এপস্টিনের সঙ্গে সম্পর্ককে ‘গুরুতর ভুল’ বলে ক্ষমা চাইলেন নোয়াম চমস্কির স্ত্রী
জেফরি এপস্টিনের অতীত সম্পর্কে যথাযথ খোঁজখবর না নিয়ে ‘অসতর্কভাবে’ তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে নোয়াম চমস্কি ও তাঁর স্ত্রী ভ্যালেরিয়া ‘গুরুতর ভুল’ করেছেন। গত শনিবার এক দীর্ঘ বিবৃতিতে এ ভুলের জন্য ভ্যালেরিয়া দুঃখ প্রকাশ করে আরও বলেন, এপস্টিন তাঁদের সঙ্গে প্রতারণা করেছিলেন।
মার্কিন বিচার বিভাগ দেশটির কুখ্যাত যৌন নিপীড়নকারী জেফরি এপস্টিনের মামলা–সংক্রান্ত লাখ লাখ নথি প্রকাশ করলে মার্কিন ভাষাবিদ ও মানবাধিকারকর্মী নোয়াম চমস্কির সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্বের বিষয়টি সামনে আসে। এরপরই ৯৭ বছর বয়সী নোয়াম চমস্কি তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন।
নথিতে দেখা যায়, ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে চমস্কির কাছে কিছু ই-মেইল পাঠিয়েছিলেন এপস্টিন। ওই সব ই-মেইলে চমস্কির কাছে পরামর্শ চেয়ে এপস্টিন লেখেন, তিনি কি তাঁকে (এপস্টিন) নিয়ে প্রকাশিত খবরের প্রতিক্রিয়ায় ‘আত্মরক্ষামূলক’ কিছু করবেন, নাকি বিষয়টি ‘উপেক্ষার’ চেষ্টা করবেন।
উত্তরে নোয়াম চমস্কি লেখেন, ‘সংবাদমাধ্যমে ও জনসমক্ষে আপনার সঙ্গে যে ভয়াবহ আচরণ করা হচ্ছে, তা আমি দেখছি। এটা কষ্টদায়ক। বলতে খারাপ লাগছে, তবে আমার মনে হয়, সামনে এগোনোর সবচেয়ে ভালো উপায় হলো এটাকে উপেক্ষা করা।’
বার্তাটির শেষে ‘নোয়াম’ সই করা ছিল। এপস্টিন পরে নিজের এক সহযোগীর কাছে পাঠানো ই–মেইলে নোয়াম চমস্কির বার্তা শেয়ার করেন।
বার্তায় নোয়াম চমস্কি আরও লেখেন, ‘শকুনেরা আসলে মরিয়া হয়ে জনসমক্ষে একটা প্রতিক্রিয়া চায়। কারণ, সেটি হলেই তারা বিষাক্ত আক্রমণ চালানোর সুযোগ পাবে। এদের অনেকে কেবল প্রচার চাইছে বা তারা উন্মাদ।’
ই-মেইলে আরও বলা হয়, ‘নারীদের ওপর নির্যাতন নিয়ে যে উন্মাদনা তৈরি হয়েছে, এই পরিস্থিতিতে তা বিশেষভাবে সত্যি। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে কোনো অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন তোলাকে হত্যার চেয়েও বড় অপরাধ হিসেবে দেখা হচ্ছে।’
শিশু যৌন নিপীড়নের একটি অভিযোগ ওঠার পর ২০০৮ সালে নিজের দোষ স্বীকার করে নেন এপস্টিন। তারপরও তাঁর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ যোগাযোগ ছিল—এমন কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির মধ্যে নোয়াম চমস্কি একজন।
২০১৮ সালে মায়ামি হেরাল্ড এপস্টিনকে নিয়ে বিস্ফোরক এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। অনুসন্ধানী ওই প্রতিবেদনে এপস্টিনের ব্যক্তিগত দ্বীপটির কথা উল্লেখ ছিল, যেখানে তিনি বহু অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরীকে যৌন নির্যাতন করেছিলেন।
