‘কর্ণাটকের জামাই’, আল–সাইয়েদের জয় কি বদলে দেবে মার্কিন রাজনীতির হিসাব

২৩৭ বছরের ইতিহাসে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের প্রথম মুসলিম সদস্য হয়েছেন আবদুল আল-সাইয়েদ। ভারতের কর্ণাটকে স্ত্রীর স্বজনেরা তাঁকে ডাকছেন ‘কর্ণাটকের জামাই’। নির্বাচনী প্রচারে ইসরায়েলপন্থী গোষ্ঠীগুলোর খরচ করা কোটি কোটি ডলার মোকাবিলা ও নিজের মুসলিম পরিচয় নিয়ে আক্রমণ পেরিয়ে আসা এ জয় মার্কিন রাজনীতিতে সত্যিই কতটা পরিবর্তনের ইঙ্গিত, উঠেছে সেই প্রশ্ন।

যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানের ডেট্রয়েটে জয়ের ঘোষণা দেওয়ার পর আয়োজিত অনুষ্ঠানের মঞ্চে ওঠেন ডেমোক্রেটিক পার্টির সিনেট প্রার্থী আবদুল আল-সাইয়েদ ও তাঁর স্ত্রী সারা জুকাকু। ৪ নভেম্বর, ২০২৬ছবি: এএফপি
প্রথম আলোকে নির্ভরযোগ্য সূত্র হিসেবে পেতে হলেএখানে ক্লিক করুন

‘যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যার মাত্র ২ দশমিক ৫ শতাংশ মুসলিম। পরিস্থিতি বিবেচনায় ফলাফল তাঁর পক্ষে যাবে, এটা আমরা কখনো ভাবিনি’—কথাগুলো ভারতের কেরলমভিত্তিক ব্যবসায়ী জুকাকু আবদুল মজিদের। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর নির্বাচিত আবদুল আল-সাইয়েদের স্ত্রীর চাচা। নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে তিনি বলেছেন, এ জয় তাঁদের কাছে এক ‘আশীর্বাদ’।

আল-সাইয়েদ মিশিগান থেকে মার্কিন সিনেটের সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। ২৩৭ বছরের ইতিহাসে তিনিই সিনেটের প্রথম মুসলিম সদস্য। ভারতের কর্ণাটক রাজ্যে স্ত্রীর স্বজনেরা তাঁকে ডাকছেন ‘কর্ণাটকের জামাই’। তবে এ জয়ের গল্প শুধু তাঁর শ্বশুরবাড়ির আনন্দের নয়। তাঁকে নিয়ে আলোচনা এখন যুক্তরাষ্ট্রসহ সর্বত্র। কিন্তু কেন?

প্রথম মুসলিম মার্কিন সিনেটর

মধ্যবর্তী নির্বাচনে মিশিগান থেকে সিনেটর নির্বাচিত হয়েছেন বিরোধী ডেমোক্রেটিক পার্টির আবদুল আল-সাইয়েদ। তিনি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী মাইক রজার্সকে হারিয়েছেন। মিডল ইস্ট আই বলছে, ৩ নভেম্বরের ভোটের ফল ৫২ শতাংশ বনাম ৪৬ শতাংশ।

যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের কার্যক্রম শুরু হয় ১৭৮৯ সালে। এরপর ২৩৭ বছরে কোনো মুসলিম কংগ্রেসের উচ্চকক্ষের সদস্য নির্বাচিত হননি। সেই ধারা ভেঙেছেন আল-সাইয়েদ। অবসরে যাওয়া ডেমোক্রেটিক সিনেটর গ্যারি পিটার্সের ছেড়ে দেওয়া আসনে তিনি জিতেছেন।

নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে মুসলিম সদস্য অবশ্য আগেও ছিলেন। ২০০৬ সালে কিথ এলিসন প্রথম মুসলিম হিসেবে সেখানে নির্বাচিত হন। ২০১৮ সালে রাশিদা তালিব ও ইলহান ওমর প্রথম মুসলিম নারী হিসেবে কংগ্রেসে আসেন। তবে সিনেটে এত দিন কোনো মুসলিম ছিলেন না।

মিডল ইস্ট আইয়ের তথ্য, আল-সাইয়েদ শুধু সিনেটের প্রথম মুসলিম আমেরিকানই নন, এ কক্ষে আসন পাওয়া ষষ্ঠ আরব আমেরিকানও। এই জয় ডেমোক্র্যাটদের দেশজোড়া বড় সাফল্যের অংশ। মধ্যবর্তী এ নির্বাচনে ‘নীল জোয়ারে’ ডেমোক্র্যাটরা পেয়েছেন কংগ্রেসের দুই কক্ষেরই নিয়ন্ত্রণ।

মিশিগানের আসনটি নিয়ে লড়াই ছিল কঠিন। আল-জাজিরার একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, এ আসনের ফলই ঠিক করতে পারে ট্রাম্পের বাকি মেয়াদে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ কোন দলের হাতে থাকবে। ২০২৪ সালে এই অঙ্গরাজ্যে জিতেছিলেন ট্রাম্প। ভোটের হিসাব-নিকাশে মিশিগান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দোদুল্যমান অঙ্গরাজ্যগুলোর একটি।

‘কর্ণাটকের জামাই’: ভাটকলের আনন্দ

আল-সাইয়েদের স্ত্রী চিকিৎসক সারা জুকাকু মনোরোগবিশেষজ্ঞ। তাঁর শিকড় ভারতের দক্ষিণের রাজ্য কর্ণাটকে। অবশ্য তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠা মিশিগানে। তাঁর স্বজনেরা এখনো কর্ণাটকের ভাটকল শহরে থাকেন। শহরটি রাজ্যের রাজধানী বেঙ্গালুরু থেকে প্রায় ৪৯০ কিলোমিটার পশ্চিমে।

ইনডিপেনডেন্ট বলেছে, ভারতে সারার পরিবারের সদস্যরা আল-সাইয়েদের জয় উদ্‌যাপন করছেন। তাঁরা তাঁকে বলছেন ‘কর্ণাটকের জামাই’। তাঁদের ভাষ্য, তিনি একজন আন্তরিক ও মিশুক মানুষ।

রাজনৈতিক চাপ ও ভয় দেখানোর কাছে নতি স্বীকার না করাই আল-সাইয়েদকে প্রতিষ্ঠিত রাজনীতিকদের থেকে আলাদা করেছে। দলীয় প্রার্থী বাছাই ও মধ্যবর্তী নির্বাচন থেকে স্পষ্ট, আইপ্যাকের মতো প্রভাবশালী লবিগোষ্ঠীর অর্থ ব্যয়ই নির্বাচনের ফল ঠিক করে দিতে পারে না।

সারা ও আল-সাইয়েদের পরিচয় মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়। ২০০৬ সালে তাঁরা বিয়ে করেন। তাঁদের দুই মেয়ে আছে। ১০ বছরের বেশি আগে এক কাজিনের বিয়েতে তাঁরা ভাটকলে গিয়েছিলেন। সেখানে স্বজনদের সঙ্গে অন্তত চার দিন কাটিয়েছিলেন।

সারার চাচা জুকাকু আবদুল মজিদ বলেন, আল-সাইয়েদের জয় তাঁদের ব্যক্তিগত বিজয়ও। সারার কাজিন বিবি হুসনা এনডিটিভিকে বলেন, কঠিন প্রচার এবং ভোট গণনার দিন পরিবার চাপে ছিল। তাঁর কথায়, ‘আল্লাহর রহমতে সুন্দর এক জয় হয়েছে।’

