মার্কিন সিনেটের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে যাবে
সিনেটে রিপবালিকানদের আসন ৫৩ টি, ডেমোক্র্যাটদের আসন ৪৭
মোট ৩৫টি সিনেট আসনে নির্বাচন হচ্ছে, যার ২৩টিই রিপাবলিকান আসন
১২টি সিনেট আসনে বদলের সম্ভাবনা রয়েছে, যার ১০টি রিপাবলিকান
প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ডামাডোলে মার্কিন সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদের নির্বাচনের বিষয়টি অনেকটা চাপা পড়ে যাচ্ছে। কিন্তু প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মতোই এ দুটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মার্কিন আইনসভার উভয় কক্ষে কারা সংখ্যাগরিষ্ঠ তার ওপর অনেক কিছুই নির্ভর করে। প্রেসিডেন্ট যিনিই হোন না কেন, তাঁর দল প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠ না হলে তিনি অনেক কিছুই করতে পারেন না।
ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সময়ও বিষয়টি দেখা গেছে। প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্প এমন অনেক কিছুই করতে পারেননি, যা উভয় কক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলে তিনি করতে পারতেন। আবার এই যে এখন সুপ্রিম কোর্টে বিচারপতি নিয়োগ প্রায় তিনি নিশ্চিত করে ফেলেছেন, তা তিনি পারছেন সিনেটে রিপাবলিকান দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে।
প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ডামাডোলের মধ্যেই সিনেট নির্বাচন বেশ জমে উঠেছে। এরই মধ্যে রিপাবলিকান নেতাদের মধ্যে সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে
এ বছর প্রতিনিধি পরিষদের সবগুলো আসনে এবং সিনেটের ৩৫টি আসনে নির্বাচন হচ্ছে। সিনেটে এখন রিপাবলিকান-ডেমোক্র্যাট আসনের অনুপাত ৫৩-৪৭। ফলে রিপাবলিকানদের এখন অন্যতম বড় লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখা। আর ডেমোক্র্যাটরা চাইছে নতুন করে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে। এ লড়াইয়ে ডেমোক্র্যাটদের রিপাবলিকানদের থেকে চারটি আসন ছিনিয়ে নিতে হবে। অবশ্য বাইডেন প্রেসিডেন্ট হলে তিনটি রিপাবলিকান আসনে জয় পেলেই ভাইস প্রেসিডেন্টের ‘টাইব্রেকার’ ক্ষমতার বদৌলতে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে যাবে ডেমোক্র্যাটরা। অন্যদিকে রিপাবলিকানদের কোনো আসন হারালে চলবে না। বড়জোর দুটি আসন হাতছাড়া করার ধকল নিতে পারে তারা।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ডামাডোলের মধ্যেই সিনেট নির্বাচন বেশ জমে উঠেছে। এরই মধ্যে রিপাবলিকান নেতাদের মধ্যে সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই আশঙ্কার পেছনে সবচেয়ে বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করছেন স্বয়ং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কোভিড-১৯ মোকাবিলায় ব্যর্থতার দায় এখন গিয়ে পড়ছে রিপাবলিকান সিনেটরদের ওপরও।
