‘এটা আমার বাবার গল্প’

দ্বিতীয় উইলিয়াম হেনরি গেটস। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মাইক্রোসফটের সহযোগী প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটসের বাবা। গত সোমবার তাঁর মৃত্যু হয়েছে। বাবার মৃত্যুতে নিজের ব্লগ ‘গেটস নোটস’ এ একটি শোকগাথা লিখেছেন বিল গেটস। কিছুটি সংক্ষেপিত আকারে তা প্রকাশ করা হলো।

দ্বিতীয় উইলিয়াম হেনরি গেটস। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মাইক্রোসফটের সহযোগী প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটসের বাবাছবি: গেটস নোটস থেকে নেওয়া

আমার বাবা সোমবার আলঝেইমার রোগে মারা গেছেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৪ বছর। আমি ও আমার পরিবার মিলে এই শোকগাথাটি লেখা হয়েছে। পরিবার ও বন্ধুদের ভাবনা থেকেই এটা এখানে পোস্ট করছি। তাতে করে আমার বাবা কী ধরনের মানুষ ছিলেন এবং কেন আমরা সবাই আমাদের জীবনে তাঁকে পেয়ে খুব ভাগ্যবান তা বোঝা আপনাদের জন্য সহজ হবে।

দ্বিতীয় উইলিয়াম হেনরি গেটস, যিনি বিল সিনিয়র হিসেবেই অনেকের কাছে পরিচিত ছিলেন। আলঝেইমার রোগে ১৪ সেপ্টেম্বর হুড ক্যানালের সৈকতবাড়িতে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। ৯৪ বছরের জীবনে আইনজীবী, মানবসেবী ও অ্যাকটিভিস্ট হিসেবে তিনি নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। আর পরিবারে তিনি ছিলেন প্রিয়তম স্বামী, বাবা এবং দাদা। আদর্শ নাগরিক এবং সুসভ্য একজন মানুষ বলতে যা তিনি ছিলেন তারই প্রতীক। দেশের অনেকের কাছে তিনি ছিলেন অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব, বিশ্বস্ত পরামর্শক এবং অনুগত বন্ধু। তাঁর নিষ্ঠা, রসবোধ, অভিগম্যতা ও চিন্তাশীলতার জন্যই তিনি বহু মানুষের প্রশংসা কুড়িয়েছেন এবং তাঁর কাজ ও নাগরিক এবং মানবসেবামূলক কর্মকাণ্ডে খুবই সফলতা পেয়েছেন।

বিলের জন্ম ১৯২৫ সালের ৩০ নভেম্বর। বেড়ে ওঠেন ব্রেমারটনের নেভি টাউনে। তাঁর বাবার একটি আসবাবের দোকান ছিল। তাঁর মা-বাবা কেউই হাইস্কুলে যাননি। বিল ব্রেমারটন হাইস্কুলে ভর্তি হন এবং বয় স্কাউটে সক্রিয় ছিলেন। তাঁর দল সেখানে একটি কাঠের কেবিন তৈরি করেছিল এবং দলগতভাবে অভিন্ন লক্ষ্য নিয়ে কাজ করার শক্তি সম্পর্কে প্রথম শিক্ষা তাঁর সেখানেই।

ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় প্রথম বর্ষ শেষ করেই বিল মার্কিন সেনাবাহিনীতে যুক্ত হন। অফিসার পদের প্রশিক্ষণ শেষে তিনি জাপানে যান। যুদ্ধবিধ্বস্ত টোকিওতে এক বছর কাটিয়েছিলেন তিনি। সেখানেই বিল মানবতার শিক্ষা লাভের প্রথম সুযোগ পেয়েছিলেন এবং মানুষকে একতাবদ্ধ করার কাজে এর ভূমিকা সম্পর্কে জানতে পেরেছিলেন।

১৯৪৯ সালে স্নাতক ডিগ্রি নেওয়ার জন্য গেটস ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে যান। পরের বছরই আইনের ওপর পড়াশোনা শেষ করেন তিনি। ওই সময়ে তাঁর প্রথম স্ত্রী মেরি ম্যাক্সওয়েলের সঙ্গে দেখা হয়। বিল ও মেরির ছিল দুই মেয়ে ও এক ছেলে। পরিবারের সবার মধ্যেই তাঁরা নাগরিক কর্তব্য পালনের বিষয়টি গড়ে তুলেছিলেন। প্রতি রাতে গেটস পরিবারের খাবারের টেবিলে স্বেচ্ছাসেবা ও দাতব্য কাজ বিষয়ক আলোচনা হতো।

বন্ধুত্বের পরিচর্যা করে বিল ও মেরি প্রভূত আনন্দ পেতেন। তাঁরা যে কোনো আয়োজন মাতিয়ে রাখতে পারতেন। আরও ৮টি পরিবারকে নিয়ে ১০টি গ্রীষ্ম চিরিও রিসোর্টের হুড ক্যানালে কাটিয়েছিলেন তাঁরা। সেখানে বিল ‘দ্য মেয়র’ হিসেবে খ্যাত ছিলেন। কয়েক বছর ধরে ছুটির দিনগুলোতে তাঁরা স্কেটিং পার্টি আয়োজন করতেন। ৬ ফুট ৭ ইঞ্চি উচ্চতার বিলকে সেখানে সান্তা ক্লজ সেজে রোলার স্কেটে দেখা যেত।

মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস
ছবি: রয়টার্স

আইনি পেশার শুরুতে ব্যক্তিগত আইনজীবী হিসেবে কাজ করতেন বিল। একই সঙ্গে ব্রেমারটনের নগর আইনজীবী হিসেবে খণ্ডকালীন কাজও করতেন। পরে সিয়াটল ল ফার্মে যোগ দেন। এর প্রায় এক যুগ পর দুই সহযোগীকে নিয়ে নতুন আইনি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান চালু করেছিলেন বিল। ব্যবস্থাপনা সহযোগী হিসেবে গেটস ওই প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলেন, যা এখন কে অ্যান্ড এল গেটস নামে পরিচিত। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ আইনি সেবা দেওয়ার প্রতিষ্ঠান এটি। তাঁর প্রতিষ্ঠান শুরুতে ওই অঞ্চলের প্রযুক্তিশিল্পে যুক্ত ছিল, যা পরে অন্যান্য খাতেও কাজ শুরু করে। প্রায় ৪৮ বছর কাজ করার পর ওই সময়ে প্রেস্টন গেটস অ্যান্ড এলিস নামে পরিচিত প্রতিষ্ঠানটি থেকে ১৯৯৮ সালে তিনি অবসর নেন।

আইনের শক্তি দিয়ে মানুষকে সহায়তা করা এবং এর মধ্যে দিয়ে উৎকৃষ্ট পরিবর্তন আনা সম্ভব—এমনটাই বিশ্বাস করতেন বিল। তাঁর সহকর্মীরা তাঁর সততার প্রশংসা করতেন, তাঁর বুদ্ধিমত্তায় আস্থা রাখতেন এবং তাঁর পরামর্শ চাইতেন।

আইনি পেশাজীবী সংগঠনগুলোর সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন। এর মধ্যে ছিল—স্থানীয় ও রাজ্য পর্যায়ের আইনজীবী সমিতির সভাপতির দায়িত্ব পালন, আমেরিকান বার অ্যাসোসিয়েশনের নেতৃত্ব দেওয়া, আদালতের বেশ কয়েকটি কমিশনে অংশগ্রহণ এবং অন্যান্য পদ। এই সংস্থাগুলোর মাধ্যমে তিনি ভিন্ন বর্ণের ব্যক্তিদের জন্য আইন স্কুলের বৃত্তি এবং দরিদ্র ব্যক্তিদের জন্য আইনি সেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে সহায়তা করেছিলেন। শুধু তাই নয়, শহরের নাগরিক সমাজের নেতাদের মধ্যেও অন্যতম ছিলেন বিল।

বিল গেটস

১৯৯৪ সালে প্রথম স্ত্রী মেরিকে ক্যানসারে হারান বিল সিনিয়র। জীবনের প্রায় পাঁচটি দশক তিনি মেরির সঙ্গে কাটিয়েছিলেন। ১৯৯৬ সালে তিনি বিয়ে করেন মিমি গার্ডনারকে। বিল ও মিমি একসঙ্গে প্রায় ২৪টি বছর কাটিয়েছেন, হাসিখুশিময় এক জীবন ছিল তাঁদের। জীবনের শেষ দিনগুলো বিল ও মিমি হুড ক্যানেলে কাটিয়েছেন।
বিল ও মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন ও এই ফাউন্ডেশন যাদের জন্য কাজ করত, তাদের ওপরও বিলের গভীর প্রভাব ছিল। তিনি ফাউন্ডেশনের নীতি-নৈতিকতাগুলোকে আকার দিয়েছিলেন। তিনি এই ফাউন্ডেশনকে দিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ শুরু করিয়েছিলেন।

২০০০ সালে গেটস কেমব্রিজ স্কলার্স ট্রাস্ট গঠন করেছিলেন তিনি। ফাউন্ডেশনের মূল বিনিয়োগ যাতে মানবসেবা, শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে কাজে লাগানো হয়, সে ক্ষেত্রে তিনি নির্দেশনা দিতেন। তিনি কখনোই কাউকে ভুলতে দিতেন না যে, ফাউন্ডেশনের মূল কৌশলগুলোর পেছনে আছে শুধুই মানুষ। সবার ভালো দিকগুলোই শুধু তাঁর নজরে আসত এবং সবাইকেই তিনি বিশেষ মনে করতেন। ফাউন্ডেশনের মূলমন্ত্র সমুন্নত রাখার কাজও সব সময়ই তিনি করে গেছেন।

জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে গেটস অসংখ্য পুরস্কার পেয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে ওয়াইএমসিএ–এর একে গাই অ্যাওয়ার্ড, সিয়াটল কিং কাউন্টি রিয়েলটরস ফার্স্ট সিটিজেন অ্যাওয়ার্ড প্রভৃতি।

শেষটা করি বাবার প্রতি ছেলের কথা দিয়ে। বিল সিনিয়রকে একবার ছেলে তৃতীয় বিল গেটস লিখেছিলেন, ‘তোমাকে যদি আর কেউ জিজ্ঞেস করে যে, তুমি আসল বিল গেটস কিনা, তবে বলে দিও—তুমি সেই সবকিছু যা কিনা আরেকজন হতে চেয়েছিল।’