অস্ট্রেলিয়ায় গাড়িচাপায় পা হারালেন নারী এমপি
‘পারিবারিক বন্ধু’ কেন এই হামলা করলেন, সেই রহস্য খুঁজছে পুলিশ
অস্ট্রেলিয়ায় ফেডারেল পার্লামেন্টের স্বতন্ত্র নারী সদস্য (এমপি) হেলেন হেইন্সকে (৬৫) নিজের কার্যালয়ের সামনে গাড়িচাপা দিয়ে হত্যাচেষ্টার ঘটনায় সবচেয়ে বড় বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে হামলাকারীর পরিচয়। সন্দেহভাজন ওই হামলাকারী এমপির ২০ বছরের পুরোনো পারিবারিক বন্ধু। ঠিক কী কারণে দীর্ঘদিনের চেনা একজন মানুষ এমন ভয়াবহ হামলা চালালেন, এখন সে প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজছে পুলিশ।
গ্রেপ্তার ওই ব্যক্তির বাবা জানিয়েছেন, ওই এমপি তাঁদের পারিবারিক বন্ধু। ২০ বছরের পুরোনো এই সম্পর্ক।
৪৩ বছর বয়সী ব্রেন্ডন নিউজান্ট নামের ওই ব্যক্তি কেন এমন ভয়ংকর হামলা চালালেন, তা নিয়ে সবাই অবাক। কারণ, ব্রেন্ডন সব সময় এমপি হেলেনের কাজের প্রশংসা করতেন এবং তাঁকে দারুণ সমর্থন করতেন।
পুলিশ তাঁকে একজন পরিবেশকর্মী হিসেবে শনাক্ত করেছে। ব্রেন্ডন মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পরিবেশবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর পাস করেছেন। তিনি এর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইসরায়েলকে সমর্থনের কারণে ব্রিটেনের সমালোচনা করেছিলেন।
ইন্ডি আসনের স্বতন্ত্র এমপি হেলেন হেইন্স পরিবেশের পক্ষে কথা বলতেন এবং গাজায় ইসরায়েলি ধ্বংসযজ্ঞ নিয়ে অস্ট্রেলিয়া সরকারের নীরবতার নিন্দা জানাতেন। এসব কারণে ব্রেন্ডন আগে তাঁর প্রশংসাও করেছিলেন।
হেলেন এমপি হওয়ার পর ফেসবুকে সমর্থন জানিয়ে পোস্ট শেয়ার করেছিলেন ব্রেন্ডন। এমনকি তাঁর নির্বাচনী এলাকায় কনজারভেটিভ দলের অর্থায়নে হওয়া ‘স্বতন্ত্র-বিরোধী প্রচারণার’ সমালোচনা করে একটি পোস্ট এমপি হেলেনকেও ট্যাগ করেছিলেন তিনি।
ব্রেন্ডনের বাবা রড নিউজান্ট একটি বিবৃতি প্রকাশ করে বলেছেন, তাঁর পরিবার ২০ বছর ধরে মিসেস হেইন্সের বন্ধু। তিনি এই ‘ভয়াবহ অপরাধের’ তদন্তে পুলিশকে সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি বলেন, কয়েক মাস ধরে ব্রেন্ডনের আচরণে অস্বাভাবিকতা দেখা যাচ্ছিল।
রড নিউজান্ট বিবৃতিতে বলেন, ‘হেলেন হেইন্স আমাদের স্থানীয় সমাজের একজন গভীরভাবে সম্মানিত, মূল্যবান এবং অনেক প্রিয় সদস্য।’ তিনি বলেন, ‘হেলেন ২০ বছরের বেশি সময় ধরে আমাদের বন্ধু এবং গতকাল তাঁর সঙ্গে যা ঘটেছে, তা চরম ধ্বংসাত্মক এবং ভাবনার অতীত। আমাদের সব ভালোবাসা ও প্রার্থনা হেলেন এবং তাঁর পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে রয়েছে।’
এত ভালো সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও কেন তিনি এই হামলা করলেন? মঙ্গলবার গোয়েন্দারা ব্রেন্ডনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। তবে পুলিশ জানিয়েছে হামলার আসল উদ্দেশ্য এখনো অস্পষ্ট।
পুলিশ ধারণা করছে, ব্রেন্ডনের মানসিক সমস্যা থাকতে পারে। তিনি সামাজিক মাধ্যমে ‘দীর্ঘস্থায়ী ব্যথায়’ ভোগার কথাও বলেছিলেন এবং জানিয়েছিলেন যে তিনি ‘নিঃস্ব’ বা আর্থিকভাবে কষ্টে আছেন।
ধারণা করা হচ্ছে, পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের আগে ব্রেন্ডনকে একবার মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হবে।
অনলাইনে খুব রাগ দেখাতেন ব্রেন্ডন
