কমিউনিস্ট-সমর্থকদের দমন করা ছিল এ অভিযানের উদ্দেশ্য। এ জন্য এসব দেশের স্বৈরশাসকেরা একটি সাধারণ ডেটাবেজ বা তথ্যভান্ডার ব্যবহার করতেন। এর মধ্য দিয়ে স্বৈরশাসনবিরোধী ব্যক্তি ও তাঁদের পরিবারের ওপর নজরদারি চালানো হতো।
এ ছয় দেশের স্বৈরশাসকেরা নিজেদের মধ্যে গোয়েন্দা ও সাধারণ তথ্য, বন্দী ও নির্যাতনের কৌশল বিনিময় করতেন। লাতিন আমেরিকার কয়েকটি সংগঠন এবং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ উদ্যোগ ‘প্ল্যান কন্ডরের’ তথ্যমতে, এ অভিযানে অন্তত ৯৭ জন প্রাণ হারিয়েছিলেন।
১৯৮৯ সালে পানামায় অভিযান চালায় যুক্তরাষ্ট্র। নাম ছিল ‘অপারেশন জাস্ট কজ’। তখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ছিলেন জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ।
এল সালভাদর
মধ্য আমেরিকার দেশ এল সালভাদরের সেনাবাহিনীর অভিজাত ‘অ্যাটলাকাতল ব্যাটালিয়ন’ ১৯৮১ সালের ডিসেম্বরে দেশটির এল মোজোতে গ্রামে এক ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ চালায়। এতে নারী-শিশুসহ প্রায় ১ হাজার মানুষ নিহত হন। ১৯৮০-৯২ সালের মধ্যে দেশটিতে গৃহযুদ্ধ চলাকালে এ হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হয়েছিল।
অ্যাটলাকাতল ব্যাটালিয়নকে প্রশিক্ষণ ও সামরিক সরঞ্জাম দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। শীতল যুদ্ধ নীতির বিস্তৃত অংশ হিসেবে লাতিন আমেরিকার বামপন্থী বিদ্রোহীদের দমন করতে এসব সহায়তা দেওয়া হয়। ওই সময় এল সালভাদরে সামরিক সহায়তা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি করেছিল ওয়াশিংটন।
কয়েক মাস আগে থেকে ‘অপারেশন অ্যাবসোলিউট রিসোলভ’-এর প্রস্তুতি নিচ্ছিল যুক্তরাষ্ট্র। সেনাবাহিনীর বিশেষায়িত শাখা ডেল্টা ফোর্স, যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই), কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার (সিআইএ) একটি ছোট দল অভিযান সর্বোচ্চ গোপনীয়তা বজায় রেখে সমন্বয় করে। ভেনেজুয়েলার সরকারের একটি সূত্রও সক্রিয়ভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা করেছিল।
গ্রেনাডা
ক্যারিবীয় অঞ্চলের ছোট দেশ গ্রেনাডার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এরিক গ্যারি বিদেশ সফরে থাকাকালে ১৯৭৯ সালে সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেছিলেন মরিস বিসপ। নিজেকে প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করে মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী নীতি গ্রহণ করেছিলেন তিনি।
১৯৮০-এর দশকের শুরুর দিকে গ্রেনাডায় কিউবার প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে যুক্তরাষ্ট্র। নেতৃত্ব নিয়ে ১৯৮৩ সালের অক্টোবরে বিসপের দলের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘাত হয়। এ পরিস্থিতিতে দেশটিতে আকস্মিক অভিযান চালায় যুক্তরাষ্ট্র। অভিযানের নাম ছিল ‘অপারেশন আর্জেন্ট ফিউরি’।
এ অভিযান চালিয়ে গ্রেনাডাতে অবস্থানকারী কিউবার নাগরিকদের গ্রেপ্তার করা হয়। পাশাপাশি নিশ্চিত করা হয় দেশটি ওয়াশিংটনের চাওয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চলবে।
পানামা
পানামায় ১৯৮৫ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসেন ম্যানুয়েল আন্তোনিও নরিয়েগা। সেনাবাহিনীতে থাকাকালে নরিয়েগা যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ছিলেন। কিন্তু ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের অবনতি হতে থাকে।
যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের নিরাপত্তা, অগণতান্ত্রিক শাসনের অবসান, দুর্নীতি এবং অবৈধ মাদক ব্যবসা বন্ধের অজুহাতে ১৯৮৯ সালে পানামায় বিশেষ অভিযান চালায় যুক্তরাষ্ট্র। এ অভিযানের নাম ছিল ‘অপারেশন জাস্ট কজ’। এতে দেশটির সেনাবাহিনীর অভিজাত বাহিনী ‘ডেল্টা ফোর্স’ অংশ নিয়েছিল। বাহিনীটি ভেনেজুয়েলায় শুক্রবার রাতের অভিযানেও অংশ নেয়।
হামলার আগে ১৯৮৮ সালে নরিয়েগারের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছিল, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের মায়ামিতে মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িত। নরিয়েগা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন।
তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ছিলেন জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশের নির্দেশে ১৯৮৯ সালের ২০ ডিসেম্বর পানামায় হামলা চালান যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা। মার্কিন হামলার আগে পানামার জাতীয় নির্বাচন বাতিল করেন নরিয়েগা। এ সময় দেশটিতে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী মনোভাব তুঙ্গে ওঠে।
যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে পানামার সেনা ও অন্যান্য বাহিনী কিছুটা প্রতিরোধ গড়ে তোলে। কিন্তু তা কয়েক দিনের বেশি টিকতে পারেনি। অভিযানে কত মানুষ মারা গিয়েছিলেন, তার সঠিক সংখ্যা জানা যায় না। আর যুক্তরাষ্ট্র মৃতের যে সংখ্যার কথা স্বীকার করে, তা প্রকৃত সংখ্যার চেয়ে অনেক কম।
হামলার মুখে নরিয়েগা পানামার ভ্যাটিকান দূতাবাসে আশ্রয় নিয়েছিলেন। এ নিরাপদ আশ্রয় ত্যাগের জন্য তাঁর ওপর নানাভাবে মানসিক চাপ তৈরি করা হয়। উচ্চ শব্দে বাজানো হয় দ্য ক্ল্যাশ, ভ্যান হেইলন এবং ইউ২-এর মতো রক ব্যান্ডের গান। ১১ দিনের মাথায় তিনি ভ্যাটিকান দূতাবাস ত্যাগ করতে বাধ্য হন।
এরপর নরিয়েগাকে গ্রেপ্তার করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়া হয়। মায়ামির একটি আদলতে তাঁর বিচার হয়। ২০১০ সাল পর্যন্ত তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কারাগারে আটক ছিলেন। ওই বছর আরেকটি মামলায় মুখোমুখি হওয়ার জন্য তাঁকে ফ্রান্সে পাঠানো হয়। এর এক বছর পর তাঁকে পানামায় ফেরত পাঠানো হয়। নিজ দেশে ২০১৯ সালে কারাগারে তাঁর মৃত্যু হয়।
ভেনেজুয়েলা
হুগো চাভেজ সাম্রাজ্যবাদবিরোধী একটি প্ল্যাটফর্ম থেকে ১৯৯৯ সালে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। এরপর তিনি আলোচিত ‘বলিভিয়ারা বিপ্লব’ শুরু করেন। ভেনেজুয়েলার স্বাধীনতাসংগ্রামের নেতা সিমন বলিভারের নামে এ বিপ্লব বা আন্দোলনের নাম দেওয়া হয়েছিল। বলিভিয়ারা বিপ্লবের অংশ হিসেবে সংবিধান সংস্কার ও তেল খাতের জাতীয়করণ করেন।
তখন থেকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে কারাকাসের সম্পর্ক দ্রুত খারাপ হতে শুরু করে। এখন পর্যন্ত বিশ্বের সবচেয়ে বেশি জ্বালানি তেলের সন্ধান পাওয়া লাতিন আমেরিকার দেশটির সঙ্গে এর পর থেকে সম্পর্ক আর কখনো স্বাভাবিক হয়নি।
