ফ্রান্স-জার্মানির ওপর খেপলেন ট্রাম্প, ডিজেলের মজুত না ছাড়লে নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুমকি
# যুক্তরাষ্ট্র চায়, ইইউ ১২ কোটি ব্যারেল ডিজেলের জরুরি মজুত উন্মুক্ত করুক।
# যুক্তরাষ্ট্রের রেকর্ড পরিমাণ ডিজেলের দাম কমাতে চেষ্টা করছেন ট্রাম্প।
# শুল্ক ও অন্যান্য বিরোধের কারণে যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপ সম্পর্ক জটিল হয়ে উঠেছে।
বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম কমাতে ডিজেলের জরুরি মজুত উন্মুক্ত করতে জার্মানি ও ফ্রান্সের ওপর চাপ দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। আলোচনার বিষয়ে অবগত তিনটি সূত্র জানিয়েছে, অন্যথায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে ডিজেল রপ্তানিতে সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়বে এ দুই দেশ।
আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জ্বালানির দাম কমাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্ভাব্য রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার কথা বিবেচনা করছেন। আর এ হুঁশিয়ারি ইউরোপের ওপর তাঁর চাপ বৃদ্ধিরই স্পষ্ট ইঙ্গিত বলে ধারণা করা হচ্ছে।
শুল্ক বিরোধ ও সামরিক ব্যয়ের মতভিন্নতাকে কেন্দ্র করে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ইউরোপের সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) জন্য ডিজেলের অতিরিক্ত মজুত ছেড়ে দেওয়া বড় এক দ্বন্দ্বে পরিণত হয়েছে। কারণ, একদিকে দেশের বাজারে জ্বালানির দাম কমানোর প্রয়োজন রয়েছে; আবার ট্রাম্প ও ইরানের মধ্যে শান্তিচুক্তি না হলে বাড়তে থাকা জ্বালানিসংকট মোকাবিলার জন্য উচ্চমাত্রার মজুত বজায় রাখাও জরুরি।
ইউরোপীয় কমিশন এবং ইইউর ২৭টি সদস্যরাষ্ট্র নিয়ে গঠিত ইইউর জ্বালানি–বিষয়ক টাস্কফোর্স পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য আজ শুক্রবার সকালে জরুরি বৈঠকে বসছে বলে জানিয়েছেন কমিশনের এক মুখপাত্র।
রয়টার্সকে ইইউর দুই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ডিজেলের মজুত ছাড়ের সম্ভাব্য প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করতে ইউরোপীয় কমিশন, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, যুক্তরাজ্য ও আয়ারল্যান্ড ইতিমধ্যে গতকাল বৃহস্পতিবার এক বৈঠকে বসেছে।
জার্মানির অর্থনীতি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পশ্চিমা বিশ্বের জ্বালানি তদারকি সংস্থা ‘আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থা’ (আইইএ) এখনো জার্মানিকে তাদের মজুত তেল ব্যবহারের নির্দেশ দেয়নি। আইইএ পরবর্তী সময়ে কবে বৈঠক করতে পারে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
রয়টার্সের আগের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জরুরি তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্যের মজুত উন্মুক্ত করার আগের প্রতিশ্রুতি পুরোপুরি পূরণ করতে না পারায় ফ্রান্স ও জার্মানির ওপর ট্রাম্প প্রশাসন বিশেষভাবে ক্ষুব্ধ।
এক মার্কিন কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, পরিশোধিত পণ্যের সরবরাহ বৃদ্ধি এবং ভোক্তাদের জন্য খরচ কমানোর পথ খুঁজতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করাই ইউরোপের জন্য সবচেয়ে মঙ্গলজনক।
ইউরোপের আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র আগামী ছয় মাসের মধ্যে ইইউকে ১২ কোটি ব্যারেল ডিজেল অবমুক্ত করার অনুরোধ জানিয়েছে।
ইউক্রেনে হামলার কারণে রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া এবং মার্কিন-ইসরায়েল বনাম ইরান যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় ইউরোপ এখন মার্কিন জ্বালানির ওপর বহুলাংশে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট গতকাল ফক্স নিউজকে বলেছেন, ডিজেলের জরুরি মজুত ব্যবহার করে ইউরোপ জ্বালানির দাম কমাতে পারবে বলে তিনি ‘দৃঢ়ভাবে আশাবাদী’।
রাইট বলেন, ‘যেহেতু আমরা ফসল তোলার মৌসুম এবং শীতকালীন হিটিং অয়েলের যুগে প্রবেশ করছি, তাই সুসংগঠিতভাবে ডিজেল মজুত উন্মুক্ত করার এটিই সঠিক সময়। এখনই বাজারে আরও ডিজেল নিয়ে আসার সময় এবং সেই ডিজেল মজুত রয়েছে। আমি মনে করি, আমাদের সামনে কিছু ভালো খবর আসছে।’
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেছেন, আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থার সদস্যদের মধ্যে মার্চ মাসে স্বাক্ষরিত চুক্তির অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ১৭ কোটি ২০ লাখ ব্যারেল তেল উন্মুক্ত করে ওয়াশিংটন তার দায়িত্ব পালন করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে বেসেন্ট লিখেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র তার দায়িত্ব পালন করছে। আমরা আশা করি, আমাদের সহযোগীরা কাজের মাধ্যমে তাদের প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন ঘটাবে।’
ইরান যুদ্ধ বিশ্বজুড়ে তেল ও জ্বালানির অন্যতম প্রধান সরবরাহব্যবস্থাকে ব্যাহত করেছে। ইউক্রেনের হামলায় রাশিয়ার অনেক শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর রাশিয়া অক্টোবর মাসের শেষ পর্যন্ত ডিজেল রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা বাড়িয়েছে, যা বাজারের ওপর চাপ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
সূত্রমতে, চীনের শোধনাগারগুলোও ঘরোয়া মজুত ধরে রাখতে অক্টোবরের জ্বালানি রপ্তানি স্থগিত করেছে।
ফ্রান্সের জ্বালানি মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
এলিসি প্যালেসের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ ও ট্রাম্প গত সপ্তাহে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের এক ফাঁকে বৈঠক করলেও তাঁরা এ বিষয় নিয়ে আলোচনা করেননি।
তবে ওই কর্মকর্তা বলেন, জ্বালানির আকাশছোঁয়া দাম এবং বিশ্বব্যাপী পরিশোধিত জ্বালানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে জি-৭ ভুক্ত দেশগুলোর নেতাদের নিয়ে একটি ভিডিও কনফারেন্স আহ্বান করতে পারেন মাখোঁ। ওই সম্মেলনো আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থার সমন্বয়ে জরুরি মজুত উন্মুক্ত করার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।