ন্যাটোর প্রধানের সঙ্গে বৈঠকে মিত্রদের নিয়ে কী বললেন ট্রাম্প

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (ডানে) ও ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুতে। সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের বৈঠকের ফাঁকে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে, ২১ জানুয়ারি ২০২৬ছবি: রয়টার্স

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদেশগুলো যোগ দিতে রাজি না হওয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘চরম হতাশ’। স্থানীয় সময় গতকাল বুধবার ওয়াশিংটনে ট্রাম্পের সঙ্গে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠক শেষে ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুতে এ মন্তব্য করেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে একান্ত বৈঠকের পর সিএনএনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রুতে নানা বিষয়ে কথা বলেন। ট্রাম্পের সঙ্গে আলাপচারিতাকে তিনি ‘দুই বন্ধুর’ মধ্যে হওয়া একটি ‘অত্যন্ত স্পষ্ট ও খোলামেলা’ আলোচনা হিসেবে বর্ণনা করেন। তবে ইরান যুদ্ধকে ঘিরে ট্রাম্প ন্যাটো থেকে বেরিয়ে যাওয়ার হুমকি দিয়েছেন কি না, তা নিয়ে রুতে সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি।

ট্রাম্প ও রুতের বৈঠকটি এমন এক সংবেদনশীল সময়ে হলো, যার মাত্র এক দিন আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। চুক্তির আওতায় হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার কথা রয়েছে।

এর আগে ট্রাম্প ইরানের বেসামরিক স্থাপনায় হামলার হুমকি দিয়ে বলেছিলেন, তেহরানকে মঙ্গলবার সন্ধ্যার আলটিমেটামের মধ্যে এ প্রণালি খুলে দিতে হবে। অন্যথায় ইরানের ‘পুরো সভ্যতা বিলুপ্ত হয়ে যাবে’। এ আলটিমেটামের দেড় ঘণ্টা আগে ট্রাম্প নিজেই যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যৌথভাবে আগ্রাসন শুরু করে। হামলার কয়েক দিনের মধ্যে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি প্রায় বন্ধ করে দেয় ইরান। এতে প্রতি ব্যারেল জ্বালানির দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়।

এ পরিস্থিতিতে শক্তি প্রয়োগ করে জলপথটিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করতে সেখানে মিত্রদের যুদ্ধজাহাজ পাঠাতে অনুরোধ জানিয়েছিলেন ট্রাম্প, কিন্তু তারা তাতে সাড়া দেয়নি। এতে ট্রাম্প খুব চটে যান। এরপর ৭৭ বছরের পুরোনো সামরিক জোট ন্যাটোর তীব্র সমালোচনা করেন তিনি। জোটটিকে তিনি ‘কাগুজে বাঘ’ বলেও তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেন।

নিউইয়র্কের টাইমস স্কয়ারে একটি ডিজিটাল বিলবোর্ডে প্রদর্শিত হচ্ছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ছবি। ৮ এপ্রিল ২০২৬
ছবি: এএফপি

ট্রাম্প ও রুতের মধ্যে একসময় উষ্ণ সম্পর্ক ছিল। সে সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে আটলান্টিক পারের সামরিক মিত্রদের প্রতি ট্রাম্পের অবজ্ঞা কমাতে চেয়েছিলেন রুতে; কিন্তু তেমন সফল হননি। কারণ, ইরান যুদ্ধের সময় এই মিত্ররা ওয়াশিংটনকে সমর্থন দেয়নি।

বৈঠকের পর নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘আমাদের যখন ন্যাটোর দরকার ছিল, তখন তাদের পাওয়া যায়নি। ভবিষ্যতে কখনো দরকার হলেও তাদের পাওয়া যাবে না। গ্রিনল্যান্ডের কথা মনে আছে? ওই যে বড়, অব্যবস্থাপনায় ভরা এক বরফের খণ্ড!!!’ চলতি সপ্তাহের শুরুতে ট্রাম্প বলেছিলেন, গ্রিনল্যান্ড দখলের চেষ্টায় মিত্রদের বাধা দেওয়ার পর থেকে ন্যাটোর ওপর তাঁর নতুন করে বিরক্তি ‘শুরু’ হয়।

বুধবার ট্রাম্প-রুতে বৈঠকের আগে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলাইন লেভিট বলেন, প্রেসিডেন্ট ন্যাটো ছাড়ার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। লেভিট বলেন, ‘আমি মনে করি, এটি এমন একটি বিষয়, যা নিয়ে প্রেসিডেন্ট কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মহাসচিব রুতের সঙ্গে আলোচনা করবেন।’

ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই ন্যাটোর সমালোচক। প্রথম মেয়াদে (২০১৭-২০) ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, এ জোট থেকে তাঁর একতরফাভাবে বেরিয়ে যাওয়ার এখতিয়ার রয়েছে। তবে মার্কিন কংগ্রেস ২০২৩ সালে একটি আইন পাস করে, ফলে কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের একতরফাভাবে ন্যাটো থেকে বের হওয়া সম্ভব নয়।

ন্যাটো ৩২টি দেশের একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা জোট। এই জোটের মূল কথা হলো, কোনো একটি সদস্যদেশের ওপর হামলা হলে তা সবার ওপর হামলা হিসেবে গণ্য হবে, যা চুক্তির ‘আর্টিকেল ৫’ নামে পরিচিত। ১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই জোটের ইতিহাসে এই ধারা মাত্র একবারই কার্যকর করা হয়েছে, তা ছিল ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের টুইন টাওয়ারে হামলার পর আফগানিস্তান ও ইরাকে অভিযানে ওয়াশিংটনের সঙ্গে অংশগ্রহণ।

ন্যাটোর সমর্থন পাওয়া সত্ত্বেও ইরান যুদ্ধকে ঘিরে ট্রাম্প বারবার অভিযোগ করেছেন, জোটটি প্রমাণ করেছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের পাশে নেই।

ট্রাম্প-রুতে বৈঠকের আগে রিপাবলিকান সিনেটর মিচ মিচনেল ন্যাটোর সমর্থনে একটি বিবৃতি দেন। এতে তিনি বলেন, ‘১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর ন্যাটোর মিত্ররা আফগানিস্তান ও ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করার জন্য তাদের তরুণ সেনাদের পাঠিয়েছিল। সেখানে তাঁরা প্রাণও দিয়েছেন।’

গতকাল সকালে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিরও সঙ্গেও আলাদা করে বৈঠক করেন রুতে। বৈঠকের পর এক বিবৃতিতে জানানো হয়, তাঁরা ইরান যুদ্ধের পাশাপাশি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রচেষ্টা এবং ন্যাটোর মিত্রদের মধ্যে সমন্বয় ও দায়িত্ব ভাগাভাগি করা নিয়ে আলোচনা করেছেন।