আন্তর্দেশীয় দত্তক-প্রক্রিয়া (ইন্টার কান্ট্রি অ্যাডপশন প্রসেস) সাধারণত যে দেশ থেকে দত্তক গ্রহণ করা হবে সেই দেশের আইন অনুযায়ী। সুতরাং কোনো প্রবাসী বাংলাদেশি দম্পতিকে স্বদেশ থেকে সন্তান দত্তক নিতে হলে তাদের আইন অনুসরণ করতে হবে।
১৯৯৫ সালে গৃহীত ‘হেগ কনভেনশন অন প্রোটেকশন অব চিলড্রেন অ্যান্ড কো-অপারেশন ইন রেসপেক্ট অব ইন্টার কান্ট্রি অ্যাডপশন’ (সংক্ষেপে হেগ কনভেনশন) অনুসমর্থন করেছে কি না তার ওপর ভিত্তি করে দত্তক নেওয়ার প্রক্রিয়া বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে।
প্রথমে জেনে নেওয়া যাক কোন ধরনের শিশুকে দত্তক নেওয়া যাবে এবং কারা শিশু দত্তক নিতে পারবেন?
এ ক্ষেত্রে প্রথম কোন ধরনের বাচ্চাকে এতিম বা অরফান হিসেবে চিহ্নিত করা হবে—
ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ন্যাশনালিটি অ্যাক্টের ১০১ (বি) (১) (এফ) ধারায় বিদেশে জন্ম নেওয়া ১৬ বছরের কম বয়সী কোনো শিশু (ক) মৃত্যু, নিরুদ্দেশ, পরিত্যাগ অথবা বিচ্ছেদের কারণে যার বাবা-মা কেউই নেই অথবা (খ) যার বাবা-মায়ের একজন নেই কিন্তু অন্যজন আছেন, যিনি ওই সন্তানের যত্ন নিতে সামর্থ্য রাখেন না এবং অভিবাসন ও দত্তকের জন্য লিখিত অপ্রত্যাহারযোগ্য দলিল সম্পাদন করে দিয়েছেন। ইতিমধ্যে দত্তক নেওয়া হয়েছে এমন একজন শিশুর ভাই-বোনকে একই অভিভাবক দত্তক নিতে চাইলে সেই ভাই-বোনের বয়স আঠারোর কম হতে হবে।
কে দত্তক নেওয়ার আবেদন করতে পারবেন—
২৫-এর বেশি বয়সী অবিবাহিত মার্কিন যেকোনো বয়সী বিবাহিত মার্কিন ক্রিমিনাল ব্যাকগ্রাউন্ড চেক, ফিঙ্গারপ্রিন্ট ও হোম স্টাডি সাপেক্ষে বাচ্চা দত্তক নেওয়ার যোগ্য হবেন। গ্রিনকার্ডধারী হলে বাচ্চা দত্তক নেওয়া যাবে না যদি না তাঁর স্বামী/স্ত্রী মার্কিন নাগরিক হন।
যেহেতু বাংলাদেশ মুসলিম অধ্যুষিত দেশ ও মুসলিম আইনে দত্তক নেওয়ার কোনো বিধান নেই, তাই প্রচলিত আইনে বাংলাদেশে চূড়ান্ত দত্তক নেওয়া যায় না। তবে ১৮৭৫ সালের মাইনরিটি অ্যাক্টের ৩ ধারা অনুযায়ী ১৮ বছরের কম বয়সী কোনো শিশুর জন্য ১৮৯০ সালের অভিভাবকত্ব ও পোষ্য (গার্ডিয়ান্স অ্যান্ড ওয়ার্ডস) আইনের ৭ ধারায় জিম্মায় নিতে হলে ১৯৮৫ সালের ফ্যামিলি কোর্ট অর্ডিন্যান্সের এখতিয়ারভুক্ত পারিবারিক আদালতে আবেদন করা যাবে। বাংলাদেশে কেন্দ্রীয় সরকারের কোনো স্বতন্ত্র দত্তক কর্তৃপক্ষ নেই। দত্তকের মতো পারিবারিক বিষয়ে সমুদয় ও একচ্ছত্র এখতিয়ার কেবল পারিবারিক আদালতের। বাংলাদেশে অনেক আইনজীবী রয়েছেন, যাঁরা অভিভাবকত্ব প্রক্রিয়ায় সহায়তা করতে পারেন। বাংলাদেশে কোনো বাচ্চা দত্তক নেওয়ার প্রক্রিয়া এবার আলোচনায় আসা যেতে পারে।
