ঘটনার দিন বিশেষ একটি অভিযানে বেরিয়েছিলেন উইলিয়ামস। তখন তাঁর বয়স মাত্র ২৭ বছর। মার্কিন নৌবাহিনীর চারটি যুদ্ধবিমান কোরীয় উপদ্বীপের উত্তরাংশে ছিল। ওই অঞ্চলে থাকা মার্কিন রণতরি ইউএসএস অরিসকানি থেকে উড়ছিল যুদ্ধবিমানগুলো। তবে কিছু কারিগরি ত্রুটি দেখা দেওয়ায় তিনটি যুদ্ধবিমান রণতরিতে ফিরে আসে।

আকাশে তখন বিমান নিয়ে একাই উড়ছিলেন উইলিয়ামস। আকস্মিকভাবে আকাশে সাতটি সোভিয়েত মিগ-১৫ যুদ্ধবিমান উড়ে আসে। সম্মুখযুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হয়। কেননা, ওই সময় কোরীয় যুদ্ধ ঘিরে একদিকে যেমন উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া দুইভাগে বিভক্ত, তেমনি যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নও বিভক্ত প্রভাব বলয়ের রাজনীতিতে। যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন দিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়াকে। আর সোভিয়েত ইউনিয়ন সমর্থন দিয়েছে উত্তর কোরিয়াকে।

ওই সময় মার্কিন নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে উইলিয়মাসকে এই ঘটনা পুরোপুরি গোপন রাখতে বলা হয়েছিল। তাই তিনি তাঁর স্ত্রীকেও এ কথা জানাননি। পরে মার্কিন সরকারের পক্ষ থেকে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তাঁকে বলা হয়, ইতিমধ্যে এ–সংক্রান্ত গোপন নথি অবমুক্ত করা হয়েছে। এটা জানার পর তিনি প্রথমে তাঁর স্ত্রীকে ঘটনাটি জানান।

মার্কিন-সোভিয়েত রেষারেষি তখন প্রায়ই দেখা যায়। যাহোক, ওই দিন চারটি সোভিয়েত মিগের মুখ উইলিয়ামসের যুদ্ধবিমানের দিকে ঘুরে যায়। গুলি ছুড়তে শুরু করে। তবে বেঁচে যান তিনি। যুদ্ধবিমানটিকেও রক্ষা করতে সক্ষম হন। এরপর তিনিও পাল্টা গুলি ছোড়েন। একে একে ধ্বংস হয় চারটি মিগ-১৫। নিহত হন তিনজন সোভিয়েত পাইলট।

পরে এক সাক্ষাৎকারে উইলিয়ামস বলেন, ‘আমাকে পালিয়ে আসতে বলা হয়েছিল। সোভিয়েত যুদ্ধবিমানগুলোর সঙ্গে লড়তে মানা করা হয়েছিল। কিন্তু আমি জানতাম, সোভিয়েত যুদ্ধবিমানগুলো আমারটির চেয়ে গতিশীল। সহজেই ওরা আমাকে তাড়া করে ধরে ফেলবে, হত্যা করবে। তাই আমি লড়াইয়ে নামার সাহসী সিদ্ধান্ত নিই।’

ওই লড়াইয়ে উইলিয়ামস তাঁর যুদ্ধবিমানে থাকা ৭৬০ রাউন্ড ২০ এমএম ক্যানন শেলের পুরোটাই ব্যবহার করেন বলে জানান। লড়াই শেষে তিনি যখন রণতরিতে ফেরেন, তখন শারীরিকভাবে তিনি অক্ষত থাকলেও ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাঁর যুদ্ধবিমানটি। দেখা যায়, গুলি লেগে যুদ্ধবিমানটিতে ২৬৩টি গর্ত হয়েছে।

আমাকে পালিয়ে আসতে বলা হয়েছিল। সোভিয়েত যুদ্ধবিমানগুলোর সঙ্গে লড়তে মানা করা হয়েছিল। কিন্তু আমি জানতাম, সোভিয়েত যুদ্ধবিমানগুলো আমারটির চেয়ে গতিশীল। সহজেই ওরা আমাকে তাড়া করে ধরে ফেলবে, হত্যা করবে। তাই আমি লড়াইয়ে নামার সাহসী সিদ্ধান্ত নিই।
রয়সি উইলিয়ামস, যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর সাবেক বৈমানিক।

সবেই একটি বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছে। এ ঘটনা প্রকাশ পেলে আরেকটি যুদ্ধের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এমন প্রেক্ষাপটে তখন এ ঘটনা গোপন রাখা হয়। তবে ১৯৫৩ সালে উইলিয়ামসকে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য সিলভার স্টার অ্যাওয়ার্ড দেওয়া হয়।

যুক্তরাষ্ট্র নয় বরং রাশিয়ার পক্ষ এ ঘটনা প্রথম প্রকাশ করা হয়। ১৯৯০-এর দশকে রাশিয়া পুরোনো কিছু সামরিক গোপন নথি প্রকাশ করে। সেগুলোর মধ্যে এই ঘটনাটিও ছিল। তখনই মানুষ প্রথম উইলিয়ামসের বীরত্বের কথা জানতে পারে। তবে বিস্তারিত জানা যায় ২০০২ সালে এসে। ওই সময় উইলিয়ামস বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে এ বিষয়ে জানান।  

১৯৫২ সালের পর মার্কিন নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে উইলিয়মাসকে এই ঘটনা পুরোপুরি গোপন রাখতে বলা হয়েছিল। তাই তিনি তাঁর স্ত্রীকেও এ কথা জানাননি। নথি অবমুক্তির পরে মার্কিন সরকারের পক্ষ থেকে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তাঁকে বলা হয়, ইতিমধ্যে এ–সংক্রান্ত গোপন নথি অবমুক্ত করা হয়েছে। এটা জানার পর তিনি প্রথম তাঁর স্ত্রীকে ঘটনাটি জানান।

রয়সি উইলিয়ামস যা করেছিলেন, সেটা অবিশ্বাস্য।
কার্লোস দেল তোরো, যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীবিষয়ক মন্ত্রী।

মাঝের সময়টায় উইলিয়ামসকে নিয়ে অনেক জল্পনা, সমালোচনা ছিল। তিনি কেন সিলভার স্টার অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন, তা নিয়ে অনেকেই সমালোচনা করতেন। তবে ওই ঘটনার ৭০ বছর পর গত ডিসেম্বরে কার্লোস দেল তোরো বিষয়টি নিয়ে আবার সরব হন। তিনি বলেন, উইলিয়ামসের সামরিক পদক নেভি ক্রসে উন্নীত করা প্রয়োজন। সে মোতাবেক তাঁকে নেভি ক্রস পদক দেওয়া হয়েছে।