নিউইয়র্ক টাইমসের বিশেষ প্রতিবেদন
কার্টার থেকে রিগ্যান, ক্লিনটন থেকে ট্রাম্প—কীভাবে মার্কিন প্রেসিডেন্টদের ধাঁধায় ফেলেছেন ইরানের নেতারা
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা নিয়ে ইরান ‘অবিশ্বাস্য রকমের প্রতারণা’ করছে বলে গত সোমবার অভিযোগ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর এ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া প্রতিদ্বন্দ্বী তেহরানের নেতাদের আচরণ বুঝতে না পারারই একটি নতুন লক্ষণ।
ট্রাম্প নিজেকে প্রতিদ্বন্দ্বীদের দুর্বলতা চেনার এবং তা কাজে লাগানোর একজন দক্ষ কারিগর মনে করেন। তবে ইরানের নেতারা তাঁকে পুরোপুরি ধাঁধায় ফেলে দিয়েছেন।
গত সপ্তাহে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘তাঁরা শুধু আমার ক্ষোভই বাড়াচ্ছেন। তাঁরা শুধুই আমাকে রাগাচ্ছেন।’
তবে মার্কিন প্রেসিডেন্টের জন্য সামনে হয়তো আরও বড় হতাশা অপেক্ষা করছে। ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়ার বিষয়ে একটি নতুন চুক্তি খুব কাছাকাছি। কিন্তু সেখানে শুল্ক আদায়ের বিষয়ে নিজেদের দাবিতে অনড় ইরান।
ইরানকে বুঝতে গিয়ে ট্রাম্পই প্রথম কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট নন, যিনি এমন সংকটে পড়েছেন। ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে প্রত্যেক মার্কিন প্রেসিডেন্টই দেশটির ধোঁয়াশাপূর্ণ শাসনকাঠামো এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের মানসিকতা বোঝার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তাঁদের বেশির ভাগই ব্যর্থ হয়েছেন। কেউ কেউ আবার বড় ধরনের রাজনৈতিক ধাক্কাও খেয়েছেন।
ট্রাম্প অবশ্য আগেই এ শুল্কের দাবিকে অগ্রহণযোগ্য বলে নাকচ করে দিয়েছেন। ইরানের সঙ্গে একটি সুবিধাজনক চুক্তি করতে না পারার খেসারত ট্রাম্পকে রাজনৈতিকভাবে দিতে হচ্ছে। বিশেষ করে যুদ্ধ নিয়ে ক্লান্ত ভোটারদের কাছে তাঁর জনপ্রিয়তা কমছে। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ ওই নৌপথ নিয়ে চলমান দ্বন্দ্ব বিশ্ববাজারে তেলের দামকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। এর মাশুল দিতে হচ্ছে মার্কিন ভোক্তা ও বিশ্ব অর্থনীতিকে।
ইরানকে বুঝতে গিয়ে ট্রাম্পই প্রথম কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট নন যিনি এমন সংকটে পড়েছেন। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে প্রত্যেক মার্কিন প্রেসিডেন্টই ইরানের ধোঁয়াশাপূর্ণ শাসনকাঠামো এবং দেশটির রাজনৈতিক নেতৃত্বের মানসিকতা বোঝার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তাঁদের বেশির ভাগই ব্যর্থ হয়েছেন, কেউ কেউ বড় ধরনের রাজনৈতিক ধাক্কাও খেয়েছেন।
এ ক্ষেত্রে একটি ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত ছিলেন সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। ২০১৫ সালে ইরানের সঙ্গে তাঁর করা পরমাণু চুক্তিটি ছিল ২০ মাসের দীর্ঘ কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ফল। রিপাবলিকান ও কিছু ডেমোক্র্যাট সদস্য অবশ্য সমালোচনা করেছিলেন যে ইরান ‘উদারতার ভান’ করে ওবামাকে একটি ত্রুটিপূর্ণ চুক্তিতে প্রলুব্ধ করেছে। তবে সব সমালোচনা সত্ত্বেও ওবামা এ চুক্তিকে তাঁর একটি বড় অর্জন বলে মনে করতেন।
সাবেক সিআইএ বিশ্লেষক ও মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা পর্ষদের কর্মকর্তা কেনেথ পোলাক মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিগত প্রেসিডেন্টদের মধ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্পই হয়তো ইরানের নেতৃত্বকে সবচেয়ে কম বুঝতে পেরেছেন।
অনেক দিক থেকেই ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি হওয়া দীর্ঘদিনের হতাশার এক চরম প্রতীক হলেন ট্রাম্প। তিনি একদিকে ইরানের সঙ্গে চুক্তি করার জন্য সবচেয়ে বেশি ব্যাকুল ছিলেন, আরেকদিকে দেশটির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি শক্তিও প্রয়োগ করেছেন। কিন্তু দেখলেন, কোনো পথেই তাঁর কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জিত হয়নি।
কয়েক দশক ধরে ইরানকে নিয়ে গবেষণা করা এ বিশ্লেষক বলেন, ‘অনেক দিক থেকেই ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি হওয়া দীর্ঘদিনের হতাশার এক চরম প্রতীক হলেন ট্রাম্প। তিনি একদিকে ইরানের সঙ্গে চুক্তি করার জন্য সবচেয়ে বেশি ব্যাকুল ছিলেন, আরেকদিকে দেশটির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি শক্তিও প্রয়োগ করেছেন। কিন্তু দেখলেন, কোনো পথেই তাঁর কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জিত হয়নি।’
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রায়ই এমনভাবে কথা বলেন, যেন ব্যাপক শক্তি প্রয়োগ করলেই খুব দ্রুত একটি চুক্তি করা সম্ভব। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে হামলা চালানোর মাধ্যমে তেহরান–ওয়াশিংটন যুদ্ধ শুরু হয়। ওই হামলায় দীর্ঘ প্রায় ৪০ বছর ধরে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্বে থাকা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। এর পরপরই ইরানের জনগণকে তাঁদের সরকারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে এবং শাসনভার নিজেদের হাতে তুলে নেওয়ার আহ্বান জানান ট্রাম্প।
ট্রাম্প সে সময় আরও বলেন, তিনিই ইরানের পরবর্তী নেতা ‘বেছে দেবেন’। পরে মার্কিন বিমান হামলায় ইরানের আরও কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নিহত হন। তবে ট্রাম্পের আশা অনুযায়ী ইরানে কোনো গণ-অভ্যুত্থান ঘটেনি। উল্টো দেশটির কট্টরপন্থী সরকার নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করেছে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, মোজতবা খামেনি তাঁর বাবার চেয়েও অনেক বেশি কট্টর এবং পারমাণবিক বোমা অর্জনের বিষয়ে আগ্রহ আরও বেশি। নতুন খামেনিকে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে বেছে নেওয়া ‘অগ্রহণযোগ্য’ হবে বলে ট্রাম্প জনসমক্ষে যে ঘোষণা দিয়েছিলেন, ইরান তা পাত্তাই দেয়নি। এমনকি সশরীর বৈঠকের জন্য ট্রাম্পের দেওয়া একটি প্রকাশ্য প্রস্তাবের কোনো জবাবই দেননি নতুন এ সর্বোচ্চ নেতা।
গত মার্চ মাসে আলী খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনিকে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, মোজতবা খামেনি তাঁর বাবার চেয়েও অনেক বেশি কট্টর এবং পারমাণবিক বোমা অর্জনের বিষয়ে আগ্রহ আরও বেশি। নতুন খামেনিকে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে বেছে নেওয়া ‘অগ্রহণযোগ্য’ হবে বলে ট্রাম্প জনসমক্ষে যে ঘোষণা দিয়েছিলেন, ইরান তা পাত্তাই দেয়নি। এমনকি সশরীর বৈঠকের জন্য ট্রাম্পের দেওয়া একটি প্রকাশ্য প্রস্তাবের কোনো জবাবই দেননি নতুন এ সর্বোচ্চ নেতা।
এ পরিস্থিতি সত্ত্বেও ট্রাম্প ইরানে বড় ধরনের পরিবর্তনের আশা ছাড়েননি। গত এপ্রিলের শেষের দিকে তিনি বলেন, ‘ইরান যদি একটি চুক্তি করে, তবে তারা নিজেদের খুব ভালো অবস্থানে নিয়ে যেতে পারবে।’ তাঁর মতে, চুক্তি করলে ইরান ‘একটি বৈধ দেশে পরিণত হতে পারে, মৃত্যু আর আতঙ্কের কোনো দেশ হিসেবে নয়।’
অবশ্য ইরানের কর্মকর্তারা বলছেন যে তাঁরা হরমুজ প্রণালি এবং নিজেদের পারমাণবিক কর্মসূচির মতো বিষয়গুলো নিয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনা করতে পারেন। তবে ট্রাম্পের মূল দাবিগুলোর একটি বড় অংশ তাঁরা শুরুতেই নাকচ করে দিয়েছেন।
‘যুক্তরাষ্ট্রকে আমাদের চেয়ে ইরানিরাই ভালো বোঝেন’
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি তীব্র বিদ্বেষের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় দেশটির কোনো নেতাই ওয়াশিংটনের সঙ্গে বড় কোনো সমঝোতা বা সম্পর্ক পুনরুদ্ধারে আগ্রহী নন। মাসের পর মাস ইরানের বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্পের লেনদেন চললেও, দেশটির শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে তিনি এখনো কোনো স্পষ্ট ধারণা পাননি বলেই মনে হয়।
চলমান সংঘাতের পুরোটা সময় ট্রাম্প ইরানের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা ও তাঁর প্রতিনিধিদের মূল্যায়ন করার ক্ষেত্রে নিজের অবস্থান প্রতিনিয়ত বদলেছেন। তিনি কখনো তাঁদের ‘পাগল’, কখনো ‘যৌক্তিক’, কখনো ‘উন্মাদ স্বভাবের’, ‘অত্যন্ত বুদ্ধিমান’ কিংবা ‘একেবারেই উন্মাদ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