সারার পারিবারিক ইতিহাসেও আছে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসনের গল্প। তাঁর বাবা জুকাকু তাইয়েব বেঙ্গালুরু মেডিকেল কলেজে পড়েছেন। ১৯৭৬ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে যান। সারার দাদা জুকাকু শামসুদ্দিন তৎকালীন মহীশূর রাজ্যের অর্থবিষয়ক উপমন্ত্রী ছিলেন।

‘আরবের চেয়ে বেশি ভারতীয়’: আল-সাইয়েদের রসিকতা

নির্বাচনী প্রচারে তীব্র লড়াইয়ের মধ্যেও আল-সাইয়েদ নিজের ভারতীয় পারিবারিক সম্পর্ক নিয়ে রসিকতা করেছেন। বলেছেন, দুই দশক ধরে এক দক্ষিণ ভারতীয় নারীর সঙ্গে সংসার করে তিনি ‘আরবের চেয়ে বেশি ভারতীয়’ হয়ে গেছেন (সূত্র: ইনডিপেনডেন্ট)। উল্লেখ্য, আল-সাইয়েদ একজন মিসরীয় বংশোদ্ভূত তথা আরব বংশোদ্ভূত আমেরিকান।

আল-সাইয়েদ আরও বলেন, ‘আমি সম্মানসূচক ভারতীয়। ভারতীয় সংস্কৃতির একটা ধৈর্যের দিক আছে। ভারতে না গেলে আমি তা বুঝতে পারতাম না। আপনি এক শ কোটি মানুষের মধ্যে ঘেরা। কোনো কিছুই দ্রুত হয় না।’

মার্কিন সিনেট নির্বাচনে মিশিগানের ডেমোক্রেটিক প্রাইমারিতে জয়ী হয়ে মধ্যবর্তী নির্বাচনেও জিতেছেন আবদুল আল-সাইয়েদ। ডেট্রয়েটে সংবাদ সম্মেলনে। ৫ আগস্ট ২০২৬
ছবি: রয়টার্স

আগস্টে প্রকাশিত এক পডকাস্টে আল-সাইয়েদ একটি পারিবারিক রসিকতার কথা বলেন। তাঁর এক চাচা জানতে চেয়েছিলেন, ৮ কোটি মিসরীয় থাকতে তিনি কেন ভারতীয় নারীকে বিয়ে করলেন। আল-সাইয়েদ জবাব দেন, ‘আমু (আরবিতে চাচা), ওদের (ভারতীয়দের) সংখ্যা এক শ কোটি। পরিসংখ্যান অনুযায়ী এটাই ছিল উচ্চ সম্ভাবনার বিষয়।’

আলাদা এক বক্তব্যে আল-সাইয়েদ বলেছেন, তিনি ‘দেশি নারীদের’ মধ্যে ঘেরা। তাঁর ভাষায়, ‘আমার দুই দেশি মেয়ে আর এক দেশি স্ত্রী আছে।’ তবে নিজের মিসরীয় শিকড় থেকেও তিনি দূরে সরে যাননি। তিনি মিসরীয় খাবার ও রসবোধের প্রশংসা করেছেন। তাঁর বাবা বড় হয়েছেন মিসরের ভূমধ্যসাগরীয় শহর আলেকজান্দ্রিয়ায়।

মিশিগানের ছেলে, পেশায় চিকিৎসক

আল-সাইয়েদের জন্ম মিশিগানের রচেস্টার হিলসে। তাঁর মা-বাবা মিসর থেকে এসে যুক্তরাষ্ট্রে বসতি গড়েছিলেন। রাজনীতিতে আসার আগে তিনি চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্য খাতে কাজ করেছেন।

আনাদোলু এজেন্সি বলছে, পড়াশোনায়ও আল-সাইয়েদ উজ্জ্বল। ২০০৭ সালে ইউনিভার্সিটি অব মিশিগান থেকে স্নাতক হন। রোডস স্কলার হিসেবে ২০১১ সালে অক্সফোর্ড থেকে জনস্বাস্থ্যে ডক্টরেট করেন। ২০১৪ সালে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ডিগ্রি পান।

