যুক্তরাষ্ট্রে বিরল উদ্যোগ, ইসরায়েলের পরমাণু সক্ষমতা সম্পর্কে জানতে চান কংগ্রেস সদস্যরা
ইসরায়েলের পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে মার্কিন সরকারের দীর্ঘদিনের নীরবতা ভাঙার আহ্বান জানিয়েছেন একদল ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য। ৪ মে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর কাছে পাঠানো এক চিঠিতে তাঁরা এই দাবি জানান।
চিঠিতে আইনপ্রণেতারা উল্লেখ করেছেন, ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ইসরায়েলের স্বচ্ছতা এখন সময়ের দাবি।
ওয়াশিংটনভিত্তিক ‘নিউক্লিয়ার থ্রেট ইনিশিয়েটিভ’-এর তথ্যমতে, ১৯৬০-এর দশক থেকেই ইসরায়েলের পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। তবে দেশটি কখনোই আনুষ্ঠানিকভাবে এ কথা স্বীকার করেনি। এ বিষয়ে সব সময় ‘অস্পষ্টতা’ বজায় রাখার নীতি মেনে চলছে ইসরায়েল।
হোয়াইট হাউসও কয়েক দশক ধরে ইসরায়েলের পারমাণবিক কর্মসূচি বা অস্ত্র নিয়ে মুখ খোলেনি। তবে এবার ৩০ জন আইনপ্রণেতার সই করা এই চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘মধ্যপ্রাচ্যের পারমাণবিক ভারসাম্য এবং সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি সম্পর্কে পূর্ণ তথ্য জানার সাংবিধানিক অধিকার কংগ্রেসের রয়েছে, কিন্তু আমরা সেই তথ্য পাইনি।’
চিঠিতে আইনপ্রণেতারা আরও বলেন, ‘কোনো এক পক্ষের পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে সরকারি অস্পষ্টতা থাকলে মধ্যপ্রাচ্যে পারমাণবিক বিস্তার রোধ নীতি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। ইরান, সৌদি আরবসহ পুরো অঞ্চলের ওপর এর প্রভাব পড়বে।’
পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিওর কাছে আইনপ্রণেতারা স্পষ্ট জানতে চেয়েছেন, ইসরায়েলের কাছে কতগুলো পারমাণবিক ওয়ারহেড ও লঞ্চার আছে। বিশেষ করে দেশটির দিমোনা শহরে নেগেভ পারমাণবিক গবেষণাকেন্দ্র নিয়ে তাঁরা বিস্তারিত তথ্য চেয়েছেন।
এ ছাড়া ইসরায়েল বর্তমানে কী পরিমাণ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করছে এবং ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের কোনো পরিকল্পনা আছে কি না, সে বিষয়েও প্রশাসনকে জবাব দিতে বলা হয়েছে।
চিঠিতে আইনপ্রণেতারা আরও প্রশ্ন করেন, ইসরায়েল কি যুক্তরাষ্ট্রকে কোনো নিশ্চয়তা দিয়েছে যে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করা হবে না?
ইসরায়েলের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পর্কে যা জানা যায়
বিভিন্ন সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা, ইসরায়েলি তথ্য ফাঁসকারী এবং প্রকাশিত গোয়েন্দা নথি অনুযায়ী, ইসরায়েলের পারমাণবিক কর্মসূচি বহু দশক ধরে সক্রিয় আছে বলে ধারণা করা হয়।
১৯৬৮ সালে সিআইএ তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট লিন্ডন বি জনসনকে জানায়, ইসরায়েল পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করেছে বা তৈরি করার সক্ষমতা অর্জন করেছে।
পরবর্তী সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী গোল্ডা মেয়ারের মধ্যে একটি সমঝোতা হয় বলে জানা যায়। এতে ইসরায়েল কখনোই পারমাণবিক অস্ত্রের অস্তিত্ব স্বীকার না করার এবং কোনো পারমাণবিক পরীক্ষা না চালানোর শর্তে রাজি হয়। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র দেশটির ওপর নজরদারি বন্ধ করে।
১৯৮৬ সালে ইসরায়েলি পারমাণবিক প্রযুক্তিবিদ মোর্দেখাই ভানুনু ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম সানডে টাইমসে নেগেভ পারমাণবিক কেন্দ্রের তথ্য ফাঁস করেন, যা বড় আলোড়ন সৃষ্টি করে।
চিঠিতে বলা হয়, বহু মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়ন ও সরকারি বিবৃতি ইঙ্গিত দেয়, ইসরায়েলের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে।
নিউক্লিয়ার থ্রেট ইনিশিয়েটিভের অনুমান অনুযায়ী, ইসরায়েলের কাছে প্রায় ৯০টি পারমাণবিক ওয়ারহেড, ৭৫০ থেকে ১ হাজার ১১০ কেজি প্লুটোনিয়াম, পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম ৬টি সাবমেরিন এবং ৪ হাজার ৮০০ থেকে ৬ হাজার ৫০০ কিলোমিটার পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে।
এই চিঠির গুরুত্ব কী
এর আগে এককভাবে কিছু আইনপ্রণেতা ইসরায়েলের পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে প্রশ্ন তুললেও কংগ্রেসের এমন সমন্বিত উদ্যোগ খুবই বিরল।
গাজায় যুদ্ধ এবং ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল সম্পর্ক নিয়ে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান উভয় দলেই আলোচনা-সমালোচনা বাড়ছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই চিঠিটি পাঠানো হলো।
এর আগে গত এপ্রিলে ৪০ জন ডেমোক্র্যাট সিনেটর ইসরায়েলের জন্য সামরিক সরঞ্জাম বিক্রির একটি বিলের বিরোধিতা করেন।
ট্রাম্প প্রশাসন বলছে, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে আটকানোই তাদের প্রধান লক্ষ্য। বিশ্লেষকেরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ঠেকানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছে। অন্যদিকে একই ইস্যুতে ইসরায়েলের বিষয়ে নীরব। এই দ্বৈত নীতি নিয়ে প্রশ্ন বাড়ছে।
ইনস্টিটিউট ফর মিডল ইস্ট আন্ডারস্ট্যান্ডিং পলিসি প্রজেক্টের নীতি পরিচালক জশ রুবনার বলেন, ইসরায়েলের পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে স্বচ্ছতা না থাকলে পুরো অঞ্চলে পারমাণবিক নিয়ন্ত্রণনীতি কার্যকর করা কঠিন হয়ে পড়বে।