ভেনেজুয়েলায় মার্কিন আগ্রাসন
ভেনেজুয়েলার নতুন নেতৃত্বের কাছে কী চান ডোনাল্ড ট্রাম্প
যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কৌশলের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে এখন রয়েছেন দেলসি রদ্রিগেজ।
মাদুরোকে গ্রেপ্তার করা কোনো ‘শাসন পরিবর্তন’ বা যুদ্ধের অংশ নয়: হোয়াইট হাউস।
ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজকে বেশ কিছু শর্ত দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। এসব শর্ত মানলে তিনি নিকোলা মাদুরোর মতো পরিণতি এড়াতে পারবেন বলে জানানো হয়েছে। মূলত ওয়াশিংটন-ঘনিষ্ঠ নীতি গ্রহণ করার জন্যই তাঁর ওপর এই চাপ দেওয়া হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতির বিষয়ে অবগত এক মার্কিন কর্মকর্তা এবং প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ আলোচনার বিষয়ে জানেন এমন এক ব্যক্তির বরাতে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, দেলসি রদ্রিগেজকে অন্তত তিনটি পদক্ষেপ নিতে হবে। এগুলো হলো মাদক পাচার কঠোরভাবে দমন করা; ইরান, কিউবা ও ওয়াশিংটন–বিরোধী অন্যান্য দেশের নেটওয়ার্ক বা গোয়েন্দাদের দেশ থেকে তাড়ানো এবং যুক্তরাষ্ট্রের শত্রুদেশগুলোর কাছে তেল বিক্রি বন্ধ করা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই দুই ব্যক্তি আরও বলেছেন, বর্তমানে ভেনেজুয়েলা পরিচালনাকারী সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট রদ্রিগেজের কাছ থেকে শেষ পর্যন্ত একটি অবাধ নির্বাচন ও ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রত্যাশা করছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে এসব দাবি পূরণের কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়নি। মার্কিন কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলেছেন, ভেনেজুয়েলায় এই মুহূর্তে কোনো নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
গত শনিবার ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে তুলে নিয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে এখন পর্যন্ত ভেনেজুয়েলা নিয়ে ওয়াশিংটনের অবস্থান অস্পষ্ট। হোয়াইট হাউসের দাবি, মাদুরোকে গ্রেপ্তার করা কোনো ‘শাসন পরিবর্তন’ বা যুদ্ধের অংশ নয়; বরং তা একজন মাদক সম্রাটের বিরুদ্ধে চালানো আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অভিযান। অবশ্য নিজেদের পদক্ষেপের পক্ষে যুক্তি দিতেই এমন ব্যাখ্যা দিচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন।
তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাটকীয় পদক্ষেপ এবং সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানোর প্রবণতা এবার ভেনেজুয়েলায় কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়তে পারে। অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত তিন কোটি মানুষের দেশটিতে সামান্য ভুল পদক্ষেপে বড় ধরনের সহিংসতা বা অস্থিতিশীলতা তৈরি হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কৌশলের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন দেলসি রদ্রিগেজ। যদিও তিনি দীর্ঘ সময় মাদুরোর ঘনিষ্ঠ মিত্র ও সমাজতান্ত্রিক হিসেবে পরিচিত। তবু ট্রাম্প প্রশাসন আত্মবিশ্বাসী যে রদ্রিগেজ তাদের কথামতোই চলবেন। আর তা না হলে তাঁকে ভয়াবহ সামরিক পদক্ষেপের মুখোমুখি হতে হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ট্রাম্প।
রোববার মার্কিন প্রেসিডেন্টকে বহনকারী উড়োজাহাজ এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘ভেনেজুয়েলা এখন পর্যন্ত বেশ ভালো আচরণ করছে। তবে আমাদের মতো শক্তিশালী বাহিনী থাকাটা কাজে দেয়। তারা যদি ঠিকমতো না চলে, তবে আমরা দ্বিতীয়বার হামলা চালাব।’
যুক্তরাষ্ট্রের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রশাসনের বর্তমান লক্ষ্য হলো দেশটির স্থিতিশীলতা বজায় রেখে মার্কিন স্বার্থের দিকে এগিয়ে যাওয়া। তবে রদ্রিগেজকে দেওয়া শর্তাবলি নিয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
রোববার এবিসি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্ক রুবিও কারাকাসের প্রতি মার্কিন বার্তার কিছুটা ইঙ্গিত দেন। তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র এমন পরিবেশ তৈরি করবে যাতে ভেনেজুয়েলা আর আমাদের এই গোলার্ধের জন্য হুমকি না হয়ে দাঁড়ায়।’ ট্রাম্প প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ এক ব্যক্তি জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন মনে করছে যে রদ্রিগেজ এখন তাদের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে বা ‘ছোট শিকলে’ বাঁধা রয়েছেন।
দেলসিকে বশে আনার চেষ্টা
মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানেই সুর বদলেছেন রদ্রিগেজ। মাদুরোকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় শুরুতে কড়া নিন্দা জানালেও রোববার তিনি সুর নরম করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে তিনি সহযোগিতা করবেন।
গত সপ্তাহে টেলিভিশনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মার্ক রুবিও ইঙ্গিত দেন, ভেনেজুয়েলা ‘পরিচালনা’ করার বিষয়ে ট্রাম্পের দাবি মূলত রদ্রিগেজকে প্রভাবিত করার একটি কৌশল। এক মার্কিন কর্মকর্তার মতে, ট্রাম্পের সাবেক উপদেষ্টা রিচার্ড গ্রেনেল রদ্রিগেজকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্ষমতায় রাখার পক্ষে। রদ্রিগেজকে বাগে আনতে সামরিক শক্তির পাশাপাশি পুরস্কার ও শাস্তি নীতিও ব্যবহার করছে যুক্তরাষ্ট্র। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কাতার ও তুরস্কে রদ্রিগেজের যে বিশাল সম্পদ রয়েছে, তার ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং নিষেধাজ্ঞা শিথিলের টোপ দিয়ে তাঁকে বশ করার চেষ্টা চলছে।
এদিকে, ভেনেজুয়েলায় বন্দী মার্কিন নাগরিকদের মুক্তির দাবি জানালেও রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি নিয়ে ওয়াশিংটনের নীরবতা রিপাবলিকান মহলে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। এলিয়ট আব্রামসসহ অনেকেই আশঙ্কা করছেন যে যুক্তরাষ্ট্র হয়তো দেশটিতে নতুন নেতৃত্ব আনার লড়াই থেকে সরে আসতে পারে।
ট্রাম্প কারাকাসে মার্কিন দূতাবাস আবার খোলার কথা ভাবলেও বর্তমানে ওয়াশিংটন দূর থেকেই সব নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে। তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, মাদুরোর অনুসারীদের মধ্যকার অভ্যন্তরীণ কোন্দল। বিশ্লেষকদের মতে, রদ্রিগেজ এখন উভয়সংকটে। মাদুরোকে ধরিয়ে দেওয়ার পেছনে তাঁর হাত আছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।