আগেই উল্লেখ করেছি, বাংলাদেশ হেগ কনভেনশন অনুসমর্থন না করায় বাংলাদেশকে নন-কনভেনশন কান্ট্রি হিসেবে বিবেচনা করে অ্যাডপশন প্রসেস করতে হবে। তাই প্রথমত, বাংলাদেশ থেকে বাচ্চা দত্তক নেওয়ার আগে আমেরিকার স্বীকৃত ও অনুমোদিত একটি দত্তক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান বেছে নিতে হবে, যারা আপনি বসবাসরত অঙ্গরাজ্যের নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় হোম স্টাডি সম্পাদন করে আপনার কেসে প্রাথমিক সেবাদানকারী হিসেবে কাজ করবে। ২০১৪ সালের ১৪ জুলাই ইউনিভার্সাল অ্যাক্রেডিটেশন অ্যাক্ট ২০১২-এর অধীনে প্রত্যেক আন্তর্দেশীয় দত্তক কেসে একটি সংস্থা প্রাথমিক সেবাদানকারী হিসেবে কাজ করা বাধ্যতামূলক। এই সংস্থাটিকে অবশ্যই আন্তর্দেশীয় দত্তক আইন ২০০০ ও ২২ সিএফআর ৯৬-এর অধীনে স্বীকৃত ও অনুমোদিত হতে হবে। এই হোম স্টাডি আবার ফরম এম-৭৬০, অরফান হোম স্টাডি টিপ শিট ফর অ্যাডপশন সার্ভিস প্রোভাইডারস অ্যান্ড প্রসপেকটিভ অ্যাডপ্টিভ প্যারেন্টস এবং ৮ সিএফআর ২০৪.৩১ ও ২২ সিএফআর ৯৬.৪৭-এ উল্লেখিত বিধান অনুযায়ী হতে হবে। প্রাথমিক সেবাদানকারীর তালিকা https://goo.gl/MmnJR8 ওয়েবসাইট থেকে পাওয়া যাবে।
দ্বিতীয়ত দত্তক নেওয়ার যোগ্যতা রয়েছে এমন স্বীকৃতি পেতে ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটির অধীনে দায়িত্ব পালনরত ইউএস সিটিজেনশিপ ও ইমিগ্রেশন সার্ভিসের বরাবরে পূর্ণাঙ্গ হোম স্টাডি রিপোর্ট, নাগরিকত্ব সনদ, প্রয়োজনানুযায়ী বিয়ের কাবিন ও বিবাহবিচ্ছেদের সনদসহ আই-৬০০এ, অ্যাপ্লিকেশন ফর অ্যাডভান্স প্রসেসিং অব অরফান পিটিশনের জন্য ৭৭৫ ইউএস ডলার ফি এবং প্রত্যেক অ্যাডাল্ট হাউসহোল্ড মেম্বারের তথ্যসংবলিত সাপ্লিমেন্টের জন্য ৮৫ ইউএস ডলার ফি জমা দিতে হবে।
তৃতীয়ত, বাংলাদেশে আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শিশুর জিম্মা নিতে হবে। বাচ্চার বসবাসের স্থান অনুযায়ী এখতিয়ারভুক্ত পারিবারিক আদালতে দত্তক নিতে ইচ্ছুক ব্যক্তিকে আইনগত অভিভাবকত্ব নেওয়ার জন্য শিশুর জন্ম সনদ, বাবা-মায়ের মধ্যে কেউ জীবিত থাকলে তার কাছ থেকে অপ্রত্যাহারযোগ্য চুক্তি সম্পাদনের পর সত্যায়িত অঙ্গীকার বা হলফনামাসহ ৬০ টাকা কোর্ট ফি দিয়ে আবেদন করতে হবে। এ সব ক্ষেত্রে অনুমোদন পেতে প্রায় তিন মাস সময় লাগে।
চতুর্থত, এই পর্যায়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে অনাপত্তি ছাড়পত্র নিতে হবে এবং বাচ্চার পাসপোর্ট করাতে হবে। চতুর্থত শিশুর জন্ম সনদ, দত্তকের চূড়ান্ত রায়, প্রযোজ্যতা অনুযায়ী শিশুর মা-বাবার মৃত্যু সনদ, শিশু এতিম হওয়ার প্রমাণ, লিখিত ত্যাগনামা, দত্তক নিতে ইচ্ছুক অভিভাবকের সঙ্গে ইতিপূর্বে যোগাযোগ থাকার প্রমাণসহ শিশুটিকে নিকটাত্মীয় হিসেবে প্রমাণের জন্য ফরম আই-৬০০, পিটিশন টু ক্লাসিফাই অরফান অ্যাজ অ্যান ইমিডিয়েটিভ রিলেটিভের মাধ্যমে আবেদন করতে হবে। যেহেতু আই-৬০০-এ ইতিমধ্যে অনুমোদিত হয়েছে, তাই এবার আর আই-৬০০-এর জন্য নতুন করে কোনো ফি দিতে হবে না।
