আল–জাজিরার এক্সপ্লেইনার
জো কেন্ট কে, তাঁর পদত্যাগ কি ইরান যুদ্ধে ট্রাম্পের মত পরিবর্তনে কোনো প্রভাব ফেলবে
যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ সন্ত্রাসবিরোধী কর্মকর্তা জো কেন্ট ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধের বিরোধিতা করে পদত্যাগ করেছেন। গতকাল মঙ্গলবার খুদে ব্লগ লেখার সাইট এক্সে তাঁর পদত্যাগপত্রের একটি প্রতিলিপি প্রকাশ করেছেন।
এক্স পোস্টে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্দেশে কেন্ট লিখেছেন, ‘ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে সমর্থন জানাতে আমার বিবেক সাড়া দিচ্ছে না।’
কেন্ট আরও লিখেছেন, ‘ইরান আমাদের দেশের জন্য কোনো আসন্ন হুমকি তৈরি করেনি। এটা স্পষ্ট, ইসরায়েল ও তাদের প্রভাবশালী মার্কিন লবিস্টদের কাছ থেকে আসা চাপের কারণে আমরা এই যুদ্ধ শুরু করেছি।’
জো কেন্ট জাতীয় সন্ত্রাসবিরোধী কেন্দ্রের পরিচালক হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন। এটি একটি মার্কিন সংস্থা, যা সন্ত্রাসবিরোধী গোয়েন্দা তথ্য সমন্বয় ও বিশ্লেষণের দায়িত্বে নিয়োজিত।
কেন্টের পদত্যাগের ঘটনাটি ইরানে ট্রাম্প প্রশাসনের চালানো যুদ্ধের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে উচ্চপর্যায়ের কোনো ব্যক্তির প্রতিবাদ।
জো কেন্ট কে
৪৫ বছর বয়সী জো কেন্ট অতীতে উগ্র ডানপন্থী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার কারণে সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছেন।
কেন্ট ইউএস আর্মি স্পেশাল ফোর্সেসের সাবেক সদস্য। কেন্ট ১১টি যুদ্ধাভিযানে অংশ নিয়েছেন।
কেন্টের প্রথম স্ত্রী শনন কেন্ট মার্কিন নৌবাহিনীর ক্রিপ্টোলজিক টেকনিশিয়ান ছিলেন। ২০১৯ সালে সিরিয়ায় এক আত্মঘাতী বিস্ফোরণে তিনি নিহত হন।
কেন্ট জাতীয় সন্ত্রাসবিরোধী কেন্দ্রের প্রধান হিসেবে আট মাসের কম সময় দায়িত্বে ছিলেন। গত বছরের জুলাইয়ে সিনেট ৫২–৪৪ ভোটে তাঁকে অনুমোদন দেয়। তিনি শুধু রিপাবলিকানদের কাছ থেকে সমর্থন পেয়েছিলেন।
সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেওয়ার পর কেন্ট যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএতে আধা সামরিক কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করেছেন। পরে তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শুরু হয়।
কেন্ট ২০২২ ও ২০২৪ সালে দুবার যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে ওয়াশিংটনের দক্ষিণ–পশ্চিমাঞ্চলের রিপাবলিকান প্রার্থী হিসেবে প্রতিনিধিত্ব করার জন্য নির্বাচন করেছিলেন। তবে তিনি দুবারই মধ্যপন্থী ডেমোক্র্যাট মেরি গ্লুয়েসেনকাম্প পেরেজের কাছে পরাজিত হন।
ডোনাল্ড ট্রাম্প দুই নির্বাচনেই কেন্টকে সমর্থন করেছিলেন। কেন্টের বিরুদ্ধে নানা সমালোচনা ছিল। এর মধ্যে একটি হলো, তিনি উগ্র ডানপন্থী গোষ্ঠী প্রাউড বয়েজের এক সদস্যকে পরামর্শক ফি দিয়েছিলেন।
কেন্ট কত দিন ট্রাম্প প্রশাসনে কাজ করেছেন
কেন্ট জাতীয় সন্ত্রাসবিরোধী কেন্দ্রের প্রধান হিসেবে আট মাসের কম সময় দায়িত্বে ছিলেন। গত বছরের জুলাইয়ে সিনেট ৫২–৪৪ ভোটে তাঁকে অনুমোদন দেয়। তিনি শুধু রিপাবলিকানদের কাছ থেকে সমর্থন পেয়েছিলেন।
কেন্টের ঘনিষ্ঠ সহযোগী কারা
জাতীয় গোয়েন্দা বিভাগের পরিচালক তুলসী গ্যাবার্ড ট্রাম্প প্রশাসনে কাজ করার সময় কেন্টের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ছিলেন।
কেন্টের দাবি, ইরানকে ঘিরে হুমকির বিষয়ে ট্রাম্পকে ভুল বোঝানো হয়েছে। তিনি এর জন্য কিছু গণমাধ্যম, ইসরায়েলের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও লবিস্টদের দায়ী করেছেন, যাঁরা ট্রাম্পকে তাঁর ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি থেকে সরে আসতে প্রভাবিত করেছেন।
জুলাইয়ে কেন্টের নিয়োগ নিশ্চিত হওয়ার পর শুরুতেই তাঁকে অভিনন্দন জানান গ্যাবার্ড। তিনি কেন্টকে একজন ‘দেশপ্রেমিক’ হিসেবে উল্লেখ করেন এবং তাঁর যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন।
