শিগগিরই যুদ্ধ শেষ করতে চান ডোনাল্ড ট্রাম্প
ইরান যুদ্ধ শেষ করার ইঙ্গিত দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরানে এক মাসের বেশি সময় ধরে ধ্বংসযজ্ঞ এবং বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির পর এবার তাঁর ভাষ্য, ‘খুব শিগগির’ এ যুদ্ধ শেষ হবে। আর যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক তৎপরতার দিকে ইঙ্গিত করে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, যুদ্ধের শেষসীমা বা সমাপ্তি দেখতে পাচ্ছেন তিনি।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হয় গত ২৮ ফেব্রুয়ারি। এরপর ট্রাম্প একাধিকবার যুদ্ধ শেষ করার কথা বলেছেন। একই সময়ে যুদ্ধের পরিধি বাড়াতে মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েনও করছেন। তাই প্রশ্ন উঠেছে, ট্রাম্প আদৌ তাড়াতাড়ি যুদ্ধ শেষ করবেন কি না? গত সপ্তাহে তাঁর দেওয়া একটি বক্তব্যও সামনে এসেছে। তিনি বলেছিলেন, ‘ট্রাম্পের সময়ে এক দিনের কোনো সীমা নেই।’
যুদ্ধ শেষ করার বক্তব্য নিয়ে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে আরেকটি অভিযোগ আছে। তা হলো যুদ্ধের জেরে দেখা দেওয়া অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা সামাল দিতে মাঝেমধ্যে এমন কথা বলেন তিনি। ট্রাম্পের বক্তব্যের পর বুধবার এশিয়ার শেয়ারবাজার বেশ কিছুটা চাঙা হয়। জাপানের নিক্কেই সূচক বৃদ্ধি পায় প্রায় ৪ শতাংশ। দক্ষিণ কোরিয়ার কেওএসপিআই সূচক বৃদ্ধি পায় ৬ শতাংশের বেশি।
ট্রাম্পের বক্তব্যে অর্থনীতি সাময়িক চাঙা হলেও পাল্টাপাল্টি হামলা কমেনি। বুধবার যুদ্ধের ৩৩তম দিনে ইরানের রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এদিন ইরান, লেবানন ও ইয়েমেন থেকে ত্রিমুখী হামলার শিকার হয়েছে ইসরায়েলও। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের জ্বালানি স্থাপনা ও তেলবাহী জাহাজ লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে।
যুদ্ধের শুরু থেকে ট্রাম্পের বক্তব্যে ইরানে সরকার পতন, দেশটির সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস, খারগ দ্বীপ দখল, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণসহ নানা লক্ষ্যের বিষয় উঠে এসেছে। এসব লক্ষ্য পূরণ ছাড়াই তিনি কেন যুদ্ধ শেষ করার কথা বলছেন? দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের অধ্যাপক মোহাম্মদ এলমাসরি আল–জাজিরাকে বলেন, ইরানে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হওয়ায় যুদ্ধে সামগ্রিকভাবে কৌশলগত ব্যর্থতার মুখে পড়েছে ওয়াশিংটন। ফলে ট্রাম্পের বক্তব্যে এমন পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।
‘প্রয়োজনে আবার ফিরে হামলা চালানো হবে’
যুদ্ধ শেষ করা প্রসঙ্গে গত মঙ্গলবার ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে এক সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন। সেখানে ‘শিগগিরই’ বোঝাতে একটি সময়সীমা তুলে ধরেন তিনি। সেটি হলো, দুই সপ্তাহের মধ্যে, হয়তো দুই সপ্তাহ, হয়তো তিন। বুধবার রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারেও ট্রাম্প বলেন, ইরান যুদ্ধ থেকে শিগগিরই বের হয়ে যাবে যুক্তরাষ্ট্র। তবে প্রয়োজন পড়লে আবার ফিরে এসে হামলা চালানো হবে।
ট্রাম্পের ভাষ্যমতে, ইরানের তাদের ‘এপিক ফিউরি’ অভিযান শেষ করার জন্য ‘ইরানের কোনো চুক্তি করা লাগবে না’। তবে চুক্তির জন্য আলোচনা চলছে বলে ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিও। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যুদ্ধে সময়ক্ষেপণ করতে ‘লোকদেখানো’ আলোচনা করছেন না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা শেষ সীমাটা দেখতে পাচ্ছি।’
এমন সব বক্তব্যের মধ্যে হোয়াইট হাউস থেকে জানানো হয়েছে, বুধবার স্থানীয় সময় রাত ৯টায় ইরান যুদ্ধ নিয়ে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। এর পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লেখেন, ইরানের ‘নতুন সরকারের প্রেসিডেন্ট’ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে যুদ্ধবিরতির জন্য আহ্বান জানিয়েছে। যদিও এ বক্তব্য খণ্ডন করে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, তেহরান এমন কোনো আহ্বান জানায়নি। এ যুদ্ধ ছয় মাস পর্যন্ত চালিয়ে যেতে প্রস্তুত তারা।
