ভেনেজুয়েলা নিয়ে ট্রাম্প গর্ব করলেও তাঁর প্রতি কেন বিরক্ত হচ্ছেন শীর্ষ উপদেষ্টা ও রিপাবলিকানরা

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পছবি: রয়টার্স

যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযান চালিয়ে দেশটির নেতা নিকোলা মাদুরোকে তুলে নিউইয়র্কে নিয়ে গেছে। এ নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এত বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন যে খোদ হোয়াইট হাউসের কয়েকজন উপদেষ্টা ও রিপাবলিকান আইনপ্রণেতার মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তাঁরা মনে করছেন, আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ট্রাম্পের উচিত দেশের অর্থনীতি ও স্বাস্থ্যসেবার মতো বিষয়গুলোতে বেশি মনোযোগ দেওয়া। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত তিনজন বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এমনটা জানিয়েছেন।

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং ট্রাম্প যেভাবে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি সামাল দিচ্ছেন, তাতে সাধারণ ভোটাররা আগে থেকেই অসন্তুষ্ট। এমন পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের মিত্ররা ভয় পাচ্ছেন, পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে এত বেশি মাতামাতি আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির জন্য দুঃসংবাদ বয়ে আনতে পারে। দলটি কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তাঁরা।

গত সপ্তাহে ভেনেজুয়েলায় মার্কিন অভিযানের পর থেকে হোয়াইট হাউসের কয়েকজন শীর্ষ উপদেষ্টা প্রকাশ্যে হতাশা প্রকাশ করেছেন। এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও আবাসন খরচ, খাদ্য এবং স্বাস্থ্যবিমার উচ্চমূল্যের কারণে ভোটাররা এখন দুশ্চিন্তায় আছেন। অথচ ট্রাম্প এবং তাঁর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা সমানে আন্তর্জাতিক বিষয় নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন।

হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলোতে বেশি মনোযোগ দেওয়ার জন্য ট্রাম্পকে অব্যাহত চাপ দিচ্ছেন হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ সুজি উইলস, তাঁর নির্বাহী জেমস ব্লেয়ার এবং মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স।

ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকগুলোতে এ বিষয়ে সবচেয়ে বেশি সরব দেখা গেছে জেডি ভ্যান্সকে। তিনি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সমস্যার দিকে মনোযোগ ফেরাতে ট্রাম্পকে অব্যাহতভাবে জোর দিয়ে আসছেন।

গত সপ্তাহে ভেনেজুয়েলায় মার্কিন অভিযানের পর থেকে হোয়াইট হাউসের কয়েকজন শীর্ষ উপদেষ্টা প্রকাশ্যে হতাশা প্রকাশ করেছেন। এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও আবাসন খরচ, খাদ্য এবং স্বাস্থ্যবিমার উচ্চমূল্যের কারণে ভোটাররা এখন দুশ্চিন্তায় আছেন। অথচ ট্রাম্প ও তাঁর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা সমানে আন্তর্জাতিক বিষয় নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে হোয়াইট হাউস বলেছে, ট্রাম্প সব সময়ই অর্থনীতিকে অগ্রাধিকার দেন। চলতি সপ্তাহে আবাসন খরচ কমানোর বিষয়ে তাঁর ঘোষণার উদাহরণ টেনে মুখপাত্র আনা কেলি বলেন, ‘প্রেসিডেন্টের পররাষ্ট্রনীতি সব সময়ই “আমেরিকা ফার্স্ট” নীতি মেনে চলে। প্রেসিডেন্ট সব সময় আমাদের দেশে বিনিয়োগ এবং সুফল ফিরিয়ে আনতে কাজ করবেন।’

এ বিষয়ে ভ্যান্সের মুখপাত্র বলেন, ভাইস প্রেসিডেন্ট সব সময় ট্রাম্পের পররাষ্ট্র ও অভ্যন্তরীণ নীতিগুলোকে সমর্থন জানিয়েছে আসছেন। তবে এ বিষয়ে সুজি উইলস ও জেমস ব্লেয়ার মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেননি।

ট্রাম্পের অগ্রাধিকার নিয়ে উদ্বেগ নতুন কিছু নয়। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড এবং পানামা দখলের প্রচ্ছন্ন হুমকি দিয়েছেন, সিরিয়া ও নাইজেরিয়ায় বোমা হামলার নির্দেশ দিয়েছেন এবং ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের মীমাংসায় ব্যস্ত সময় পার করেছেন। ইরান সরকারকে হুমকি দিচ্ছেন, বিক্ষোভকারীদের গুলি করে হত্যা করলে যুক্তরাষ্ট্র ‘কঠোর আঘাত’ করবে।

ট্রাম্পের অগ্রাধিকার নিয়ে উদ্বেগ নতুন নয়। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড এবং পানামা দখলের প্রচ্ছন্ন হুমকি দিয়েছেন, সিরিয়া ও নাইজেরিয়ায় বোমা হামলার নির্দেশ দিয়েছেন এবং ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের মীমাংসায় ব্যস্ত সময় পার করেছেন।

