শিশুদের বুকে জড়িয়ে ধরা অবস্থায় উদ্ধার হয় শিক্ষকের লাশ

ইভা মিরেলেস ও ইরমা গার্সিয়া।
ছবি: উভালডে স্কুল ডিস্ট্রিক্ট ওয়েবপেইজ

‘আমাদের সামনে চমৎকার একটি বছর!’ স্কুলে নতুন বছর শুরুর সময় শিক্ষক ইভা মিরেলেস অনেক স্বপ্ন নিয়ে শিক্ষার্থীদের এমন কথা শুনিয়েছিলেন। কিন্তু বছরটা এমন হবে কে জানত।

বিবিসির এক প্রতিবেদনে জানা যায়, গরমের ছুটির আগে গত মঙ্গলবার ইভা মিরেলেস (৪৪) ও তাঁর ফেলো শিক্ষক ইরমা গার্সিয়া (৪৮) সবকিছু গুছিয়ে নিচ্ছিলেন। টেক্সাসের ছোট উভালডে শহরের রব এলিমেন্টারি স্কুলের শিক্ষকতা করতেন দুজন। গরমের ছুটিতে হয়তো দুজনের অনেক পরিকল্পনাই ছিল। তবে সেসবের বদলে এখন দুজনের পরিবার তাঁদের শেষকৃত্যের আয়োজন করছে। কারণ, ওই স্কুলে বন্দুকধারীর গুলিতে ১৯ শিশু নিহত হয়। প্রাণ হারান এই দুই শিক্ষকও।

আরও পড়ুন

গত মঙ্গলবার টেক্সাসের ওই স্কুলে হামলার পর থেকে গার্সিয়া ও মিরেলেসের সাহসিকতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে প্রশংসিত হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, এই দুই শিক্ষক গুলি থেকে শিক্ষার্থীদের রক্ষা করতে সব রকমের চেষ্টা করেছিলেন।

গার্সিয়ার ভাতিজা জন মার্টিনেজ নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, গোলাগুলির পর যখন শিক্ষক গার্সিয়াকে উদ্ধার করা হয়, তখন তিনি শিশুদের বুকে জড়িয়ে ধরেছিলেন। জন মার্টিনেজ আরও বলেন, চরম বিপদের সময়েও তিনি বুকে আগলে শিক্ষার্থীদের জীবন রক্ষার জন্য চেষ্টা করেছেন। তিনি একজন হিরো।

গার্সিয়ার মৃত্যুর মাত্র দুই দিন পরে তাঁর স্বামী জো গার্সিয়া হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। এ সময় মার্টিনেজ জানান স্ত্রীর শোকে তাঁর মৃত্যু হয়েছে।

গার্সিয়া ও মিরেলেস পাঁচ বছর ধরে একই শিক্ষক দলে ছিলেন। তাঁদের দলগতভাবে কাজ করার অভিজ্ঞতা ৪০ বছরের।

উভালডে শহরের বাসিন্দা ও শিক্ষাবিদ নাতালি এরিয়াস বলেন, ইভা মিরেলেস ও ইরমা গার্সিয়া আমাদের স্কুলের খুবই ভালো শিক্ষক ছিলেন। তাঁরা যখন ক্লাস নিতেন তখন শিক্ষার্থীরা মজা, আনন্দে মেতে থাকত। শিক্ষার্থীরা আনন্দের সঙ্গে পড়াশোনা করত। সবাই এই দুই শিক্ষককে ভালোবাসত।

আরও পড়ুন

ইভা মিরেলেসের খালা লিডিয়া মার্টিনেজ ডেলগাডো এক বিবৃতিতে বলেন, ‘এভাবে গোলাগুলি চলতে পারে ভেবে আমি আতঙ্কিত। এই শিশুরা নিষ্পাপ। আগ্নেয়াস্ত্র এভাবে সবার কাছে সহজলভ্য থাকা উচিত নয়। তিনি আরও বলেন, এটা আমার শহর। এখানে ২০ হাজারেরও কম বাসিন্দা রয়েছে। কখনো ভাবতে পারিনি এমনটা ঘটবে, বিশেষ করে প্রিয়জনের সঙ্গে।’

মিরেলেসের স্বামী রুবেন রুইজ ওই স্কুলের একজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা। দুই মাস আগে তিনি স্কুলে গুলি চালানোর মহড়া করেন। যুক্তরাষ্ট্রের স্কুলগুলোতে প্রায়ই এমন মহড়া হয়। সে সময় তিনি জানতেন না কয়েক সপ্তাহ পরেই এমন ঘটনায় তাঁর স্ত্রীকে হারাতে হবে।

দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের খবরে জানা যায়, রব এলিমেন্টারি স্কুলে হামলার খবর শোনার পর রুইজ সেখানে ছুটে যান। তিনি স্ত্রীর কাছে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। পুলিশ কর্মকর্তারা তাঁকে আটকে রেখেছিলেন।


ওয়াশিংটন পোস্টের তথ্য অনুসারে ১৯৯৯ সালে কলোরাডোতে কলম্বাইন হাইস্কুলে হত্যার ঘটনার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের স্কুলগুলোতে হামলায় শিক্ষকসহ কমপক্ষে ১৮৫ শিশু নিহত হয়েছে।

স্কুলগুলোতে এ ধরনের গোলাগুলির ঘটনায় যারা নিহত হয়েছে, তাদের স্মরণে কানসাসে একটি স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন করা হয়েছে। সেই স্মৃতিস্তম্ভে এখন মিরেলেস ও গার্সিয়ার নাম যুক্ত হলো।

১৭ বছর ধরে শিক্ষকতা করেছেন মিরেলেস। স্কুল ডিস্ট্রিক্ট ওয়েবসাইটে মিরেলেসের সংক্ষিপ্ত জীবনবৃত্তান্ত দেওয়া হয়েছে। সেখানে মিরেলেস বলেছেন তাঁর আনন্দঘন, ভালোবাসাময় একটি পরিবার আছে। তাঁর স্বামী, তিনি ও স্নাতক পাস কন্যা তাঁর প্রিয় তিন বন্ধু।

মিরেলেসের মেয়ে আডালিন রুইজ টুইটে বলেন, ‘আমার মিষ্টি মাকে আমি হৃদয় নিংরানো শ্রদ্ধা জানাই। আমি খুবই খুশি যে মানুষ আমার মায়ের নাম জানে। মায়ের সুন্দর মুখটা চেনে। তারা জানে আমার মা একজন সাহসী নারী।’

ইভা মিরেলেস চতুর্থ গ্রেডের শিক্ষক। যুক্তরাষ্ট্রে এই ধাপের শিক্ষকেরা সৃজনশীল ও দায়িত্বশীল কাজে যুক্ত থাকেন। তিনি নিঃস্বার্থভাবে শিক্ষার্থীদের জীবন রক্ষার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। মিরেলেস বিশেষ শিশুদেরও শিক্ষা দিতেন। অড্রে গার্সিয়া নামের এক অভিভাবক বলেন মিরেলেস শুধু শিক্ষক ছিলেন না, তিনি শিশুদের বিকাশে অনেক ভূমিকা রাখতেন।

২৩ বছর ধরে শিক্ষকতা করেছেন গার্সিয়া। পুরো সময়টাই তিনি রব এলিমেন্টারি স্কুলে কাটিয়েছেন। ২০১৯ সালে তিনি সেরা স্কুলশিক্ষক হন। এলাকার ওয়েবসাইটে গার্সিয়া বলেন, ‘আমি নতুন বছরে স্কুল শুরু করতে পেরে খুবই আনন্দিত।’

কর্তৃপক্ষ গার্সিয়ার পরিবারকে বলেছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে থাকা তাঁর এক বন্ধু বলেছেন গার্সিয়া গুলির হাত থেকে কীভাবে শিক্ষার্থীদের প্রাণ বাঁচাচ্ছিল, তা তিনি দেখেছেন। তাঁর ভাতিজা জন মার্টিনেজ ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেন, নিজের জীবন বাজি রেখে তিনি শিশুদের বাঁচানোর চেষ্টা করেছেন।


জন মার্টিনেজ আরও বলেন, শিক্ষার্থীরা শুধু তাঁর শিক্ষার্থী ছিল না। তারা তাঁর সন্তান ছিল। তাদের জীবন রক্ষা করতে গিয়ে তাঁর প্রাণ গেছে। তিনি এ ধরনের মানুষ ছিলেন।

গার্সিয়া বিবাহিত ছিলেন। তাঁর চার সন্তান। দুজন ছেলে ও দুজন মেয়ে। তাদের বয়স ১২ থেকে ২৩ বছরের মধ্যে। ফেসবুক পেজে তিনি সুন্দর পরিবার ও শিশুদের জন্য ঈশ্বরের কাছে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিলেন।

ফেসবুক পেজে শিক্ষার্থীদের নিয়েও নানা পরিকল্পনার কথা বলেছিলেন গার্সিয়া। বলেছিলেন শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতে স্বাধীনচেতা নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর।