ভেনেজুয়েলায় যেতে আগ্রহী যুক্তরাষ্ট্রের সব তেল কোম্পানি
ভেনেজুয়েলায় হামলা চালিয়ে প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে তুলে নেওয়ার পর দেশটির বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল উত্তোলনে তোড়জোড় শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। উত্তোলন বাড়াতে কয়েক দিনের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের তেল কোম্পানিগুলোর সঙ্গে বৈঠকে বসতে পারেন মার্কিন কর্মকর্তারা। বৈঠকের বিষয়ে জানাশোনা আছে এমন একটি সূত্র এ তথ্য রয়টার্সকে জানিয়েছে।
গত শনিবার মাদুরোকে তুলে নেওয়ার পর ভেনেজুয়েলার তেল খাত ‘নিজেদের কাছে নেওয়ার’ কথা বলেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর ওই বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোর সঙ্গে আসন্ন বৈঠককে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ, এর মধ্য দিয়ে প্রায় দুই দশক পর আবার ভেনেজুয়েলার প্রবেশ করতে পারে মার্কিন কোম্পানিগুলো।
বৈঠকের বিষয়ে ওয়াশিংটন এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো কিছু জানায়নি। তবে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র টেইলর রজার্স বলেছেন, ‘আমাদের সব তেল কোম্পানি ভেনেজুয়েলায় বড় বিনিয়োগ করতে আগ্রহী এবং প্রস্তুতও রয়েছে। এর মাধ্যমে দেশটির জ্বালানি অবকাঠামো নতুন করে গড়ে তোলা হবে, যা মাদুরোর অবৈধ সরকারের আমলে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।’
বিশ্বের সবচেয়ে বেশি জ্বালানি তেল মজুত রয়েছে ভেনেজুয়েলায়। ২০২৩ সালের হিসাবে তা ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেলের মতো। এটি বিশ্বে মাটির নিচে থাকা অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের প্রায় ২০ শতাংশ।
তেল কোম্পানিগুলোর সঙ্গে বৈঠকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ও জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট নেতৃত্ব দিতে পারেন বলে সূত্রের বরাতে জানা গেছে। এ নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে রয়টার্সের কাছে মন্তব্য করেনি যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় তিন তেল কোম্পানি—এক্সন মোবিল, কনোকো ফিলিপস ও শেভরন। তবে এখন পর্যন্ত মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে তাদের কোনো আলাপ হয়নি বলে জানিয়েছে সূত্র।
বিশ্বের সবচেয়ে বেশি জ্বালানি তেল মজুত রয়েছে ভেনেজুয়েলায়। ২০২৩ সালের হিসাবে তা ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেলের মতো। এটি বিশ্বে মাটির নিচে থাকা অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের প্রায় ২০ শতাংশ। মাদক চোরাচালানের অভিযোগ তুলে গত সেপ্টেম্বরে ভেনেজুয়েলা ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ব্যাপক সেনা মোতায়েনের পর থেকে মাদুরো বলে আসছিলেন, ওয়াশিংটনের নজর আসলে তেলের দিকে।
আছে নানা জটিলতা
১৯৯৯ সালে ভেনেজুয়েলার সমাজতন্ত্রী প্রেসিডেন্ট হুগো চাভেজ ক্ষমতায় আসার পর দেশটির তেল খাত জাতীয়করণ করা হয়। ২০০৭ সালে এক্সন মবিল ও কনোকো ফিলিপস দেশটি থেকে কার্যক্রম গুটিয়ে নেয়। কারাকাসের সঙ্গে দীর্ঘ আইনি লড়াইয়েও জড়ায় তারা। বর্তমানে মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোর মধ্যে শেভরনই কেবল সীমিত পরিসরে ভেনেজুয়েলায় কাজ করছে।
ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তায় এক বিক্ষোভকারীর পোশাকে লেখা ছিল, ‘মার্কিন সম্রাজ্যবাদ রুখে দাও’। আর আর্জেন্টিনার বুয়েনস এইরেসে একটি প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল, ‘মাদুরোর মুক্তি চাই’।
ভেনেজুয়েলায় নতুন করে মার্কিন কোম্পানিগুলোর প্রবেশ ঘিরে নানা জটিলতা দেখছেন বিশ্লেষকদের অনেকে। তাঁরা বলছেন, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে ভেনেজুয়েলায় ভেঙে পড়া জ্বালানি অবকাঠামো, মাদুরোকে তুলে নেওয়ার পর দেশটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং মার্কিন নীতির অস্পষ্টতার কারণে ট্রাম্প প্রশাসনের এই পরিকল্পনা ভেস্তে যেতে পারে।
যদিও সোমবার সংবাদমাধ্যম এনবিসির সঙ্গে আলাপচারিতায় ট্রাম্প বলেছেন, ভেনেজুয়েলায় তেল উত্তোলন বাড়াতে মার্কিন কোম্পানিগুলোকে ভর্তুকি দিতে পারে তাঁর সরকার। তবে পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি খাতের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আমার মনে হয় না শেভরন ছাড়া অন্য কোনো কোম্পানি এখনই ভেনেজুয়েলার জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেবে।’
একই সন্দেহ ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান পিডিভিএসএর সাবেক বিশ্লেষক হোসে চালহুবের। বিবিসিকে তিনি বলেন, কনোকো ও এক্সনের সঙ্গে কী হয়েছিল, তা মার্কিন কোম্পানিগুলোর মনে আছে। তাদের আগ্রহী করার জন্য ভেনেজুয়েলায় সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যা স্বল্প মেয়াদে সম্ভব নয়। ফলে কোম্পানিগুলো বড় বিনিয়োগে ঝুঁকি নিতে চাইবে না।
তৎপর মাচাদো
মাদুরোকে তুলে নেওয়ার ঘটনার পর ‘যত দ্রুত সম্ভব’ ভেনেজুয়েলায় ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা মারিয়া কোরিনা মাচাদো। সোমবার ফক্স নিউজকে এ কথা বলেন তিনি। মাদুরোর অনুপস্থিতিতে ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হওয়া দেলসি রদ্রিগেজের সমালোচনা করে মাচাদো বলেন, ‘তিনি নিপীড়ন, নির্যাতন, দুর্নীতি ও মাদক পাচারের প্রধান স্থপতিদের একজন।’
গত ডিসেম্বরে গোপনে ভেনেজুয়েলা ছেড়েছিলেন শান্তিতে নোবেলজয়ী মাচাদো। ফক্স নিউজের সঙ্গে আলাপচারিতায় তিনি বলেছেন, তাঁর নোবেল পুরস্কার ট্রাম্পের সঙ্গে ভাগ করে নিতে চান। মাদুরোকে তুলে নেওয়ার পর অনেকেই ধারণা করছিলেন, মাচাদোকে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট পদে বসাতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। তবে সম্প্রতি সে সম্ভাবনা সরাসরি নাকচ করে দেন ট্রাম্প।
ভেনেজুয়েলায় কোনো নির্বাচনের আগে ‘দেশটিকে ঠিকঠাক’ করা লাগবে—সোমবার এনবিসিকে এমন কথাই বলেন ট্রাম্প। তখন প্রশ্ন করা হয়, তত দিন পর্যন্ত দেশটির চালকের ভূমিকায় কে থাকবেন? মাদুরোকে তুলে নেওয়ার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের বিস্তর নিন্দা, ব্যাপক সমালোচনার পরও এনবিসিকে ট্রাম্পের জবাব ছিল—‘আমি।’
দেশে দেশে বিক্ষোভ
মার্কিন সামরিক বাহিনী শনিবার রাতে মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে ভেনেজুয়েলা থেকে তুলে নেয়। সোমবার দুজনকে নিউইয়র্কের আদালতে তোলা হয়। তাঁদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ নিয়ে আদালতে পরবর্তী শুনানি হবে ১৭ মার্চ। মাদুরোকে এভাবে তুলে নেওয়া এবং ভেনেজুয়েলায় মার্কিন অভিযানের প্রতিবাদে প্রতিদিনই বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভ হচ্ছে।
মঙ্গলবার ও আগের দিনও যুক্তরাষ্ট্র, ইন্দোনেশিয়া, নেপাল, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনাসহ বেশ কিছু দেশে বিক্ষোভ হয়। এসব বিক্ষোভে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী বিভিন্ন স্লোগান, নানা প্ল্যাকার্ড দেখা যায়। যেমন ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তায় এক বিক্ষোভকারীর পোশাকে লেখা ছিল, ‘মার্কিন সম্রাজ্যবাদ রুখে দাও’। আর আর্জেন্টিনার বুয়েনস এইরেসে একটি প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল, ‘মাদুরোর মুক্তি চাই’।
আরও পড়ুন:
ভেনেজুয়েলাকে যেন অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দেওয়া না হয়, ট্রাম্পকে এরদোয়ানের সতর্কবার্তা
ভেনেজুয়েলা অভিযান কেন ট্রাম্পের জন্য অশুভ সংকেত হতে পারে
লাতিন আমেরিকার দেশে দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান, কী কৌশল ছিল