সৌদি আরব, কাতার, পাকিস্তান ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিক, ট্রাম্প চাইলেও এটা কি সম্ভব

আব্রাহাম চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে অংশ নেন বাহরাইনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুললতিফ আল জায়ানি, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল্লাহ বিন জায়েদ। ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২০ছবি: রয়টার্স

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গতকাল সোমবার মধ্যপ্রাচ্যের আরও কয়েকটি দেশকে আব্রাহাম চুক্তির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া এই চুক্তির মাধ্যমে ইসরায়েলের সঙ্গে কয়েকটি দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়েছিল। এ চুক্তিকে ট্রাম্প তাঁর প্রথম মেয়াদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সাফল্যগুলোর একটি বলে দাবি করেছেন।

ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টে লিখেছেন, আরও বেশি দেশ এই চুক্তিতে যোগ দিলে মধ্যপ্রাচ্যে সহযোগিতা আরও জোরদার হবে। তিনি এমন ইঙ্গিতও দিয়েছেন, ভবিষ্যতে ইরানও এতে যোগ দিতে পারে।

আরেক পোস্টে ট্রাম্প এই চুক্তিতে যোগ দেওয়ার জন্য সৌদি আরব, কাতার ও পাকিস্তানকে ‘প্রস্তুত, আগ্রহী ও সক্ষম’ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।

২০২০ সালে হোয়াইট হাউসের লনে স্বাক্ষরিত আব্রাহাম চুক্তির মাধ্যমে ইসরায়েলের সঙ্গে উপসাগরীয় দুই আরব দেশ—বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাত কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে। পরে মরক্কোর সঙ্গেও একই ধরনের চুক্তি হয়। এর আগে শুধু মিসর ও জর্ডান আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিয়েছিল।

২০২৪ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে পুনর্নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে ট্রাম্প এই চুক্তির পরিধি বৃদ্ধি করার চেষ্টা করে আসছেন। তবে খুব বেশি সফল হতে পারেননি। গত নভেম্বরে কাজাখস্তান এ চুক্তির সঙ্গে যুক্ত হয়। অবশ্য, দেশটির সঙ্গে আগে থেকেই ইসরায়েলের পূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিল।

আরও দেশ যদি এই চুক্তিতে যোগ দেয়, তাহলে ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে থাকা মার্কিন নেতাদের কিছুটা শান্ত করা যেতে পারে। তাঁরা ইরানের সঙ্গে শান্তিচুক্তির চেষ্টা করায় ট্রাম্পের সমালোচনা করছেন। তেমনই একজন সাউথ ক্যারোলাইনার সিনেটর ইসরারায়েলপন্থী লিন্ডসে গ্রাহাম।

গ্রাহাম সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইরানের সঙ্গে শান্তিচুক্তি করার বিষয়ে কয়েকবার সতর্ক করেছেন। তবে ইসরায়েলের সঙ্গে সৌদি আরব ও অন্য আরব দেশগুলোর সম্পর্ক স্বাভাবিক করার সম্ভাবনাকে তিনি স্বাগত জানান।

গ্রাহামের মতে, আব্রাহাম চুক্তি হলো ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিগুলোর একটি। শুরু থেকেই এটির মূল লক্ষ্য ছিল ইরানকে একঘরে করা।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, শিগগিরই এমন কিছু ঘটার সম্ভাবনা কম। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালিয়ে যে যুদ্ধ শুরু করেছে, সেটির অবসান হলেও তা সৌদি আরবসহ অন্যান্য দেশকে দ্রুত এই চুক্তিতে যোগ দিতে উৎসাহিত করবে না।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
রয়টার্স ফাইল ছবি

আব্রাহাম চুক্তি কী

২০২০ সালে হোয়াইট হাউসের লনে স্বাক্ষরিত আব্রাহাম চুক্তির মাধ্যমে ইসরায়েলের সঙ্গে উপসাগরীয় দুই আরব দেশ—বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাত কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে। পরে মরক্কোর সঙ্গেও একই ধরনের চুক্তি হয়।

এর আগে শুধু মিসর ও জর্ডান আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। বেশির ভাগ আরব দেশ বলেছিল, স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আগে তারা ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করবে না।

কোনো দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকার অর্থ হলো ইসরায়েলের নাগরিকেরা এসব দেশে যেতে পারবেন না। আবার ওই দেশগুলোর নাগরিকেরাও ইসরায়েলে যেতে পারবেন না। ব্যবসা-বাণিজ্য ও নিরাপত্তা সহযোগিতাও গোপনে করতে হতো। আব্রাহাম চুক্তির আগপর্যন্ত সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ কয়েকটি আরব দেশের সঙ্গে ইসরায়েলে সরাসরি ফোনে যোগাযোগও বন্ধ ছিল।

