গৃহহীন আর তরুণদের জন্য কাজ করতে চাই

মেরী জোবাইদা
মেরী জোবাইদা

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আমেরিকান মেরী জোবাইদা। নিউইয়র্ক স্টেট অ্যাসেম্বলি ডিস্ট্রিক্ট-৩৭ থেকে প্রার্থিতা ঘোষণা করেছেন। প্রথম বাংলাদেশি-আমেরিকান হিসেবে এই আসনে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রাইমারিতে অ্যাসেম্বলিওম্যান পদে নির্বাচনী লড়াইয়ে নেমেছেন তিনি। 

আমেরিকায় রাজনীতি এবং নির্বাচন প্রসঙ্গে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রথম আালো উত্তর আমেরিকাকে মেরী জোবাইদা বলেন, ‘আমি তিন সন্তানের মা এবং একজন সাধারণ ঘরের মেয়ে। আমি কোনো রাজনীতিবিদ নই। রাজনীতি করার কথা আমার ছিল না। যে কাজ করছিলাম তা করে চারটে ডালভাত ঘরে নিয়ে সন্তানসহ খাওয়ার কথা ছিল আমার। কিছু কারণ আমাকে তাড়িত করেছে রাজনীতিতে নামার জন্য।’

মেরী জোবাইদা নির্বাচনী লড়াইয়ে নেমে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন নিউইয়র্কের বর্তমান অ্যাসেম্বলিওম্যান ক্যাথরিন নোলানকে। ক্যাথরিন দীর্ঘ প্রায় দুই দশক ধরে এই আসনের নির্বাচিত অ্যাসেম্বলিওম্যান হিসেবে নিউইয়র্কের রাজধানী আলবেনির ক্যাপিটাল হিলে প্রতিনিধিত্ব করছেন। ২০২০ সালে অনুষ্ঠেয় নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের নির্বাচনে বিজয়ী হলে মেরী জোবাইদা প্রথম বাংলাদেশি আমেরিকান হিসেবে আলবেনির প্রতিনিধি সভায় যোগ দেওয়ার গৌরব অর্জন করবেন। প্রতিনিধিত্ব করবেন নিউইয়র্ক-এর ডিস্ট্রিক্ট-৩৭ এর। ইতিমধ্যেই নিউইয়র্কের সংবাদমাধ্যমে তাঁর প্রার্থিতা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।

নিউইয়র্ক নগরের কুইন্স ব্রিজ, লং আইল্যান্ড সিটি, সানি সাইড, উডসাইড, ম্যাসপাথ ও রিজউড নিয়ে অ্যাসেম্বলি ডিস্ট্রিক্ট-৩৭ আসন। ২০১০ সালের আদমশুমারির হিসেবে, এই আসনে ১ লাখ ২৯ হাজার ১৮৭ ভোটারের বসবাস। বাংলাদেশি কমিউনিটি ছাড়াও বিভিন্ন প্রগতিশীল গ্রুপসহ ইহুদি, খ্রিষ্টান ও স্প্যানিশ কমিউনিটি তার সমর্থনে এগিয়ে এসেছেন।

প্রথম আলোর পক্ষ থেকে ১৫ অক্টোবর আলাপে মেরী জোবাইদা বলেন, ‘রাজনীতিতে আসার কিছু কারণ আছে আমার। আর এসব কারণের মধ্যে আমাদের স্থানীয় ইস্যুও রয়েছে। ধরুন, এই জেন্টিফিকেশন। ১০ বছর ধরে আমরা দেখতে পাচ্ছি, বিনিয়োগকারীরা আমাদের এলাকাকে পরিবর্তন করে দিয়েছে। এটা এক ধরনের দখলদারি। মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। সন্তান-সন্ততি নিয়ে নিউইয়র্ক নগরের এসব এলাকা আমদের মতো মানুষের জন্য বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠেছে দিনে দিনে। দুই হাজার ডলার ভাড়ার একটা বাসার ভাড়া এখন পাঁচ হাজার হয়েছে তথাকথিত এই জেন্টিফিকেশনের কারণে। যে হারে বাসা ভাড়া বেড়েছে সেই হারে মানুষের আয় কিন্তু বাড়েনি বা বাড়ছে না। তাহলে এত ভাড়া দিয়ে মানুষ থাকবে কীভাবে?’

মেরী জোবাইদা বলেন, ‘আমি বিষয়টি চিন্তা করে অনেক নির্ঘুম রাত কাটিয়েছি। এ রকম চলতে থাকলে বাচ্চাদের নিয়ে নিউইয়র্কে বাস করব কীভাবে? আমাদের চোখের সামনেই মানুষ নিজের ঘর থেকেই ঘরহীন হয়ে পড়ছে। কোথা থেকে যেন ধনী মানুষগুলা এসে বিতাড়িত করে দিচ্ছে এখানে দীর্ঘদিন থেকে বসবাস করা এই পরিবারগুলোকে। অনেক মানুষই গৃহহীন হয়ে পড়ছে। এটা আমাদের কমিউনিটির জন্য একটি মারাত্মক সমস্যা। এই কমিউনিটির ২১ হাজার মানুষ সন্তান-সন্ততি নিয়ে এখন হোমলেস-সেল্টারে আছে। তাদের সন্তানদের স্কুলিং কীভাবে হবে। পরিবার, বাচ্চাদের আমরা ঘর দিতে পারছি না, স্কুল দিতে পারছি না। এটা আমাদের জন্য অত্যন্ত লজ্জার। নিউইয়র্কের এমন জীবনতো আমরা চাইনি। আজ বিশ্বের কোনায় কোনায় মানুষ নিউইয়র্কের নাম জানে। কিন্তু আমাদের নিউইয়র্কের কি এ অবস্থা হওয়া উচিত?’
নির্বাচন কেন করছেন, তার কারণ ব্যাখ্যা করে জোবাইদা বললেন, ‘আমরা নামে গণতান্ত্রিক, দলের নাম ডেমোক্রেটিক পার্টি। কিন্তু গত প্রায় ৩০ বছরের বেশি সময় ক্যাথরিন নোলান ডিস্ট্রিক্ট- ৩৭-এর অ্যাসেম্বলির দায়িত্বে আছেন। ১০ বছর ধরে তাঁকে চ্যালেঞ্জই কেউ করছে না।

জগদ্দল পাথরের মতো তিনি একটি আসন অলংকৃত করে বসে আছেন। আর নতুন কেউ আসবে না, তাঁকে চ্যালেঞ্জ করবে না। এটাতো কোনো গণতান্ত্রিক পদ্ধতি হতে পারে না। অথচ যে এলাকার মানুষের প্রতিনিধিত্ব তিনি করছেন, তাদের কষ্ট বেড়েই চলেছে। সন্তানদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের যে আমেরিকান স্বপ্ন তারা দেখেছিল, সেই অনিশ্চয়তা বেড়েই চলেছে। কুইন্সব্রিজ, লং আইল্যান্ড সিটি, সানিসাইড, উডসাইড, মেসপ্যাথ ও রিজউড নিয়ে গঠিত আমাদের এই ডিস্ট্রিক্ট। এই নির্বাচনী এলাকার মানুষ বঞ্চিত তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে।’

নিউইয়র্ক মূলধারার রাজনীতির প্রধান ইস্যুগুলোর ক্ষেত্রে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি কী—এমন প্রশ্নে মেরী জোবাইদা নিজেকে একজন বামপন্থী প্রগতিশীল হিসেবে পরিচয় দেন। তিনি বলেন, এখানকার ক্রিমিনাল জাস্টিস পদ্ধতিটা প্রকটভাবে ত্রুটিপূর্ণ। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ছোট ছোট অপরাধের কারণে তরুণদের গ্রেপ্তার, সংশোধন ব্যবস্থার পরিবর্তে তাদের অপরাধী হিসেবে রেকর্ডভুক্ত করা হচ্ছে, যার ফলে তরুণদের জীবন বিপন্ন হচ্ছে। দশকের পর দশক ধরে ক্ষমতায় বসে থাকা রাজনীতিবিদদের আমাদের তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো ভাবনা নেই। আমি নির্বাচিত হলে স্টেট পর্যায়ে তরুণদের কল্যাণে কাজ করতে চাই। গর্ভপাত প্রসঙ্গে মেরী বলেন, একজন নারীর শরীরের ব্যাপারে তার নিজের পছন্দ ও অধিকারের পক্ষে তিনি।

নিজেকে বাম প্রগতিশীল ডেমোক্র্যাট হিসেবে পরিচয় দেওয়া মেরী জোবাইদাকে তাঁর হিজাব নিয়ে প্রশ্ন করা হয়। হিজাব একটি ধর্মীয় পোশাক এবং একই সঙ্গে নিজেকে বাম প্রগতিশীল বলাটা কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন—এমন প্রশ্নের জবাবে মেরী জোবাইদা বলেন, ‘আমি একজন প্র্যাকটিসিং মুসলমান। আমার ধর্মে যে ন্যায্য মজুরি, ন্যায়ভিত্তিক সমাজের কথা বলা আছে তাঁর সঙ্গে আমার বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থানের কোনো পার্থক্য নেই। আমি একই সঙ্গে ইসলাম ধর্মের অনুসারী এবং আমেরিকার রাজনীতিতে বাম প্রগতিশীল ধারার প্রতিনিধিত্ব করি।’