যেখানে ফুটবলে ঠিকানা খুঁজছে শরণার্থী কিশোরীরা

বিশ্বে এক কোটির বেশি মানুষ এখন শরণার্থীজীবন কাটাচ্ছেন, যাঁদের অধিকাংশ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন যুদ্ধ ও সংঘাতের কারণে। এই প্রেক্ষাপটে ২০ জুন আন্তর্জাতিক শরণার্থী দিবস পালিত হচ্ছে। এ বছর দিবসের স্লোগানে ‘সবাই নিরাপদ না হওয়া পর্যন্ত’ কাজ চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করা হয়েছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বাল্টিমোরে ‘সকার উইদাউট বর্ডারস’ সংগঠনের উদ্যোগে শরণার্থী কিশোরীদের ফুটবলে ঠিকানা খোঁজার গল্প তুলে ধরেছে জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা।

বাঁ থেকে ইউএসএ ফর ইউএনএইচসিআরের নির্বাহী পরিচালক ও সিইও সুজান ইহলার্স, সকার উইদাউট বর্ডারসের খেলোয়াড় গাগা ও উজরা এবং দলের কোচ হাজার আবুলফজলছবি: ইউএনএইচসিআর

উত্তর-পূর্ব বাল্টিমোরের একটি ফুটবল মাঠ। অনুশীলন শেষ করে কোচ হাজার আবুলফজলকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে একঝাঁক কিশোরী ফুটবলার। সামনে কী কী ম্যাচ আছে, কখন অনুশীলন হবে এবং সারা সপ্তাহে কোন কোন দক্ষতার ওপর জোর দিতে হবে—মেয়েদের সেই নির্দেশনা দিচ্ছেন কোচ। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন মাঠ বা কোর্টে প্রতিদিন এমন দৃশ্য চেনা হলেও এই দলের গল্পটি একটু আলাদা।

কোচ হাজার আবুলফজল বলেন, ‘আমার দলটি বৈচিত্র্যে ভরা। এখানে পূর্ব ও উত্তর আফ্রিকা, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের অনেক মেয়ে একসঙ্গে খেলছে। আমি ভীষণ গর্বিত। কারণ, আমি প্রত্যেক খেলোয়াড়কে একজন নেতা এবং দলের একজন শক্তিশালী কণ্ঠস্বর হিসেবে গড়ে উঠতে দেখছি। শুধু ফুটবলেই নয়, তারা সমাজ ও শিক্ষাঙ্গনেও নিজেদের দক্ষতার প্রমাণ দিচ্ছে।’

আফগান নারী হাজার আবুলফজল বর্তমানে ‘সকার উইদাউট বর্ডারস’ নামে একটি অলাভজনক সংগঠনের সিনিয়র প্রোগ্রাম কো–অর্ডিনেটর হিসেবে কাজ করছেন। ২০ বছরের বেশি সময় ধরে সংগঠনটি খেলাধুলার মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত তরুণ-তরুণী, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে আসা নতুন অভিবাসী ও শরণার্থী কিশোর-কিশোরীদের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে এবং সমাজে সবার সঙ্গে মিলেমিশে চলতে সাহায্য করছে।

‘সকার উইদাউট বর্ডারস’ নামে সংগঠনটি গত ২০ বছরের বেশি সময় ধরে খেলাধুলার মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত তরুণ-তরুণী, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে আসা নতুন অভিবাসী ও শরণার্থী কিশোর-কিশোরীদের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে এবং সমাজে সবার সঙ্গে মিলেমিশে চলতে সাহায্য করছে।

সংগঠনটির এ উদ্যোগ আবুলফজলের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে। নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি যখন এই সংগঠনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য দেখলাম, তা সরাসরি আমার হৃদয়ে দাগ কাটল। আমি মনে মনে বললাম, ওহ্‌ ঈশ্বর! সকার উইদাউট বর্ডারস যুক্তরাষ্ট্রে ঠিক সেই কাজই করছে, যা আমি একসময় আফগানিস্তানে করতাম। এটি হয়তো তাদের প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্য, কিন্তু এটিই আমার জীবনের মূল মিশন।’

আফগানিস্তানে বড় হওয়া আবুলফজলের জন্য ফুটবল খেলা তো দূরের কথা, কোনো দলে যোগ দেওয়ার সুযোগই ছিল সীমিত। সামাজিক নানা বাধা ও পারিবারিক চাপের কারণে সেখানে মেয়েদের ঘরের ভেতরেই থাকতে বাধ্য করা হতো। তবে সব প্রতিবন্ধকতাকে পাশ কাটিয়ে ফুটবলের প্রতি আবুলফজলের ভালোবাসা ছিল অদম্য। নিজের সাহস আর পরিবারের সমর্থনে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময়ই তিনি ফুটবল খেলা শুরু করেন। পরবর্তীকালে ২০০৮ সালে তিনি আফগানিস্তান নারী জাতীয় ফুটবল দলের সহ-অধিনায়ক নির্বাচিত হন।