তৃণমূল পর্যায় থেকে আসা এই অর্থ (আল-সাইয়েদের প্রচারে সহায়তা করতে দেওয়া অর্থ) মিশিগানের মানুষের মধ্যে আল-সাইয়েদকে নিয়ে তৈরি হওয়া উদ্দীপনার প্রমাণ। এটি মিশিগান অঙ্গরাজ্যকে বছরের পর বছর পিছিয়ে রাখা পুরোনো ধারার রাজনীতির বিরুদ্ধে মানুষের অবস্থানেরও প্রকাশ।
কোল ওজনিয়াক, আল-সাইয়েদের প্রচারশিবিরের মুখপাত্র

২০১৫ সালে আল-সাইয়েদ ডেট্রয়েট শহরের স্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক হন। আর্থিক সংকটের পর শহরটির জনস্বাস্থ্যসেবা নতুন করে সাজানোর কাজ তদারক করেন। ২০১৭ সাল পর্যন্ত তিনি এ পদে ছিলেন। ২০১৮ সালে গভর্নর পদে ডেমোক্রেটিক পার্টির মনোনয়ন চেয়েছিলেন, কিন্তু গ্রেচেন হুইটমারের কাছে হেরে যান। ২০২৬ সালে তিনি আবার নির্বাচনী রাজনীতিতে ফেরেন।

বিপুল অর্থ ঢেলেও যায়নি থামানো

গত আগস্টে মিশিগানে ডেমোক্রেটিক পার্টির সিনেট প্রার্থী বাছাইয়ের নির্বাচনে (প্রাইমারি) আল-সাইয়েদ প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য হ্যালি স্টিভেন্সকে হারান। তাঁর (আল-সাইয়েদ) প্রচারে সমর্থন দেন প্রগতিশীল ধারার কয়েকজন প্রভাবশালী রাজনীতিক। এঁদের মধ্যে ছিলেন সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স, প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজ ও রাশিদা তালিব।

আল-জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রার্থী বাছাইয়ের ওই লড়াইয়ে আল-সাইয়েদকে হারাতে ইসরায়েলপন্থী গোষ্ঠীগুলো ৬ কোটি ডলারের বেশি খরচ করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে প্রভাবশালী ইসরায়েলপন্থী লবিং গোষ্ঠী আমেরিকান ইসরায়েল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটি (আইপ্যাক) এ লড়াইয়ে নেতৃত্ব দেয়। তারা স্টিভেন্সের পক্ষে ৩ কোটি ডলারের বেশি ঢালে। কিন্তু মার্কিন গণমাধ্যম এনবিসি আল-সাইয়েদের জয়ের পূর্বাভাস দেয়। এখন তাঁর জয়কে এআইপ্যাকের জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েল লবির বিরুদ্ধে আল-সাইয়েদের অবস্থান এবং তা থেকে তৈরি হওয়া উদ্দীপনা না থাকলে তিনি স্টিভেন্সকে হারাতে পারতেন না।

রাজনৈতিক চাপ ও ভয় দেখানোর কাছে নতি স্বীকার না করাই আল-সাইয়েদকে প্রতিষ্ঠিত রাজনীতিকদের থেকে আলাদা করেছে। প্রাথমিক বাছাই ও মধ্যবর্তী নির্বাচন থেকে এটা স্পষ্ট, আইপ্যাকের মতো প্রভাবশালী লবিগোষ্ঠীর অর্থ ব্যয়ই নির্বাচনের ফল ঠিক করে দিতে পারে না।

শেষ মুহূর্তের ধাক্কা, ২৪ লাখ ডলারের জবাব

মধ্যবর্তী নির্বাচনের ঠিক দুই দিন আগে স্টিভেন্স রিপাবলিকান প্রার্থী রজার্সকে সমর্থন দেন। আল-সাইয়েদের নির্বাচনী বক্তব্য ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে এ সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

