একদিকে হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে হুমকি দিচ্ছেন ট্রাম্প, অন্যদিকে যুদ্ধবিরতির কথা বলছেন
তেহরান যদি আগামীকাল মঙ্গলবারের মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে না দেয়, তবে ইরানের ওপর চরম বিপর্যয় নামিয়ে আনার হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেই সঙ্গে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনীর প্রশংসাও করেছেন।
ট্রাম্প একদিকে চরম বিপর্যয়ের হুমকি দিলেও অন্যদিকে যুদ্ধবিরতির আলোচনা চলছে বলে জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস। যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারী কয়েকটি দেশ ইরান যুদ্ধের সম্ভাব্য ৪৫ দিনের যুদ্ধবিরতির শর্তাবলি নিয়ে আলোচনা করছে।
সংবাদমাধ্যমের খবরে জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনী ইরানের অনেক ভেতরে ঢুকে উচ্চঝুঁকির এক অভিযান চালিয়ে নিখোঁজ মার্কিন বিমানসেনাকে উদ্ধার করে নিয়ে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল পাঁচ সপ্তাহের বেশি সময় ধরে ইরানের ওপর ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমান হামলা চালাচ্ছে। ইরানও ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক অবস্থান লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালাচ্ছে।
যুদ্ধ শুরুর পর ইরান হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে। নৌপথে জ্বালানি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক–পঞ্চমাংশ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহন করা হয়।
গতকাল রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে ট্রাম্প অশালীন ভাষায় ইরানকে হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে হুমকি দেন। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর প্রায় পাঁচ সপ্তাহ ধরে ইরান গুরুত্বপূর্ণ এ জলপথ কার্যত বন্ধ করে রেখেছে।
নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লেখেন, ‘ইরানের জন্য মঙ্গলবার হবে পাওয়ার প্ল্যান্ট ডে এবং ব্রিজ ডে—সব একসঙ্গে।’
এখানে ‘পাওয়ার প্ল্যান্ট ডে’ ও ‘ব্রিজ ডে’ বলে ট্রাম্প ইরানের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও পরিবহন অবকাঠামোর ওপর হামলার হুমকি দিয়েছেন। এ ধরনের হামলা আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন হবে বলে মত বিশেষজ্ঞদের।
পোস্টে ট্রাম্প আরও লেখেন, ‘সেখানে এমন কিছু হবে না! ...হরমুজ প্রণালি খুলে দিন..., না হলে আপনাদের নরকের ভেতর বসবাস করতে হবে, শুধু দেখুন! সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য’—প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
গতকাল রাতে চারটি সূত্রের বরাত দিয়ে মার্কিন অনলাইন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও আঞ্চলিক কয়েকটি মধ্যস্থতাকারী দেশ ইরান যুদ্ধের সম্ভাব্য ৪৫ দিনের একটি যুদ্ধবিরতির শর্তাবলি নিয়ে আলোচনা করছে। এই আলোচনা শেষ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের স্থায়ী অবসানের পথ তৈরি করতে পারে।
এ আলোচনার বিষয়ে জানা আছে, এমন মার্কিন, ইসরায়েলি ও আঞ্চলিক চারটি সূত্রের বরাত দিয়ে অ্যাক্সিওস এ খবর দিয়েছে।
তবে বার্তা সংস্থা রয়টার্স তাৎক্ষণিকভাবে এই প্রতিবেদন যাচাই করতে পারেনি। হোয়াইট হাউস এবং যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য রয়টার্সের অনুরোধে তৎক্ষণাৎ কোনো উত্তর দেয়নি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যস্থতাকারীরা দুই ধাপের একটি চুক্তি নিয়ে আলোচনা করছে। প্রথম ধাপ হবে ৪৫ দিনের যুদ্ধবিরতি; দ্বিতীয় ধাপ হবে যুদ্ধ শেষ করার একটি চুক্তি।
সেদিন ফক্স নিউজকে ট্রাম্প নিজেও ইরানের সঙ্গে আলোচনা হওয়ার কথা বলেছিলেন। ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরান আলোচনা করছে, সোমবারের মধ্যে একটি চুক্তি সম্ভব।
যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে এমন মিশ্র বার্তা যুদ্ধের সমর্থক, বিরোধী ও আর্থিক বাজারকে বিভ্রান্ত করছে।
এদিকে ওয়াশিংটনের মিত্র ইসরায়েলও ইরানের ওপর চাপ বৃদ্ধি করার চেষ্টা করছে। গত শনিবার দেশটি ইরানের একটি বড় পেট্রোকেমিক্যাল প্রতিষ্ঠানে হামলা করে। তেহরানের ওপর চাপ আরও বৃদ্ধির অংশ হিসেবে ইসরায়েল আগামী সপ্তাহে ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে বলে জানিয়েছেন দেশটির এক জ্যেষ্ঠ প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা।
ইরানের নিন্দা ও হুঁশিয়ারি
ট্রাম্পের হুমকির নিন্দা জানিয়েছেন ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ। তিনি ট্রাম্পকে প্রতিহিংসা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, তিনি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দ্বারা বিভ্রান্ত হচ্ছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে গালিবাফ লেখেন, ‘আপনার বেপরোয়া পদক্ষেপগুলো যুক্তরাষ্ট্রকে নরকের ভেতর টেনে নিয়ে যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি পরিবারকে নরকের ভেতর বাস করতে হবে এবং আমাদের পুরো অঞ্চলে আগুন জ্বলতে চলেছে। কারণ, আপনি নেতানিয়াহুর নির্দেশ অনুসরণ করতে জোর করছেন।’
ক্রু উদ্ধার
গতকাল ভোরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে ট্রাম্প ইরান থেকে মার্কিন বিমানসেনা উদ্ধারে অভিযানের ঘোষণা দেন। ইরানের পাহাড়ি এলাকায় পরিচালিত ওই অভিযানকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে ‘সবচেয়ে সাহসী’ অভিযানগুলোর একটি বলে বর্ণনা করেন।
গত শুক্রবার ইরান একটি মার্কিন এফ-১৫ই স্ট্রাইক ইগল যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করে। সেটিতে দুজন ক্রু ছিলেন। একজন পাইলট, অন্যজন অস্ত্রব্যবস্থা–সংক্রান্ত কর্মকর্তা। যুদ্ধবিমানটিতে ইরানি আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা আঘাত হানলে দুজনই ককপিট থেকে বেরিয়ে (ইজেক্ট) যান।
সেদিনই যুদ্ধবিমানের পাইলটকে উদ্ধার করা গেলেও অস্ত্রব্যবস্থা–সংক্রান্ত কর্মকর্তার খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—উভয়ই ওই বিমানসেনাকে মরিয়া হয়ে খুঁজতে থাকে। ইরান নিখোঁজ মার্কিন সেনার খোঁজ দিতে অর্থ পুরস্কার ঘোষণা করে।
গতকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে ট্রাম্প নিখোঁজ অস্ত্র কর্মকর্তাকে উদ্ধারের কথা জানান। পোস্টে তিনি বলেন, উদ্ধার হওয়া সেনা আহত হলেও একদম সুস্থ হয়ে উঠবেন।