ইরানের সঙ্গে একটি বড় চুক্তি করার আশা নিয়ে ট্রাম্পের পূর্বসূরি কয়েকজন প্রেসিডেন্টও ঠিক একই ধরনের হতাশাজনক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন। ওয়াশিংটনের ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক পরিচালক সুজান ম্যালোনি বলেন, ‘কয়েক দশক ধরে মার্কিন নীতিনির্ধারকেরা ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের আদর্শিক প্রতিশ্রুতি এবং তাদের গভীরভাবে গেঁথে থাকা প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার কাঠামোকে ক্রমাগত অবমূল্যায়ন করে এসেছেন।’
নীতিনির্ধারকদের এ ব্যর্থতার একটি বড় কারণ, মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে ইরানের শীর্ষ নেতাদের সরাসরি যোগাযোগের অভাব। কোনো মার্কিন কর্মকর্তা কখনোই ইরানের প্রথম সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি, সদ্যপ্রয়াত আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি কিংবা তাঁর ছেলে মোজতবা খামেনির সঙ্গে সশরীর সাক্ষাৎ করার সুযোগ পাননি।
সুজান ম্যালোনির মতে, চলমান যুদ্ধ ইরানের ধর্মীয় ও সামরিক নেতৃত্বের ক্ষমতা আরও শক্তিশালী করেছে। ফলে দেশটিতে এই মুহূর্তে বিকল্প কোনো শক্তিশালী ক্ষমতা কেন্দ্র গড়ে ওঠার পথ রুদ্ধ।
ইরান বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের ব্যর্থতার একটি বড় কারণ, মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেশটির শীর্ষ নেতাদের সরাসরি যোগাযোগের অভাব। কোনো মার্কিন কর্মকর্তা কখনো ইরানের প্রথম সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি, সদ্যপ্রয়াত আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি কিংবা তাঁর ছেলে মোজতবা খামেনির সঙ্গে সশরীর সাক্ষাৎ করার সুযোগ পাননি।
ইরানের আধা-গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থায় একজন প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্ট থাকলেও, সবকিছুই মূলত সর্বোচ্চ নেতার পূর্ণ ধর্মীয় কর্তৃত্বের অধীন পরিচালিত হয়। অতীতে এ ব্যবস্থার ভেতরেই কখনো কখনো এমন কিছু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার উত্থান ঘটেছে, যাঁরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের পক্ষে ছিলেন। বিভিন্ন সময় ওয়াশিংটন তাঁদের দিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিলেও, শেষ পর্যন্ত তা শুধু অনুশোচনা আর ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে।
দুই মার্কিন রাজনৈতিক দলের (ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান) প্রেসিডেন্টদের অধীনেই মধ্যপ্রাচ্য কূটনীতিতে দীর্ঘকাল কাজ করার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন প্রবীণ কূটনীতিক ডেনিস রস পরিস্থিতি মূল্যায়ন করতে গিয়ে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রকে আমাদের চেয়ে ইরানিরাই হয়তো অনেক ভালো বোঝেন।’
‘তিক্ত হতাশা’
১৯৮০ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার তেহরানের মার্কিন দূতাবাস থেকে আগের বছর জিম্মি হওয়া ৫২ জন মার্কিনকে মুক্ত করার লক্ষ্যে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে একটি গোপন আলোচনার অনুমোদন দেন। কার্টারের ডায়েরির পাতা থেকে জানা যায়, বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতোই তিনিও ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কৌশল এবং শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যকার কোন্দলের মতো খুঁটিনাটি বিষয়গুলো নিয়ে প্রতিনিয়ত গভীরভাবে ভাবতেন।
১৯৮০ সালের শুরুর দিকে কার্টার ভেবেছিলেন যে তিনি জিম্মিদের মুক্ত করার বিষয়ে একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে পেরেছেন। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রের তরফে ইরানের অবরুদ্ধ শত কোটি ডলারের সম্পদ ছেড়ে দেওয়া ও দেশটির অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ওয়াশিংটন কোনো হস্তক্ষেপ করবে না—এমন কিছু প্রতিশ্রুতি দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কার্টারের ভাষায় এটা ছিল এক ‘তীব্র হতাশা’।