স্টিভেন্সের এমন অবস্থানে নিজের দল ডেমোক্রেটিক পার্টির ভেতরে তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়। তবে আল-সাইয়েদের প্রচার থামেনি।

সিএনএনের খবর অনুযায়ী, ওই দিনই আল-সাইয়েদের প্রচারশিবির এক দিনে ২৪ লাখ ডলার সংগ্রহ করে। প্রচারশিবিরের মুখপাত্র জানান, এটি তাঁদের প্রচারের ইতিহাসে এক দিনের সর্বোচ্চ তহবিল সংগ্রহ।

মিশিগানের ডেট্রয়েটে নির্বাচনের আগের শেষ নির্বাচনী সমাবেশে বক্তব্য দেন আবদুল আল-সাইয়েদের স্ত্রী চিকিৎসক সারা জুকাকু। বক্তব্য শেষে মঞ্চে তাঁর সঙ্গে যোগ দেন আল-সাইয়েদ। ২ নভেম্বর, ২০২৬
ছবি: রয়টার্স

প্রচারশিবিরের তথ্য অনুযায়ী, ওই দিন ৬৫ হাজারের বেশি মানুষ অনুদান দেন। তাঁদের মধ্যে ২৯ হাজার ৬০২ জন প্রথমবারের মতো অর্থ দেন। গড়ে প্রত্যেকে দেন ৩৬ ডলার ৭৪ সেন্ট।

মুখপাত্র কোল ওজনিয়াকের ভাষায়, তৃণমূল পর্যায় থেকে আসা এই অর্থ মিশিগানের মানুষের মধ্যে আল-সাইয়েদকে নিয়ে তৈরি হওয়া উদ্দীপনার প্রমাণ। এটি অঙ্গরাজ্যকে বছরের পর বছর পিছিয়ে রাখা পুরোনো ধারার রাজনীতির বিরুদ্ধে মানুষের অবস্থানেরও প্রকাশ।

স্টিভেন্সের সমর্থন প্রত্যাহারের পর ডেমোক্রেটিক পার্টির কেন্দ্রীয় ও জাতীয় নেতারা আরও জোরালোভাবে আল-সাইয়েদের পক্ষে নামেন। শেষ পর্যন্ত দলের অভ্যন্তরীণ বিরোধিতা ও বাইরের অর্থের চাপ সামলে তিনি সাধারণ নির্বাচনে জয় পান।

নাম ও মুসলিম পরিচয় নিয়ে আক্রমণ, ব্যালটে জবাব

আল-সাইয়েদ সবার জন্য মেডিকেয়ার কর্মসূচি চালুর মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ বৃদ্ধি করার প্রতিশ্রুতি দেন। পাশাপাশি আবাসন ব্যয়, রাজনীতিতে ধনী দাতাদের প্রভাব কমানো এবং শ্রমজীবী পরিবারের অর্থনৈতিক সুযোগ বৃদ্ধির কথা বলেন।

ইনডিপেনডেন্টের ভাষায়, সাবেক এ জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তার প্রচার ছিল তৃণমূলকেন্দ্রিক। প্রচারের মুখ্য বিষয় ছিল সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা, নির্বাচনে বাইরের অর্থের প্রভাব কমানো এবং ইসরায়েলের কড়া সমালোচনা।

নিজের নাম ও মুসলিম পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন উঠলে জবাবে আল-সাইয়েদ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, বাসস্থান, স্বাস্থ্যসেবা ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে কথা বলেন। ইরান যুদ্ধবিরোধী অবস্থানের সঙ্গে জনগণের স্বাস্থ্যসেবা, বিশুদ্ধ পানি ও ন্যায্য মজুরির দাবি যুক্ত করেন তিনি। জীবনরক্ষাকারী ওষুধের জন্য লড়াই করা এক মায়ের কথাও বলেছেন।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আল-সাইয়েদকে ‘জিহাদি’ বলেছেন এবং চেয়েছেন তিনি মেটাল ডিটেক্টরের মধ্য দিয়ে যান। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স তাঁকে বলেছেন ‘সাইকোপ্যাথ’। এই দুজনই জানুয়ারিতেও দায়িত্বে থাকবেন। জয়ের পর আল-সাইয়েদ বলেছেন, ‘খারাপ লোকেরা হেরে গেছেন।’