এবার যে সিনেট আসনগুলোয় নির্বাচন হচ্ছে, তার মধ্যে ২৩টিতেই রয়েছেন রিপাবলিকান সিনেটর। আর ১২টিতে রয়েছেন ডেমোক্র্যাট সিনেটর। এর মধ্যে ১২টি সিনেট আসনে পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা রয়েছে। রয়টার্স বলছে, এই ১২ আসনই সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতার সমীকরণটি ঠিক করবে। এর মধ্যে ১০টি আসনে রয়েছেন রিপাবলিকান সিনেটর। আর ২টিতে রয়েছেন ডেমোক্র্যাট সিনেটর। ফলে ডেমোক্র্যাটরা উজ্জীবিত, আর রিপাবলিকানদের কপালে এই মুহূর্তে চিন্তার ভাঁজ। দেখা যাক কোন অঙ্গরাজ্যগুলো এবার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—
রিয়্যালক্লিয়ারপলিটিকস ডটকমের তথ্যমতে, অ্যারিজোনার ওই সিনেট আসনে জনমত জরিপে মার্থা ম্যাকস্যালি থেকে মার্ক কেলি ৮ শতাংশ পয়েন্ট ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছেন
অ্যারিজোনা
অ্যারিজোনার রিপাবলিকান সিনেটর মার্থা ম্যাকস্যালি এবার আসনটি ধরে রাখতে লড়ছেন ডেমোক্রেটিক দলের প্রার্থী মার্ক কেলির সঙ্গে। জনমত জরিপগুলোয় দেখা যাচ্ছে, মার্ক কেলি তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী থেকে বেশ এগিয়ে রয়েছেন। নির্বাচনী তহবিলও তাঁর বেশি।
নির্বাচনী প্রচার সম্পর্কিত ওয়েবসাইট রিয়্যালক্লিয়ারপলিটিকস ডটকমের তথ্যমতে, অ্যারিজোনার ওই সিনেট আসনে জনমত জরিপে মার্থা ম্যাকস্যালি থেকে মার্ক কেলি ৮ শতাংশ পয়েন্ট ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছেন।
কলোরাডো
কলোরাডোর রিপাবলিকান সিনেটর কোরি গার্ডনারকে এবার সিনেট আসনটি ছেড়ে দিতে হতে পারে। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী জন হিকেনলুপার অঙ্গরাজ্যটির গভর্নর ছিলেন দুই মেয়াদে। এবার তিনি সিনেট নির্বাচনে দাঁড়িয়েছেন দলের পূর্ণ সমর্থন নিয়ে। নির্বাচনী তহবিলও বেশ বড়। অন্যদিকে ট্রাম্পের তল্পিবাহক হিসেবে পরিচিত কোরি গার্ডনারের ওপর ভোটারদের বিরক্তিও এখন আর অপ্রকাশিত নয়। অঙ্গরাজ্যটিতে সিনেট দৌড়ে হিকেনলুপার বর্তমান সিনেটর কোরি গার্ডনার থেকে জনসমর্থনে দুই অঙ্কের ব্যবধানে এগিয়ে। ফাইভথার্টিএইট ডটকমের জনমত জরিপের তথ্য বলছে, এবার এই আসনটি ধরে রাখতে পারছে না রিপাবলিকান দল।
জর্জিয়া
জর্জিয়ার রিপাবলিকান সিনেটর ডেভিড পারডু দ্বিতীয় মেয়াদে সিনেটর হতে পারবেন কিনা, তা নিয়ে জোর সংশয় তৈরি হয়েছে। নিজেকে খোলাখুলিভাবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে পরিচয় দেওয়াটাই এখন তাঁর কাল হচ্ছে। রিয়েলক্লিয়ারপলিটিকসের জনমত জরিপ বলছে, প্রতিদ্বন্দ্বী জন ওসফ থেকে তিনি খুবই কম ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছেন। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে তাঁর সিনেট নির্বাচনে। অঙ্গরাজ্যটির সাধারণ মানুষের মধ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের কোভিড-১৯ মোকাবিলায় ব্যর্থতা নিয়ে সুস্পষ্ট ক্ষোভ রয়েছে।
