যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক সিটির প্রথম মুসলিম মেয়র হিসেবে ঐতিহাসিক অভিষেক হয়েছে জোহরান মামদানির। এই অভিষেক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন প্রায় ৫০ হাজার মানুষ। পুরো অনুষ্ঠান ঘিরে ছিল জমকালো আয়োজন।
লোয়ার ম্যানহাটনের সিটি হলের সামনে বছরের প্রথম দিন উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে এ আয়োজন করা হয়। সেখানে ৩৪ বছর বয়সী স্বঘোষিত এই ‘ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্টকে’ শপথ পাঠ করান ভারমন্টের স্বতন্ত্র সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স। পবিত্র কোরআন শরিফ ছুঁয়ে শপথ নেন মামদানি।
নিউইয়র্ক সিটির প্রথম মুসলিম, প্রথম দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত এবং শতাব্দীর কনিষ্ঠ মেয়র হিসেবে ইতিহাস গড়েছেন জোহরান মামদানি। চার বছরের জন্য নির্বাচিত হয়েছেন তিনি।
অভিষেক অনুষ্ঠানে প্রথমবারের মতো ‘ব্লক পার্টি’ হয়েছে। যেখানে সাতটি ব্লকে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ অংশগ্রহণ করেছেন। এর মধ্যে চার হাজার নিবন্ধিত অতিথি ছিলেন সিটি হল এলাকার মধ্যে। অন্যরা আশপাশের সাতটি ব্লকজুড়ে অবস্থান নেন। প্রত্যেকেই বিনা মূল্যে নিবন্ধন করেছেন।
ডেমোক্রেটিক পার্টির আইনপ্রণেতা আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজ অভিষেক অনুষ্ঠানে মামদানিকে পরিচয় করিয়ে দেন। এ সময় তিনি বলেন, ‘এটি নিউইয়র্ক সিটির জন্য এক নতুন যুগের সূচনা। আমরা ভয়ের পরিবর্তে সাহস বেছে নিয়েছি। কয়েকজনের লুটের পরিবর্তে অনেকের সমৃদ্ধি বেছে নিয়েছি। জোহরান মামদানির মাধ্যমে আমরা এমন এক মেয়র পেয়েছি, যিনি শ্রমজীবী মানুষের জীবনকে সমৃদ্ধ করে তুলতে সবসময় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। জোহরান আমাদের সবার মেয়র হবেন।’
সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এমন এক সময় আমরা মামদানিকে নির্বাচিত করেছি, যখন আমরা দেখছি অত্যধিক ঘৃণা, বিভেদ ও অবিচার। নিউইয়র্কবাসী, আপনারা আমাদের দেশকে অনুপ্রাণিত করেছেন। আপনারা আমাদের আশা দিয়েছেন যে, আমরা এমন সরকার গড়তে পারি যা সবার জন্য কাজ করে, শুধু ধনী ও ক্ষমতাবানদের জন্য নয়।’
নবনির্বাচিত মেয়র জোহরান মামদানি তাঁর প্রথম বক্তৃতায় বলেন, ‘এমন মুহূর্ত খুব কমই আসে। এমন সময় আরও কম আসে, যখন পরিবর্তনের চাবিকাঠি জনগণের নিজেদের হাতে থাকে। আমরা সবসময় সফল না-ও হতে পারি, কিন্তু চেষ্টার সাহসের অভাবে কখনো অভিযুক্ত হব না।’
অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করেন মার্কিন অভিনেতা ও গায়ক ম্যান্ডি প্যাটিনকিন। উপস্থিত ছিলেন সাবেক মেয়র বিল ডি ব্লাসিও, সদ্য বিদায়ী মেয়র এরিক অ্যাডামসসহ ডেমোক্র্যাট পার্টির প্রগ্রেসিভ নেতারা।
অভিষেক ঘিরে উচ্ছ্বাস
সরেজমিন দেখা যায়, মূল অনুষ্ঠানের বাইরে ‘ইনঅগুরেশন অব অ্যা নিউ এরা (এক নতুন যুগের অভিষেক)’ নামের ব্লক পার্টি লোয়ার ম্যানহাটনের ব্রডওয়েতে মারে স্ট্রিট থেকে লিবার্টি স্ট্রিট পর্যন্ত সাতটি ব্লকে অনুষ্ঠিত হয়েছে। নিউইয়র্ক সিটি মেয়রের অভিষেক অনুষ্ঠানে এ ধরনের আয়োজন এবারই প্রথম।
প্রায় এক কিলোমিটার এই বৃহৎ সড়কজুড়ে ছিলেন নিবন্ধিত ৪০ হাজার অংশগ্রহণকারী। এ ছাড়া বহু মানুষ সেই সড়কের পাশে ব্রুকলিন ব্রিজের কাছ থেকে দেখছিলেন এই অনুষ্ঠান, যাঁরা নিবন্ধন করেননি। বড় স্ক্রিনে অনুষ্ঠানটি সরাসরি সম্প্রচার করা হয় সিটি হলের বাইরের দর্শনার্থীদের জন্য।
অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত পিউ বনিক প্রথম আলোকে বলেন, ‘মাইনাস ১০ ডিগ্রি তাপমাত্রা উপেক্ষা করে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ এখানে এসেছেন ঐতিহাসিক এই অভিষেক অনুষ্ঠান উপভোগ করতে। আমরা আশা করছি, বাংলাদেশিদের জন্য তিনি আরও কল্যাণকর কিছু করবেন।’ একই সঙ্গে সংখ্যালঘুদের জন্যও নতুন মেয়র কাজ করবেন বলে আশাবাদী তিনি।
হাদিসুল ইসলাম নামের আরেকজন প্রথম আলোকে বলেন, ‘একজন মুসলিম মেয়র পেয়ে আমরা গর্বিত। তাই কনকনে শীতের মধ্যে আমরা দেড় ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলাম অনুষ্ঠানস্থলে প্রবেশ করতে। সাশ্রয়ী আবাসন, সিটির অভ্যন্তরে বিনা মূল্যে পরিবহন সেবা, “ইউনিভার্সাল চাইল্ডকেয়ার” এবং ধনীদের ওপর কর বাড়ানোর যে প্রতিশ্রুতিগুলি মামদানি দিয়েছিলেন, আশা করছি তিনি তা বাস্তবায়ন করবেন।’
এর আগে ৩১ ডিসেম্বর মধ্যরাতে মামদানি পরিত্যক্ত ওল্ড সিটি হল সাবওয়ে (পাতালরেল) স্টেশনে ছোট পরিসরে পবিত্র কোরআন শরিফ ছুঁয়ে শপথ নেন। তাঁকে শপথবাক্য পাঠ করান নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিসিয়া জেমস। এ সময় অন্যদের মধ্যে মামদানির মা-বাবা কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মাহমুদ মামদানি ও চলচ্চিত্রকার মিরা নায়ার উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা দুজনই ভারতীয় বংশোদ্ভূত।