হোয়াইট হাউসের পরিকল্পনা ছিল, তারা দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলো নিয়ে বেশি কাজ করবে এবং ট্রাম্প দেশজুড়ে ঘুরে ঘুরে সাধারণ মানুষের সমস্যার কথা বলবেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, তিনি পররাষ্ট্রনীতি নিয়েই বেশি ব্যস্ত। মার্কিন কর্মকর্তারা বলেছেন, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনের বছর হওয়ায় দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলোয় মনোযোগ দেওয়া আরও বেশি জরুরি হয়ে পড়েছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর নির্বাচনী প্রচারে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু সম্প্রতি তিনি বলেছেন, সাধারণ মানুষের ক্রয়সক্ষমতা কমে যাওয়ার বিষয়টি ডেমোক্রেটিক দলের ধাপ্পাবাজি ছাড়া আর কিছুই নয়।

হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা বলেছেন, গত বছরের নভেম্বর থেকে এ পর্যন্ত হোয়াইট হাউসের অর্থনীতিবিষয়ক বেশ কিছু বৈঠকে তাঁরা ট্রাম্পকে সমীক্ষা, জরিপ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট দেখিয়েছেন—যেখানে জীবনযাত্রার ব্যয় এবং ট্রাম্পের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে ভোটারদের গভীর উদ্বেগের বিষয়টি ফুটে উঠেছে। কর্মকর্তারা তাঁকে জনসম্মুখে দেওয়া বক্তব্যে অর্থনৈতিক বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়ার জোরালো অনুরোধ জানিয়েছেন।

আরও পড়ুন

ট্রাম্প অবশ্য এসব উদ্বেগকে খুব একটা পাত্তা দিচ্ছেন না। তিনি কর্মকর্তাদের বলেছেন, মার্কিন অর্থনীতি বর্তমানে শক্তিশালী। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, অর্থনীতিতে বেশি মনোযোগ দেওয়ার অর্থ ডেমোক্র্যাটদের পাতা ফাঁদে পা দেওয়া। এর মাধ্যমে তারা তাঁর (ট্রাম্পের) সাফল্যগুলোকে খাটো করে দেখানোর সুযোগ পাবে।

ট্রাম্প আরও দাবি করেন, বর্তমানে উচ্চ মূল্যস্ফীতির মূলে রয়েছে তাঁর পূর্বসূরি জো বাইডেনের নেওয়া বিভিন্ন নীতি।

গত শনিবার ট্রাম্প ঘোষণা দেন, এখন থেকে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলা ‘চালাবে’। এক কর্মকর্তা জানান, এর পর থেকে হোয়াইট হাউসে রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাদের ফোনের বন্যা বয়ে যায়। তাঁরা জোর দিয়ে বলেন, অন্য দেশ নয়, ট্রাম্পের উচিত নিজের দেশ চালানো।

রিপাবলিকান আইনপ্রণেতারা জনসমক্ষে ট্রাম্পের বৈদেশিক হস্তক্ষেপকে সমর্থন করলেও ব্যক্তিগতভাবে প্রশ্ন তুলছেন যে ট্রাম্প কেন দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলোতে বেশি নজর দিচ্ছেন না।

সাধারণত প্রেসিডেন্টের দল মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের আসন ধরে রাখতে হিমশিম খায়। বর্তমানে কংগ্রেসের উভয় কক্ষে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির সংখ্যাগরিষ্ঠতা খুবই সামান্য। অর্থনীতি নিয়ে ভোটারদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগের কারণে এ নির্বাচন দলটির জন্য এক কঠিন পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

ট্রাম্প তাঁর ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ এজেন্ডা নিয়ে পুনর্নির্বাচিত হয়েছিলেন, যেখানে তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, অন্য কোনো দেশের সমস্যা কিংবা সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রকে জড়াবেন না এবং অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবেন।

ট্রাম্পের সমর্থকেরা এখনো তাঁর ভেনেজুয়েলায় হস্তক্ষেপকে সমর্থন দিচ্ছেন। তবে এ ধরনের পররাষ্ট্রনীতি কংগ্রেস নির্বাচনে জয়ের হাতিয়ার হিসেবে খুব একটা কাজ করে না।

আরও পড়ুন
নিউইয়র্কে আটককেন্দ্র থেকে আদালতে নেওয়ার পথে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেস। সোমবার নিউইয়র্কের ডাউন টাউন ম্যানহাটান হেলিপোর্টে। ৫ জানুয়ারি, ২০২৬
ছবি: রয়টার্স

রয়টার্স/ইপসোসের এক জরিপ অনুসারে, গত ডিসেম্বরে প্রতি তিনজনে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মার্কিন নাগরিক ট্রাম্পের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার প্রতি সমর্থন জানিয়েছিলেন, যা গত বছরে তাঁর সর্বনিম্ন রেটিং।

চলতি সপ্তাহের এক জরিপে দেখা গেছে, খুব কম মানুষ ভেনেজুয়েলায় ট্রাম্পের হামলার সমর্থন করেছেন। যদিও শুরুতে রিপাবলিকানদের মধ্যে এই সমর্থন ছিল ৬৫ শতাংশ।

রিপাবলিকান আইনপ্রণেতারা জনসমক্ষে ট্রাম্পের বৈদেশিক হস্তক্ষেপকে সমর্থন করলেও ব্যক্তিগতভাবে প্রশ্ন তুলছেন, ট্রাম্প কেন দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলোতে বেশি নজর দিচ্ছেন না।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক রিপাবলিকান কৌশলবিদ বলেন, ভোটাররা যেসব বিষয়ে গুরুত্ব দেয় তাঁকে সেদিকেই মনোনিবেশ করতে হবে। তাঁরা দৈনন্দিন সমস্যা নিয়ে চিন্তিত, কোনো দেশের সরকার পরিবর্তন নিয়ে নয়।

আরও পড়ুন