একই অঙ্গরাজ্যের আরেক রিপাবলিকান সিনেটর জনি আইজ্যাকসন অবসরে যাওয়ায় দ্বিতীয় এ সিনেট আসনেও নির্বাচন হচ্ছে। তাঁর আসনে এবার রিপাবলিকান দল থেকে দাঁড়িয়েছেন কেলি লোফলার, যিনি গত বছর আইজ্যাকসনের হয়ে দায়িত্ব পালন করেন। এবার তিনি সরাসরি ভোটে দাঁড়িয়েছেন। এদিকে একই দল থেকে তাঁকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন ডাউ কলিনস। তাঁদের মধ্যে প্রাথমিক বাছাইয়ের পর রিপাবলিকান প্রার্থী নির্ধারিত হবে। নভেম্বরেই এ আসনের ফল জানা না গেলেও প্রবণতা বলছে, এই আসনটিও হারাতে হতে পারে রিপাবলিকানদের। কারণ, রিপাবলিকানরা যখন তাদের প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে ব্যস্ত, তখন ডেমোক্রেটিক দলের প্রার্থী রাফায়েল ওয়ারনক এগিয়ে যাচ্ছেন প্রচারকাজে। ফলে জনমত জরিপে তিনি বেশ এগিয়ে গেছেন এরই মধ্যে।
আইওয়া
আইওয়া অঙ্গরাজ্যের রিপাবলিকান সিনেটর জনি আর্নস্টের চেয়ে বেশ ভালো ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী থেরেসা গ্রিনফিল্ড। নির্বাচনী তহবিলের দিক থেকেও এগিয়ে রয়েছেন গ্রিনফিল্ড। এবার এই অঙ্গরাজ্যটি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও সুইং স্টেট তকমা পাওয়ায় রিপাবলিকান সিনেটরের আসন ধরে রাখা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।
এখানে বিবেচনা বিষয় করোনা পরিস্থিতিও। গত মার্চ-জুন সময়ে এই অঙ্গরাজ্যের প্রচুর মানুষ করোনা আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের করোনা মোকাবিলায় ব্যর্থতা এই অঙ্গরাজ্যে একটি বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করবে।
কানসাসে ১৯৩২ সালের পর কোনো ডেমোক্র্যাট সিনেট নির্বাচনে জয় পাননি
কানসাস
কানসাসে ১৯৩২ সালের পর কোনো ডেমোক্র্যাট সিনেট নির্বাচনে জয় পাননি। কিন্তু এ বছর ভিন্ন কিছু ঘটতে পারে। অঙ্গরাজ্যটির ডেমোক্রেটিক স্টেট সিনেটর বারবারা বোলিয়ার ও প্রতিনিধি পরিষদের রিপাবলিকান সদস্য রজার মার্শাল এবার আসনটির জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তহবিল সংগ্রহে বোলিয়ার অনেক এগিয়ে। জনমত জরিপ বলছে, তাঁদের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে।
মেইন
এই অঙ্গরাজ্যে রিপাবলিকান সিনেটর সুসান কলিনস চতুর্থ মেয়াদে দায়িত্ব পালন করছেন। উদারনৈতিক ও স্বাধীন সিনেটর হিসেবে পরিচিত হলেও সম্প্রতি তাঁর জনপ্রিয়তায় ধস নেমেছে। কারণ ডোনাল্ড ট্রাম্প। ভোটারদের দৃষ্টিতে, গত চার বছরে সুসান ট্রাম্প প্রশাসনের বিতর্কিত বিভিন্ন পদক্ষেপের বিরুদ্ধে শক্ত হয়ে দাঁড়াতে পারেননি। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী মেইন অঙ্গরাজ্যের প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার সারা গিডিয়ন। এই ডেমোক্র্যাট এই মুহূর্তে জনমত জরিপে বেশ ভালো ব্যবধানে সুসান কলিনস থেকে এগিয়ে রয়েছেন।
মনটানা
মনটানার রিপাবলিকান সিনেটর স্টিভ ডায়ানসকে সিনেট আসনটি ধরে রাখতে এবার বেশ জোর লড়াই করতে হচ্ছে দুই মেয়াদে অঙ্গরাজ্যটির গভর্নর থাকা স্টিভ বুলকের বিরুদ্ধে। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত স্টিভ ডায়ানসের বিপরীতে স্টিভ বুলকের পরিচয় তিনি উদার ও মুক্তমনা ডেমোক্র্যাট। এরই মধ্যে বুলক বেশ ভালো নির্বাচনী তহবিলের পাশাপাশি জনমত জরিপে ডায়ানস থেকে কিছুটা এগিয়ে গেছেন।
