এখন যুদ্ধের দায়ভার প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথের ওপর চাপানোর চেষ্টা করছেন ট্রাম্প
ইরান যুদ্ধের দায় নিজের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের ওপর চাপানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি গতকাল সোমবার বলেন, তাঁর প্রশাসনের সদস্যদের মধ্যে হেগসেথই প্রথম তাঁকে ইরানে হামলার পরামর্শ দিয়েছিলেন।
টেনেসি অঙ্গরাজ্যের মেমফিসে সোমবার ‘সেফ টাস্ক ফোর্সের’ এক গোলটেবিল বৈঠকে ট্রাম্প এমনই ইঙ্গিত দেন।
টেনেসি অঙ্গরাজ্যে ওই গোলটেবিল বৈঠকে পেন্টাগন প্রধান হেগসেথের পাশেই বসা ছিলেন ট্রাম্প। সেখানে তিনি বলেন, ‘আমি পিটকে ডাকলাম, জেনারেল কেইনকে ডাকলাম। আমাদের আরও অনেক দক্ষ মানুষকে ডেকে বললাম, আসুন আলোচনা করি। মধ্যপ্রাচ্যে আমাদের একটি সমস্যা আছে। ইরান নামের দেশটি ৪৭ বছর ধরে সন্ত্রাস ছড়াচ্ছে। তারা এখন পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। আমরা চাইলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে দিতে পারি, অথবা মধ্যপ্রাচ্যে একটি ছোট অভিযানের মাধ্যমে এই বড় সমস্যার সমাধান করে ফেলতে পারি।’
হেগসেথের দিকে তাকিয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘পিট, আমার মনে হয় আপনিই প্রথম মুখ খুলেছিলেন। আপনিই বলেছিলেন, চলুন শুরু করি। কারণ, তাদের হাতে কিছুতেই পারমাণবিক অস্ত্র আসতে দেওয়া যাবে না।’
বৈঠকে দায় চাপানোর পাশাপাশি হেগসেথের প্রশংসাও করেন ট্রাম্প। এ সময় ট্রাম্প দাবি করেন, তেহরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের খুব ভালো আলোচনা চলছে। অবশ্য ইরানের পক্ষ থেকে একে ‘ভুয়া খবর’ বলে দাবি করা হয়েছে। তেহরানের দাবি, এসব কথা ট্রাম্পের সময়ক্ষেপণের কৌশল।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে আগ্রাসন চালায়। সেই আগ্রাসন চতুর্থ সপ্তাহে গড়িয়েছে। এর মধ্যেই ট্রাম্প সোমবার আরও বলেন, মেমফিস টাস্ক ফোর্সে কর্মরত ন্যাশনাল গার্ডের সব সদস্যের পাশাপাশি ওয়াশিংটন ডিসি, নিউ অরলিন্স এবং প্রশাসনের সীমান্ত নিরাপত্তা মিশনে নিয়োজিত সদস্যরাও সেনাসদস্যদের মতো সমান সুযোগ-সুবিধা পাবেন। এমন একটি নির্দেশনায় স্বাক্ষর করেছেন হেগসেথ।
ট্রাম্প বলেন, ‘এটি মন্দ নয়।’ এ সময় হেগসেথ, প্রেসিডেন্টের পাশে বসা অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বন্ডিসহ উপস্থিত দর্শকেরা করতালি দেন।
হেগসেথ পেন্টাগনে সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি, ড্রোন উৎপাদন ও নৌবাহিনী ধ্বংস করার মতো মার্কিন সামরিক লক্ষ্যগুলো তুলে ধরেন। এ সময় যুদ্ধের সমালোচনামূলক সংবাদ প্রকাশের জন্য বারবার গণমাধ্যমের সমালোচনাও করেন তিনি।
ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক অভিযান কবে শেষ হতে পারে, সে বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট সময় জানাতে অস্বীকৃতি জানান হেগসেথ। এর আগে গত বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আমরা কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করতে চাই না।’
ইরানবিদ্বেষী মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী আরও বলেন, ‘অভিযান সঠিক পথেই আছে এবং এটি কীভাবে শেষ হবে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন ট্রাম্প।’
হেগসেথের ওপর যুদ্ধের দায় চাপালেও নিজের ভাইস প্রেসিডেন্টের ওপর খুব বেশি খুশি নন ট্রাম্প। তিনি স্বীকার করেছেন, দীর্ঘকাল ধরে বৈদেশিক হস্তক্ষেপে বিরোধী ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স এ যুদ্ধ নিয়ে হেগসেথের মতো ততটা উৎসাহী ছিলেন না। তবে ভ্যান্স জনসমক্ষে কোনো সমালোচনা করা থেকে বিরত রয়েছেন।
নেতানিয়াহুর পরামর্শে যুদ্ধ
ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও রক্ষণশীল মিডিয়া মোগল রুপার্ট মারডক ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের পক্ষে পরামর্শ দিয়েছিলেন। অন্যদিকে জেডি ভ্যান্স, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং চিফ অব স্টাফ সুজি ওয়াইলস এ যুদ্ধের বিষয়ে সন্দিহান ছিলেন।
গত সপ্তাহে ন্যাশনাল কাউন্টার টেরোরিজম সেন্টারের সাবেক প্রধান জো কেন্ট পদত্যাগ করার সময় দাবি করেছিলেন, ইসরায়েলই যুক্তরাষ্ট্রকে এ যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
ট্রাম্প আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার কথা বললেও ইরান তা সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে। দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এক্সে লিখেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি। মূলত আর্থিক ও তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণ করতেই তারা মিথ্যা খবর ছড়াচ্ছে।’
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতির কথা ভাবলেও ইসরায়েল ইরান ও লেবাননে হামলা চালিয়ে যাবে। এর মধ্যেই গত মঙ্গলবার ইরান থেকে ইসরায়েল ও উপসাগরীয় আরব দেশগুলোকে লক্ষ্য করে দফায় দফায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে।
ইসরায়েলি বাহিনীর দাবি, ইরান থেকে তিন দফায় ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে, যার বেশ কিছু অংশ দেশটির উত্তরাঞ্চলে আঘাত হেনেছে।