যখন আমার দলের খেলোয়াড়েরা তাদের জীবনের গল্পগুলো আমার সঙ্গে শেয়ার করে, তখন আমার মনে হয়, ঠিক এই অভিজ্ঞতা তো আমার নিজের জীবনেও হয়েছে। আমি তাদের কষ্টটা একদম ভেতর থেকে অনুভব করতে পারি। তারা কী বলতে চাইছে এবং জীবনের কোন কঠিন পথ পাড়ি দিয়ে তারা এখানে এসেছে, তা আমি খুব সহজেই বুঝতে পারি।
–হাজার আবুলফজল, কোচ ও সিনিয়র প্রোগ্রাম কো–অর্ডিনেটর, সকার উইদাউট বর্ডারস

মাঠের বাইরেও খেলাধুলার মাধ্যমে নারী ক্ষমতায়নের কাজকে নিজের জীবনের মূল লক্ষ্য বানিয়ে নেন হাজার আবুলফজল। আফগান মেয়েদের ফুটবলের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে এবং ‘মেয়েরা খেলার মাঠে যেতে পারবে না’—সমাজের এমন অন্ধ বিশ্বাস দূর করতে তিনি একটি অলাভজনক সংস্থা চালু করেন। সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের এই কাজের সূত্র ধরেই তিনি নিউইয়র্কে জাতিসংঘের যুব সমাবেশে (ইউনাইটেড নেশনস ইয়ুথ অ্যাসেম্বলি) আফগানিস্তানের প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দেওয়ার সুযোগ পান।

হাজার আবুলফজল যে কাজকে নিজের জীবনের লক্ষ্য বানিয়েছিলেন, সেটিই একসময় তাঁর জীবনকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলে দেয়। ২০১৭ সালের দিকে আফগানিস্তানের পরিস্থিতি নারীদের জন্য দিন দিন আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠছিল, বিশেষ করে সমাজ ও সংস্কৃতির প্রথা ভেঙে যেসব নারী নিজেদের অধিকার আদায়ে এগিয়ে আসছিলেন।

নিজের সেই কঠিন দিনগুলোর কথা মনে করে হাজার আবুলফজল বলেন, ‘আমি কেবল নিজের জীবন বাঁচাতে এবং নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে যুক্তরাষ্ট্রে চলে আসি। দেশ ছাড়ার সময় আমি আমার সবকিছু আফগানিস্তানে ফেলে এলেও ফুটবলপ্রেম আর স্বপ্নটাকে ফেলে আসিনি। সেটাকে আমি সঙ্গে করে নিয়ে এসেছি এবং একই লক্ষ্য নিয়ে এখানেও কাজ করে যাচ্ছি।’

অলিম্পিক রিফিউজি ফাউন্ডেশন এবং জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের পাশাপাশি ২০২৬ সালে স্পোর্ট ফর রিফিউজিস কোয়ালিশনের সহ-আহ্বায়ক হিসেবে মনোনীত হয়েছে সকার উইদাউট বর্ডারস। বৈশ্বিক পর্যায়ে সকার উইদাউট বর্ডারস এখন ইউএনএইচসিআর এবং অলিম্পিক রিফিউজি ফাউন্ডেশনের সঙ্গে যুক্ত।

যুক্তরাষ্ট্রের বাল্টিমোরে এসে হাজার এখন ফুটবলের মাধ্যমে মেয়েদের ক্ষমতায়নের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। নিজের চড়াই-উতরাই ও দেশ ছাড়ার অভিজ্ঞতার কারণে তিনি তাঁর দলের খেলোয়াড়দের জীবনযুদ্ধ এখন আরও গভীরভাবে বুঝতে পারেন।

হাজার আবুলফজল বলেন, ‘যখন আমার দলের খেলোয়াড়েরা তাদের জীবনের গল্পগুলো আমার সঙ্গে শেয়ার করে, তখন আমার মনে হয়, ঠিক এই অভিজ্ঞতা তো আমার নিজের জীবনেও হয়েছে। আমি তাদের কষ্টটা একদম ভেতর থেকে অনুভব করতে পারি। তারা কী বলতে চাইছে এবং জীবনের কোন কঠিন পথ পাড়ি দিয়ে তারা এখানে এসেছে, তা আমি খুব সহজেই বুঝতে পারি।’

