গবেষণা করা অপরাধ হয়ে গেল!

আ ব ম ফারুক
আ ব ম ফারুক

‘মস্তিষ্ক প্রক্ষালক যন্ত্র। এ এমন কল, যাতে রাজকর্ম হয়ে যায় জল। এর সাহায্যে রাজভক্তি প্রকাশে নারাজ যে, তাকে করে তোলে একনিষ্ঠ রাজভক্ত...।’ তবে, সরকারি কর্মচারী ও গবেষকের রাজভক্তি এক রকম নয়। গবেষক যখন শিক্ষক হয়, তার পেটে দানাপানি না থাকলে আত্মমর্যাদা টনটনে থাকে। মন্ত্র স্থাপন করে কৃষক-শ্রমিককে বশে আনা যায় বটে, কিন্তু শিক্ষক হুলিয়া নিয়ে পালিয়ে বেড়ায়। জানতাম তাকে বশে আনা দায়। কিন্তু কলিকালে গুরু মশায় অকালে আত্মসমর্পণ করে পায়ে লুটায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি অনুষদের বিভিন্ন বিভাগের চেয়ারম্যানদের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দেখে তাই মনে হয়। বাপু, আমরা এসবে নেই। সব দায় অধ্যাপক ফারুকের। আমরা দায় মুক্তি চাই। তাঁদের মুক্তি দিন। চলুন, আমরা গবেষণার গল্প শুনি।
ভালোবাসার বন্ধন যত নিবিড় হোক না কেন, কক্সবাজারে বেড়াতে যাওয়া আপনার প্রিয়তমাকে ভিমরুলে হুল ফুটালে প্রেয়সীর ব্যথা ঢাকার কারওয়ান বাজারে অফিসে বসে উপলব্ধি করতে পারবেন না। কিন্তু কোয়ান্টাম মেকানিক্সের জগতে বিজড়িত বস্তুদ্বয়কে পৃথক করে গণনা যোগ্য দূরত্বে রাখলেও তারা বিজড়িত বস্তুর ন্যায় আচরণ করে, যাকে আইনস্টাইন কোয়ান্টাম মেকানিক্সের ভৌতিক ক্রিয়া নামে আখ্যায়িত করেছেন। এই একটি কারণে তিনি কোয়ান্টাম মেকানিক্সকে অসম্পূর্ণ ভাবতেন। ২০১৬ সালে প্রমাণিত হয় ‘কোয়ান্টাম এন্টাংগেলমেন্ট (বিজড়ায়ন) কোন ভৌতিক ক্রিয়া নয়, বাস্তব ঘটনা। শতবর্ষ ধরে পদার্থবিজ্ঞানীদের নিরন্তর গবেষণার ফলে এ সত্য উদ্‌ঘাটিত হয়। প্রকারান্তরে আইনস্টাইনের ধারণা ত্রুটিযুক্ত প্রমাণিত হয়। অতি সম্প্রতি পদার্থবিজ্ঞানীরা একটি জটিল পরীক্ষার মাধ্যমে একটা লেজার থেকে এক জোড়া ফোটনকে বিভাজিত করে দুটি ভিন্ন পথে পরিভ্রমণ করিয়ে একটি বিশেষ ক্যামেরার সাহায্যে ছবি ধারণ করে দেখান যে, বিচ্ছিন্ন দুটো ফোটন সর্বদা একে অন্যের প্রতিচ্ছবি ও তারা এক জোড়া বিজড়িত ফোটনের ন্যায় আচরণ করছে।
শত বছরব্যাপী শত শত পদার্থবিজ্ঞানীদের প্রাণান্ত প্রচেষ্টা ও নিরন্তর গবেষণায়, পরীক্ষায়, নিরীক্ষায় গ্রহণ ও বর্জনের মাধ্যমে বিজড়ায়ন আজকের অবস্থানে এসেছে। এটি একটি মৌলিক গবেষণা। এটিকে মানবকল্যাণে ব্যবহারের জন্য গবেষণা চলছে। সুপার কম্পিউটার, অত্যাধুনিক মাইক্রোফোন ও বায়োকম্পাস শিগগিরই বাজারে আসবে। এসব প্রায়োগিক গবেষণার ফল। পিয়ার রিভিউ জার্নাল থেকে শুরু করে বিভিন্ন দৈনিক ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া এ গবেষণার বিষয় প্রকাশ করেছে। প্রটোকলজনিত কোন সমস্যার উদ্ভব হয়নি। এসব গবেষণা যেসব দেশে হয়, সেসব দেশে সুন্দর পদ্ধতি তৈরি করা আছে। তাই অনাকাঙ্ক্ষিত ও উদ্ভট কোন সমস্যার উদ্ভব হয় না। কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট যদি না থাকে ও কোন উৎস থেকে যদি অর্থ গ্রহণ না করেন, তবে স্বাধীনভাবে করা গবেষণা কর্মের ফলাফল গবেষক যেখানে খুশি প্রকাশ করতে পারেন। পিয়ার রিভিউ জার্নালে প্রকাশের পর কেবল প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় প্রকাশ করা যাবে এমন উজবুক রিসার্চ প্রটোকল বিশ্বের কোনো দেশে নেই। সচরাচর গবেষকেরা পিয়ার রিভিউ জার্নালে প্রকাশের আগে বিভিন্ন কনফারেন্সে কাজের অংশবিশেষ উপস্থাপন করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আ ব ম ফারুকের গবেষণা মৌলিক বা প্রায়োগিক কোনটিতে পড়ে না। ওনার গবেষণাকে জনস্বার্থে গবেষণা বা গবেষণাধর্মী পরীক্ষণ বলা ভালো। ঢাকার বাতাসে কার্বন ড্রাই অক্সাইড বা কার্বন মনো অক্সাইড, ওজন ও সিসার পরিমাণ কত, তা বের করা কোনো মৌলিক গবেষণা নয়। আবার দুধে অ্যান্টিবায়োটিক বা অন্যান্য উপাদান কী পরিমাণে আছে, তা নির্ণয় করা কোন মৌলিক ও প্রায়োগিক গবেষণা নয়, তাই এসব পিয়ার রিভিউ জার্নালে প্রকাশের সম্ভাবনা সীমিত। বিভিন্ন দেশের সরকার জনস্বার্থে সরকারি অর্থায়নে এ ধরনের পরীক্ষা করে থাকেন, কারণ জনগণের দ্বারা নির্বাচিত সরকার জনগণের কাছে দায়বদ্ধ।
অধ্যাপক ফারুক রিসার্চ প্রটোকল নয়, রিসার্চ এথিকস মানেননি। আমি যত দূর জানি, বাংলাদেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আইআরবি (ইনস্টিটিউশন রিভিউ বোর্ড) আছে, কিন্তু তারা কতটা সক্রিয় তা অনেকের অজানা। অধ্যাপক ফারুক যেহেতু অবসরপ্রাপ্ত, তাই তাঁর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইআরবির অনুমোদনের প্রয়োজন নেই। তা ছাড়া তিনি এমন কোনো গবেষণা করেননি যাতে প্রাণী, পরিবেশ বা প্রতিবেশের কোন প্রকার ক্ষতির আশঙ্কা আছে। তবে গবেষণা নীতিমালা অনুসারে তিনি কোন কোম্পানির খাদ্যপণ্যের নাম উল্লেখ করতে পারেন না, যতক্ষণ না তাদের অথবা বিএসটিআইয়ের অনুমতি না পান। কিন্তু আমাদের দেশে কোনো সিস্টেম নেই। অধ্যাপক ফারুক কিইবা করতে পারেন। এখন যদি কোম্পানিগুলো ওনার বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করেন, একজন অধ্যাপকের পক্ষে তা মোকাবিলা করার সম্ভব নয়। আবার কোম্পানিগুলো প্রতারণার আশ্রয় নিতে পারে, তারা এখন ভালো নমুনা তৈরি করে অতি সহজে প্রমাণ করতে পারবে, অধ্যাপক ফারুকের গবেষণা ত্রুটিযুক্ত। আবার অধ্যাপক ফারুক কোম্পানিগুলোর কাছে ক্ষমা চেয়ে তার গবেষণার ফলাফল প্রত্যাহার করে বলতে পারেন, জনগণ তোমরা দুধের বদলে অ্যান্টিবায়োটিক, ডিটারজেন্ট ও সিসা খাও, আমরা কী আসে যায়।
