কনসার্ট ফর বাংলাদেশ ও আমার বাবা

বাংলাদেশ, বাংলাদেশ
কাছে এসেছিল বন্ধু
চোখজোড়া বিষণ্নতায় ছাওয়া
বন্ধুর একটাই চাওয়া
তার স্বদেশের বেঁচে থাকা
বেদনা বুঝিনি আমি, জানি
চেষ্টা আজ বেদনা বোঝারই
তোমাদের কাছে আজ বলি
এসো, কিছু জীবন বাঁচাই
বাংলাদেশ, বাংলাদেশ
ঝরে পড়ে জীবন অশেষ
দয়াহীন বিবেক রহিত
মর্মপীড়া তুলনা রহিত
এখনো কি বাড়াবে না হাত
চেষ্টা করো বুঝতে একবার
এ দুঃখ ঘোচাও বাংলার
বাংলাদেশ, বাংলাদেশ। (সংক্ষেপিত)

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় আয়োজিত ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’-এ গানটি গেয়েছিলেন জর্জ হ্যারিসন। গানটির সুর ও কথাও তাঁরই। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বহির্বিশ্বের জনমত গঠনে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল এই ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’।
ব্যান্ডসংগীতের কিংবা বিখ্যাত জনপ্রিয় শিল্পীদের গানের অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মানবকল্যাণে তহবিল সংগ্রহের একটি উপায় হিসেবে এ ধরনের আয়োজনের সূচনা হয় ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’-এর মাধ্যমে জর্জ হ্যারিসনের হাত ধরেই। কোনো দেশের মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে এর আগে এমন কনসার্টের আয়োজন এর আগে আমেরিকায় হয়নি। বিটলসের সাবেক সদস্য জর্জ হ্যারিসন এবং উপমহাদেশের বিখ্যাত সেতার শিল্পী ওস্তাদ রবিশঙ্কর ও সরোদ শিল্পী ওস্তাদ আলী আকবর খানের উদ্যোগে এ কনসার্টের আয়োজন করা হয়।
১৯৭১ সালের ১ আগস্ট বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত নিউইয়র্ক সিটির ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে ও অর্থ সংগ্রহের লক্ষ্যে আয়োজিত এ কনসার্টে সমবেত হয়েছিলেন ৪০ হাজার দর্শক। কে ছিলেন না এ কনসার্টে? বব ডিলান, এরিক ক্ল্যাপটন, রিংগো স্টার, বিলি পেস্টন, লিওন রাসেলের মতো সময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় শিল্পীদের অংশগ্রহণে এ কনসার্ট এক দিনেই সারা বিশ্বকে জানিয়ে দিয়েছিল বাংলাদেশের কথা। তবলায় ছিলেন ওস্তাদ আল্লারাখা খান ও তানপুরায় কমলা চক্রবর্তী। আর ছিলেন তখনকার আমেরিকায় বসবাসকারী আমার আব্বা নবাব আলীর মতো বাংলার দেশপ্রেমী মানুষেরা। এখনকার মতো এত বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি তখন নিউইয়র্কে ছিলেন না।
সেই স্মরণীয় কনসার্টে সংগৃহীত হয়েছিল ২ লাখ ৪৩ হাজার ৪১৮ দশমিক ৫০ ডলার, যার পুরোটাই মুক্তিযুদ্ধ ও শরণার্থীদের কল্যাণের জন্য ইউনিসেফের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল। আব্বার মুখে প্রায়ই শুনতাম ওই কনসার্টের কথা। সে সময়ে নিউইয়র্কে বসবাসরত আমার আব্বা ওই কনসার্টে অর্থ সংগ্রহে কাজ করেন। চুল দাঁড়িতে বিধ্বস্ত, বিষণ্ন ও স্বজনদের ভাবনায় বিমূঢ় একজন বাংলাদেশি সাজিয়ে আব্বাকে বসিয়ে রাখা হয়েছিল অর্থ সংগ্রহের জন্য। সেই সময়ে নিউইয়র্কে পাকিস্তান কনস্যুলেটে কর্মরত মোহাম্মদ আলী ও ফরিদা মজিদের অনুপ্রেরণায় ওই দিন ছাড়াও আব্বা ম্যানহাটনের রাস্তায় বসে বাংলাদেশের জন্য অর্থ সংগ্রহ করেছেন। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এভাবে অর্থ সংগ্রহের সুযোগটিও করে দিয়েছিল ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ই। এর আগে অধিকাংশ আমেরিকানের কাছে বাংলাদেশ নামটি ছিল অপরিচিত ছিল, অজ্ঞাত ছিল এর মানুষদের মুক্তির যুদ্ধের কথা। সে সময় আমেরিকায় বসবাসরত বাঙালিদের ‘ইন্ডিয়ান’ বলা হতো।
মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করার সুবাদে সাবেক প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর সঙ্গে আব্বার একটা ভালো সম্পর্ক তৈরি হয়। ওই কনসার্টে ফরিদা মজিদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও অবদানের কথা আমার আব্বা খুব বলতেন। সিলেটের ভাদেশ্বরের মনির আহমেদ, সালেহ আহমেদ ও গৌস আহমেদের মুক্তিযুদ্ধে আমেরিকায় জনমত ও অর্থ সংগ্রহের কথাও আব্বার মুখে শুনেছি।
তখন অবশ্য এত কিছু বুঝিনি। ১৯৭৪ সালের দিকে আমেরিকার ভিসা ইন্টারভিউয়ের জন্য আব্বার সঙ্গে ঢাকা যাই। ঢাকার মতিঝিলে শরীফ ইনে রেস্টুরেন্টে আব্বাকে আপ্যায়িত করেন মোহাম্মদ আলী। সেই দিন উনি আমাকে চাচা ডাকতে বলেছিলেন। সে দিন তাঁদের আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল একটাই—নিউইয়র্কের ম্যাডিসন গার্ডেন ও কনসার্ট ফর বাংলাদেশ।
১৯৭১ সাল চারদিকে যুদ্ধের ভয়াবহতা। আব্বা তখন আমেরিকায় একা। ১৪ বছরের কিশোরী আমি। রয়েছে সাত, পাঁচ ও তিন বছর বয়সী আরও তিন ভাই-বোন। আমাদের সবাইকে নিয়ে মা একা থাকেন বাড়িতে। সিলেটের বিয়ানীবাজার শত্রুর কবলে চলে গেলে বাড়ির রাখাল থেকে শুরু করে সবাই পালিয়ে যায়। দাদা-দাদি, চাচা, ফুফুহীন আমাদের বিরাট এক মালিকানার বাড়ি। রাতে মাটিতে বিছানা পেতে আমরা ঘুমাতাম। আমাদের ঘুম পাড়িয়ে সারা রাত জেগে কাটাতেন মা। রাত ৮টার পর থেকেই শুরু হয়ে যেত কার্ফ্যু। তখন ঘরে বাতি জ্বালানো দেখলে টহলরত পাকিস্তানি চরদের সন্দেহের মুখে পড়তে হতো। আমরা সন্ধ্যারাতে রাতের খাওয়া সারতাম। মা হারিকেনের আলো একদম কমিয়েও স্বস্তি পেতেন না। ঢেকে রাখতেন হারিকেন।
আমাদের বাড়ির পর থেকেই শুরু দিগন্তহীন মুড়িয়া হাওর। আমাদের পুকুরপাড়ে দাঁড়ালে মুড়িয়া হাওরের ওপারে তাজপুর ও ভারতের সীমান্তসংলগ্ন গ্রাম সারপার দেখা যায়। আমাদের এ পার ছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর দখলে, আর ওপার ছিল মুক্তিবাহিনীর দখলে। প্রতি রাতের যুদ্ধেই জোনাকি পোকার মতো বারুদের ওড়াউড়ি দেখা যত। আগুনের স্ফুলিঙ্গ যেন ডানা পেয়েছিল সে সময়। আমাদের বাড়ির টিনের চালে অসংখ্য ফুটো হয়ে গিয়েছিল।
অনিরাপদ সময়ে বাবা ছাড়া বাড়িতে আমাকে রাখা বিপজ্জনক মনে হওয়ায় আমাকে পাঠিয়ে দেওয়া হলো নানাবাড়ি ভাউরবাগ। নানা বাড়িতে মায়ের খোঁজখবর নিয়ে আসার কাজটি করতেন ছোট মামা। ছোট মামার আরেকটি কাজ ছিল—আমাদের বাড়িতে আলু-ডাল নিয়ে যাওয়ার বাহানায় মায়ের কাছ থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য চা পাতা, ব্লেড ,সাবান ও দেশলাই নিয়ে আসা।
আব্বা ইন্ডিয়ায় মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য টাকা পাঠাতেন। সঙ্গে আম্মার কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্যও টাকা দিতেন। তিন হাত ঘুরে আসা সেই টাকা ও চিঠি নয় মাসে মাত্র দুবার মায়ের হাতে পৌঁছেছিল।
আব্বা বলতেন, ‘খালা যেমন মায়ের মতো হয় না, তেমনি প্রবাস কখনো নিজ দেশ হয় না।’ ১৯২৪ সালে আমেরিকায় পাড়ি দেন আব্বা। জন্মভূমিকে তুচ্ছ করা হবে বলে দীর্ঘকাল আমেরিকায় বাস করেও নেননি মার্কিন নাগরিকত্ব। এ জন্য আমার মাসহ পরিবারের আত্মীয়স্বজনদের অনেকেই তাঁকে দোষারোপ করতেন। জবাবে আব্বা বলতেন, ‘নাগরিকত্ব গ্রহণের সময় করা শপথে জন্মভূমির প্রতি বেইমানি করতে পারব না।’
হজ করতে গেলে মক্কার পবিত্র ভূমিতে সমাহিত হওয়া অনেক মুসলিমের আকাঙ্ক্ষা থাকে। কিন্তু আমার আব্বা হজে গিয়ে প্রচণ্ড অসুখে পড়লে তাঁর সহযাত্রীদের ও আমার আম্মাকে বলেছিলেন দোয়া করতে, যেন তাঁর মৃত্যু বাংলাদেশে হয়। আর যদি সেখানেই মৃত্যু হয়, তবে যেন তাঁর লাশ দেশে নিয়ে দাফন করা হয়।’
‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’-এর কথা উঠলেই আমার চোখে ভাসে আমার আব্বার প্রত্যয়ী মুখ। চোখের সামনে ভেসে ওঠে জর্জ হ্যারিসনের গিটারের ছবি, যা তেড়ে যাচ্ছে সেই অপশক্তির বিরুদ্ধে, যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল। মনে সেই সব কণ্ঠযোদ্ধাকে, যাদের সংগীত অস্ত্র হয়ে শত্রুর বিরুদ্ধে লড়েছিল; জাগিয়ে ছিল ঘুমন্ত বিশ্বের বিবেক।