ফেসবুক-ইনস্টাগ্রামে শিশুদের আসক্ত করার অভিযোগ নাকচ করল মেটা
মুনাফার লোভে শিশুদের ইচ্ছাকৃতভাবে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে আসক্ত করার অভিযোগ নাকচ করেছে মেটা প্ল্যাটফর্মস। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার ওকল্যান্ডের একটি ফেডারেল আদালতে এ নিয়ে আলোচিত মামলার বিচার শুরু হয়েছে। এ ঘটনা বিশ্বজুড়ে অত্যন্ত জনপ্রিয় এই অ্যাপগুলোর খোলনলচে বদলে দিতে পারে। দেশটির ২৯টি অঙ্গরাজ্যের একটি দ্বিপক্ষীয় জোট মেটার বিরুদ্ধে এ মামলা লড়ছে। তারা মেটার কাছ থেকে শত শত কোটি ডলার জরিমানা আদায়ের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায়িক নীতিতে বড় পরিবর্তনের দাবি জানাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের চার প্রধান অঙ্গরাজ্য ক্যালিফোর্নিয়া, কলোরাডো, কেনটাকি ও নিউ জার্সির পক্ষ থেকে অভিযোগ তোলা হয়েছে, মেটা তাদের ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম অ্যাপগুলোকে এমনভাবে তৈরি করেছে, যাতে অল্প বয়সী ব্যবহারকারীরা সহজেই আসক্ত হয়ে পড়ে। এর ফলে তাদের মধ্যে উদ্বেগ, মানসিক অবসাদ ও আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ছে। একই সঙ্গে মেটা এই অ্যাপগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে ব্যবহারকারীদের বিভ্রান্ত করেছে। এ ছাড়া ২৯টি অঙ্গরাজ্যের অভিযোগ, মেটা তাদের প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের সময় শিশুদের ব্যক্তিগত তথ্য যথাযথ অনুমতি ছাড়া সংগ্রহ ও ব্যবহার করে মার্কিন কেন্দ্রীয় আইন লঙ্ঘন করেছে।
‘মেটা দেখেছে, যত কম বয়সে একটি শিশু এই অ্যাপ ব্যবহার শুরু করবে, প্রতিষ্ঠানের জন্য সেটা ততই ভালো।’
ক্যালিফোর্নিয়ার ওকল্যান্ডের একটি ফেডারেল আদালতে গত মঙ্গলবার এ ঐতিহাসিক মামলার শুনানি শুরু হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, তরুণদের ওপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে এটিই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় আইনি লড়াই। শুনানিতে ক্যালিফোর্নিয়ার ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মেগান ও’নিল আট সদস্যের জুরিকে বলেন, মেটার ব্যবসায়িক মডেল হলো, ‘ব্যবহারকারীদের আসক্ত করা, তাদের বেশিক্ষণ আটকে রাখা, তথ্য হাতিয়ে নেওয়া এবং জনসাধারণের কাছে সত্য গোপন করা।’ ও’নিল আরও বলেন, শিশুদের ক্ষেত্রে এ কৌশল সবচেয়ে ভালো কাজ করেছে।
মেটার আইনজীবী পল স্মেড অবশ্য স্বীকার করেছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের কারণে কেউ কেউ সমস্যায় পড়ছেন। সে বিষয়ে ‘কোনো বিতর্ক নেই’। তবে তিনি দাবি করেন, একে কোনোভাবেই আসক্তি বলা যায় না। কিশোর-কিশোরীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের সঙ্গে তাদের ভালো না থাকার কোনো স্পষ্ট সম্পর্ক গবেষণায় পাওয়া যায়নি। স্মেড আরও বলেন, মেটা এবং এর সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মার্ক জাকারবার্গ সব সময় তাদের সেবা উন্নত করতে চান, একে ঝুঁকিপূর্ণ করতে নয়। তিনি বলেন, মানুষ যদি তাঁদের সেবা পছন্দ না করে, তাহলে তাঁরা ভালো করতে পারবেন না, এটা তাঁরা বোঝেন।
ছয় সপ্তাহের এ বিচারপ্রক্রিয়ায় মার্ক জাকারবার্গ এবং ইনস্টাগ্রামের প্রধান অ্যাডাম মোসেরির সাক্ষ্য দেওয়ার কথা রয়েছে। শুনানিতে ও’নিল ইনস্টাগ্রামের প্রধান মোসেরিকে পাঠানো মেটার একটি অভ্যন্তরীণ ই–মেইল জুরিদের সামনে তুলে ধরেন। সেই ই–মেইলে ‘কিশোর-কিশোরীদের এসব প্ল্যাটফর্মে বেশি সময় কাটানো’ লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ ছিল। ও’নিল দাবি করেন, মেটার কর্মীরা ইনস্টাগ্রামকে একটি ‘নেশা’ এবং নিজেদের ‘মাদক বিক্রেতা’ হিসেবে দেখতেন। তিনি আরও বলেন, মেটা দেখেছে, যত কম বয়সে একটি শিশু এই অ্যাপ ব্যবহার শুরু করবে, প্রতিষ্ঠানের জন্য সেটা ততই ভালো।
বিচারপ্রক্রিয়া শুরুর পর আদালতের বাইরে বিক্ষোভ করেছেন মেটার সমালোচকেরা। মেরি রডি নামের এক নারী বলেন, ২০২১ সালে ফেসবুকে এক প্রতারকের ফাঁদে পড়ে তাঁর ১৫ বছর বয়সী ছেলে রাইলি ব্যাসফোর্ড আত্মহত্যা করে।
২০২৩ সালে শুরু হওয়া এ মামলার ভিত্তি ছিল প্রতিষ্ঠানটির সাবেক কর্মী ফ্রান্সিস হগেনের দেওয়া তথ্য। ২০২১ সালে মার্কিন সিনেট কমিটিতে হগেন তাঁর সাক্ষ্যে বলেছিলেন, মেটা তাদের পণ্যগুলো শিশুদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ জেনেও প্রতিষ্ঠানটি বেশি মুনাফার আশায় কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।