কিন্তু সরকার ও বিএসটিআই লেজে খেলা দেখার জন্য নয়, জনস্বার্থ দেখা তাদের দায়িত্ব। এ পরীক্ষা করার নয়, করানোর দায়িত্ব ছিল বিএসটিআইয়ের। হাইকোর্টে বিএসটিআইয়ের আইনজীবী বলেছেন, তাদের এ ধরনের পরীক্ষা করার সুযোগ-সুবিধা নেই। তাহলে প্রশ্ন থাকে, বিএসটিআই কীভাবে পাস্তুরিত দুধ বাজারজাতকরণের অনুমোদন দিয়ে থাকে? বিএসটিআই কোন গবেষণা প্রতিষ্ঠান নয়, এটি একটি প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান। বিসিএসআইআর, আইসিডিডিআরবি, অ্যাটমিক এনার্জি কমিশন ও বিশ্ববিদ্যালয় হলো গবেষণা প্রতিষ্ঠান। বিএসটিআইয়ের কাজ হল এসব গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকে গবেষণা ও পরীক্ষা করে নিয়ে তার ফলাফলের ভিত্তিতে খাদ্যপণ্য বাণিজ্যিক অনুমোদন দেওয়া। আবার ব্যবসায়ীদের কাজ এসব গবেষণা প্রতিষ্ঠানে এসে পর্যাপ্ত গবেষণা ও পরীক্ষণের মাধ্যমে তাদের খাদ্যদ্রব্যের উপাদানের সঠিক মাত্রা নিরূপণ করা ও বিএসটিআইতে অনুমোদনের জন্য জমা দেওয়া। আমাদের বিএসটিআই আসলে নিধিরাম সর্দার।
বিশ্বে এফডিএর সুনাম সুবেদিত। আসুন খুব সংক্ষেপ দেখি, এফডিএ কীভাবে কাজ করে। এটি একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। পরিসংখ্যান বলে এটি আমেরিকার অর্থনীতির প্রায় ১৪ ভাগ নিয়ন্ত্রণ করে। ধরুন, কোন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান কোন খাদ্যদ্রব্য বাজারজাত করতে এফডিএতে আবেদন করেছে। এফডিএ প্রথমে তার বিভিন্ন দপ্তরের সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীদের ওই খাদ্যদ্রব্যের গুণমান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের দেওয়া সব তথ্য-উপাত্ত যাচাই করতে দেয়। অতঃপর অনেকটা সিনেটের মতো তারা একাডেমিক কাউন্সিলের সভা ডাকে। তাতে থাকে এফডিআইয়ের বিজ্ঞানী ও গবেষক, ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানী, গবেষক ও প্রশাসক, এফডিএর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, ব্যবসায়ীদের ও এফডিএর আমন্ত্রিত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানীরা। প্রথমে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে তাদের সব তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করা হয়। তারপর এফডিএর পক্ষ থেকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে ব্যবসায়ীদের দাবি করা বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করা হয়। ব্যবসায়ীরা কিছু লুকিয়ে থাকলে বা কিছু বাড়িয়ে বললে, তা সবার সামনে উন্মুক্ত করা হয়। শেষে এফডিএর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও আমন্ত্রিত অতিথিরা ভোট দিয়ে ঠিক করেন, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ওই পণ্য বাজারজাত করতে পারবে কি না? সেখানে প্রশ্নোত্তর পর্ব নামে আরেকটা অংশ থাকে, যেখানে যে কেউ অন্যের মতামত নিয়ে প্রশ্ন করতে পারে। এভাবে একটি ভোগ্যপণ্য বাজারে আসবে কি না, তা নির্ধারণ করা হয়।
আমাদের বিএসটিআইয়ের এমন কোন পদ্ধতি আছে কি? লোকবল, পর্যাপ্ত গবেষক, বিজ্ঞানী, সরকারি সহযোগিতা, পরীক্ষণ ও গবেষণার পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা আছে কি? সহজ উত্তর নেই। আমাদের বিএসটিআই খাজা বাবার দরবার। এখানে কোন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আবেদন করে বিফল হয় না। এখানে কালিজিরার নামে ইঁদুরের বিষ্ঠা, গুঁড়া মরিচের বদলে ইটের গুঁড়া বিক্রির অনুমোদন মেলে।