উজরা ও গাগার মতো ফুটবলারদের কাছে হাজার আবুলফজল কেবল একজন কোচ নন, তার চেয়েও বেশি কিছু।

আফগানিস্তান থেকে আসা উজরা ২০২৪ সালে সকার উইদাউট বর্ডারসে যোগ দেয়। হাসিমুখে সে বলে, ‘তিনি (হাজার) আমাদের বড় বোনের মতো।’ উজরা এই দলে খেলার পাশাপাশি মাধ্যমিক স্কুলের মেয়েদের ফুটবল কর্মসূচিতে রেফারির দায়িত্বও পালন করছে।

দক্ষিণ সুদান থেকে আসা শরণার্থী ফুটবলার গাগা বলে, ‘হাজারের সঙ্গে দেখা হওয়াটা সত্যিই দারুণ এক অভিজ্ঞতা ছিল। ফুটবলের প্রতি তাঁর ভালোবাসা অনেক গভীর। নারীদের ফুটবল খেলতে দেখা এবং আমার সামনে একজন বড় পথপ্রদর্শক আছেন। এটি জানার পর আমার খুব আনন্দ হয়।’

গাগা সকার উইদাউট বর্ডারস এবং তার হাইস্কুল দলের হয়ে খেলার পাশাপাশি চলতি বছরের ফল সেমিস্টার থেকে কলেজে ফুটবল খেলার প্রস্তাবও লুফে নিয়েছে। সকার উইদাউট বর্ডারসের মতো কর্মসূচির প্রভাব এখন বিশ্বজুড়ে স্বীকৃতি পাচ্ছে।

অলিম্পিক রিফিউজি ফাউন্ডেশন এবং জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের পাশাপাশি ২০২৬ সালে স্পোর্ট ফর রিফিউজিস কোয়ালিশনের সহ-আহ্বায়ক হিসেবে মনোনীত হয়েছে সকার উইদাউট বর্ডারস।

ইউএসএ ফর ইউএনএইচসিআরের নির্বাহী পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী সুজান ইহলার্স বলেন, বৈশ্বিক পর্যায়ে সকার উইদাউট বর্ডারস এখন ইউএনএইচসিআর এবং অলিম্পিক রিফিউজি ফাউন্ডেশনের সঙ্গে যুক্ত। এটি প্রমাণ করে যে শরণার্থীশিবির থেকে শুরু করে বাল্টিমোরের শহরতলি পর্যন্ত—খেলাধুলাকে যে সুরক্ষা, আপন অনুভূতি এবং সমাজে অন্তর্ভুক্তির একটি বড় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা যায়, তা এখন বিশ্বজুড়ে সবাই মানছে।

‘হাজারের কাছে উজরা ও গাগা হলো মেয়েদের ক্ষমতায়নে খেলাধুলার ভূমিকার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। হাজার যখনই কোচিং করান বা কাউকে পথ দেখান, তাঁর একটাই মূলমন্ত্র থাকে—তাদের মাঠে নিয়ে এসো’—এই মূলমন্ত্রের ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, মেয়েদের ঘরের বাইরে বের করে আনা এবং দলে যুক্ত করার জন্য অনেক কাজ করতে হয়। তাদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলতে হবে, স্কুলের সঙ্গে কথা বলতে হবে, তাদের উৎসাহিত করতে হবে এবং বোঝাতে হবে যে এটি একটি ভালো এবং আনন্দের জায়গা।

চলতি মৌসুমের একটি ম্যাচে কঠিন লড়াইয়ের পর জয় পায় হাজারের দল। মাঠের ভেতরে মেয়েদের হাসিমুখের ভিড়ে দাঁড়িয়ে গর্বিত হাজার বলেন, ‘জানেন, কোন জিনিসটা আমাকে সবচেয়ে বেশি আনন্দ দেয়? এই যেমন দলে একদম নতুন যোগ দেওয়া কেউ যখন মাঠে নেমে চমৎকার পারফর্ম করে, তা দেখতে পাওয়া।

‘মাঠ ছাড়ার আগে পুরো দল একে অপরের হাত ধরে গোল হয়ে দাঁড়ায়। সবার হাত থাকে ঠিক মাঝখানে। একজন খেলোয়াড় চিৎকার করে দলকে উৎসাহিত করে বলে ওঠে, তিন গুনতেই সবাই বলবে—সকার উইদাউট বর্ডারস! দলের বাকি সবাই তখন একসঙ্গে সুর মিলিয়ে চিৎকার করে বলে ওঠে, সকার উইদাউট বর্ডারস!’