তুলসী লিখেছিলেন, ‘বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক যুদ্ধক্ষেত্রগুলোয় কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁকে ইসলামপন্থী সন্ত্রাসবাদের স্থায়ী ও পরিবর্তনশীল হুমকি সম্পর্কে গভীর ও বাস্তবসম্মত ধারণা দিয়েছে।’
গ্যাবার্ড, কেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সকে ট্রাম্প প্রশাসনের এমন একটি অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যাঁরা বিদেশে মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপ নিয়ে তুলনামূলকভাবে বেশি সংশয়ী।
গত সপ্তাহে ডোনাল্ড ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইরানে হামলার বিষয়ে ‘সম্ভবত কম উৎসাহী’ ছিলেন। তবে তিনি আরও বলেন, ‘এ বিষয়ে আমাদের মধ্যে বোঝাপড়া খুব ভালো।’
তুলসী গ্যাবার্ড গতকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিলেও কেন্টের পদত্যাগের বিষয়ে কিছু বলেননি। তিনি ইরানে ট্রাম্পের অভিযানের প্রতি সমর্থন জানান।
তুলসী লিখেছেন, ‘মার্কিন জনগণ ডোনাল্ড ট্রাম্পকে আমাদের প্রেসিডেন্ট ও কমান্ডার–ইন–চিফ হিসেবে বিপুল সমর্থন দিয়ে নির্বাচিত করেছেন।’
তুলসী আরও বলেন, ‘আমাদের কমান্ডার–ইন–চিফ হিসেবে কোনটি আসন্ন হুমকি এবং কোনটি নয়, তা নির্ধারণের দায়িত্ব তাঁরই।’
কেন্ট কেন ইরান যুদ্ধের কারণে পদত্যাগ করেন
এক সাবেক সামরিক কর্মকর্তা হিসেবে অভিজ্ঞতার আলোকে জো কেন্ট বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি বড় যুদ্ধের ঝুঁকি তাঁকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।
পদত্যাগপত্রে কেন্ট উল্লেখ করেন, ট্রাম্প তাঁর আগের তিনটি নির্বাচনী প্রচারে যে পররাষ্ট্রনীতি তুলে ধরেছিলেন, তিনি সেটিকেই সমর্থন করতেন।
কেন্ট স্মরণ করিয়ে দেন, ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে ‘অন্তহীন যুদ্ধ’ থেকে দূরে রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
কেন্ট লিখেছেন, ‘২০২৫ সালের জুন নাগাদ আপনারা বুঝে গেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধগুলো একটি ফাঁদ। এ যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশপ্রেমিকদের মূল্যবান জীবন কেড়ে নেয় এবং দেশের সম্পদ ও সমৃদ্ধি নষ্ট করে।’
তবে কেন্টের দাবি, ইরানকে ঘিরে হুমকির বিষয়ে ট্রাম্পকে ভুল বোঝানো হয়েছে। তিনি এর জন্য কিছু গণমাধ্যম, ইসরায়েলের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও লবিস্টদের দায়ী করেছেন, যাঁরা ট্রাম্পকে তাঁর ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি থেকে সরে আসতে প্রভাবিত করেছেন।
কেন্ট আরও বলেন, মানুষকে মিথ্যা বলে বিশ্বাস করানো হয়েছে, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি আসন্ন হুমকি। এখনই হামলা করলে দ্রুত জয়ের সমূহ সম্ভাবনা আছে।
কেন্টের মতে, ‘একই কৌশল ব্যবহার করে ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রকে ইরাক যুদ্ধে জড়িয়েছিল। এতে আমাদের দেশের অসংখ্য নারী ও পুরুষের প্রাণহানি হয়েছে।’
কেন্ট বলেন, ‘আমরা এই ভুল আর করতে পারি না।’
কেন্ট সিরিয়ায় মার্কিন সামরিক অভিযান চলাকালে তাঁর স্ত্রী শনন নিহত হওয়ার ঘটনাটিকে উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
কেন্টের পদত্যাগ কি ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধের নীতিকে প্রভাবিত করতে পারে
ব্রিটিশ কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক পল কুইর্ক বলেন, কেন্টের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে বোঝা যায়, কীভাবে ‘সরকারের প্রাসঙ্গিক সামরিক, গোয়েন্দা ও পররাষ্ট্রনীতি বিশেষজ্ঞদের পরামর্শকে পাশ কাটিয়ে’ ট্রাম্পের কর্মকাণ্ড চলে।
তবে কুইর্ক আরও বলেন, কেন্ট একা কতটা প্রভাব ফেলতে পারবেন, তা নিয়ে তিনি সন্দিহান।
ভোটাররা কেন্টের পদত্যাগকে কীভাবে দেখছেন