আমরা যত উন্নয়নের কথা বলি না কেন, দুধ এখনো আমাদের দেশে সর্বসাধারণের খাবার নয়। এখনো নিম্ন, নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তরা তাদের কষ্টার্জিত অর্থ দিয়ে সন্তানের জন্য এসব পাস্তুরিত দুধ কেনে। অথচ বিএসটিআই বলছে, পাস্তুরিত দুধে সহনীয় মাত্রার চেয়ে অধিক সিসা পাওয়া গেছে। ভয়ানক বিপদের কথা, একটা প্রজন্মকে ধ্বংস করতে সিসাই যথেষ্ট। আর এই সিসা একটি শিশুর মস্তিস্ক স্থায়ীভাবে ধ্বংস করে দিতে পারে। জনস্বার্থে সরকার কোম্পানিগুলোকে তাদের পাস্তুরিত দুধ বাজার থেকে প্রত্যাহার করতে বাধ্য করতে পারে। যদি এবং কেবল যদি কোম্পানিগুলো প্রমাণ করতে পারে তাদের পাস্তুরিত দুধ মানোত্তীর্ণ, তবে তাঁরা আবার বাজারে আসার অধিকার রাখে।
সঙ্গে সঙ্গে বিএসটিআইকে এফডিএর আদলে ঢেলে সাজাতে হবে, বাড়াতে হবে লোকবল, গবেষণা ও পরীক্ষণের সুযোগ-সুবিধা। বিএসটিআইকে বিশ্ববিদ্যালয় ও অপারপর গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কলাবোরেশনে আসতে হবে। প্যাকেটজাত সব খাবারের প্যাকেটে পরিষ্কার বাংলায় খাবারের বিভিন্ন উপাদান ও পরিমাণ অবশ্যই লিখতে হবে। না হলে লাইসেন্স বাতিল করতে হবে। সব ধরনের খাবার হোটেল এমনকি রাস্তায় খাবার বিক্রেতাদের লাইসেন্স থাকতে হবে।
এটা মনে রাখা উচিত, গবেষণা মন্ত্রী বা মন্ত্রণালয় সচিব ও সচিবালয়ের কাজ নয়, এমনকি কাজ নয় বিএসটিআইয়ের। অথচ তারা অনধিকার চর্চা করছে। গবেষণা গবেষক ও শিক্ষকদের কাজ। রিসার্চ প্রটোকলের দোহাই দিয়ে সরকারের একজন অতিরিক্ত সচিব বিশ্ববিদ্যালয়ের (স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের) একজন প্রবীণ অধ্যাপক ও গবেষককে অশোভন ভাষায় কথা বলা ও সময়সীমা বেঁধে দিয়ে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া অভব্যবতা ছাড়া কিছু নয়। অধ্যাপক ফারুক খুব সুন্দর বলেছেন, ‘একটি গবেষণাকে ভুল বলার জন্য আরেকটি গবেষণা দরকার।’ এটা ক্ষমতা বা দাম্ভিকতা প্রকাশের বিষয় নয়, এটা শুধুই গবেষণার বিষয়।
বাংলাদেশে মৌলিক গবেষকের সংখ্যা হাতে গোনা, প্রায়োগিক গবেষণা করার পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নেই। কিন্তু যারা জনস্বার্থে স্বপ্রণোদিত হয়ে গবেষণা করছেন তাঁদের গলা চিপে হত্যা করা হচ্ছে কার স্বার্থে? স্বাধীনভাবে গবেষণা করার অধিকার বিশ্বব্যাপী সর্বজনবিদিত। এটি কোন হীরক রাজার দেশ নয় যে, গবেষকেরা যন্তরমন্তর ঘরে বসে মস্তিষ্ক প্রক্ষালক যন্ত্র বানাবে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা হুলিয়া নিয়ে পালাবে, গায়কেরা কীর্তন গাইবে, লেখকেরা সভাকবি সেজে রাজমন্ত্র লিখবে। এটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ।