ইরান যুদ্ধকে ‘পাগলামি’ আখ্যা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী পডকাস্ট সঞ্চালক জো রোগান বলেছেন, এই যুদ্ধের কারণে মার্কিন নাগরিকেরা ‘প্রতারিত’ বোধ করছেন। তাঁরা ভাবছেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁদের সঙ্গে এ নিয়ে ‘প্রতারণা’ করেছেন।
গত মঙ্গলবার তাঁর শোতে রোগান বলেন, ট্রাম্প নির্বাচনের সময় যে ধরনের নীতি প্রচার করেছিলেন, এই যুদ্ধ ঠিক তার উল্টো।
রোগান আরও বলেন, ‘এটি স্রেফ উন্মাদনা বলে মনে হচ্ছে।’ ২০২৪ সালের নির্বাচনে জো রোগান ট্রাম্পকে সমর্থন দিয়েছিলেন। এখনো মাঝেমধ্যে তাঁদের মধ্যে খুদে বার্তায় যোগাযোগ হয়।
এই পডকাস্টার আরও বলেন, ‘ট্রাম্প নির্বাচনের আগে প্রচার চালিয়েছিলেন, তিনি আর যুদ্ধ চান না। প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এসব কাণ্ডজ্ঞানহীন ও অর্থহীন যুদ্ধ বন্ধ করার। অথচ এখন আমরা এমন এক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছি, যার কোনো সুনির্দিষ্ট কারণও আমাদের জানা নেই।’
২০২৪ সালে নির্বাচনী প্রচারের শেষ দিনগুলোতে জো রোগান ট্রাম্পকে বেশ এগিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি ট্রাম্পের দীর্ঘ তিন ঘণ্টার একটি সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ট্রাম্পকে সমর্থন জানান।
তবে ট্রাম্প ক্ষমতায় ফেরার পর থেকেই রোগান মাঝেমধ্যে তাঁর সমালোচনা করেছেন। বিশেষ করে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে প্রশাসনের কর্মকাণ্ড নিয়ে তাঁকে বেশ সন্দিহান হতে দেখা যাচ্ছে।
গত ডিসেম্বরে হোয়াইট হাউসে সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সমালোচনা করে লাগানো একটি নতুন ফলককে রোগান ‘স্রেফ পাগলামি’ বলে অভিহিত করেন।
গত জানুয়ারি মাসে মিনিয়াপোলিসে আইসিই (আইস নামে পরিচিত) এজেন্টের গুলিতে রেনি নিকোল গুডের মৃত্যুর ঘটনাকে তিনি ‘সব দিক থেকেই ভুল’ বলে মন্তব্য করেন। এ সময় তিনি মিনেসোটার বৃহত্তম শহরে পরিচালিত ফেডারেল অভিবাসন দমন অভিযানকে নাৎসি জার্মানির গেস্টাপো বাহিনীর কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তুলনা করেন।
তবে, গত মঙ্গলবার রোগান সরাসরি ট্রাম্পের কঠোর সমালোচনা করেন।
ইরান যুদ্ধের সঙ্গে জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে গ্রেপ্তার করা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের তুলনা করে জো রোগান বলেন, ‘কোনোটিই যৌক্তিক ছিল না।’ তবে মাদুরোকে গ্রেপ্তারের বিষয়টিতে ‘অন্তত স্পষ্টতা ছিল।’
রোগান বলেন, ‘তারা ভেতরে ঢুকল, তাঁকে অপহরণ করল এবং বের করে নিয়ে এল। কিন্তু এটা (ইরান যুদ্ধ) একেবারেই পাগলামি।’
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অ্যানা কেলি এক বিবৃতিতে বলেছেন, প্রেসিডেন্ট অত্যন্ত সাহসের সঙ্গে ইরানের ‘দুর্বৃত্ত’ শাসকগোষ্ঠীর তরফ থেকে আসা প্রাণঘাতী হুমকি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে রক্ষা করছেন এবং এটিই ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
স্পটিফাইতে রোগানের অনুষ্ঠান ‘দ্য জো রোগান এক্সপেরিয়েন্স’ সবচেয়ে জনপ্রিয় পডকাস্ট।
রোগানের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি বেশ জটিল। ২০২০ সালের ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রেসিডেন্ট প্রার্থী বাছাইয়ের সময় তিনি প্রগতিশীল নেতা সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্সকে সমর্থন দিয়েছিলেন এবং তিনি নিজেকে কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য হিসেবে নিবন্ধন করেননি বলে জানান।
রোগানের অনুষ্ঠানটি কেবল রাজনৈতিক গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং সেখানে কৌতুক, এলোমেলো আলাপচারিতা এবং কোয়ান্টাম মেকানিকসের মতো জটিল বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়।
তবে কিছু বিষয়ে জো রোগানের ডানপন্থী দৃষ্টিভঙ্গি এবং তাঁর ব্যাপক সম্পৃক্ততার কারণে বুধবার সকাল পর্যন্ত তাঁর সর্বশেষ পডকাস্টটি ইউটিউবে ৩ লাখ ৫০ হাজারের বেশিবার দেখা হয়েছে। এটি তাঁকে রক্ষণশীল রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিতে পরিণত করেছে।
রোগান এই সমালোচনা এমন সময়ে করলেন, যখন ১২ দিনের এই যুদ্ধ চলতি বছরের শেষ দিকে অনুষ্ঠেয় মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের দলের জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করছে।
জনমত জরিপ বলছে, অধিকাংশ মার্কিন এই যুদ্ধ পছন্দ করছেন না। যুদ্ধের ফলে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় রিপাবলিকানরা বেশ চাপে পড়েছেন।
আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের (এএএ) তথ্য অনুযায়ী, গত বুধবার যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন পেট্রোলের গড় দাম ছিল ৩ দশমিক ৫৮ ডলার। মাত্র এক সপ্তাহে দাম বেড়েছে ৩৮ সেন্ট।
এই যুদ্ধের কারণে পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথটি অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের পাঁচ ভাগের এক ভাগ এই পথ দিয়েই যায়।
টাকার কার্লসন, মেগিন কেলি ও ক্যান্ডেস ওয়েন্সের মতো পরিচিত রক্ষণশীল পডকাস্টাররা এই যুদ্ধের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন। ওয়েন্সের ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন’ শিরোনামের ভিডিওটি ইউটিউবে ২০ লাখের বেশিবার দেখা হয়েছে।
তবে রাজনৈতিক মতাদর্শ নির্বিশেষে রোগানের মতো প্রভাব আর কারও নেই।
ট্রাম্প নিজেও অতীতে রোগানের গুরুত্ব স্বীকার করেছেন।
২০২৪ সালে ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘তিনি (রোগান) বর্তমানে (যুক্তরাষ্ট্রের) সবচেয়ে বড় (প্রভাবশালী) ব্যক্তি।’