এপস্টেইনের নথি
‘খাসোগি হত্যায় সৌদি যুবরাজকে ফাঁসাতে পারেন আমিরাতের শাসক মোহাম্মদ বিন জায়েদ’
তুরস্কের ইস্তাম্বুলে সৌদি আরবের সাংবাদিক জামাল খাসোগিকে হত্যার কয়েক দিনের ভেতর এ ঘটনা নিয়ে প্রয়াত কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইন একাধিক বার্তা আদান–প্রদান করেছিলেন।
গত শুক্রবার মার্কিন বিচার বিভাগের প্রকাশ করা এপস্টেইন–সংক্রান্ত আরও প্রায় ৩০ লাখ পৃষ্ঠার নতুন নথিতে এ তথ্য উল্লেখ করা হয়।
নথিতে দেখা গেছে, এপস্টেইন ও আনাস আল রশিদ নামের এক ব্যক্তির মধ্যে সৌদি সাংবাদিক জামাল খাসোগি হত্যাকাণ্ড নিয়ে কথোপকথন হয়েছে।
জামাল খাসোগিকে ২০১৮ সালের ২ অক্টোবর ইস্তাম্বুলে সৌদি কনস্যুলেটের ভেতর হত্যা করা হয়। সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের নির্দেশ খাসোগিকে খুন করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। এ নিয়ে তদন্তের পর মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো উপসংহারে পৌঁছায় যে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এ হত্যাকাণ্ডের অনুমোদন দিয়েছিলেন।
খাসোগি খুন হওয়ার কয়েক দিনের ভেতর এ ঘটনা একটি আন্তর্জাতিক সংকটে পরিণত হয়। ১২ অক্টোবরের মধ্যে ওয়াশিংটন পোস্টের কলাম লেখক খাসোগি খুনের ঘটনায় বিশ্বজুড়ে তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দার ঝড় ওঠে।
প্রকাশিত নথির ভেতর থাকা আরেকটি ফলোআপ ই–মেইলে দেখা গেছে, এপস্টেইন লিখেছেন, একটি ‘পরোক্ষ সূত্র’ তাঁকে বলেছেন, খাসোগি হত্যা অভিযানে অংশগ্রহণকারী এক ব্যক্তি ফোনে একটি ভিডিও রেকর্ড করেছিলেন। পরে ফোনটি হ্যাক করে তৃতীয় পক্ষ ভিডিও ফুটেজটি হাতে পায়।
২০১৮ সালের ১২ অক্টোবর তারিখের একটি বার্তায় আল রশিদ সাংবাদিক খাসোগি খুনের ঘটনাকে ‘বীভৎস...খুবই বীভৎস’ বলে বর্ণনা করেন।
এর জবাবে এপস্টেইন লেখেন, ‘আমার মনে হচ্ছে, এর পেছনে বড় কিছু আছে। যদি বের হয়, এমবিজেড তাঁকে (মোহাম্মদ বিন সালমানের) ফাঁসিয়ে দিয়েছেন; তবে আমি একেবারেই অবাক হব না।’
এখানে এমবিজেড বলতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল-নাহিয়ানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এপস্টেইনের এ বার্তার জবাবে আল রশিদের উত্তর, ‘হুমমমম’।
এপস্টেইন এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানতে চাইলে আল রশিদ লেখেন, ‘এ তথ্যগুলো (খাসোগি হত্যায় যুবরাজের সংশ্লিষ্টতা সংক্রান্ত) খুব বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে ফাঁস করা হয়েছে এমনটা বলা কঠিন এবং…দ্রুত…খুব দ্রুত...।’
আল রশিদ সতর্ক করে আরও লিখেছিলেন, এ সংকট এখন একটি কূটনৈতিক লড়াইতে পরিণত হয়েছে। তিনি লেখেন, ‘এটি এখন একটি গণমাধ্যম যুদ্ধ। সৌদিরা যদি নিজেদের রক্ষায় কাজ শুরু না করেন, তাঁরা ট্রাম্পকে (সমর্থন) হারাতে যাচ্ছেন। আর আমার মতে, নিজেদের পক্ষে সাফাই দেওয়ার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো, সত্য বলা, তা যত খারাপ হোক।’
প্রকাশিত নথিতে থাকা আরেকটি ফলোআপ ই–মেইলে দেখা গেছে, এপস্টেইন লিখেছেন, একটি ‘পরোক্ষ সূত্র’ তাঁকে বলেছেন, খাসোগি হত্যা অভিযানে অংশগ্রহণকারী এক ব্যক্তি ফোনে একটি ভিডিও রেকর্ড করেছিলেন। পরে ফোনটি হ্যাক করে তৃতীয় পক্ষ ওই ভিডিও ফুটেজটি হাতে পায়।
কে বা কারা ফোনটি হ্যাক করেছে বা করতে পারে, সে বিষয়ে ই–মেইলে কিছু উল্লেখ করা হয়নি।
২০১৮ সালের ১৩ অক্টোবর এপস্টেইন আরেকটি কথোপকথনে এ প্রসঙ্গে আরও প্রশ্ন তোলেন। তিনি প্রশ্ন করেন, খাসোগিকে ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করা যায় কি না। তিনি খাসোগি খুনের ঘটনাকে একটি ‘ব্যর্থ গোপন অভিযান’ বা কারও জন্য ‘ফাঁদ পাতার’ ঘটনা হিসেবে উত্থাপনের সম্ভাবনা আছে কি না, সেটিও জানতে চান। এসব কথোপকথনে তিনি আবুধাবির শাসক মোহাম্মদ বিন জায়েদের নাম বারবার উল্লেখ করেন।
নথিপত্রে দেখা যাচ্ছে, ওই দিন রাতেই এপস্টেইন আরও একজন পরিচিত ব্যক্তির কাছ থেকে একটি বার্তা পান; যাঁর নাম নথিতে ঢেকে দেওয়া রয়েছে।
বার্তায় বলা হয়েছিল, মোহাম্মদ বিন জায়েদ একটি ‘জরুরি’ বৈঠকের জন্য অনুরোধ করেছেন। পরদিন সকালেই ওই বৈঠকের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ শুক্রবার এপস্টেইন–সংক্রান্ত ৩০ লাখের বেশি পৃষ্ঠার নথি, ১ লাখ ৮০ হাজার ছবি ও ২ হাজার ভিডিও প্রকাশ করেছে। দেশটির নতুন ট্রান্সপারেন্সি আইন অনুসারে এসব নথি প্রকাশ করা হয়েছে; যা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময় চূড়ান্ত অনুমোদন পায়।
সর্বশেষ প্রকাশিত এপস্টেইনের নথিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ধনকুবের ইলন মাস্ক, মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস, যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রিন্স অ্যান্ড্রুর মতো বেশ কয়েকজন বিখ্যাত ব্যক্তির নাম আবার উঠে এসেছে।
এর আগে প্রকাশিত বিভিন্ন নথিতেও এই ব্যক্তিদের নাম দেখা গিয়েছিল। এ ছাড়া সর্বশেষ নথিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও ট্রাম্পের বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিকের নামও রয়েছে।