আপনি যে শিশুকে দত্তক নেওয়ার জন্য আমেরিকায় আনতে চান এই পর্যায়ে ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব স্টেট এর অধীনে পরিচালিত ঢাকায় কনস্যুলেট অফিস থেকে তার জন্য একটি ইমিগ্রান্ট ভিসা প্রয়োজন হবে। অ্যাডপশনের জন্য প্রযোজ্য ইমিগ্রান্ট ভিসাগুলো হলো আইএইচ-থ্রি, আইএইচ-ফোর, আইআর-২, আইআর-৩ এবং আইআর-৪। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে নন-হেগ অ্যাডপশন প্রসেস অনুসরণ করায় আইআর-৪ ভিসা দেওয়া হয়। কনস্যুলার অফিসার আই-৬০৪, ডিটারমিনেশন অন চাইল্ড ফর অ্যাডপশন সম্পন্ন করে ভিসা দেওয়ার জন্য ইন্টারভিউয়ের তারিখ উল্লেখ করে চিঠি দেবেন। ইন্টারভিউয়ের কমপক্ষে দুই সপ্তাহ আগে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য অনুমোদিত চিকিৎসকের কাছ থেকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে হবে। ডাক্তারি পরীক্ষার সময় সব আবেদনকারীকে তাঁর পাসপোর্ট ও চার কপি ছবি সঙ্গে নিতে হবে। ১৫ বছরের বেশি বয়সী আবেদনকারীর জন্য ৩ হাজার ৪৫০ টাকা ফি দিতে হবে।
গত কয়েক বছরের চিত্র ঘেঁটে দেখা যায়, গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ থেকে নিয়মিত আমেরিকায় দত্তক শিশু আনা হয়েছে। এর মধ্য ২০১৫ সালে ৯, ২০১৪ সালে ১৯, ২০১৩ সালে ১৪, ২০১২ সালে ১৯, ২০১১ সালে ১০, ২০১০ সালে ১০ ও ২০০৯ সালে ১২টি শিশু আমেরিকায় দত্তক হিসেবে আনা হয়েছে।
চাইল্ড সিটিজেনশিপ অ্যাক্ট ২০০১-এর আওতায় আমেরিকায় প্রবেশের পর দত্তক নেওয়ার দিন তার বয়স ১৮-এর কম হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সে আমেরিকার নাগরিক হয়ে যাবে। এরপর তাঁর নাগরিকত্ব সনদের জন্য এন-৬০০ ফরমের মাধ্যমে এবং পাসপোর্টের জন্য ডিএস-১১ ফরমের মাধ্যমে আবেদন করতে হবে। নাগরিকত্ব সনদের জন্য এন-৬০০ ফরম জমা দেওয়ার ফি ১ হাজার ১৭০ ইউএস ডলার হলেও কারও বার্ষিক আয় ইউএস ফেডারেল পভার্টি গাইড লাইনের ১৫০ শতাংশের কম হলে অথবা আপনি যদি মেডিকেইড, ফুড স্টাম্প বা হাউজিংয়ের মতো কোনো একটি মিনস-টেস্টেড বেনিফিট পান তাহলে আপনার সন্তানের সিটিজেনশিপ সনদের জন্য এন-৬০০ ফরম বিনা মূল্যে জমা দিতে পারবেন। ১৬ বছরের বেশি বয়সী সন্তানের পাসপোর্টের জন্য ডিএস-১১ ফরম জমা দেওয়ার ফি হবে ১৩৫ ইউএস ডলার আর ১৬ বছরের কম বয়সী সন্তানের জন্য এই ফি হবে ১০৫ ডলার।
লেখক: ব্যারিস্টার, নিউইয়র্ক প্রবাসী
মোব: (৯২৯) ৩৯১-৬০৪৭, ই-মেইল: [email protected]