>করোনাভাইরাস পাল্টে দিয়েছে আমাদের জীবনের বাস্তবতা। দেশ-বিদেশের পাঠকেরা এখানে লিখছেন তাঁদের এ সময়ের আনন্দ-বেদনাভরা দিনযাপনের মানবিক কাহিনি। আপনিও লিখুন। পাঠকের আরও লেখা দেখুন প্রথম আলো অনলাইনে। লেখা পাঠানোর ঠিকানা: [email protected]
এক মাসের বেশি হয়ে এল পরমার সঙ্গে আমাদের দেখা নেই। আমাদের একমাত্র মেয়ে সে। দিনের কাজের শেষে অথবা রাতের শিফটে কাজে যাওয়ার আগে ফেসটাইমে আমাদের সঙ্গে কথা হয়। আমরা দুরু দুরু বুকে ওর কলের অপেক্ষায় থাকি।

বুক দুরু দুরু করার কারণ আছে। পরমা পেশায় চিকিৎসক। কাজ করে নিউইয়র্কের ব্রঙ্কসের মন্টিফিউর হাসপাতালে। হাসপাতালের সঙ্গেই বরাদ্দ করা অ্যাপার্টমেন্টে ওর বাস। শেষ বাসায় এসেছিল ১ মার্চ। করোনাভাইরাস মোকাবিলায় নিউইয়র্ক শহরে সেদিন বিশেষ ব্যবস্থার কথা ঘোষণা করা হয়েছে। আমাদের সঙ্গে রাতের খাবার খেতে খেতেই জানাল, সে সাইকিয়াট্রি থেকে মেডিসিনে যাওয়ার অপশন দিয়েছে। কারণ, এখন মেডিসিনে অনেক চিকিৎসক দরকার। হাসপাতালে দলে দলে রোগী আসছেন। তুলনায় চিকিৎসক অনেক কম। চিকিৎসকেরা হিমশিম খাচ্ছেন। পরমা বলল, ‘এ অবস্থায় কি আমি সাইডলাইনে বসে থাকতে পারি?’
পরমা সাইকিয়াট্রিস্ট। আমরা ভেবেছিলাম, এ কারণে করোনা রোগীদের সঙ্গে সরাসরি ওর কাজ নেই। ওর কথা শুনে আমরা দুজনই স্তম্ভিত। মা-বাবার সহজাত শঙ্কা থেকে বলতে চাইলাম, যাওয়াটা কি এতই জরুরি? কিন্তু ওর মুখে যে দীপ্তি আর দৃঢ়তা দেখলাম, তাতে আর সাহস হলো না। মেয়ের সাহস আর মানসিকতা দেখে বুকটা ভরে গেল।
প্রতি সপ্তাহের মতো আজও ওর মা ওর জন্য নানা রকম খাবার তৈরি করেছে। নানা রকম কনটেইনারে ভরে আমরা সাধারণত ওকে খাবার দিয়ে দিই। সারা সপ্তাহ ফ্রিজে রেখে খায়। আজও তা-ই হলো। যাওয়ার আগে পরমা বলল, ‘পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত আমি কিন্তু বাসায় আসব না। তোমাদের মিস করব। কিন্তু তোমাদের তো অসুস্থ করে দিতে পারি না।’
আমরা প্রতিদিন শুধু দোয়া করি, ও যেন সুস্থ থেকে আরও মানুষকে সেবা করতে পারে। প্রতিদিনই কাজে যাওয়ার আগে ভার্চ্যুয়াল আলাপে সে জানায়, চিকিৎসকেরা কীভাবে রোগীদের বাঁচানোর চেষ্টা করছেন। হাসপাতালে এখন নিশ্বাস নেওয়ারও সময় নেই। মনিটরে বিপ বিপ শব্দ করে জানান দিচ্ছে কোনো রোগীর রক্তচাপ দ্রুত নিচে নামছে। নার্সরা সাদা পর্দা দিয়ে ঘিরে হৃৎপিণ্ডে ইলেকট্রিক শক দিয়ে তাঁকে ফেরানোর চেষ্টা করছেন। আরেক চিকিৎসক তখন চেঁচিয়ে বলছেন, ভেন্টিলেটর চাই। মরণাপন্ন কোনো মানুষকে তাঁর পরিবারের সঙ্গে ফেসটাইমে শেষবারের মতো দেখা করিয়ে দিচ্ছে পরমা।
টেলিফোনে পরমা বলল, ‘এত মানুষ মারা যাচ্ছে, কিন্তু কারও জন্য থমকে দাঁড়িয়ে একটু দুঃখও করতেও পারছি না। একজনের কাজ শেষ করে ছুটে যেতে হচ্ছে আরেকজনের কাছে। চিকিৎসকেরাও আছে ভীষণ মানসিক চাপে। একসঙ্গে এত মৃত্যু তারাও কেউ কখনো দেখেনি। সবচেয়ে হৃদয়বিদারক হচ্ছে মৃত্যুর সময় চিকিৎসক ছাড়া পাশে কোনো প্রিয়জন না থাকা।’ ওর মুখে এসব শুনতে শুনতে মনে হয় যেন চলচ্চিত্রের কোনো দৃশ্য। আহা, সত্যিই যদি তা-ই হতো?
প্রথম দিকে ওকে নিয়ে খুবই আতঙ্কে থাকতাম। এখন অনেকটাই কাটিয়ে উঠেছি। তবে মেয়েটাকে বারবার দেখতে ইচ্ছা করে। আমাদের চাপাচাপিতে বলল, একদিন বাসায় আসবে, তবে একটা শর্তে। এসে বাসার কাচের দরজার বাইরে ও দাঁড়িয়ে থাকবে। আর আমরা ওর খাবার আর প্রিয় ভিডিও গেম কনসোলটা বাইরে রেখে দেব। ব্যস, এভাবেই আমাদের দেখা হবে। এরপর বাইরে থেকেই খাবার নিয়ে ও চলে যাবে।
চীনের উহানে যখন করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ল, তখন টিভির খবরে একটি দৃশ্য দেখেছিলাম। করোনায় আক্রান্ত মাকে দেখতে মেয়ে হাসপাতালে এসেছে। কিন্তু দেখছে দূর থেকে। মা হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। মেয়েও। যেন অদৃশ্য এক আলিঙ্গন। সেদিন কে ভেবেছিল, আমরাও একদিন এমন পরিস্থিতিতে পড়ব।
মেয়েটাকে এত কাছে পেলেও আমরা ছুঁতে পারব না, ভাবতেই চোখ ভিজে যাচ্ছে। ওর মা সেদিন থেকেই কাঁদতে কাঁদতে ওর প্রিয় খাবারগুলো রান্না করছে।
আবদুল্লাহ জাহিদ, ম্যানেজার, কুইন্স লাইব্রেরি, হলিস শাখা, যুক্তরাষ্ট্র