বন্ড বাতিল: আটককেন্দ্রগুলোয় অনশন

গত মাসের শেষ সপ্তাহে আমেরিকার ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইস) কর্তৃক আটক হওয়া কয়েক ডজন আশ্রয়প্রার্থী ফেরিডে লা রিভার কারেকশন সেন্টারে অনশন ধর্মঘট করেন। সে সময় ১৫০ জন অনশনে অংশ নেন বলে দাবি করেছিলেন বিক্ষোভকারীরা। যদিও আইস বলছে মাত্র ২৪ জন ওই অনশন ধর্মঘটে অংশ নেয়। আইস ওই ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন বিক্ষোভ দাবি করলেও গত তিন মাসে এক আটক কেন্দ্রেই ছয়টি অনশন ধর্মঘটের ঘটনা ঘটে।
আশ্রয় আবেদনের পর অভিবাসন মামলাগুলো স্থগিত করা হয়েছিল। স্থগিত হওয়ার পর এসব মামলার প্রক্রিয়া কয়েক বছর সময় নিতে পারে। এর মধ্যে বন্ডে মুক্তি দেওয়ার নির্দেশনা থাকলেও তা করা হয়নি। রিভার কারেকশন সেন্টারের ও এল পাসো প্রসেসিং সেন্টারে ৭৭ দিনের অনশন ধর্মঘটের এটাই ছিল মূল কারণ। কিন্তু এ ঘটনা প্রথমে নজরে আসেনি। তবে অনশনকারীদের আইস এজেন্টরা জোর করে খেতে বাধ্য করলে বিষয়টি মার্কিন সংবাদমাধ্যমের নজরে আসে। বিষয়টি নিয়ে হইচই শুরু হলে আদালত আইস এজেন্টদের এমন পদক্ষেপ বন্ধের আদেশ দেন। ওয়াশিংটনের অভিবাসী অধিকারকর্মী মারু মোরা ভিলালপান্ডো বলেন, ‘আমরা তিন থেকে চার মাসেরর কম সময়ে ভিন্ন জায়গায়, ভিন্ন ভিন্নভাবে এতগুলো ধর্মঘট কখনো দেখিনি।’
এ বিষয়ে আইসের মুখপাত্র ব্রায়ান কক্স বলেন, ‘সাধারণভাবে আইস জনগণের অধিকারকে সম্পূর্ণরূপে শ্রদ্ধা করে। আইস অনশন ধর্মঘটের বিরুদ্ধে কোনোভাবে প্রতিহিংসাপরায়ণ নয়।’
আশ্রয়প্রার্থীদের আটক থাকা অবস্থায় শাস্তি মওকুফের দুটি উপায় রয়েছে, যা এখনো পর্যালোচনাধীন। এগুলো হচ্ছে বন্ড ও প্যারোল। ওবামা প্রশাসনের শেষ দিকে আদালতে ‘বন্ড হিয়ারিং’-এর ব্যবহার বেড়েছিল, যা পরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সময়ে বদলে যায়। সর্বশেষ অ্যাটর্নি জেনারেল উইলিয়াম পি বার ‘বন্ড হিয়ারিং’ তুলে দিয়ে মামলার নিষ্পত্তির আগ পর্যন্ত আশ্রয়প্রার্থীদের আটক রাখার নির্দেশনা দেন অভিবাসন বিচারকদের। আর ‘প্যারোল’ আশ্রয়প্রার্থীদের দেওয়া এক ধরনের মুক্তির স্বীকৃতি। যারা তাদের দেশে নির্যাতনের শিকার এবং ফিরে যেতে ভীত তাদের প্যারোলে মুক্তির বিধান রয়েছে।
কিন্তু এখন আশ্রয়প্রার্থীদের প্রতি ট্রাম্প প্রশাসন কঠোর অবস্থান নিয়েছে। আশ্রয়প্রার্থীদের আটক রাখা কিংবা তাদের জোরপূর্বক আমেরিকার বাইরে থাকার জন্য বাধ্য করা হচ্ছে। নভেম্বরে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা তাদের ধরতে যাচ্ছি, আমরা তাদের মুক্ত করতে যাচ্ছি না। ডিপোর্টেশন শুনানি না হওয়া পর্যন্ত বা আশ্রয়ের শুনানি না হওয়া পর্যন্ত তারা আমাদের সঙ্গে থাকবে এবং দীর্ঘ আদালত পদ্ধতির জন্য অপেক্ষা করবে। এ ক্ষেত্রে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে। আমরা তাদের আর আমাদের দেশে মুক্ত করছি না। তারা অপেক্ষা করবে।’