দ্রুত যুদ্ধ শেষ চান মার্কিন নাগরিকেরা
ইরান যুদ্ধে শুধু লক্ষ্য পূরণ না হওয়ার চাপেই নেই ট্রাম্প। যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে যে অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা দেখা দিয়েছে, তার আঁচ পড়ছে যুক্তরাষ্ট্রেও। এরই মধ্যে দেশটিতে ২০২২ সালের পর গ্যাসোলিনের (জ্বালানি) দাম সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। হচ্ছে ট্রাম্পবিরোধী বিক্ষোভ। এমন পরিস্থিতিতে রয়টার্স–ইপসসের এক জরিপে দেখা গেছে, দুই–তৃতীয়াংশ মার্কিন নাগরিক দ্রুত ইরান যুদ্ধ বন্ধ চান।
এই জরিপ করা হয়েছে গত শুক্রবার থেকে রোববার পর্যন্ত। জরিপে অংশ নিয়েছেন ১ হাজার ২১ জন। তাঁদের ৬৬ শতাংশ বলেছেন, যুদ্ধ দ্রুত বন্ধ হওয়া দরকার। আর ২৭ শতাংশ বলেছেন, নিজেদের সব লক্ষ্য অর্জন না করে যুদ্ধ থেকে সরে যাওয়া ওয়াশিংটনের উচিত হবে না। এতে যুদ্ধ আরও বেশি সময় ধরে চললে তাঁদের কোনো আপত্তি নেই। ৬ শতাংশ কোনো মন্তব্য জানাননি।
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের দিনে প্রায় ২০০ কোটি ডলার খরচ হতে পারে বলে জানিয়েছেন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞ লিন্ডা ব্লিমস। এদিকে ইঙ্গিত করে নিউইয়র্ক শহরের মেয়র জোহরান মামদানি বুধবার ইউটিউবার ব্রায়ান টেইলরকে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, যুদ্ধে এই বিপুল ব্যয় এমন এক সময় হচ্ছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ‘ঐতিহাসিক সংকটের’ মধ্যে রয়েছে।
ন্যাটো ছাড়ার চিন্তা
এবারের যুদ্ধ ঘিরে পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর সদস্যদের ওপর বেশ চটেছেন ট্রাম্প। জোটটির সনদের পঞ্চম অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনো সদস্যদেশ হামলার শিকার হলে অন্য দেশগুলো তার প্রতিরক্ষায় এগিয়ে আসবে। তবে ইরান যুদ্ধে কোনো দেশই যুক্তরাষ্ট্রের পাশে সরাসরি দাঁড়ায়নি। তাদের অনেকের ভাষ্য, যুদ্ধ শুরুর আগে তাদের সঙ্গে আলাপ করা হয়নি। এটি তাদের যুদ্ধ নয়।
এমন পরিস্থিতিতে ন্যাটো থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেওয়ার কথা ভাবছেন ট্রাম্প। মঙ্গলবার সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ন্যাটো একটি ‘কাগুজে বাঘ’। এই জোট যুক্তরাষ্ট্রের পাশে থাকে না। আর মার্কো রুবিও বলেছেন, যুদ্ধ শেষে ন্যাটোর সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্বিবেচনা করবে যুক্তরাষ্ট্র। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।
‘এই যুদ্ধে আমরা খুব ক্লান্ত’
চলমান যুদ্ধের মধ্যে বুধবার ত্রিমুখী হামলার মুখে পড়েছে ইসরায়েল। এদিন ইরানের সামরিক বাহিনী, লেবানন থেকে সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ ও ইয়েমেন থেকে আরেক সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতি ইসরায়েল লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। হামলায় তেল আবিবসহ দেশটির বিভিন্ন এলাকায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। এসব হামলায় ইসরায়েলে আহতের সংখ্যা বেড়ে ৬ হাজার ২৮৬–তে দাঁড়িয়েছে।
এদিন ইরানের হামলায় কাতারের একটি তেলবাহী জাহাজ আক্রান্ত হয়। ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে কুয়েতের একটি বিমানবন্দরে তেলের ট্যাংকে আগুন ধরে যায়। হামলায় বাহরাইনেও আগুন লাগার ঘটনা ঘটে। আর সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ এলাকায় ড্রোনের ধ্বংসাবশেষের আঘাতে এক বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। সৌদি আরব দুটি ড্রোন প্রতিহত করেছে বলে জানিয়েছে।
ইরানের বিভিন্ন ইস্পাত কারখানাও বুধবার ব্যাপক হামলার মুখে পড়েছে। তেহরান, কেরমান, সিরজান, ইসফাহানসহ বিভিন্ন শহরে দফায় দফায় বিস্ফোরণ হয়েছে। রেড ক্রিসেন্ট জানিয়েছে, যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ইরানে ১ লাখ ১৫ হাজারের বেশি বেসামরিক স্থাপনা ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নিজেদের দুর্দশার কথা তুলে ধরে তেহরানের এক তরুণ বিবিসিকে বলেন, ‘এক মাস ধরে আজাবের মধ্যে রয়েছি। এই যুদ্ধে আমরা এখন খুব ক্লান্ত।’