ডোনাল্ড ট্রাম্প আব্রাহাম চুক্তিকে তাঁর প্রথম মেয়াদের পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বড় সাফল্য বলে বর্ণনা করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের আইনপ্রণেতারাও এই চুক্তিকে সমর্থন দিয়েছেন।

আরব নেতাদের দীর্ঘদিনের লক্ষ্য হলো পশ্চিম তীর ও গাজাকে নিয়ে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু কয়েকটি ইউরোপীয় দেশ সম্প্রতি ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও সেই সম্ভাবনা এখনো খুবই ক্ষীণ বলে মনে করা হচ্ছে।

এই চুক্তির প্রভাব কী

আব্রাহাম চুক্তিতে অংশ নেওয়া দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য, নিরাপত্তা সহযোগিতা ও পর্যটনের নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের সবচেয়ে বড় শহর দুবাইয়ে বিপুলসংখ্যক ইসরায়েলি পর্যটক ও বিনিয়োগকারী যেতে শুরু করেছেন। প্রযুক্তি ও জ্বালানি খাতের বিভিন্ন কোম্পানিও নতুন চুক্তি করেছে। ২০২৪ সালে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ ৩০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যায়। একই সঙ্গে আমিরাত ও তেল আবিবের মধ্যে নিয়মিত ফ্লাইট চলাচল শুরু হয়।

মরক্কোতেও ইসরায়েলি পর্যটকের সংখ্যা বেড়েছে। দেশটিকে চুক্তিতে আনতে প্রণোদনা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র বিতর্কিত পশ্চিম সাহারা অঞ্চলকে মরক্কোর সার্বভৌম অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

তবে বাহরাইনে এই চুক্তির প্রভাব তুলনামূলকভাবে সীমিত ছিল। উপসাগরীয় দেশটিতে এই চুক্তির বিরুদ্ধে নিয়মিত বিক্ষোভ হতে দেখা গেছে।

ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত সমাধানেও চুক্তি কোনো অগ্রগতি আনতে পারেনি।

আরব নেতাদের দীর্ঘদিনের লক্ষ্য হলো পশ্চিম তীর ও গাজাকে নিয়ে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু কয়েকটি ইউরোপীয় দেশ সম্প্রতি ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও সেই সম্ভাবনা এখনো খুবই ক্ষীণ বলে মনে করা হচ্ছে।

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
এএফপি ফাইল ছবি

এটি কি শান্তিচুক্তি

আব্রাহাম চুক্তি স্বাক্ষরের প্রায় ছয় বছর ধরে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই চুক্তিকে ‘শান্তিচুক্তি’ বলে উল্লেখ করে আসছেন।

হোয়াইট হাউস থেকে চুক্তি ঘোষণার সময় নেতানিয়াহু বলেছিলেন, ‘আজ আমরা যে শান্তি প্রতিষ্ঠা করছি, তার সুফল হবে বিশাল।’

উগ্রবাদী ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী আরও বলেছিলেন, ‘শেষ পর্যন্ত এটি আরব-ইসরায়েল সংঘাতকে একেবারে থামিয়ে দিতে পারে।’

তবে মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি মূলত কথার কথা। কারণ, ইসরায়েলের সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাত বা বাহরাইনের আগে কখনো যুদ্ধই হয়নি।

মরক্কোও মূলত আরব-ইসরায়েল সংঘাতের বাইরে ছিল। শুধু ১৯৭৩ সালের যুদ্ধে প্রতীকীভাবে কিছু সেনা পাঠিয়েছিল তারা।

অর্থাৎ এই চুক্তি ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনিদের মূল সংঘাতকে পাশ কাটিয়ে এমন দেশগুলোর মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করেছে, যাদের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ চলছিল না।

আরও দেশ কি যোগ দেবে

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে আরও দেশকে এই চুক্তিতে আনার আশা প্রকাশ করে আসছেন। কিন্তু বহু বছরেও তাঁরা সেই লক্ষ্য পূরণ করতে পারেননি।

চুক্তির সমর্থকদের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য ছিল, তেলসমৃদ্ধ ও প্রভাবশালী দেশ সৌদি আরবকে যুক্ত করা। কিন্তু ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিতে সৌদি আরবকে রাজি করানোর বহু চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।

সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসনও এ বিষয়ে জোরালো উদ্যোগ নিয়েছিল। তাদের পরিকল্পনায় সৌদি আরবকে বড় ধরনের সুবিধা দেওয়ার কথাও ছিল।

বিশ্লেষকদের মতে, গাজা যুদ্ধে ইসরায়েলের ভূমিকা ও ফিলিস্তিনি বেসামরিক মানুষের ব্যাপক দুর্ভোগের কারণে আরব দেশগুলোর জন্য এই চুক্তিতে যোগ দেওয়াটা এখন আরও কঠিন হয়ে গেছে।

সৌদি কর্মকর্তারা বলে আসছেন, স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ছাড়া তাঁরা ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিতে পারবেন না। আর ইসরায়েল সরকার এই ধারণার ঘোর বিরোধী।