ট্রাম্প প্রথম মেয়াদেই (২০১৭-২১) মাদুরোর বিরুদ্ধে নানা পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। ২০২০ সালের মার্চে ম্যানহাটানের ফেডারেল আদালতে মাদুরোর বিরুদ্ধে ‘মাদক পাচার-সংক্রান্ত সন্ত্রাসবাদ’-এর অভিযোগ আনা হয়েছিল। তখনই মাদুরোর অবস্থান সম্পর্কে তথ্য দিতে ১ কোটি ৫০ লাখ ডলার পুরস্কার ঘোষণা করেছিলেন ট্রাম্প। গত আগস্টে তা বাড়িয়ে পাঁচ কোটি ডলার করা হয়।
গত সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে ক্যারিবীয় সাগর ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে তথাকথিত মাদকবাহী নৌযানে যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা হামলা চালাতে শুরু করেন। গত শুক্রবার পর্যন্ত অন্তত ৩৫টি নৌযানে মার্কিন হামলায় ১০০ জনের বেশি নিহত হন। নিহতদের প্রায় সবাই ভেনেজুয়েলার। ওয়াশিংটনের দাবি, এসব নৌযান ও ব্যক্তি মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িত।
এরই মধ্যে ভেনেজুয়েলা উপকূলের কাছে বড় পরিসরে সামরিক শক্তি মোতায়েন করে যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্প সম্প্রতি বলেছেন, ভেনেজুয়েলার ভেতরে স্থল অভিযানের সম্ভাবনা তিনি একেবারে বাতিল করে দিচ্ছেন না। একপর্যায়ে তিনি দেশটিতে শিগগিরই স্থলপথে অভিযানের ঘোষণা দেন।
মাদুরোর বিরুদ্ধে ট্রাম্পের অভিযোগ, তিনি যুক্তরাষ্ট্রে ফেন্টানাইল ও হেরোইনের মতো মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িত। তা ছাড়া তাঁর কাছে ‘অবৈধ অস্ত্র’ও রয়েছে। ট্রাম্প মাদুরোর প্রতি আত্মসমর্পণের আহ্বান জানান।
ট্রাম্পের সব অভিযোগ অস্বীকার করে মাদুরো পাল্টা অভিযোগ করেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের মূলত উদ্দেশ্যে আমাদের জ্বালানি সম্পদ লুট করা। এ জন্য তারা আমাকে সরিয়ে দিতে চায়।’
ক্রমেই বাড়তে থাকা উত্তেজনার মধ্যে গত শনিবার শেষ রাতে (স্থানীয় সময় রাত ২টা ১ মিনিটে) ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসসহ দেশটির বিভিন্ন স্থান বিকট বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে। ২৫ মিনিটের মতো দ্রুতগতির অভিযানে বোমারু, যুদ্ধবিমান এবং নজরদারিতে দেড় শর বেশি উড়োজাহাজ অংশ নেয়। হামলার শুরুতে ভেনেজুয়েলার প্রায় সব আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস করে দেওয়া হয়।
কয়েক মাস আগে থেকে ‘অপারেশন অ্যাবসলিউট রিসলভ’-এর প্রস্তুতি নিচ্ছিল যুক্তরাষ্ট্র। সেনাবাহিনীর বিশেষায়িত শাখা ডেল্টা ফোর্স, যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই), কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার (সিআইএ) একটি ছোট দল অভিযান সর্বোচ্চ গোপনীয়তা বজায় রেখে সমন্বয় করে। ভেনেজুয়েলার সরকারের একটি সূত্রও সক্রিয়ভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা করেছিল।
মাদুরোকে এখন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের ব্রুকলিনের একমাত্র আটককেন্দ্র মেট্রোপলিটন ডিটেনশন সেন্টারে (এমডিসি) রাখা হয়েছে। মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে গতকাল সোমবার ম্যানহাটানের ফেডারেল আদালতে হাজির করা হয়েছে। সেখানে ‘মাদক পাচার’-এর মামলায় তাঁর তথাকথিত বিচার করা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ব্রাজিল, রাশিয়া, চীন, কলম্বিয়া, কিউবাসহ বিশ্বের অনেক দেশ মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী ফ্লোরেসকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
তথ্যসূত্র: আল-জাজিরা, বিবিসি, সিএনএন এবং দ্য গার্ডিয়ান অবলম্বনে