কেন্টের পদত্যাগে মার্কিন সামরিক কৌশলে পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা কম হলেও বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এর রাজনৈতিক প্রভাব থাকতে পারে।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের আট মাসের কম সময় বাকি। এ সময় ট্রাম্পের নীতির প্রতি বিরূপ প্রতিক্রিয়ার বিষয়টি রিপাবলিকানদের ভোটের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
আল–জাজিরার সংবাদদাতা মাইক হানা বলেন, ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’ শিবিরে কেন্ট উচ্চপর্যায়ের অবস্থানে আছেন। সুতরাং, প্রেসিডেন্টের প্রতি কেন্টের সমালোচনা ট্রাম্পের অনুসারীদের মধ্যে ব্যাপক হতাশা তৈরি করতে পারে।
হানা বলেন, ইরানে মার্কিন–ইসরায়েল যুদ্ধ নিয়ে কেন্টের সমালোচনা খুবই জরুরি। কারণ, তিনি ট্রাম্পের নিয়োগ পাওয়া সাধারণ কোনো কর্মকর্তা নন। তিনি একজন সাবেক যোদ্ধা। বিশেষ বাহিনীর অংশ হিসেবে বিভিন্ন জায়গায় কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে তাঁর। তিনি ট্রাম্প ও মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন আন্দোলনের কঠোর সমর্থক ছিলেন। ট্রাম্পকে মিথ্যা তথ্য দিয়ে যুদ্ধে টানার জন্য তিনি ইসরায়েলকে দায়ী করেছেন।
হানা মনে করেন, এ ধরনের বক্তব্য ডানপন্থীদের মধ্যে প্রেসিডেন্টের প্রতি সমর্থনের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে।
কেন্টের পদত্যাগে প্রতিক্রিয়া কী
কেন্টের পদত্যাগপত্র রিপাবলিকানদের মধ্যে বিভক্তি তৈরি করেছে। কেউ কেউ তাঁর পদত্যাগকে নৈতিক অবস্থান বিবেচনা করে সমর্থন করেছেন। আবার কেউ কেউ প্রেসিডেন্টের প্রতি তাঁর আনুগত্য বজায় না রাখার বিষয়ে নিন্দা জানিয়েছেন।
ট্রাম্প নিজেও কেন্টকে নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। গতকাল ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, ‘আমি সব সময় তাঁকে ভালো মানুষ হিসেবে বিবেচনা করেছি। কিন্তু সব সময় মনে হয়েছে, তিনি নিরাপত্তার বিষয়ে দুর্বল। এখন ভালো হলো, তিনি বের হয়ে গেছেন। কারণ, তিনি বলেছিলেন, ইরান কোনো হুমকি নয়।’
হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলাইন লেভিটও কেন্টের দাবিকে ‘অপমানজনক ও হাস্যকর’ উল্লেখে খারিজ করে দিয়েছেন।
কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার মাইক জনসন মনে করেন, ইরানের হুমকি নিয়ে কেন্টের ধারণা ভুল। আরকানসর সিনেটর টম কটনও এমনটাই মনে করেন।
কটন এক বিবৃতিতে লিখেছেন, ‘কেন্ট ও তাঁর পরিবার আমাদের দেশের জন্য বিপুল ত্যাগ স্বীকার করেছে। আমি তাঁর সেবার জন্য তাঁকে ধন্যবাদ জানাই। তবে আমি তাঁর ভুল ধারণার সঙ্গে একমত নই।’
তবে জো কেন্টের সিদ্ধান্তের প্রশংসা করেছেন রক্ষণশীল ধারার গণমাধ্যম বিশ্লেষক টাকার কার্লসন।
নিউইয়র্ক টাইমসকে টাকার বলেন, ‘জো আমার দেখা সবচেয়ে সাহসী মানুষ। তাঁকে উন্মাদ হিসেবে উপেক্ষা করা যাবে না। তিনি এমন একটি পদ থেকে বের হচ্ছেন, যা তাঁকে সর্বোচ্চ স্তরের প্রাসঙ্গিক গোয়েন্দা তথ্য পাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। নিও–কনজারভেটিভরা তাঁকে ধ্বংস করার চেষ্টা করবে।’
কেন্টের বিরুদ্ধে কেন ইহুদিবিদ্বেষের অভিযোগ
সমালোচকদের কেউ কেউ কেন্টের পদত্যাগপত্রের সেই অংশকে তুলে ধরেছেন, যেখানে তিনি ইরানে হামলা চালাতে ট্রাম্পকে প্রভাবিত করার জন্য ইসরায়েলকে দায়ী করেছেন।
সমালোচকেরা দাবি করেছেন, এ ধরনের মন্তব্য ইহুদিবিদ্বেষী। কারণ, এতে ইসরায়েলের নেতা বা কর্মকর্তাদের খারাপ শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যাঁরা মিথ্যা তথ্য দিয়ে ট্রাম্পকে প্রভাবিত করেছেন।
কেন্টের পদত্যাগের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে মার্কিন বিমানবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডন বেকন লিখেছেন, ‘ইহুদিবিদ্বেষ একটি অনিষ্ট, যা আমি ঘৃণা করি। আমরা নিশ্চিতভাবেই আমাদের সরকারের মধ্যে এটি চাই না।’