এপস্টিনকে গ্রেপ্তারের পরও বান্ধবী গিলেন সুইস ব্যাংক ইউবিএসে বিপুল অর্থের লেনদেন করেন
সুইজারল্যান্ডের বৃহৎ সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ইউবিএসে ২০১৪ সালে গিলেন ম্যাক্সওয়েলের সঞ্চয়ী হিসাব খোলা হয়েছিল। জেফরি এপস্টিনের সঙ্গে জেপি মরগান চেজ সম্পর্ক ছিন্ন করার মাত্র কয়েক মাস পরেই এই হিসাব খোলা হয়।
নথিপত্র অনুযায়ী, গিলেন যৌন পাচারের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগের বছরগুলোতে ইউবিএস তাঁকে প্রায় ১ কোটি ৯০ লাখ ডলার লেনদেন করতে সহায়তা করেছে।
গত মাসে মার্কিন বিচার বিভাগের প্রকাশিত নথিপত্র থেকে গিলেনের সঙ্গে ইউবিএসের ব্যাংকিং সম্পর্কের গভীরতা সম্পর্কে নতুন তথ্য পাওয়া গেছে। জেফরি এপস্টিনের এই বান্ধবী ২০২০ সালে গ্রেপ্তার হন। অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের যৌন নিপীড়নে এপস্টিনকে সহায়তা করার দায়ে তিনি দোষী সাব্যস্ত হন। বর্তমানে তিনি ২০ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন।
ই–মেইল, ব্যাংক স্টেটমেন্টসহ এসব নথিপত্র থেকে জানা যায়, সুইস এই ব্যাংকে গিলেনের জন্য ব্যক্তিগত এবং ব্যবসায়িক অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছিল। এসব ব্যাংক হিসাবে নগদ অর্থ, শেয়ার ও হেজ ফান্ডে বিনিয়োগ ছিল।
ইউবিএস গিলেনের জন্য দুজন রিলেশনশিপ ম্যানেজার নিয়োগ করে দিয়েছিল, যাঁরা তাঁকে লাখ লাখ ডলার স্থানান্তর করতে এবং ব্যাংকের ধনী গ্রাহকদের জন্য সংরক্ষিত অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পেতে সহায়তা করেছিলেন।
২০১৪ সালে জেপি মরগান এপস্টিনের ব্যাংক হিসাবগুলো বন্ধ করে দেওয়ার পর ইউবিএস তাঁকে একটি ক্রেডিট কার্ড দিয়েছিল বলে এক ই–মেইলে দেখা গেছে। এর আগে ২০০৮ সালে অপ্রাপ্তবয়স্ক এক কিশোরীকে যৌনকাজে প্ররোচিত করার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন এবং এপস্টিন কারাভোগ করেছিলেন।
সেই বছরের সেপ্টেম্বরে ওই ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেওয়া হয়। এপস্টিনের অ্যাকাউন্ট্যান্ট তাঁকে ই–মেইলে জানিয়েছিলেন, ‘সুনামহানির ঝুঁকির’ কারণে ইউবিএস এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে ব্যাংকটি গিলেনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখে। অথচ এপস্টিনের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতার কথা বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রচার হয়েছিল।
অন্য একটি ব্যাংকের কাছে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ বিবেচিত একজন গ্রাহককে কেন ইউবিএস গ্রহণ করেছিল—রয়টার্সের এমন প্রশ্নসহ অন্যান্য প্রশ্নের উত্তর দিতে ইউবিএস অস্বীকার করেছে। ইউবিএস বা তাদের উপদেষ্টাদের পক্ষ থেকে কোনো অন্যায়ের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কিছু নথিতে দেখা গেছে, জেপি মরগান থেকে অ্যাকাউন্ট স্থানান্তরের আগে ব্যাংকটি যথাযথ তদন্ত করেছিল।
গিলেনের একজন আইনজীবী এসব বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেননি।
ইউবিএসের সঙ্গে গিলেনের পরিচয়
এপস্টিন ও গিলেন দীর্ঘ বছর ধরে জেপি মরগানে ব্যাংকিং করতেন। তবে ২০০৮ সালে এপস্টিন দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের এই বৃহত্তম ব্যাংকটি তাদের সঙ্গে লেনদেনের ঝুঁকি নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ে।