নির্বাচনী প্রচারে আল-সাইয়েদের মুসলিম পরিচয় বড় ইস্যু হয়ে ওঠে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ রিপাবলিকান দলের কয়েকজন নেতা তাঁর নাম, ধর্মীয় পরিচয় ও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে সমালোচনা করেন।

জবাবে আল-সাইয়েদ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক সংকট থেকে দৃষ্টি সরাতেই প্রেসিডেন্ট তাঁর নাম ও ধর্মীয় পরিচয় ব্যবহার করছেন।

ট্রাম্প বারবার আবদুল আল-সাইয়েদের নাম নিয়ে বিদ্রূপ করেছেন। প্রতিপক্ষ ও কিছু ভোটার তাঁর মুসলিম পরিচয়কে সন্দেহের কারণ হিসেবে তুলে ধরেছেন। যেসব সংগঠনের সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পর্ক নেই, সেগুলোর সঙ্গেও তাঁকে জড়িয়ে অভিযোগ তোলা হয়েছে। কিন্তু আল-সাইয়েদ নিজের পরিচয় আড়াল করেননি।

মিডল ইস্ট আইয়ের ভাষ্য, মাসের পর মাস রজার্স ও তাঁর সমর্থকেরা আল-সাইয়েদের আরব ও মুসলিম পরিচয়কে রাজনৈতিক দুর্বলতা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে হিজবুল্লাহ, হামাস ও মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে সম্পর্ক থাকার অভিযোগ তোলা হয়। ৯/১১-এর হামলাকে তিনি সমর্থন করেন, এমন ইঙ্গিতও দেওয়া হয়। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রে ‘শরিয়াহ আইন’ চালুর পরিকল্পনার অভিযোগ আনা হয়।

এসব অভিযোগের কোনো ভিত্তি না থাকলেও উদ্দেশ্য ছিল, আল-সাইয়েদকে বিদেশি, বিপজ্জনক ও ‘অ-মার্কিন’ হিসেবে তুলে ধরা। আল-সাইয়েদ, তাঁর প্রচারশিবির ও সমর্থকদের বারবার বলতে হয়েছে, তিনি মিশিগানে জন্মেছেন এবং তিনি একজন খাঁটি আমেরিকান।

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাপিটল হিল ভবন
ছবি: রয়টার্স

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আল-সাইয়েদকে ‘জিহাদি’ বলেছেন এবং চেয়েছেন তিনি মেটাল ডিটেক্টরের মধ্য দিয়ে যান। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স তাঁকে বলেছেন ‘সাইকোপ্যাথ’। এই দুজনই জানুয়ারিতেও দায়িত্বে থাকবেন। জয়ের পর আল-সাইয়েদ বলেছেন, ‘খারাপ লোকেরা হেরে গেছেন।’

নির্বাচনের দিনের একটি নেতিবাচক অভিজ্ঞতাও আছে আল-সাইয়েদের। ম্যাকম্ব কাউন্টির এক ভোটকেন্দ্রের বাইরে প্রচারপত্র বিলি করছিলেন তিনি। এ সময় এক মধ্যবয়সী শ্বেতাঙ্গ ব্যক্তি গাড়িতে ওঠার সময় আল-সাইয়েদকে ‘মুসলিম সন্ত্রাসী’ বলে চিৎকার করেন এবং শরিয়াহ আইন নিয়ে আপত্তি তোলেন।

আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, আরব-আমেরিকান ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক মায়া বেরি আল-সাইয়েদের বিজয়কে ‘বিরাট ঘটনা’ বলেছেন। তাঁর মতে, ভোটাররা এমন নেতিবাচক প্রচারে প্রভাবিত হননি, যেখানে নীতি বা জনকল্যাণের কথা না তুলে শুধু ‘আবদুল নামের এক আরব-আমেরিকান মুসলিম’ প্রার্থীকে লক্ষ্য করে ব্যক্তিগত আক্রমণ চালানো হয়েছিল।

জয়ের পর ভাষণে আল-সাইয়েদ নিজের পুরো নাম উচ্চারণ করেন—আবদুর রহমান মোহাম্মদ আল-সাইয়েদ। প্রচারের সময় জয় নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি প্রায়ই ইনশা আল্লাহ বলতেন। বিজয়ী হওয়ার পর তিনি বলেন, এবার আলহামদুলিল্লাহ বলার সময় এসেছে।

ট্রাম্পের রাজ্যেই ‘ট্রাম্পের পরাজয়’

মিশিগানের মুসলিম সম্প্রদায়ের কাছে আল-সাইয়েদ পরিচিত মুখ। ২০১৮ সালে গভর্নর পদে নির্বাচন থেকে শুরু করে স্থানীয় মসজিদে জুমার খুতবা, নানা কাজের মধ্য দিয়ে তিনি দীর্ঘদিন স্থানীয় কমিউনিটির সঙ্গে যুক্ত। প্রচারে তিনি শুধু মুসলিমদের নয়, মিশিগানের সব মানুষের পক্ষে কাজ করার অঙ্গীকার করেছিলেন।

আল-সাইয়েদের বিজয় ‘বিরাট ঘটনা’। ভোটাররা নেতিবাচক প্রচারে প্রভাবিত হননি, যেখানে নীতি বা জনকল্যাণের কথা না তুলে শুধু ‘আবদুল নামের এক আরব-আমেরিকান মুসলিম’ প্রার্থীকে লক্ষ্য করে ব্যক্তিগত আক্রমণ চালানো হয়েছিল।
মায়া বেরি, আরব-আমেরিকান ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক

নিউইয়র্কের প্রথম মুসলিম মেয়র জোহরান মামদানির জয়ের পর অনেকে ভেবেছিলেন, ফিলিস্তিনের পক্ষে সরব কোনো মুসলিম প্রার্থী হয়তো উদারপন্থী বড় শহরেই জিততে পারেন। ২০২৪ সালে ট্রাম্পের জেতা অঙ্গরাজ্যে (মিশিগান) এমন প্রার্থীর জয় কঠিন, ছিল এমন ধারণাও। কিন্তু আল-জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, আল-সাইয়েদ ছোট শহর, গ্রাম, শিল্পাঞ্চল ও শহরতলিতে প্রচার চালিয়েছেন। গির্জা ও মসজিদ, দুই জায়গাতেই গেছেন। শেষ পর্যন্ত পুরো অঙ্গরাজ্যে জয় পেয়েছেন।

আরও পড়ুন

ইসরায়েল প্রশ্নে অনড় অবস্থান

আল-সাইয়েদ ইসরায়েলকে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া সামরিক সহায়তার কড়া সমালোচক। ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েলের আগ্রাসনকে তিনি গণহত্যা বলে আখ্যায়িত করেছেন এবং ইসরায়েলকে নিঃশর্ত মার্কিন সামরিক সহায়তা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন। ফলে এ অবস্থান তাঁর নির্বাচনী প্রচারের অন্যতম বিতর্কিত বিষয় হয়ে ওঠে।

আল-জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, আল-সাইয়েদের যুক্তি ছিল, যেসব যুদ্ধে অর্থ ঢাললে শুধু ইসরায়েলের লাভ হয়, সেই অর্থ যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন ও অবকাঠামোগত সমস্যার সমাধানে ব্যয় করা উচিত।

