এক কোটিরও বেশি বাঙালি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বসবাসরত আছেন। এর মধ্যে ইউরোপ ও আমেরিকায় বসবাস করেন প্রায় ২৫ লাখ। তাঁরা যে কেবল মহা কর্মযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছেন তা নয়; অনেকেই শিক্ষা-দীক্ষায়, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির আবিষ্কারে বিস্ময় সৃষ্টি করেছেন। অনেকেই শ্রম, ঘাম, মেধা, সাধনা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতায় উন্নতির শিখরে পৌঁছেছেন। বাঙালির বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিস্ময়কর আবিষ্কারের সুখ্যাতি বিশ্বময় ছড়িয়ে গেছে। তাঁদের সম্মান ও গৌরবে বাংলাদেশি হিসেবে আমরাও গর্বিত। প্রবাসে জীবন-জীবিকার লড়াই-সংগ্রামের পাশাপাশি বাঙালির ভাষা-সমাজ-সংস্কৃতি ও সভ্যতার লড়াই সংগ্রামও চলছে। বিদেশে বসবাসরত বাঙালিরা নিজস্ব সামাজিকতা, নিজেদের সংস্কৃতির জাগরণ—উত্তরণের যোদ্ধা হিসেবে কাজ করে চলছেন। বিশ্বব্যাপী প্রবাসী বাঙালির জীবনযুদ্ধের পাশাপাশি ভিনদেশিদের কাছে যে মূল্যবোধ, শ্রদ্ধাবোধ ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তা আমাদের প্রবাসীদের অর্জিত অমূল্য সম্পদ। ওই সম্পদের ওপর ভিত্তি করেই, প্রবাসীরা এগিয়ে যাবেন স্বপ্ন পূরণের অভীষ্ট লক্ষ্যে। বাঙালি একদিন বিশ্ব জয় করবে।
প্রবাসীরা শুধু শ্রমজীবী, কর্মজীবী, পেশাজীবী ও অর্থ উপার্জনকারী রেমিট্যান্স দাতা হিসেবে পরিচিত হবেন কেন? শৃঙ্খলাবদ্ধ প্রবাস জীবনে বাঙালিরা এখন আর শুধু বেঁচে থাকার জন্য সংগ্রাম করেন না। লড়াই করছেন নিজেদের বিবর্তন ও ভাষা সংস্কৃতিকে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। বিশ্বের বহু উন্নত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নিজস্ব সংস্কৃতিতে নিজেদের মতো করে বেঁচে থাকার সংগ্রাম চলছে বাঙালির। এই টিকে থাকা শুধুমাত্র জীবনকে বদলানোর জন্য নয়। সামগ্রিক মুক্তি ও পরিবর্তনের জন্যও। এই বিবর্তনের পথ ধরেই একদিন বাঙালি-সমাজ ও সভ্যতা গড়ে উঠবে পৃথিবীর বহু দেশে। বাঙালিরা আজ বিশ্বের বহু দেশে এই লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছেন। একটি জাতির ভাষা-সংস্কৃতি শিল্প সাহিত্য কৃষ্টি ঐতিহ্য হচ্ছে অমূল্য সম্পদ। এই সংস্কৃতি ও ভাষাকে আন্তর্জাতিক পরিসরে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়। নিজস্ব ভাষার অঞ্চল গড়ে তোলা যায়। নিশ্চয় তা হবে গৌরবের। এ জন্য প্রয়োজন আমাদের প্রবাসের নতুন প্রজন্মকে সংস্কৃতির দর্শক হিসেবে অনুষ্ঠানাদিতে হাজির করানো। তার চেয়ে বেশি প্রয়োজন বাঙালি সংস্কৃতির তালিম প্রদান করা।
বিশ্বের অনেক দেশে বাংলা স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছেন প্রবাসী বাঙালিরা। সেগুলো দক্ষতার সঙ্গে পরিচালিত হচ্ছে। আমেরিকার নিউইয়র্কেও কয়েকটি বাংলা স্কুল রয়েছে। উত্তর পূর্ব আমেরিকার বাঙালি অধ্যুষিত অঙ্গরাজ্য নিউইয়র্কসহ অনেক অঙ্গরাজ্যে বাংলাদেশের জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় সব দিবসই পালিত হয়। কিন্তু মৌলিক অনেক বিষয় এখানে অনুপস্থিত থাকে। এই সব অনুষ্ঠানে প্রবাসী প্রজন্মের তেমন একটা যোগসূত্র নেই বললেই চলে। প্রবাসের নতুন প্রজন্ম বাংলাদেশের পরিচিতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য, কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও গৌরব আর অহংকারের বিষয়গুলোও জানে না। বিশেষ করে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি ঘরে ঘরে অনেকটা অবহেলিত। ন্যূনতম যারা দেশ থেকে এসএসসি বা ইন্টারমিডিয়েট পাস করে আসেন, বাংলা তাদের দখলে থাকে। এসএসসি পরীক্ষার আগে যারা আমেরিকায় পাড়ি জমান, তাঁরা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে ধারণ করা থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েন। আরও অবাক হওয়ার মতো বিষয় হলো, আমাদের দেশ থেকে ন্যূনতম এসএসসি পর্যন্ত পড়ে আসা সন্তানের মায়েরা বিদেশি ভাষা রপ্ত করে নিজের আয়ত্তে নিতে, স্কুলগামী সন্তানদের সঙ্গে নিজ ঘরে ইংরেজি ভাষা শিক্ষার চর্চা শুরু করেন। কিন্তু শেখার নেশায় বিদেশি ভাষা চর্চা এমন একপর্যায়ে পৌঁছায়, তখন নিজ ঘর থেকে বাংলা ভাষা হারিয়ে যায়। বিদেশি ভাষা শেখার মোহে পড়ে, নিজ মাতৃভাষাকে ভুলে যাওয়া, দিন দিন আশঙ্কাজনক ভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রবাসে আমরা জীবনজীবিকার প্রয়োজনে বিদেশি ভাষা শিখব। এটা দোষের বা অন্যায় নয়। কিন্তু নিজ ঘরে বাংলা ভাষার অমর্যাদা, অবজ্ঞা জাতি হিসেবে আমাদের একদিন শিকড় থেকে বিচ্যুত করবে।
এগিয়ে যাওয়ার পথে, আমাদের সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ। আগামী দিনের সকল চ্যালেঞ্জ ঐক্যবদ্ধভাবে মোকাবিলা করে এগিয়ে যেতে হবে। সকলের সম্মিলিত উদ্যোগ ও প্রচেষ্টায় এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। বিবর্তনের গড্ডল প্রবাহে বাঙালি হিসেবে আমাদের অহংকারের জায়গাটি থেকে নতুন প্রজন্মকে হারিয়ে যেতে দিতে পারি না। আমাদের চ্যালেঞ্জ, আমাদের ভাষা, শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি, ইতিহাস ঐতিহ্যকে সমুন্নত রাখার। এবং পরবর্তী প্রজন্মকে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করার পাশাপাশি তাদের মধ্যে স্বদেশ স্বজন ভাবনাচিন্তা জাগ্রত করাতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন আমাদের দেশীয় সংস্কৃতির চর্চা ও বিকাশের সুযোগ তৈরি করা। আমাদের ও আমাদের পূর্বপুরুষদের জন্মভিটা প্রিয় বাংলাদেশের ইতিহাস ঐতিহ্য সংস্কৃতি ও কৃষ্টির সঙ্গে প্রবাসের প্রজন্ম থেকে প্রজন্মকে, শেকড় সমৃদ্ধ মন-মেধায় প্রজ্বলিত করার ক্ষেত্র সৃষ্টি করতে হবে। পূর্বপুরুষদের গৌরব সমৃদ্ধ শেকড় থেকে তারা যেন বিচ্ছিন্ন না হয়ে পড়ে।
লেখক: সাংবাদিক ও সমাজ অনুশীলক, নিউইয়র্ক।