কেননা, ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খোমেনি সেই প্রস্তাব এক ঝটকায় নাকচ করে দেন। খোমেনির এ আকস্মিক সিদ্ধান্ত মার্কিন কর্মকর্তাদের পাশাপাশি তাঁর নিজের অধীনস্থদেরও পুরোপুরি অন্ধকারে ফেলে দিয়েছিল। পরে কার্টার জিম্মিদের উদ্ধারে একটি সামরিক অভিযানের নির্দেশ দিলেও তা ব্যর্থ হয়। অবশেষে দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর কার্টারের প্রেসিডেন্ট পদের শেষ দিনে এসে এক চুক্তির মাধ্যমে ওই মার্কিনরা মুক্তি পান।
গোপন অস্ত্রচুক্তি
এ ঘটনার ঠিক পাঁচ বছর পর, ১৯৮৫ সালে পরবর্তী মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান তাঁর সহযোগীদের একজন ইরানি অস্ত্র ব্যবসায়ীর পাঠানো একটি বার্তা খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেন।
বার্তায় দাবি করা হয়েছিল যে খোমেনি মারা যাওয়ার পর ইরানের কিছু মধ্যপন্থী কর্মকর্তা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহী হতে পারেন। রিগ্যান এটিকে পরবর্তী সময়ে একটি ‘কৌশলগত সুযোগের সন্ধান’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন। লেবাননে জিম্মি থাকা মার্কিনদের মুক্তির বিনিময়ে ইরানের কাছে গোপনে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দেন। তবে এ পুরো প্রক্রিয়াটি পরে ইতিহাসে কুখ্যাত ‘ইরান-কন্ট্রা কেলেঙ্কারি’ নামে পরিচিতি পায়। কারণ, মার্কিন কংগ্রেসের সিদ্ধান্তকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ওই অস্ত্র বিক্রির টাকা গোপনে নিকারাগুয়ার একটি কমিউনিস্ট-বিরোধী বিদ্রোহী গোষ্ঠী ‘কন্ট্রাস’-এর তহবিলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এ গোপন লেনদেনের বিষয়টি প্রকাশ পাওয়ার পর রিগ্যানের প্রেসিডেন্সি এক বড় কেলেঙ্কারির মুখে পড়ে। ঘটনার জেরে কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় মার্কিন কর্মকর্তা দোষী সাব্যস্ত হন এবং রিগ্যানের সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা আত্মহত্যারও চেষ্টা করেন।
ইরানের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের সেই চেষ্টা শেষ পর্যন্ত মরীচিকা বলেই প্রমাণিত হয়। তেহরানে কোনো মধ্যপন্থী নেতার দেখা পাওয়া যায়নি। মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা (সিআইএ) পরে জানতে পারে যে পুরো প্রক্রিয়ার ‘হোতা’ সেই ইরানি অস্ত্র ব্যবসায়ী আসলে একজন ‘প্রতারক’ ছিলেন।
এদিকে এ ঘটনার প্রধান বিষয়গুলো নিজের অজানা ছিল দাবি করে প্রেসিডেন্ট রিগ্যান পরবর্তী সময় জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে ক্ষমা চান। তবে ইরানি মধ্যপন্থীদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরির মূল লক্ষ্যটির পক্ষে তিনি নিজের অবস্থান বজায় রেখেছিলেন।
প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের আমলে ১৯৯৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে আরও একটি বাস্তব সুযোগ আসে। সে বছর ইরানে সংস্কারপন্থী নেতা মোহাম্মদ খাতামি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার আহ্বান জানান এবং এমনকি দূতাবাসে মার্কিন জিম্মি সংকটের ঐতিহাসিক ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন। এটি ছিল একটি প্রকৃত ও ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত।
জবাবে ক্লিনটনও ইরানের পেস্তা ও কার্পেট আমদানির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার মতো কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নেন। একই সঙ্গে ইরানের পুরোনো কিছু ক্ষোভ ও অভিযোগের যৌক্তিকতা স্বীকার করে সমঝোতামূলক বক্তব্য দেন। তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেডেলিন অলব্রাইট তো ১৯৫৩ সালে ইরানে এক সামরিক অভ্যুত্থানে সিআইএর সমর্থন দেওয়ার জন্য প্রকাশ্যে ক্ষমাও চান। এ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ইরানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছিল, যিনি দেশটির পশ্চিমা-নিয়ন্ত্রিত তেলশিল্পকে জাতীয়করণ করেছিলেন।
তবে ইরানের শক্তিশালী কট্টরপন্থী নেতারা প্রেসিডেন্ট খাতামির এ উদারপন্থী দৃষ্টিভঙ্গির তীব্র বিরোধিতা করেন। এর অন্যতম কারণ ছিল, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হলে তাঁদের পশ্চিমা–বিরোধী আদর্শের মূল ভিত্তিই হুমকির মুখে পড়ত।
অলব্রাইটের সেই বক্তব্যের কয়েক দিন পর, ইরানের নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি (১৯৮৯ সালে খোমেনির মৃত্যুর পর সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্বে আসা) মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনার সব সম্ভাবনা এক ফুৎকারে উড়িয়ে দেন।
আন্তর্জাতিক শান্তিবিষয়ক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ওয়াশিংটনের কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস-এর ইরানবিষয়ক বিশেষজ্ঞ করিম সাদজাদপুরের মতে, প্রেসিডেন্ট খাতামি পরে ব্যক্তিগতভাবে জানিয়েছিলেন যে খামেনি বিশ্বাস করতেন—ইরান কখনোই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তিতে বসবাস করতে পারবে না।
যুক্তরাষ্ট্রকে যে বিশ্বাস করা যায় না—ইরানের এমন দীর্ঘদিনের সন্দেহ খুব দ্রুতই সত্য বলে প্রমাণিত হয়। ২০১৮ সালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হুট করেই সেই পরমাণু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে নেন এবং চুক্তির আগের চেয়েও আরও কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তেহরানের ওপর চাপিয়ে দেন। জবাবে তেহরানও তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি আরও জোরদার করে।
যুক্তরাষ্ট্রকে বারবার ছাপিয়ে গেছে ইরান
ইরানের সঙ্গে বড় কোনো কূটনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছাতে পেরেছেন শুধু সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তির মাধ্যমে সর্বোচ্চ ১৫ বছরের জন্য ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়। এর বিনিময়ে শিথিল করা হয় দেশটির ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা।
ওবামা প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তা আশা করেছিলেন, আরেক মধ্যপন্থী ইরানি নেতা হাসান রুহানির সঙ্গে করা ওই চুক্তি দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের প্রথম ধাপ হবে। কিন্তু সেটি আর হয়নি। আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি চুক্তির অনুমোদন দিলেও সম্পর্ক আরও এগিয়ে নেওয়ার কোনো আগ্রহ দেখাননি।
ওবামার সমালোচকেরা তখন বলেছিলেন, আয়াতুল্লাহ খামেনির এ আচরণই প্রমাণ করে যে রুহানির ওপর ভরসা করা আর অতীতে খাতামির ওপর ভরসা করা একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।
যুক্তরাষ্ট্রকে যে বিশ্বাস করা যায় না—ইরানের এমন দীর্ঘদিনের সন্দেহ খুব দ্রুতই সত্য বলে প্রমাণিত হয়। ২০১৮ সালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প (তাঁর প্রথম মেয়াদে) হুট করেই সেই পরমাণু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে নেন এবং চুক্তির আগের চেয়েও আরও কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তেহরানের ওপর চাপিয়ে দেন। জবাবে তেহরানও তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি আরও জোরদার করে।
এমন পরিস্থিতি দুই দেশকে গত বছর এক সহিংস সংঘাতের দিকে ঠেলে দেয়। ওই সংঘাতের চূড়ান্ত রূপ হিসেবে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে ট্রাম্প ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েলকে নিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেন।
সাবেক মার্কিন কূটনীতিক ডেনিস রস বলেন, তখন থেকেই ইরান প্রতিনিয়ত ওয়াশিংটনকে কূটনীতিতে টেক্কা দিয়ে যাচ্ছে এবং যুদ্ধ শেষ করার জন্য ট্রাম্পের স্পষ্ট অধৈর্য মনোভাব ইরানের কৌশলকে আরও সহজ করে তুলেছে।
রস পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘আমাদের তাড়াহুড়াকে তারা একধরনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। আমরা সব সময় সবকিছু দ্রুত শেষ করতে চাই। আর তারা এ নীতিতে কাজ করে যে—সময় আমাদের চেয়ে তাদের স্বার্থকেই বেশি রক্ষা করবে।’
অনুবাদ: মো. আবু হুরাইরাহ্