ফিলিস্তিনে গণহত্যার বিরোধিতা করায় সমালোচনা হলে আল-সাইয়েদ প্রশ্ন তোলেন, শিশুদের বোমার ভয় ছাড়া বেঁচে থাকার অধিকার চাওয়া কীভাবে ঘৃণার প্রকাশ হতে পারে। সরকারি পদে নির্বাচিত হতে একজন মুসলিমকে নিজ সম্প্রদায় বা ফিলিস্তিনের পক্ষে অবস্থান ছাড়তে হবে, এমন ধারণাও তিনি প্রত্যাখ্যান করেন।

২০২৪ সালে গাজা প্রশ্নে ইসরায়েলের পক্ষে বাইডেন-হ্যারিস প্রশাসনের সমর্থনের প্রতিবাদে অনেক মুসলিম ভোটার ডেমোক্র্যাটদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। এবার তাঁরা এমন এক প্রার্থী পেয়েছেন, যিনি শুরু থেকেই ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সহিংসতার বিরোধিতা করেছেন।

আল-সাইয়েদকে বারবার ইসরায়েলের ‘অস্তিত্বের অধিকার’ স্বীকার করা ইস্যুতে প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছে। এ প্রশ্নের প্রতি গণমাধ্যমের অতিরিক্ত আগ্রহকে তিনি অযৌক্তিক বলেছেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, রাজনীতিকদের কখনো জিজ্ঞেস করা হয় না, ফিলিস্তিনের অস্তিত্ব বা ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার আছে কি না, সেই বিষয়টি।

আরও পড়ুন

বদলের আভাস, নাকি শুরু মাত্র

ইনডিপেনডেন্টের মতে, ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে এ জয় আল-সাইয়েদের আন্দোলনে (প্রগতিশীল রাজনীতি, সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা, বৈষম্য দূরীকরণ, রাজনীতিতে অর্থশক্তির ব্যবহার কমানো) শক্তি জোগাবে। এ এজেন্ডা নিয়ে এগোনো অন্য প্রার্থীরাও আগামী দিনে গুরুত্বপূর্ণ দোদুল্যমান অঙ্গরাজ্যে জিততে পারেন।

আল-সাইয়েদের জয় প্রয়োজনীয় সব পরিবর্তনের নিশ্চয়তা দেয় না ঠিক, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে কী সম্ভব, তার পরিসর বৃদ্ধি করে। পরিবর্তনের লড়াই এখন সিনেটে নিয়ে যাবেন তিনি।

আল-সাইয়েদের জয় রাতারাতি যুক্তরাষ্ট্রের নীতিকেও ন্যায়সংগত করে তুলবে না। ফিলিস্তিনের কোনো শিশুকেও ফিরিয়ে আনবে না। ডেমোক্র্যাট কিংবা ট্রাম্প সরকারের দায়ও এতে মুছবে না। একজন সিনেটর একা যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধনীতি বা দেশের ভেতরের বৈষম্যমূলক কাঠামো বদলে দিতে পারবেন না।

তাই আল-সাইয়েদের এ জয় যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিম প্রতিনিধিত্বের এক ঐতিহাসিক মাইলফলকই শুধু নয়, বরং মার্কিন রাজনীতিতে নতুন সম্ভাবনার পথ খুলে দেওয়ার পরীক্ষাও। নিজের মুসলিম ও মিসরীয় পরিচয় বজায় রেখে, প্রথাগত রাজনীতির বাইরে গিয়ে এবং বিভিন্ন বিষয়ে বিতর্কিত অবস্থান সত্ত্বেও ‘ট্রাম্পের রাজ্য’ মিশিগানে তিনি বাজিমাত করেছেন। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়িয়ে বহুদূরে ভারতের ভাটকলে তিনি শুধু মিসরীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন সিনেটর নন, ‘কর্ণাটকের জামাই’ও।

আরও পড়ুন