মার্কিন আদালতের পৃথক এক নথিতে দেখা গেছে, ২০১১ সালে গ্রাহক যাচাইয়ের সময় জেপি মরগান অভ্যন্তরীণভাবে পরামর্শ দিয়েছিল, যেন এপস্টিনের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে গিলেনকে ‘উচ্চঝুঁকিপূর্ণ গ্রাহক’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ২০১৩ সালে জেপি মরগান এপস্টিনের অ্যাকাউন্ট বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়।
নিউইয়র্কের ফেডারেল আদালতে ইউএস ভার্জিন আইল্যান্ডসের করা মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে, জেপি মরগান এপস্টিন সম্পর্কে উল্লেখ করেছিল, ব্যাংক নীতি অনুযায়ী, (এপস্টিনের মতো) অপরাধীদের উচ্চঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং অতিরিক্ত অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। ২০২৩ সালে জেপি মরগান ৭ কোটি ৫০ লাখ ডলারের বিনিময়ে এই মামলার নিষ্পত্তি করে।
জেপি মরগান এসব বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। ব্যাংকটি গিলেনের অ্যাকাউন্ট কখন ও কেন বন্ধ করেছিল, তা–ও জানাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
এক ই–মেইল বিনিময়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে সোরাস প্রাইভেট ইকুইটি পার্টনারসের তৎকালীন পার্টনার ডেভিড ওয়াসং ইউবিএসের সঙ্গে গিলেনকে পরিচয় করিয়ে দেন।
ওয়াসং লিখেছিলেন, ‘আমি আমার অন্যতম সেরা বন্ধু গিলেন ম্যাক্সওয়েলকে সিসি করছি। তিনি একজন নতুন সম্পদ ব্যবস্থাপক খুঁজছেন। আমি তাঁকে পরামর্শ দিয়েছি, আপনার সঙ্গে তাঁর দেখা করা উচিত।’
২০১৪ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি নাম গোপন রেখে একটি ই–মেইলে ইউবিএসকে অনুরোধ করা হয়, যেন ‘জেপি মরগান থেকে এই স্থানান্তর প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করা হয়।’
ই–মেইলে লেখা ছিল, ‘গিলেন আগামী সপ্তাহে এক মাসের বেশি সময়ের জন্য বাইরে যাচ্ছেন। তাই যাওয়ার আগেই তাঁর এসব কাজ শেষ করা এবং নথিপত্রে স্বাক্ষর করা প্রয়োজন। এ ছাড়া তিনি নিজের পরিচয় দিতে আপনার সঙ্গে কথা বলতে চান।’
উত্তরে ইউবিএস প্রতিনিধিরা বলেন, তাঁরা জমা দেওয়া নথিপত্র পর্যালোচনা করেছেন এবং অ্যাকাউন্ট স্থানান্তরের প্রক্রিয়া চলাকালে তাঁদের আরও কিছু প্রশ্ন রয়েছে।
গিলেনের সঙ্গে তাঁর লেনদেনের বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে ওয়াসং সাড়া দেননি।
নথিপত্র অনুযায়ী, এর কিছুদিন পরেই ইউবিএস গিলেনের জন্য একটি ব্যাংক হিসাব খোলে। গিলেন তাঁর ব্যক্তিগত খরচ ও ব্যবসার কাজে এই হিসাব ব্যবহার করেন। এর মধ্যে ছিল তাঁর দাতব্য সংস্থা ‘টেরামার প্রজেক্ট’ এবং এলম্যাক্স, পট অ্যান্ড কেটল, ম্যাক্স ফাউন্ডেশন ও ম্যাক্স হোটেল সার্ভিসেস নামের প্রতিষ্ঠান। ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারির শুরুর দিকেই গিলেনের একটি ইউবিএস হিসাবে প্রায় ২০ লাখ ডলার ছিল।
গিলেন ব্যাংককে তাঁর নগদ অর্থ স্থানান্তরের নির্দেশ দিতেন। ২০১৬ সালে এক অনুরোধে গিলেন ব্যাংককে বলেন স্কট বোর্গারসনকে ২৫ লাখ ডলার পরিশোধ করতে। এই স্কটকে তিনি সেই বছর বিয়ে করেছিলেন।
নথিপত্র অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ২২ জুলাই, অর্থাৎ এপস্টিন গ্রেপ্তারের ১৬ দিন পর গিলেনের অনুরোধে ইউবিএস তাঁর সঞ্চয়ী হিসাব থেকে চেকিং অ্যাকাউন্টে ১ লাখ ৩০ হাজার ডলার সরিয়ে নেয়, যাতে তিনি তাঁর আমেরিকান এক্সপ্রেস কার্ডের বিল পরিশোধ করতে পারেন।
বোর্গারসন পেশাজীবীদের যোগাযোগমাধ্যম লিঙ্কডইনে পাঠানো প্রশ্নের কোনো উত্তর দেননি।
২০১৯ সালের ১৬ আগস্টে এপস্টিন গ্রেপ্তার হওয়ার পরের মাসে ইউবিএস গিলেনের বিষয়ে ‘গ্র্যান্ড জুরি সাবপোনা’ (আদালতের সমন) পায়। এফবিআইয়ের কাছে লেখা এক চিঠি অনুযায়ী, ইউবিএস তখন এফবিআইকে তার ব্যাংক লেনদেনের তথ্য সরবরাহ করেছিল।