যুক্তরাষ্ট্রে আঘাত হানতে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্র বানাচ্ছে ইরান, ট্রাম্পের এই দাবির আদৌ কি কোনো ভিত্তি আছে

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিছবি: এএফপি
  • ট্রাম্পের দাবি ইরান ‘শিগগিরই’ এমন অস্ত্র পাবে, যা যুক্তরাষ্ট্রে আঘাত হানতে সক্ষম।

  • গোয়েন্দা সূত্র বলছে, ট্রাম্পের এই দাবির পক্ষে কোনো গোয়েন্দা তথ্য পাওয়া যায়নি।

  • ডিআইএর মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ২০৩৫ সালের আগে ইরানের কাছে আইসিবিএম আসার সম্ভাবনা নেই।

  • মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিও বলেছেন, ইরান এমন অস্ত্র তৈরির ‘পথে রয়েছে’, যা একদিন যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছাতে পারে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরান শিগগিরই যুক্তরাষ্ট্রে আঘাত হানতে সক্ষম এমন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করবে। তবে মার্কিন গোয়েন্দা প্রতিবেদন তাঁর এই দাবিকে সমর্থন করে না। ফলে ট্রাম্পের এই দাবি অতিরঞ্জিত বলে মনে হচ্ছে।

মার্কিন গোয়েন্দা প্রতিবেদনের সঙ্গে পরিচিত তিনটি সূত্র জানাচ্ছে, এই দাবিটি ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ইরানের ওপর সম্ভাব্য হামলার পক্ষে ট্রাম্পের যুক্তির একটি অংশকে সন্দেহের মুখে ফেলেছে।

গত মঙ্গলবার কংগ্রেসে দেওয়া ট্রাম্প তাঁর ‘স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন’–এর ভাষণে মার্কিন জনগণের সামনে ইরানের ওপর হামলা কেন চালানো হতে পারে, তার পক্ষে যুক্তি দিতে শুরু করেন। তিনি বলেন, তেহরান এমন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির কাজ করছে, যেগুলো ‘শিগগিরই যুক্তরাষ্ট্রে আঘাত করবে’।

তবে দুটি সূত্র জানিয়েছে, মার্কিন প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থার (ডিআইএ) ২০২৫ সালের একটি অপ্রকাশিত মূল্যায়নে কোনো পরিবর্তন আসেনি। ওই মূল্যায়নে বলা হয়েছিল, ইরানের বর্তমান উপগ্রহ-উৎক্ষেপণকারী যান (এসএলভি) থেকে একটি ‘সামরিকভাবে কার্যকর আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র’ (আইসিবিএম) তৈরি করতে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অ্যানা কেলি বলেছেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের সৃষ্ট গুরুতর উদ্বেগের বিষয়টি তুলে ধরে একেবারে সঠিক কাজ করেছেন। যে দেশ ‘আমেরিকার মৃত্যু চাই’ বলে স্লোগান দেয়, তাদের হাতে আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র থাকা উদ্বেগের বিষয়।’

একটি সূত্র জানিয়েছে, ইরানের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করে—সেই চীন বা উত্তর কোরিয়ার মতো দেশ প্রযুক্তিগত সহায়তা দিলেও একটি কার্যকর আইসিবিএম তৈরি করতে ইরানের অন্তত আরও আট বছর সময় লাগবে।

সংবেদনশীল গোয়েন্দা তথ্যের বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে, মার্কিন মূল ভূখণ্ডে আঘাত হানার মতো ক্ষেপণাস্ত্র ইরান শিগগিরই তৈরি করতে পারবে—এমন কোনো গোয়েন্দা মূল্যায়নের কথা তাদের জানা নেই। তবে তারা এমন কোনো নতুন গোয়েন্দা প্রতিবেদনের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়নি, যা হয়তো তাদের নজরে আসেনি।

নিউইয়র্ক টাইমস প্রথম খবর প্রকাশ করেছে, ইরান যুক্তরাষ্ট্রে আঘাত হানতে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি থেকে সম্ভবত আরও কয়েক বছর দূরে রয়েছে—মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এমনটাই মনে করে।

ট্রাম্পের মতো দাবি পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিওর

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা সম্পর্কে ট্রাম্পের এই দাবি এমন এক সময়ে এল, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিরা তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করছেন। তবে এই অঞ্চলে ব্যাপক সামরিক প্রস্তুতির মধ্যে সম্ভাব্য মার্কিন হামলা এড়ানোর মতো কোনো অগ্রগতির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

১৯৭৯ সালে বিপ্লবের পর ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে সবচেয়ে আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ কেন নিতে যাচ্ছেন, সে সম্পর্কে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে খুব কমই ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

গত মঙ্গলবার ট্রাম্প তাঁর ভাষণে বিভিন্ন উগ্রবাদী গোষ্ঠীকে তেহরানের সমর্থন, বিক্ষোভকারীদের হত্যা এবং দেশটির ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক কর্মসূচিকে এই অঞ্চল ও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেন।

মার্কিনবিরোধী একটি বিলবোর্ডের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন এক ইরানি নারী। ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, তেহরান
ছবি: রয়টার্স

কোনো প্রমাণ উপস্থাপন ছাড়াই ট্রাম্প দাবি করেন, তেহরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি আবার শুরু করছে। গত জুনে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সঙ্গে যুক্ত তিনটি প্রধান স্থানে মার্কিন বিমান হামলায় ওই কর্মসূচি ‘বিধ্বস্ত’ হয়েছিল।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও গত বুধবার ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সম্পর্কে ট্রাম্পের তুলনায় কিছুটা নমনীয় ভাষায় কথা বলেছেন। তিনি বলেন, ‘তেহরান এমন পথে রয়েছে, যাতে একদিন তারা যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে পৌঁছাতে সক্ষম অস্ত্র তৈরি করতে পারবে।’

ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কথা অস্বীকার করে আসছে। তাদের দাবি, তারা কেবল বেসামরিক কাজে ব্যবহারের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করছে। তবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্রক্রিয়া সময়ভেদে বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি ও পারমাণবিক ওয়ারহেড উভয়ই তৈরি করা সম্ভব।