২০০৮ সালে দোষ স্বীকার করার পর এপস্টিনকে খুবই কম সাজা দেওয়া হয়েছিল বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
শনিবার ভ্যালেরিয়া চমস্কি স্বীকার করেন, তাঁরা প্রতিবেদনটি পড়েছিলেন। কিন্তু এপস্টিনের অপরাধের পরিমাণ সম্পর্কে পূর্ণ ধারণা করতে পারেননি। ২০১৯ সালের জুলাই মাসে এপস্টিন দ্বিতীয়বার গ্রেপ্তার হলে তাঁরা পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে পারেন।
ভ্যালেরিয়া বলেন, ‘আমরা তাঁর পটভূমি সম্পূর্ণভাবে খতিয়ে দেখার ক্ষেত্রে অসতর্ক ছিলাম। এটি একটি গুরুতর ভুল এবং সেই বিচক্ষণতার অভাবের জন্য আমি আমাদের উভয়ের পক্ষ থেকে ক্ষমা চাইছি। স্ট্রোকের (২০২৩) আগে নোয়ামও আমার সঙ্গে একই অনুভূতি ভাগ করে নিয়েছিলেন।’
ভ্যালেরিয়া আরও বলেন, ‘যখন আমরা বুঝতে পারি, আমরা এমন একজনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছিলাম, যিনি উপকারী বন্ধুর ভান করেছিলেন। কিন্তু গোপনে অপরাধমূলক, অমানবিক ও বিকৃত কর্মকাণ্ডে লিপ্ত ছিলেন। আমাদের দুজনের জন্যই এটি গভীর মনোবেদনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
২০১৯ সালে এপস্টিনের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার বিষয়ে নোয়াম চমস্কি যে পরামর্শ দিয়েছেন, সেটিকে প্রসঙ্গ অনুযায়ী বিবেচনা করা উচিত বলেও মনে করেন ভ্যালেরিয়া।
চমস্কির স্ত্রী বলেন, নোয়ামের কাছে এপস্টিন দাবি করেছিলেন, তাঁকে (এপস্টিন) অন্যায়ভাবে বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছে। নোয়াম নিজের রাজনৈতিক বিতর্ক ও সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে অভিজ্ঞতা থেকে পরামর্শ দিয়েছেন।
ভ্যালেরিয়া বলেন, এপস্টিন তাঁর বিরুদ্ধে মামলার বিষয়ে নোয়ামকে একটি মিথ্য গল্প বলেছিলেন, যা সরল মনে বিশ্বাস করেছিলেন। বিষয়টি যে পরিকল্পিত ছিল, তা এখন স্পষ্ট। অন্তত এপস্টিনের উদ্দেশ্যগুলোর একটি ছিল—নোয়ামের মতো কাউকে পাশে রেখে, সম্পর্কের সূত্র ধরে নিজের সুনাম বা ভাবমূর্তি পুনর্গঠনের চেষ্টা করা।
ভ্যালেরিয়া চমস্কি স্বীকার করেছেন, তাঁরা নিউইয়র্কে এপস্টিনের টাউনহাউসে ডিনারে যোগ দিয়েছিলেন, প্যারিসে তাঁর অ্যাপার্টমেন্টে অবস্থান করেছিলেন, নিউ মেক্সিকোতে তাঁর র্যাঞ্চে ডিনারে অংশ নিয়েছিলেন এবং এপস্টিনের সঙ্গে শিক্ষাবিষয়ক একাধিক সমাবেশে যোগ দিয়েছিলেন। তবে তাঁরা কখনো এপস্টিনের দ্বীপে যাননি এবং সেখানে যা হয়েছে, তা–ও জানতেন না।
এপস্টিনের সঙ্গে নোয়াম চমস্কির পরিচয় হয় ২০১৫ সালে। সে সময় তাঁরা ২০০৮ সালে শিশু যৌন নিপীড়ন ও যৌনকর্মের জন্য নারী পাচারের অভিযোগে তাঁর দোষ স্বীকার ও সাজা পাওয়ার বিষয়টি জানতেন না।
এপস্টিন নিজেকে বিজ্ঞান ও মানবকল্যাণমূলক কাজে আগ্রহী একজন দাতা হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন বলেও দাবি করেন ভ্যালেরিয়া।
ভ্যালেরিয়া বলেন, ‘এটা যে আমাদের ফাঁদে ফেলার একটি কৌশল, সেটা আমরা বুঝতে পারিনি। আমরা দুঃখিত।’