স্যারাকুস বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রানজেকশনাল রেকর্ডস অ্যাক্সেস ক্লিয়ারিং হাউসের তথ্যমতে, ২০০৯ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে ওবামা প্রশাসনের প্রথম ছয় বছর অভিবাসন আদালতগুলো ৫১ থেকে ৬০ শতাংশ বন্ড প্রত্যাখ্যান করে। ২০১৫ ও ২০১৬ সালে এটি পরিবর্তিত হয়। সাবেক ওবামা প্রশাসনের শেষ দুই বছরে এই হার কমে ৪৪ শতাংশ হয়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অফিস গ্রহণের পর ২০১৮ সালে এ হার আবার বেড়ে ৫২ শতাংশে দাঁড়ায়।
আশ্রয়প্রার্থীদের মধ্যে যারা বন্দরের বাইরের প্রবেশদ্বার দিয়ে আমেরিকায় ঢুকে সীমান্তরক্ষীদের হাতে ধরা পড়েছেন, তাদের জন্য বন্ডের ব্যবস্থা। এই বন্ডের অধীনে মুক্তির সিদ্ধান্তটি দেন আইস বা অভিবাসন বিচারক। আর প্যারোল দেন শুধু আইস এজেন্টরা। কিন্তু দুই ক্ষেত্রেই আইস নিজের নিয়ম ভাঙছে বলে মত দিয়েছেন অভিবাসন আইনজীবীরা।
২০১৮ সালে সিভিল লিবার্টিস ইউনিয়ন আইস ও হোমল্যান্ড সিকিউরিটির কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করে। ওই মামলায় বলা হয়েছিল, আইস নিজস্ব নীতি লঙ্ঘন করছে।
২০০৯ সালের প্যারোল সম্পর্কিত নির্দেশনায় বলা হয়েছে, আশ্রয়প্রার্থীদের প্যারোলে মুক্তি দেওয়া উচিত। যদি তাদের ফিরে যাওয়ার বিশ্বাসযোগ্য ভীতি সম্পর্কিত তথ্য পাওয়া যায়, তবে তাদের পরিচয় প্রতিষ্ঠিত করতে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে তাদের কমিউনিটির জন্য বিপদ বলে উপস্থাপন করা উচিত নয়। এই নির্দেশনা মেনে ২০১১ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে আইস ৯২ শতাংশ আশ্রয়প্রার্থীকে প্যারোল দিয়েছে। ২০১৭ সালে এ হার নেমে মাত্র ৪ শতাংশে দাঁড়ায়, যা নিজের নিয়ম নিজে ভাঙার একটি বড় প্রমাণ।
এদিকে বন্ড বা প্যারোলে মুক্তি পাওয়ার সম্ভাবনা কমার সঙ্গে সঙ্গে কমছে আশ্রয়প্রার্থীদের আমেরিকায় থাকার অনুমোদন পাওয়ার সম্ভাবনাও। ২০১২ সালে যেখানে মাত্র ৪২ শতাংশ আশ্রয়ের আবেদন খারিজ করা হয়েছিল, সেখানে গত বছর এ সংখ্যা বেড়ে ৬৫ শতাংশে দাঁড়ায়। ২০১৩ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে নিউ অর্লেন্ড অভিবাসন আদালত ৮০ শতাংশ আশ্রয় আবেদন অস্বীকার করে। ওকডেলে দ্বিতীয় লুইজিয়ানা অভিবাসন আদালত ৯০ শতাংশ আবেদন অস্বীকার করে। এই আদালতের বিচারক অ্যাগনেলিস এল রিস গত সাত বছরে একটিও আবেদন অনুমোদন করেননি।
অভিবাসী অধিকারকর্মী মারু মোরা ভিলালপান্ডো বলেন, ‘ট্রাম্পের অধীনে অভিবাসন সিস্টেমে মানবাধিকার লঙ্ঘন দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে; এটি নতুন কিছু নয়। বারাক ওবামা প্রশাসনে আটক ও নির্বাসনের অবিশ্বাস্যরকম বিশাল এক মেশিন রেখে গেছেন।’
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নতুন এই পদ্ধতির জন্য দুটি প্রাথমিক কারণ বলেছেন। তাঁর মতে, প্রথমত, মুক্তিপ্রাপ্ত আশ্রয়প্রার্থীরা আদালতের শুনানির জন্য ফিরে আসে না। বড়জোর ৩ শতাংশ আদালতে হাজির হয়। দ্বিতীয়ত, আশ্রয় ব্যবস্থাটি হুমকির মুখে থাকা অভিবাসীদের জন্য কোনো বাধা নয়, বরং এটি তাদের এই দেশে থাকাকে সহজ করবে। ট্রাম্প এমন যুক্তি তুলে ধরলেও তথ্য কিন্তু ভিন্ন কথা বলছে।
২০১৭ সালে প্রকাশিত বিচার বিভাগের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, আশ্রয়প্রার্থীদের ৮৯ শতাংশই শুনানির সময় আদালতে হাজির হয়েছিলেন। ফলে ট্রাম্পের প্রথম যুক্তিটি ধোপে টেকে না।