নর্থ ক্যারোলাইনা
এবারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ব্যাটলগ্রাউন্ড অঙ্গরাজ্যগুলোর একটি নর্থ ক্যারোলাইনা। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মতোই এ অঙ্গরাজ্যের সিনেট নির্বাচনও নাটকীয় হয়ে উঠেছে। অঙ্গরাজ্যটিতে রিপাবলিকান সিনেটর টম টিলিসকে বেশ ভালোই চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছিলেন ডেমোক্রেটিক দলের প্রার্থী ক্যাল কানিংহাম। টানা কয়েক মাস দুই অঙ্কের ব্যবধানে এগিয়ে থেকেও এখন যৌন কেলেঙ্কারির ঘটনায় তিনি কিছুটা মিইয়ে পড়েছেন। এখনো তিনি এগিয়ে রয়েছেন; কিন্তু বেশি ব্যবধানে নয়। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের জমানায় যৌন কেলেঙ্কারির ঘটনা নির্বাচনে কতটা প্রভাব বিস্তার করে, তা-ই এখন দেখার বিষয়।
সাউথ ক্যারোলাইনা
শুনতে যেমনই লাগুক সাউথ ক্যারোলাইনার প্রতাপশালী রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের আসনটি ধরে রাখা নিয়েও এবার সংশয় তৈরি হয়েছে, যে কারণে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারের অংশ হিসেবে তিনি এখন আর ট্রাম্পের পক্ষে খুব একটা কথা বলছেন না। কারণ, তাঁর ডেমোক্র্যাট প্রতিদ্বন্দ্বী জেইমি হ্যারিসন তাঁকে বেশ ভালোই চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন। নির্বাচনী তহবিল ও জোর প্রচারে ভয় ধরিয়ে দিয়েছেন তিনি লিন্ডসে গ্রাহামের বুকে। লিন্ডসে গ্রাহাম এখনো এগিয়ে থাকলেও যেকোনো ঘটনায় এটি উল্টে যেতে পারে।
অন্যতম সুইং স্টেট মিশিগানে ডেমোক্রেটিক সিনেটর গ্যারি পিটারস তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান জন জেমস থেকে খুবই অল্প ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছেন
আলাবামা
আলাবামার ডেমোক্রেটিক সিনেটর ডাউ জোনসের সিনেট আসনটি নিয়ে এবার ডেমোক্রেটিক দল বেশ চিন্তায় পড়েছে। ২০১৭ সালে জেফ সেশনস ট্রাম্প প্রশাসনের অ্যাটর্নি জেনারেল হলে সেই শূন্য আসনে তিনি সিনেটর হন। সে সময় তাঁর জয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিল রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বী রয় মুরের বিরুদ্ধে ওঠা যৌন নিপীড়নের অভিযোগ। এবার তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী টমি টুবারভিল, যার কাছে চলতি বছর সিনেট নির্বাচনের দৌড়ে ফিরতে চাওয়া জেফ সেশনস প্রাথমিক বাছাইয়ে পরাজিত হয়েছেন। এখন পর্যন্ত টি টুবারভিল ডাউ জোনস থেকে বেশ ভালো ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছেন।
মিশিগান
অন্যতম সুইং স্টেট মিশিগানের ডেমোক্রেটিক সিনেটর গ্যারি পিটারস তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান জন জেমস থেকে খুবই অল্প ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছেন। জনমত জরিপে এখনো কিছুটা এগিয়ে থাকলেও শেষ পর্যন্ত তিনি নির্বাচনে জয় পাবেন কিনা, তা আগে থেকে বলার সুযোগ নেই।