১৫ মে আমাদের হবে?

নিনা আহমেদ
নিনা আহমেদ

আমেরিকায় বাংলাদেশিদের জন্য ১৫ মে তারিখটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দিনটিতে পেনসিলভানিয়া অঙ্গরাজ্যের প্রাইমারি (প্রাথমিক বাছাই)। আমেরিকায় কোনো প্রবাসী বাংলাদেশির সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পদপ্রাপ্তি নির্ধারিত হতে যাচ্ছে এ দিনটিতে। রাজ্যের লেফটেন্যান্ট গভর্নর পদের জন্য নির্বাচনী মাঠে ড. নিনা আহমেদ। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এ নারীর দিকে নজর এখন শুধু পেনসিলভানিয়া নয়, সমস্ত আমেরিকার। 

এরই মধ্যে ভিন্ন ধাঁচের প্রার্থী হিসেবে আমেরিকার রাজনৈতিক আলোচনায় চলে এসেছেন নিনা আহমেদ। নির্বাচনে লড়াইয়ের জন্য এই অঙ্গরাজ্যে সবচেয়ে বড় তহবিল এখন তাঁর। আসছে নভেম্বরে মূল নির্বাচনে যাওয়ার আগে ১৫ মেতেই ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে যাবে নিনা আহমেদের। প্রাইমারি নির্বাচনে উতরে গেলে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য পেনসিলভানিয়ার দ্বিতীয় ক্ষমতাধর পদটি একজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আমেরিকানের হওয়া সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে। এখন পর্যন্ত আমেরিকায় এটাই হতে পারে কোনো বাংলাদেশি-আমেরিকানের বড় অর্জন।
পেনসিলভানিয়ার লেফটেন্যান্ট গভর্নর পদের জন্য লড়ছেন পাঁচজন ডেমোক্র্যাট। তাঁদের একজন নির্বাচনে সঙ্গী হবেন ডেমোক্র্যাট দলের গভর্নর প্রার্থী বর্তমান গভর্নর টম উলফের। চারজন রিপাবলিকানও আছেন এ নির্বাচনী দৌড়ে। রিপাবলিকানদের নির্বাচনী লড়াইয়ে আছেন স্কট ওয়াগনার, পল ম্যাঙ্গো এবং লোরা এলসোয়ার্থ। এত প্রার্থীর মধ্যে রাজ্যের লোকজন খুব বেশি কাউকে চেনে না। ফিলাডেলফিয়ার একটি প্রভাবশালী পত্রিকার মন্তব্য, প্রার্থীদের মধ্যে তিনজনের নাম বলতে পারা লোকজনকে খুবই রাজনৈতিকসচেতন নাগরিক বলা যেতে পারে। যদি একজনের নামও বলতে না পারেন, খারাপ বোধ করার কোনো কারণ নাই। এটাই স্বাভাবিক—মন্তব্য সংবাদমাধ্যমটির। 

পেনসিলভানিয়ার লেফটেন্যান্ট গভর্নর পদের নির্বাচনটি আলোচিত হয়ে উঠেছে ভিন্ন কারণে। এ পদে পুনর্নির্বাচনের জন্য লড়ছেন বর্তমান লেফটেন্যান্ট মাইক স্টেক। নানা অনৈতিকতার অভিযোগ তাঁর বিরুদ্ধে। পুনর্নির্বাচন নিয়ে সংশয়ে খোদ সমর্থকেরা। অধস্তন কর্মীদের সঙ্গে আচরণ নিয়ে ইন্সপেক্টর জেনারেল তদন্ত করেছেন স্টাকের বিরুদ্ধে। তারপরও রাজ্যজুড়ে তাঁর নাম-পরিচয় আছে। আমেরিকার হালের রাজনীতিতে নৈতিকতা নিয়ে কেউ বাজি রাখতে পারবে না। রাজনীতির ট্রাম্প-সংস্কৃতিতে মাইক স্টেক প্রাইমারিতে টিকে গেলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। মাইক স্টেকের প্রচারণা ব্যবস্থাপক মার্টি মার্কস বলেছেন, রাজ্যজুড়ে বিভক্ত নির্বাচনী মাঠে তাদের অবস্থা খুবই অনুকূলে। নির্বাচনী মাঠে নিনা আহমেদের সঙ্গে রয়েছেন ব্রাডক শহরের মেয়র জন ফেটারম্যান, মন্টগোমেরি কাউন্টির ব্যবসায়ী রে সসা এবং চেস্টার কাউন্টি কমিশনার কেথি কোজনি।
লেফটেন্যান্ট গভর্নরের এ নির্বাচনী লড়াইয়ে নিজেকে অনেকটাই পৃথক রেখেছেন গভর্নর টম উলফ। এ রাজ্যের প্রাইমারি গভর্নর এবং লেফটেন্যান্ট গভর্নরকে আলাদাভাবে মোকাবিলা করতে হয়।
পেনসিলভানিয়া রাজ্যের পশ্চিমাঞ্চলের একমাত্র প্রার্থী জন ফাটারম্যান। ২০১৬ সালের প্রাইমারিতে লড়েছিলেন ফাটারম্যান। ফলে রাজ্যজুড়ে তাঁর কিছু পরিচিতি আছে। পশ্চিমের নিজের এলাকায় পাস করে রাজ্যের অন্য এলাকায়ও ভোট পাবেন বলে মনে করছেন। ফিলাডেলফিয়াভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মার্ক নেভিন্স বলেছেন, অতীত বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাজ্যের পশ্চিমের লোকজন নিজেদের এলাকার প্রার্থীকেই ভোট দিয়েছে। এ ক্ষেত্রে পশ্চিমের প্রার্থীর অন্যান্য অঞ্চলে ভোট পেতে তেমন অসুবিধা হয়নি। গতানুগতিক ধারার রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের বাইরে ফাটারম্যানের একটা ভাবমূর্তি আছে বলে সমর্থকদের মধ্যে তাঁকে নিয়ে আশাবাদ জেগে উঠেছে।
এসবের মধ্যে নিনা আহমেদকে পেনসিলভানিয়া প্রাইমারিতে তুরুপের তাস মনে করা হচ্ছে। নিজের ৫ লাখ ডলার ছাড়াও নির্বাচনী তহবিল সংগ্রহে নিনা আহমেদ অন্য সবার চেয়ে এগিয়ে আছেন।
আমেরিকার রাজনীতিতে নির্বাচনী তহবিল সব সময়ই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। প্রচারণার ব্যয়বহুল পথ মাড়িয়ে নিজের বক্তব্য বেশি মানুষের কাছে পৌঁছানোর জন্য স্ফীত তহবিলের কোনো বিকল্প নেই।
প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করা ছাড়াও নিনা আহমেদ গুরুত্বপূর্ণ নগর ফিলাডেলফিয়ার ডেপুটি মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর উইমেনের ফিলাডেলফিয়া চ্যাপ্টারের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। বাংলাদেশি-আমেরিকান এ বিজ্ঞানী এমন এক সময় নির্বাচনে নেমেছেন, যখন আমেরিকার রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। কিছুদিন আগেও আমেরিকার রাজনীতিতে আইনজীবীদের প্রাধান্য ছিল। হালে অন্য পেশার লোকজনের ঝোঁক বেড়েছে। জনগণের আগ্রহও দেখা যাচ্ছে এসব প্রার্থীকে নিয়ে। পেনসিলভানিয়ার দক্ষিণের কাউন্টারগুলোতে ব্যাপক ভোটার উপস্থিতি ঘটলে, নিনা আহমেদের বিজয় ঠেকিয়ে রাখা অন্যদের পক্ষে মুশকিল হবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা।
নিনা আহমেদের প্রচারণা উপদেষ্টা কেন স্নাইডার বলেছেন, নিনা আহমেদ অনগ্রসরদের জন্য লড়াই করে উঠে আসা প্রার্থী। বর্ণবিদ্বেষ আর বৈষম্যের বিরুদ্ধে তিনি লড়াই করেছেন। তাঁর এ সংগ্রামের ইতিবৃত্ত জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার লোকও আছেন নির্বাচনী মাঠে। নিনা আহমেদের বন্ধু, যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি কমিউনিটির সক্রিয় সংগঠক ডা. জিয়াউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, প্রার্থী হিসেবে নিনা আহমেদ তাঁর বক্তব্য নিয়ে যাচ্ছেন ভোটারদের কাছে। ভোটার উপস্থিতি ভালো হলে তাঁর বিজয় অনেকটাই নিশ্চিত।
প্রথম আলোকে দেওয়া বক্তব্যে নিনা আহমেদ বলেছেন, শুধু পেনসিলভানিয়া নয় নিউইয়র্ক, নিউ জার্সিসহ সর্বত্র বাংলাদেশিদের কাছ থেকে তিনি অভূতপূর্ব সাড়া পেয়েছেন। নির্বাচনী তহবিল সংগ্রহ থেকে শুরু করে সমর্থন ও উৎসাহ দিয়ে প্রবাসীরা তাঁর নির্বাচনী প্রচারণাকে বেগবান করেছেন বলে তিনি কৃতজ্ঞতার সঙ্গে উল্লেখ করেন।
প্রাইমারি নির্বাচনের আর মাত্র কয়েকটা দিন বাকি, এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসীরা চেয়ে আছেন পেনসিলভানিয়ার দিকে। অন্য রাজ্যে বসবাসকারী প্রবাসীরা পেনসিলভানিয়ায় ফোন করছেন। স্বজন-পরিজনকে নিনা আহমেদের প্রচারণায় যোগ দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন। ভোটার তালিকাভুক্তি ছাড়াও প্রচারণায় স্বেচ্ছাসেবা দেওয়ার সুযোগ আছে।
সব ভালোয় ভালোয় গেলে ১৫ মে আমাদের হবে। বাংলাদেশি-আমেরিকান নিনা আহমেদকে প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের রাজ্য সরকারের দ্বিতীয় ক্ষমতাধর পদে দেখা যাবে—প্রত্যাশা প্রবাসীদের।