ব্রেন্ডন অনলাইনে রাজনীতি নিয়ে অনেক সরব ছিলেন। ২০২৪ সালের একটি পোস্টে গাজায় যুদ্ধ বন্ধের জন্য ইসরায়েলকে আহ্বান জানানোর পর তিনি সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমারেরও সমালোচনা করেছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, ‘ইসরায়েল যে রাফায় নির্দোষ মানুষের ওপর বোমা বর্ষণ করছে, তার একমাত্র কারণ হলো, আপনাদের মতো মানুষ তাদের এটা করার জন্য কূটনৈতিক ঢাল এবং সামরিক সহায়তা দেয়।’
আরেকটি পোস্টে ব্রেন্ডন অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওংকে আক্রমণ করেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে ‘হাজার হাজার শিশু হত্যার জন্য ইসরায়েলকে দায়মুক্তি দেওয়ার’ অভিযোগ তোলেন।
এমপি হেলেনের চিন্তাভাবনাও ব্রেন্ডনের মতোই ছিল। একজন সাবেক ধাত্রী মিসেস হেইন্স স্বাস্থ্যবিষয়ক প্ল্যাটফর্মে প্রচার চালিয়েছিলেন এবং ২০১৯ সালে নির্বাচিত হওয়ার পর ‘শক্তিশালী পরিবেশ সুরক্ষার পক্ষে জোরালো কণ্ঠস্বর’ হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
পরিবেশ ধ্বংসকারীদের কঠোর শাস্তির বিধান রেখে অস্ট্রেলিয়ার সংরক্ষণ আইন সংস্কারের প্রস্তাবে হেইন্স সমর্থন জানিয়েছিলেন। এমনকি ফিলিস্তিনিদের দুর্দশা নিয়েও তিনি বারবার কথা বলেছেন।
ভয়ংকর সেই ঘটনা
সোমবার মেলবোর্নের উত্তর-পূর্বে ওয়াঙ্গারাট্টায় নিজ নির্বাচনী কার্যালয়ের বাইরে হেলেন হেইন্সের ওপর ব্রেন্ডন নিউজান্ট তাঁর টয়োটা ল্যান্ড ক্রুজারটি দুবার তুলে দেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
হেইন্স তাঁর নির্বাচনী এলাকায় একটি ডগ পার্কের উদ্বোধনে অংশ নিয়েছিলেন। তিনি কার্যালয়ের বাইরে নিজের গাড়ির পেছন থেকে জিনিসপত্র নামাচ্ছিলেন, ঠিক সে সময় গাড়িটি তাঁর দিকে ধেয়ে আসে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, তাঁরা সাদা রঙের ল্যান্ড ক্রুজারটিকে ওয়াঙ্গারাট্টার পূর্বে ৪০০ মানুষের শহর টারাউইনগির প্রধান সড়কে ইউটার্ন নিতে দেখেন। এরপর এটি কার পার্কে ঢুকে তাঁকে (হেইন্স) ধাক্কা দেয় এবং পরে উল্টো দিকে (রিভার্স) গিয়ে তাঁকে দ্বিতীয়বার ধাক্কা দেয়।
আরেকজন প্রত্যক্ষদর্শী সিডনি মর্নিং হেরাল্ডকে বলেছেন, তাঁরা গাড়িটিকে হেলেন হেইন্সকে কয়েকবার ধাক্কা দিতে দেখেছেন।
এই ভয়াবহ হামলার কারণে ৬৫ বছর বয়সী হেইন্সের একটি পা কেটে ফেলতে হয়েছে। মেলবোর্নের আলফ্রেড হাসপাতালে চিকিৎসকেরা তাঁর অন্য পা বাঁচানোর জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
সাহায্য করতে এগিয়ে আসা পথচারীরা জানান, সন্দেহভাজন ওই ব্যক্তির কাছে একটি ছুরি ছিল এবং তাঁকে এলোমেলো কথা বলতে দেখা যায়।
রিকি জেফরিস নামের একজন সেলুনকর্মী গাড়ির দিকে দৌড়ে যান। তিনি ব্রেন্ডনকে গাড়ি থেকে টেনে বের করেন এবং পুলিশ আসা পর্যন্ত তাঁকে শক্ত করে ধরে রাখেন। একটি দোকানের কর্মী কোডি লাপোইদেভিনও এ সময় দ্রুত এগিয়ে এসে তাঁকে সাহায্য করেন।
জেফরিস বলেন, ‘তার কাছে একটি ছুরি ছিল। সে এটি বের করেনি। আমি তার নড়াচড়া দেখে ভরসা পাচ্ছিলাম না, তাই আমি কেবল তার পকেট থেকে ওটা বের করে ছুড়ে ফেলে দিই।’
পথচারীরা হেইন্সের পায়ে সাময়িক ব্যান্ডেজ লাগিয়ে দেন এবং পুলিশকে ডাকেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই পুলিশ কর্মকর্তারা ব্রেন্ডনকে আটক করেন। হেইন্সকে প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে এবং পরে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে মেলবোর্নে উড়িয়ে নেওয়া হয়।